odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 15th January 2026, ১৫th January ২০২৬
মানব জীবনের সম্পর্ক কীভাবে বদলে যায়, ট্রান্সফরমেশন কীভাবে হয়, তাই দেখায় জীবন, যা চলে জীবনেরই গতিতে। A timeless tale of two siblings swept apart by the river of time

সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া দুই ভাইবোনের শৈশবের অমলিন স্মৃতি —ডানা মেলা দুটি পাখি: বদলে যাওয়া সম্পর্কের ঘূর্ণির আখ্যান

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৫ January ২০২৬ ২০:৪৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৫ January ২০২৬ ২০:৪৪

— মানবজীবনের একটি বিশেষ উপাখ্যান

এটি মানব জীবনের সম্পর্ক কীভাবে বদলে যায়, ট্রান্সফরমেশন কীভাবে হয়, তাই একটি আবেগঘন পারিবারিক স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এটি আসলে এক বোন ও তার ভাইয়ের ছোটবেলার স্মৃতি, স্কুল জীবনের সহচরিতা, ও একসাথে বেড়ে ওঠার গল্প—যেখানে সময় সবকিছু বদলে দিয়েছে, কিন্তু বন্ধনের ডাক রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরে। (A nostalgic reflection on the childhood and unbreakable bond of siblings Shimu and her brother—where time changed everything, but the call of love remained eternal.)

শুরুর গল্প: সময়ের স্রোতে দুই ডানা মেলা পাখির যাত্রা

মানুষ বলে, জীবন নদীর মতো। আপন গতিতে বয়ে চলে, কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। কিন্তু আমরা যারা সেই নদীর পাড়ে বসে থাকি—একেকটা ঢেউয়ের মধ্যে খুঁজে ফিরি পুরনো মুখ, পুরনো দিন, পুরনো গল্প।

একটা সময় ছিল, যখন আমরা দুই ভাইবোন—আমি আর শিমু—হাত ধরে স্কুলে যেতাম।
পথে গল্প হতো, হঠাৎ ঝগড়া, তারপর একসাথে হেসে উঠা। আমাদের ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে মনে হতো, আমরা যেন যমজ; আলাদা করে চিনতেই কষ্ট হতো কার কখন রাগ, কার কবে কান্না। কিন্তু সময়?

সময়ের কাছে মানুষের কোনো কথাই যেন মেলে না। সময় তার নিজের মতো করে আমাদের গল্পগুলোকে ছেঁটে, ভেঙে, ছড়িয়ে দেয় দূর আকাশে। আজ শিমু—আমার পিঠাপিঠি বড়বোন, আমার স্কুলজীবনের সঙ্গী, আমার ছায়া, আমার বন্ধুর চেয়েও আপনজন—সেই শিমু থাকে ইউএস-এ। প্রায় এক দশক পরে আবার দেখা। আজ আমার বাসায় ডিনারে এসেছে। হয়তো সপ্তাহ খানেক পরেই আবার চলে যাবে। জানি না এরপর কবে দেখা হবে, আদৌ হবে কিনা।

মনে পড়ে, এক সময় শিমু চোখের আড়াল হলেই আমি অস্থির হয়ে উঠতাম। গলা ছেড়ে ডাকতাম—শিমু রে!” সে ডাক ছিল আমার নিরাপত্তা, আশ্রয়। আজ সে ডাক বুকের ভেতর জমে থাকে, বের হয় না।

 ্আসলে জীবন চলে জীবনের গতিতে। মানুষ ভাবে, চিন্তা করে, কিন্তু জীবনের কিছু যায় আসে না।
Out of sight, out of mind—time changes everything. যে বোনটিকে এক মুহূর্ত ছাড়া থাকতে পারতাম না, তার সঙ্গে দেখা হয় না বছরের পর বছর। যা ছোটবেলায় ছিল কল্পনারও অতীত, আজ বাস্তব।

তবে এটি বলতেই পারি, এই লেখার কোনো শেষ নেই। কারণ শিমুর সাথে আমার গল্প, আমাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি—এসব নিয়ে একদিন লিখব এক মহা উপাখ্যান। আজ শুধু এইটুকু বলি— সময় হয়তো বদলায় সব, কিন্তু কিছু সম্পর্ক, কিছু ডাক…চিরকাল বেঁচে থাকে হৃদয়ের ভেতর। শিমু রে!”—এই ডাকটা আজও থেমে থাকেনি। শুধু ফিরে তাকানোর সময়টাই পাল্টে গেছে। আসলে সময়, আজ ভাইবোনের সম্পর্কেও পরিবর্তন আনছে। আর মন না চাইলেও মানুষ তা মেনে নিচ্ছে। এই যেমন এই দুই ভাই বোন!

শিমু রে! দুই ভাইবোনের গল্প, সময়ের স্রোতে গড়া এক অপরাজেয় বন্ধন

সময় কত বদলে গেছে! এক সময় শিমুকে চোখের আড়াল করলেই মনটা অস্থির হয়ে উঠত। গলা ছেড়ে ডাকতাম—শিমু রে!” আমার একমাত্র মেজো (বড়)বোন, পিঠাপিঠি বয়সের, জীবনের প্রথম ও সেরা সঙ্গী। আজ সে ইউএস প্রবাসী। প্রায় এক দশক পর ও এসেছে দেশে। আজ আমার বাসায় ডিনারে এসেছে। হয়তো সপ্তাহ খানেক পরেই ও আবার চলে যাবে। জানি না এরপর কবে দেখা হবে, আদৌ হবে কিনা।

শুধু ভাবি, কীভাবে বদলে যায় সময়। আর আমাদের দু’জনার গল্পটা? জন্ম থেকে শুরু, অজস্র অধ্যায়, প্রতিটি পাতায় ভালোবাসা, ঝগড়া, আর এক অদ্ভুত সখ্যতা।

শুরুর সেই দিনগুলো: বিদ্যালয়ের প্রথম ধাপ

আমার বাবা ছিলেন রিকাব বাজার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার সাথেই গিয়েছিলাম স্কুলে ভর্তি হতে। বোন শিমুকে ভর্তি করালেন বড় ওয়ানে, আর আমাকে ছোট ওয়ানে। শিমু ক্লাসে গেল, আর আমি হতবাক—ওকে একা ছেড়ে দিলে কী করে চলবে?

হেড স্যার আমার চিন্তিত মুখ দেখে হাসলেন। তবুও আমি বুঝতে পারছিলাম না—আমার শিমু যদি আমার পাশে না থাকে, তাহলে এই নতুন জায়গায় আমি কীভাবে থাকব?

অর্চনা ম্যাডাম ক্লাসে পড়ানো শুরু করলেন, আর আমি বই খাতা হাতে হাঁটতে থাকলাম দরজার দিকে। বললাম—"আমি শিমুর কাছে যাচ্ছি।" শিমুর ক্লাসে গিয়ে ওর পাশে বসে যেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নিশ্চিন্তি পেলাম। নাজমা আপা আর অর্চনা ম্যাডাম কিছু না বলে হেসে বললেন, "থাকো ওর সাথেই আজ।"

প্রতিদিনের স্কুলজীবন: হাতে হাত রেখে পথচলা

পরদিন, আমরা দুই ভাইবোন হাতে হাত ধরে স্কুলে গেলাম। শিমুর ক্লাসেই ঢুকলাম। নাজমা আপা বললেন, "তুমি তো এই ক্লাসের না।"

আমি বললাম, "শিমুর ক্লাসই আমার ক্লাস। না হলে কারো ক্লাসই না।"

বিষয়টা হেড স্যারের মাধ্যমে বাবার কানে গেল। বাবা আমাদের ক্লাসে এসে বুঝিয়ে বললেন—"শিমু বড়, তুমি এখনো ছোট।"

কিন্তু আমরা দু'জনেই দৃঢ়—একসাথে থাকব।
হেড স্যার অবশেষে মুচকি হেসে বললেন, “রাখেন না ওকে এখানেই, দেখি পারে কিনা।”
আমার উত্তর ছিল স্পষ্ট—"শিমু পারলে, আমি পারব।"

স্কুল বদল, শহর বদল, তবুও জোড়া বিচ্ছিন্ন নয়

বড় ওয়ান শেষ করে বাবা নারায়ণগঞ্জে ওকালতি প্র্যাকটিস শুরু করলেন। বাসা বদল, স্কুল বদল—কিন্তু না, আমাদের একসাথে থাকা বদলালো না। চাষাড়ার এক স্কুলে গিয়ে জানা গেল—মেয়েদের শিফট সকাল, ছেলেদের দুপুর। আমরা শুনেই বললাম, "তাহলে একসাথে কীভাবে পড়ব?"

বাবার অনুরোধে হেড স্যার বললেন, “ঠিক আছে, লিটুকে মেয়েদের শিফটে পড়ুক।”
সেই থেকে আবার আমরা একসাথে। দু'জনেই হাতে হাত ধরে স্কুলে যেতাম, গল্প করতে করতে হাঁটতাম। যেন ছিলাম যমজ, শুধু জন্মেই খানিকটা ফারাক।

আরও গল্প, আরও স্মৃতি

শিমু না খেললে, আমি কষ্ট পেতাম। আমি ওকে নিয়ে ছড়া কাটতাম— নসরতে ফসরত, দশের যেই নিয়ত, আমাও সেই নিয়ত। শিমু রে!” আর শিমু রাগ করে আমার পিছনে দৌড়াতো। একসাথে পড়া, খেলাধুলা, স্কুল ফাঁকি, রাগ-অনুরাগ, সবই ছিলো আমাদের ছোটবেলার সোনালি দিনগুলোর অংশ।

এখনপ্রবাস আর দূরত্ব

আজ সেই শিমু আমার সামনে, বহু বছর পর। ডিনারে বসে ওর মুখে পুরোনো গল্প শুনি। মনে হয়, সময় থেমে গেছে। আবার ভাবি—শুধু কয়েকটা দিনের জন্য দেখা, এরপর আবার দীর্ঘ বিচ্ছেদ।

সমাপ্তিহীন সম্পর্ক

এই গল্পের কোনো শেষ নেই। হয়তো একদিন আমাদের শৈশব-কৈশোরের উপর লেখা হবে এক মহা উপাখ্যান। আজও যখন চোখ বন্ধ করি, শুনি নিজের সেই ডাক—শিমু রে!” একটা ডাক, যেটা সময়কে ছুঁয়ে যায়, যেটা কোনো দিন পুরোনো হয় না।

অসমাপ্তকিন্তু অমর

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিমু_রে #ভাইবোনের_গল্প #শৈশব_স্মৃতি #বাংলা_গল্প #নস্টালজিয়া #সময়_ও_স্মৃতি #BanglaStory #SiblingBond #ChildhoodMemories #EmotionalNarrative



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: