odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 7th January 2026, ৭th January ২০২৬
ভেনেজুয়েলায় ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থান: ইতিহাস, শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক প্রভাব

ভেনেজুয়েলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের উত্থান: কারাকাস থেকে মার্গারিটা পর্যন্ত ইসলামের দৃশ্যমান উপস্থিতি

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ০৭:৩২

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ০৭:৩২

বিশেষ প্রতিনিধি, অধিকার পত্র ডটকম

দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত দেশ ভেনেজুয়েলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতির জন্য পরিচিত। উত্তরে আন্দিস পর্বতমালার সুউচ্চ শৃঙ্গ থেকে দক্ষিণে ক্রান্তীয় অরণ্য, মধ্যভাগে তৃণময় সমভূমি এবং উপকূলে চমৎকার বেলাভূমি পর্যন্ত দেশটির ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিস্তৃত। দেশটির রাজধানী কারাকাস এবং বৃহত্তম শহর হিসেবে এটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করে।

ভেনেজুয়েলা প্রায় ৩০০ বছর স্পেনীয় উপনিবেশ হিসেবে ছিল। ১৯ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। স্বাধীনতার পর দেশটির নাম রাখা হয় ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্র, যা পরে ১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলা বলিভারীয় প্রজাতন্ত্র হিসেবে সরকারিভাবে পরিবর্তিত হয়। নামটি রাখা হয় স্বাধীনতার নেতা সিমন বলিভার-এর স্মৃতিতে। স্বাধীনতার পর দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব এখনও অনেকাংশে দৃশ্যমান। তবে ১৯৫০-এর দশকের শেষ থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করছে।

ভেনেজুয়েলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন ২০২১’ অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার মোট জনসংখ্যা ২৯ মিলিয়ন, যার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ১–১.৫ লাখ। যদিও মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তারা ধীরে ধীরে দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ভেনেজুয়েলায় প্রথম মুসলিমদের আগমন ঘটে ঔপনিবেশিক যুগে, যখন উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে আনা আফ্রিকানরা ইসলাম নিয়ে দেশটিতে আসে। যদিও ধর্মীয় দমন-পীড়নের কারণে তারা প্রাথমিকভাবে গোপনে ইসলাম চর্চা করতে বাধ্য হয়, তবুও তাদের উপস্থিতি দেশের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখেছে।

আধুনিক মুসলিম সমাজের ভিত্তি

ভেনেজুয়েলায় আধুনিক মুসলিম সমাজের উত্থান ঘটে উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে, যখন লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের অভিবাসীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। যদিও প্রাথমিক অভিবাসীদের মধ্যে অনেকেই খ্রিস্টান ছিলেন, তবে সুন্নি, শিয়া ও দ্রুজ মুসলমানরা তাদের সঙ্গে বসতি স্থাপন করেন।

প্রাথমিক মুসলিম অভিবাসীরা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী হিসেবে। স্থানীয়ভাবে তাদের কোতেরো বলা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা স্থায়ী দোকান মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, বিশেষত কারাকাসে, যেখানে গড়ে ওঠে ‘লা তুরকেরিয়া’ নামে পরিচিত বাণিজ্যিক এলাকা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও গ্রাহক-কেন্দ্রিক সেবা তাদের ব্যবসাকে আলাদা পরিচিতি দেয় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্বিতীয় দফার মুসলিম অভিবাসন

বিশ শতকের মধ্যভাগে ভেনেজুয়েলার তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক বিস্তার মধ্যপ্রাচ্য থেকে দ্বিতীয় দফার মুসলিম অভিবাসীদের জন্য আকর্ষণ তৈরি করে। এ সময় মুসলিমরা খুচরা ব্যবসার বাইরে শিল্প, সেবা এবং পেশাজীবী খাতে প্রবেশ করেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ নাগাদ দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের আরব-ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বিস্তার ঘটে। ফলে চিকিৎসা, প্রকৌশল, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি প্রশাসনে মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

ভেনেজুয়েলায় ইসলামের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হলো কারাকাসের শেখ ইব্রাহিম বিন আবদুল আজিজ আল ইব্রাহিম মসজিদ। ১৯৯০-এর দশকে সম্পন্ন হওয়া এই উসমানীয় ধাঁচের স্থাপনায় লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মিনার রয়েছে। মসজিদটি কেবল ইবাদতের কেন্দ্র নয়, বরং শিক্ষামূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্র। এখানে পরিচালিত হয় গ্রন্থাগার, সম্মেলন, ক্রীড়া কার্যক্রম ও সামাজিক সেবা, যা রাজধানীতে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতিকে সুদৃঢ় করেছে।

কারাকাস ও মার্গারিটা দ্বীপের ইসলামী স্কুলগুলোতে জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধ ও আরবি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। এ ছাড়া হালাল বাজার ও খাদ্য সামগ্রীর চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সম্প্রদায়ের দৃশ্যমানতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান, তুরস্কসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃশ্যমানতা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রমজান ও অন্যান্য ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, যা ইসলামকে জাতীয় জীবনের বৈধ ও সম্মানিত অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদান

মুসলিমরা ভেনেজুয়েলার সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তারা ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি প্রশাসনের নানা স্তরে সক্রিয়। স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলিমরা সহনশীল, সামাজিকভাবে নিবেদিত এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত। তারা সামাজিক সংঘর্ষ কমাতে এবং ধর্মীয় সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে কাজ করে চলেছে।

কারাকাস ও অন্যান্য শহরে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক উৎসব, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও সমাজসেবামূলক কাজের কারণে ইসলাম এখন ভেনেজুয়েলার একটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এছাড়া হালাল খাদ্য, ইসলামী ব্যাংকিং ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৃদ্ধি মুসলিম সমাজকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করেছে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

ভেনেজুয়েলায় মুসলিম সম্প্রদায় এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তন তাদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সচেতন নতুন প্রজন্ম এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় ইসলাম এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, যদি তারা শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে দেশটির বহুমাত্রিক কাঠামোর সঙ্গে আরও সুসংহত হয়।

উপসংহার

ভেনেজুয়েলায় ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস প্রাচীন, এবং আধুনিক মুসলিম সমাজের প্রতিষ্ঠা ১৯ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু। আজ এই সম্প্রদায় দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হালাল বাজার, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিমরা ভেনেজুয়েলার বহুস্তরীয় সমাজে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে।

ভেনেজুয়েলার মুসলিম সম্প্রদায় প্রমাণ করেছে যে, একটি ছোট জনগোষ্ঠীও যদি সংহতি, শিক্ষা এবং উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে তারা দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারে।

তথ্যসূত্র:

হাওজাহ নিউজ এজেন্সি ডটকম

ইউএস ডিপার্টমেন্ট 

 

ভেনেজুয়েলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের উত্থান: কারাকাস থেকে মার্গারিটা পর্যন্ত ইসলামের দৃশ্যমান উপস্থিতি

#ভেনেজুয়েলা #মুসলিমসমাজ #ইসলাম #কারাকাস #হালালবাণিজ্য #ইসলামীশিক্ষা #আন্তর্জাতিকধর্মীয়স্বাধীনতা #মসজিদ #সমাজসেবা #বাণিজ্য

---



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: