odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | রবিবার, ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২

আদর্শের আলোয় তরুণ বাংলাদেশ: মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় নৈতিক পুনরুত্থান

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৫ ২৩:০৬

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৫ ২৩:০৬

(আগামী সপ্তাহে পৃথিবীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন “ঈদে মিলাদুন্নবী” উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ)

বাংলাদেশের তারুণ্য আজ এক অদ্ভুত যুগসন্ধিক্ষণে আশা-নিরাশার সঙ্গমস্থলে দাঁড়ানো। সামনে অবারিত সম্ভাবনার খোলা দ্বার, আর সাথেই যেন ছায়া হয়ে আছে বিভ্রান্তির দীর্ঘশ্বাস। প্রযুক্তির ঝলকানিতে তাদের ঝলসানো চোখ, রঙিন স্বপ্নের হাতছানি। বিপথে যাওয়ার প্রলোভন, অন্ধকারের শৃঙ্খলিত নিশির শেষে দিবসের আলোতে উন্মোচিত নতুন জ্ঞান দিগন্ত। এই দোলাচলের ভেতরেই আমাদের তরুণেরা কখনো লক্ষ্যচ্যুত, কখনো স্বপ্ন-দগ্ধ; কখনো দ্রুত সাফল্যের চকচকে শর্টকাটে মুগ্ধ, আবার কখনো দীর্ঘপথের ধৈর্যে ক্লান্ত। সমাজ-সংস্কৃতির বদলে যাওয়া নিয়ম, পরিবার কাঠামোর ভাঙা সময়, জনপ্রিয় সংস্কৃতির চঞ্চলতা এবং সামাজিক মাধ্যমে নির্মিত বাহ্যিক উজ্জ্বলতা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক এমন পরিবেশ, যেখানে নৈতিকতার স্থির স্রোত প্রায়ই অচেনা বালুচরে আটকে যায়। তরুণরাও হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু, নৈতিকতার বাহনে ছেড়ে অন্যায়ের পুজারি। প্রশ্ন আসে মনে, কেন আজ এই অবক্ষয়? যুগযুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে তরুন যুবাদের আজকের কেন এই দশা?

উত্তর আসে, সময়ের সাথে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মূল থেকে সরে যাওয়া, ধর্মের সূধাকে সরিয়ে দেওয়া। একসময় বাড়ির উঠোনেই চরিত্র গড়ার প্রাথমিক পাঠ নেওয়া হতো—বয়োজ্যেষ্ঠের সান্নিধ্য, ধর্মীয় শিক্ষায় আলোকিত সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারিবারিক শাসনের আবেহ গ্রোথিত হতো অন্তরে সৌম্য শিখন, প্রতিবেশীর সঙ্গে নরম কথার ভদ্রতা, শিক্ষক-গুরুদের ভক্তি, সমাজে সুস্থ্য সাংস্কৃতিক চর্চা। আজ তা বিস্মৃত হতে চলেছে, সেই উঠোনে যোগ হয়েছে স্মার্টফোনের উজ্জ্বল পর্দা, লাইক-ফলোয়ারের হিসাব, মনোযোগের চঞ্চল ব্যয়সূচি, অপ-আকাশ-সংস্কৃতির চর্চা। তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন জানালার মতো খুলে দিয়েছে বিশ্ব, তেমনি ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে গোপন প্রতিযোগিতা, তুলনা, অস্থিরতা। অনলাইন মাধ্যমের প্রভাবে ধর্মীয় ‍শিক্ষার বিপরীতে এন্টি সোশাল হিরোউজমের প্রতি আকর্ষণ। কিশোর গ্যাং, চাদাবাজি, দূর্নীতি, সন্ত্রাস, অন্যায়ের মহা ঘুর্ণনে করেছে তরুণ যুবাদের আবদ্ধ। বের হওয়ার পথ যেন নিজেরাই করে ফেলছে রুদ্ধ। পরীক্ষার হলে নকলের কাগজ, কর্মক্ষেত্রে বেপরোয়া শর্টকাট, সামাজিক সম্পর্কের ভাষায় অসহিষ্ণুতা—এ সবই আমাদের তরুণদের একটি বড় অংশকে লাইন বিচ্যুত ট্রেনের ন্যায় দিনকে দিনে কঠিন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যার চাপ নিতে গিয়ে বিপথগামীর সংখ্যা বাড়ছে। নীরবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘিরে ধরছে, পরিবারের সঙ্গে আদর্শের দূরত্ব বেড়ে গিয়ে তাদের হৃদয়ের ভেতর জমে ওঠেছে একাকিত্ব; ভবিষ্যতের হিসাব এলোমেলো হলে ভেঙে পড়ছে আত্মবিশ্বাস; সমাজে অন্যায়ের প্রাত্যহিকতা দেথে যেন তাদের মাঝে তৈরি হয়েছে ন্যায়ের ওপর আস্থাহীনতা।

তবু এই আঁধারের মাঝখানে একটানা জ্বলতে থাকা এক দীপশিখা, তরুণ-যুবাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। আর এই দীপশিখা হচ্ছে—মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা। এই শিক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে সত্য ও ন্যায়ের অবিচল চর্চা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের মর্যাদা, মানবিক সহমর্মিতা এবং জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। “সত্য বলো”—এই সহজ বাক্যটি শুধু নৈতিক উপদেশ নয়, জীবনযাপনের ভিত্তি; কারণ সততার ওপর দাঁড়ানো সেতু-ই টেকে খড়স্রোতা নদীর উথালপাথাল স্রোতে। “নিজ হাতের উপার্জন উত্তম”—এ কথায় আছে পরিশ্রমের স্বাবলম্বিতা, আছে সৎ পথে সাফল্যের দীর্ঘ শ্বাস। প্রতিকূল সময়েও ঈমানি দৃঢ়তা—ঝড়ের ভেতর তালগাছের মতো সোজা হয়ে থাকতে শক্তি যোগায়, মনকে করে সত্য, ন্যায় ও ভালোবাসার আধার—যুবসমাজকে অস্থিরতার ঢেউয়ে টিকে থাকার কৌশল। গন্তব্যে পৌছানোর দিশা। আর জাগ্রত করে মানবতার সেবায় দান-সাহায্য, আমাদের শিখায় মানব কল্যাণ—আমাদের করে তোলে এমন এক নদীর মতো, যে নদী নিজের জন্য নয়, চারপাশের তৃষ্ণা মেটাতে এই পৃথিবীর ধারায় বয়ে চলছে।

মহানবীর শিক্ষাগুলো কেবল মসজিদের দেয়ালে লেখা নীতিবাক্য নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সব স্তরের প্রতিদিনের আচরণে প্রয়োগযোগ্য এক নৈতিক রূপরেখা। শিক্ষাঙ্গনে যদি পরীক্ষার নম্বরের চেয়ে সত্যিকারের শেখা বেশি মর্যাদা পায়, তবে শিক্ষার্থীরা কেবল চাকরির জন্য নয়, জীবনের জন্যও প্রস্তুত হবে। পরিবারে যদি কথোপকথনের দরজা খোলা থাকে, শ্রদ্ধা যদি আদেশ নয়, আস্থার ভাষায় শেখানো হয়, তবে তরুণের ভিত হবে দৃঢ়। অর্থনীতিতে যদি পুরস্কৃত হয় স্বচ্ছতা, আর লেনদেনের ভিত্তি হয় বিশ্বাস, তবে শর্টকাটের প্রলোভন নিজে থেকেই ম্লান হয়ে যাবে। সামাজিক মাধ্যমে যদি আমরা শালীন ভাষা ও ধৈর্যের অভ্যাস গড়ে তুলি, তবে অ্যালগরিদমও শিখবে সৌজন্য; থেমে যাবে অযাচিত শক্তি প্রদর্শন, মুক্তি পাবে তরুণ সমাজ, স্তব্ধ হবে জনতার উন্মত্ত খেলা, বন্ধ হবে তরুণদের মব সন্ত্রাসের জগৎ।

পরিবেশগত সংস্কৃতির প্রলোভন—ভোগবাদী উজ্জ্বলতা, মিথ্যা প্রতিযোগিতা, অনৈতিক ‘গ্ল্যামার’—অনেককে টেনে নিচ্ছে সামাজিক বিরোধিতার দিকে। এই স্রোতে ভেসে যাওয়া তারুণ্যের বিবেককে উদ্ধারে প্রয়োজন উষ্ণ দিকনির্দেশনা। চাই নীরব অথচ দৃঢ় নেতৃত্ব—যেখানে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে জীবন দিয়ে, বক্তৃতা দিয়ে নয়; যেখানে শাস্তির আগে থাকবে আত্মসমালোচনার সুযোগ এবং সংশোধনের অবকাশ। তরুণদের সামনে যখন উপস্থিত হবেন এমন মানুষ, যারা সফল অথচ বিনয়ী, দৃঢ় অথচ দয়ালু, আধুনিক অথচ নৈতিক—তখন তাদের হৃদয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে উঠবে অনুকরণের প্রেরণা।

এই অর্থপূর্ণ জীবনের পথচলায় সবচেয়ে বড় পাথেয় হতে পারে মহানবী (সা.)-এর প্রদর্শিত অনিবার্য শিক্ষা। তাঁর শিক্ষায় ধর্মীয় অনুধ্যানের সঙ্গে যুক্ত হয় জগত-বোধের অনুসন্ধান, শ্রদ্ধার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশ্ন করার সাহস। মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা যদি বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকাই, তবে স্পষ্ট হয়—আজকের তরুণদের জন্য তাঁর শিক্ষাই হতে পারে একটি কার্যকর পাথেয়। কিন্তু সেই আলোর পথে চলতে আছে অসংখ্য বাধা। ধর্মব্যবসায়ীদের অপব্যাখ্যা, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার, ইসলাম সম্পর্কে বৈশ্বিক অপপ্রচার—এসবই তরুণদের মনে তৈরি করছে ধর্মবিমুখতা। তাই আজ, মহানবী (সা.)-এর দেখানো নীতিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সময়ের দাবিই হচ্ছে—আদর্শে ফিরে আসা, সত্যে স্থির হওয়া, শ্রমে গৌরব খোঁজা, দানে প্রশান্তি পাওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দিন; হৃদয়কে করুন সত্যনিষ্ঠ, ভাষাকে করুন শালীন, কর্মকে করুন সৎপথের সাক্ষ্য। আমিন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, যাতে আমরা তাঁর রাসূল (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করতে পারি। আমিন।

— লেখক: ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (লিটু), অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকা্রপত্র, odhikarpatranews@gmail.com



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: