নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের লাগাম টেনে ধরার যে শেষ আইনি কাঠামোটি টিকে ছিল, আজ তার আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটলো। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তির মেয়াদ আজ বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই রাশিয়ার তথাকথিত পারমাণবিক পরাশক্তি ইমেজে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একাল এবং সেকাল: ক্রেমলিনের ক্ষীয়মাণ প্রভাব
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান যাকে একসময় শয়তানের সাম্রাজ্য (Evil Empire) বলে অভিহিত করেছিলেন, সেই বিশাল ভূখণ্ড ভেঙে যাওয়ার পর ক্রেমলিন হারিয়েছে তার বিশাল এলাকা, আর্থিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ। তবে একটি জায়গায় রাশিয়ার আধিপত্য ছিল অটুট—পারমাণবিক অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সমান সংখ্যক পরমাণু অস্ত্রের মালিকানা মস্কোকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির শীর্ষ টেবিলে বসে বিশ্ব ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিয়েছিল। ২০১০ সালে প্রাগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ যখন 'নিউ স্টার্ট' চুক্তি সই করেন, তখন তাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশ সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি মোতায়েনকৃত দূরপাল্লার পরমাণু অস্ত্র রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ওয়াশিংটনের অনীহা বনাম মস্কোর উদ্বেগ
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ দেখা যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে এবং শেষ মুহূর্তে এটি নবায়নে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে এক মন্তব্যে বলেছিলেন, যদি এর মেয়াদ শেষ হয়, তবে হবে। আমরা প্রয়োজনে আরও ভালো কোনো চুক্তি করবো। বিপরীতে, মস্কোর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ এই চুক্তির অবসানকে মানব সভ্যতার জন্য ধ্বংসাত্মক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি 'ডুমসডে ক্লক' বা কেয়ামতের ঘড়ির কাঁটাকে আরও এগিয়ে দেবে। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে বারবার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ওয়াশিংটন থেকে কেবল 'নিস্তব্ধতা' পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প-ক্লাস যুদ্ধজাহাজ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য
বিশ্লেষকরা বলছেন রাশিয়ার এই উদ্বেগের কারণ কেবল বিশ্বশান্তি নয় বরং নিজেদের কৌশলগত দুর্বলতা। চুক্তির বাধ্যবাধকতা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র এখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরমাণু অস্ত্র বৃদ্ধির সুযোগ পাবে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ট্রাম্প-ক্লাস (Trump-class) যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা পুনরায় সামনে এনেছে যা পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুজ মিসাইল বহন করবে। সোভিয়েত আমলের রাশিয়ার পক্ষে এই ধরণের সামরিক ব্যয়ের পাল্লা দেওয়া সম্ভব হলেও, বর্তমান রাশিয়ার অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বাজেট ওয়াশিংটনের তুলনায় নগণ্য। ফলে নতুন করে শুরু হওয়া এই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার পিছিয়ে পড়া প্রায় নিশ্চিত। তাদের পরাশক্তি হওয়ার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিতে পারে।
নিউ স্টার্ট চুক্তির এই মৃত্যু কেবল একটি কাগজের বিলুপ্তি নয়, বরং এটি একটি যুগের অবসান। যেখানে ওয়াশিংটন এখন রাশিয়াকে সরিয়ে উদীয়মান পরাশক্তি চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কোনো চুক্তির কথা ভাবছে, সেখানে রাশিয়ার জন্য এটি তাদের ‘সুপারপাওয়ার’ মিথের করুণ পরিসমাপ্তি হিসেবেই দেখা দিচ্ছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: