অধিকার পত্র ডটকম
সম্পাদকীয় | অধিকার পত্র ডটকম
একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলনা ও স্বপ্ন। তার চারপাশে থাকার কথা নিরাপত্তা, স্নেহ, শিক্ষা, খেলাধুলা এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু শিশুর শৈশব এখনো শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও মানসিক চাপে বিপন্ন।
৬ অক্টোবর শিশু অধিকার দিবস ২০২৬। এবারের জাতীয় আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তিও উদযাপিত হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার কথা বলার আগে আমরা কি তার বর্তমানটুকু সুরক্ষিত করতে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আইন, নীতিমালা কিংবা সরকারি বক্তব্য দেখলে হবে না। দেখতে হবে একজন শিশু বাস্তবে কী পাচ্ছে এবং কী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের শিশুদের অধিকার কী?
বাংলাদেশের শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় একাধিক আইন ও নীতিমালা রয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা ও শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থার কাঠামো দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেরও অংশীদার।
শিশুর বেঁচে থাকা, পরিচয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিকাশ, পরিবারে বেড়ে ওঠা, সহিংসতা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা, নিজের মতামত প্রকাশ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ—এসব অধিকার স্বীকৃত।
কিন্তু অধিকার স্বীকৃত হওয়া এবং অধিকার বাস্তবে ভোগ করা এক বিষয় নয়।
২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী মাত্র ৫৯.২ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন হয়েছে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। আর ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে।
অর্থাৎ আইন আছে, কিন্তু বাস্তবতা এখনো আইনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়নি।
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন: শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু “আইন কঠোর নয়”—এভাবে দেওয়া ভুল হবে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনের সংজ্ঞা ও শাস্তির কাঠামো আরও সংশোধন করা হয়েছে। ধারা ৯ অনুযায়ী নারী বা শিশুকে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ছেলে শিশুর ওপর নির্দিষ্ট ধরনের যৌন অপরাধকেও আইনের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জামিনের ক্ষেত্রেও আইন কঠোর। ধারা ১৯ অনুযায়ী এই আইনের অধীন অপরাধগুলো বিচারার্থ গ্রহণীয় এবং মূল ও প্রত্যক্ষভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দেওয়ার আগে অভিযোগকারী পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিতে হয় এবং আদালতকে নির্দিষ্ট শর্তে সন্তুষ্ট হতে হয়। তবে আইনে এমন পরিস্থিতিও রয়েছে যেখানে আদালত নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে জামিন দিতে পারে। তাই “সব নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা অজামিনযোগ্য”—এমন সরল বক্তব্য আইনগতভাবে সঠিক নয়।
তাহলে এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না কেন?
কারণ শাস্তির আইন অপরাধ ঘটার পর কাজ করে; শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কাজ হলো অপরাধ ঘটার আগেই ঝুঁকি কমানো।
আমাদের বড় দুর্বলতা এখানেই।
প্রথম সমস্যা—অপরাধী অনেক সময় অপরিচিত নয়
শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে “অপরিচিত একজন অপরাধী এসে শিশুকে তুলে নিয়ে গেল”—এমন ধারণা বাস্তবতার পুরোটা তুলে ধরে না।
UNICEF Bangladesh ২০২৫ সালের মার্চে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ হলো—অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগী শিশুর পরিচিত ব্যক্তি। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা এমন ব্যক্তিও হতে পারে যার ওপর শিশু ও পরিবার আস্থা রাখে।
এ কারণে শুধু রাস্তা বা অপরিচিত মানুষের ভয় দেখিয়ে শিশুকে নিরাপদ করা যাবে না।
শিশুকে শেখাতে হবে—কেউ পরিচিত হলেই তার সব আচরণ নিরাপদ নয়।
দ্বিতীয় সমস্যা—শিশু কথা বলতে ভয় পায়
যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সহযোগী হলো নীরবতা।
অনেক শিশু জানে না কার কাছে বলবে। কেউ ভয় পায় তাকে বিশ্বাস করা হবে না। কেউ ভয় পায় পরিবার ভেঙে যাবে। কেউ অপরাধীর হুমকির কারণে চুপ থাকে। আবার কোনো কোনো পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে ঘটনা গোপন করে।
ফলে দৃশ্যমান মামলার সংখ্যা বাস্তব ঘটনার চেয়ে কম হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী UNICEF-এর সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ডিজিটাল যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শিশুদের ব্যাপকভাবে সাহায্য না চাওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে—২১টি দেশের গবেষণায় এক বছরের মধ্যে অনলাইনে যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুদের মধ্যে ১ শতাংশেরও কম পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনে রিপোর্ট করেছিল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শিক্ষা হলো স্পষ্ট—শিশু কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হলে শুধু আইন দিয়ে নির্যাতন বন্ধ করা কঠিন।
তৃতীয় সমস্যা—আইন প্রয়োগের আগে প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল
একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। বিচারও প্রয়োজন। কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন করতে হবে—
শিশুটি কার সঙ্গে একা থাকে?
স্কুলে তার নিরাপত্তা কতটা?
কোচিং বা প্রাইভেট টিউটরের যাচাই কীভাবে হয়?
শিশুকে আনা-নেওয়ার পরিবেশ কতটা নিরাপদ?
অনলাইনে সে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে?
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক তার প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখালে শিশুটি কাকে জানাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
চতুর্থ সমস্যা—ডিজিটাল পৃথিবী নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে
আজকের শিশু শুধু ঘর, স্কুল ও রাস্তার পরিবেশে নেই। তার একটি বড় অংশ অনলাইনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং প্ল্যাটফর্ম, মেসেজিং অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। ছবি, ভিডিও, ব্যক্তিগত তথ্য বা বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শিশুকে যৌনভাবে শোষণ করার ঝুঁকিও রয়েছে।
UNICEF-এর ২০২৬ সালের গবেষণায় ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক বছরে আনুমানিক ২ কোটি ১২–১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন শোষণ বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।
বাংলাদেশে তাই শিশু সুরক্ষা মানে শুধু “অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সাবধান”—এমন পুরোনো শিক্ষা নয়।
এখন প্রয়োজন ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা।
তাহলে পরিত্রাণের পথ কী?
শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধে একটি মাত্র সমাধান নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষকে একই সুরক্ষাব্যবস্থার অংশ হতে হবে।
১. শিশুকে ‘সেফ অ্যান্ড আনসেফ টাচ’ শেখাতে হবে
শিশুর বয়স অনুযায়ী তাকে শরীরের ব্যক্তিগত সীমা সম্পর্কে শেখাতে হবে।
কেউ আদর করার নামে অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে “না” বলতে পারবে—এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
তবে শুধু “খারাপ স্পর্শ” নয়, শিশুকে এটিও শেখাতে হবে—কোনো ব্যক্তি তাকে গোপন রাখতে বললে, ভয় দেখালে বা অস্বস্তিকর ছবি/ভিডিও চাইলে তা দ্রুত বিশ্বস্ত বড় কাউকে জানাতে হবে।
২. “তুমি বললে তোমার দোষ”—এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
নির্যাতনের শিকার শিশুকে প্রথমেই বিশ্বাস করতে হবে, নিরাপদে রাখতে হবে এবং দোষারোপ করা যাবে না।
“তুমি সেখানে গেলে কেন?”
“ওর সঙ্গে কথা বললে কেন?”
“আগে বলোনি কেন?”
—এ ধরনের প্রশ্ন শিশুকে আরও চুপ করিয়ে দিতে পারে।
প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“তুমি নিরাপদ তো?”
৩. স্কুলে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা দরকার
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শিক্ষক, কর্মচারী, পরিবহনকর্মী, কোচিং শিক্ষক—যারা নিয়মিত শিশুদের সংস্পর্শে আসেন, তাদের জন্য শিশু সুরক্ষা প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যাচাইব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
স্কুলকে শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, শিশুর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
৪. ১০৯৮ হেল্পলাইনকে আরও কার্যকর করতে হবে
বাংলাদেশে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ রয়েছে। শিশু নিজে অথবা তার হয়ে অন্য কেউ বিনামূল্যে এই নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাইতে পারে। হেল্পলাইনটি ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হয় এবং নির্যাতন, শোষণ, বাল্যবিবাহ, শিশুপাচারসহ বিভিন্ন ঝুঁকিতে সহায়তা দেওয়ার কথা সরকারি তথ্যেই উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু আইন থাকার পাশাপাশি সাহায্য পাওয়ার পথটি শিশুর কাছে পরিচিত ও সহজ করতে হবে।
প্রতিটি স্কুলে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং শিশুদের জন্য পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা যেতে পারে।
৫. দ্রুত তদন্ত ও শিশুবান্ধব বিচার নিশ্চিত করতে হবে
শিশু নির্যাতনের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী ও পরিবারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ, চিকিৎসা পরীক্ষা, প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে শিশুবান্ধব করতে হবে।
অপরাধীর শাস্তি যেমন জরুরি, তেমনি নির্যাতিত শিশুর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
৬. পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে
শিশুর সঙ্গে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় কথা বলা—এটি কোনো বিলাসিতা নয়।
শিশু কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, স্কুলে কেমন আছে, অনলাইনে কী করছে—এসব জানতে হবে।
তবে নজরদারি যেন গোয়েন্দাগিরিতে পরিণত না হয়। শিশুর সঙ্গে এমন বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যাতে বিপদে পড়ে সে প্রথমে মা-বাবা বা অভিভাবকের কাছেই যেতে চায়।
শিশুদের মানসিক বিকাশও অধিকার
শিশুকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের যন্ত্র বানালে তার পূর্ণ বিকাশ হবে না।
খেলাধুলা, সৃজনশীলতা, বই পড়া, গান, ছবি আঁকা, বন্ধুত্ব, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, নিজের মত প্রকাশ এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ—এসব শিশুর মানসিক বিকাশের অংশ।
শিশুকে প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করা উচিত—
“আজ কত নম্বর পেয়েছ?”
এর পাশাপাশি অন্তত একবার জিজ্ঞাসা করা দরকার—
“আজ তোমার মন কেমন?”
কারণ ভালো ফলাফল একজন শিশুকে সফল করতে পারে, কিন্তু নিরাপদ ও সুস্থ মানসিক বিকাশই তাকে একজন ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
বিদেশের শিশু কী পায়, বাংলাদেশে কী ঘাটতি?
বাংলাদেশের শিশুদের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই “বিদেশে এই অধিকার আছে, বাংলাদেশে নেই”—এমন সরল বিভাজন সঠিক নয়।
পার্থক্যটি বড়তরভাবে বাস্তবায়নের মান ও সেবার প্রাপ্যতায়।
অনেক উন্নত দেশে স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা সামাজিক কর্মী, নিরাপদ খেলার অবকাঠামো, ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার কাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক।
বাংলাদেশেও এসবের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হচ্ছে; কিন্তু দেশব্যাপী সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৫ সালের MICS-এ বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও নিম্ন মাধ্যমিকে তা ৬০.১ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
রাষ্ট্রকে শুধু শাস্তির রাষ্ট্র নয়, প্রতিরোধের রাষ্ট্র হতে হবে
শিশু ধর্ষণের পর মামলা হবে, আসামি গ্রেপ্তার হবে, আদালতে বিচার হবে—এটি অপরাধের পরের ধাপ।
রাষ্ট্রের আসল সক্ষমতার পরীক্ষা হলো—
কতগুলো শিশু নির্যাতনের আগেই সুরক্ষিত হলো?
কতগুলো শিশু ভয় পেলে সাহায্য চাইতে পারল?
কতজন অভিভাবক জানলেন কীভাবে শিশুকে নিরাপদ রাখতে হয়?
কতটি স্কুলে শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়িত হলো?
কতটি শিশু মানসিক সহায়তা পেল?
কতজন ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে আগেই শনাক্ত করা গেল?
এই সূচকগুলোকে জাতীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি করতে হবে।
শেষ কথা: শিশুকে ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে দেখতে হবে
শিশু কোনো পরিবারের সম্পত্তি নয়। সে রাষ্ট্রেরও কোনো “ভবিষ্যৎ প্রকল্প” নয়।
সে আজকের একজন মানুষ—যার নিরাপত্তা, মর্যাদা, মতামত, শিক্ষা, আনন্দ, খেলাধুলা এবং মানসিক সুস্থতার অধিকার আজই আছে।
২০২৬ সালের শিশু অধিকার দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত শুধু—
“শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত”—এটুকু নয়।
বরং—
শিশুর আজটাও নিরাপদ হোক।
যে শিশুর হাতে বই থাকার কথা, তার হাতে শ্রমের বোঝা নয়।
যে শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, তার বিয়ের আয়োজন নয়।
যে শিশুর নিরাপদে বড় হওয়ার কথা, তার জীবনে ভয় নয়।
যে শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে লজ্জিত নয়—সুরক্ষিত করতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আইনকে শুধু অপরাধীর শাস্তির অস্ত্র হিসেবে নয়, অপরাধের আগেই শিশুকে রক্ষার একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
কারণ একটি শিশুকে নির্যাতনের পর বিচার দেওয়ার চেয়ে, নির্যাতন থেকে শিশুটিকে বাঁচানোই রাষ্ট্রের বড় সাফল্য।
শিশুর অধিকার দিবসের সত্যিকারের সার্থকতা সেদিনই হবে, যেদিন বাংলাদেশের কোনো শিশু তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় না পেয়ে বলতে পারবে—
“আমি শিশু। আমার অধিকার আছে। আর আমার কথা শোনার মতো একজন মানুষ আমার পাশে আছে।”
মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পলাশ
—সম্পাদক ও প্রকাশ
অধিকারপত্র ডটকম
যাচাইয়ের ভিত্তি: বাংলাদেশ সরকারের আইনভান্ডারে প্রকাশিত বর্তমান আইন ও ২০২৬ সালের সংশোধনী, BBS–UNICEF-এর MICS 2025, UNICEF Bangladesh-এর শিশু সুরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য ও ২০২৫ সালের শিশু যৌন সহিংসতা নিয়ে তাদের বিবৃতি ব্যবহার করা।
