odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 16th March 2026, ১৬th March ২০২৬
স্বায়ত্তশাসন, গবেষণা বিনিয়োগ ও শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ ছাড়া উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন অসম্ভব

রাজনীতি না সংস্কার? আগামীর উন্নত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন সমীকরণ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৬ March ২০২৬ ০১:২২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৬ March ২০২৬ ০১:২২

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, গবেষণা বিনিয়োগের অভাব, স্বায়ত্তশাসনের সংকট ও শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগের দুর্বলতা কীভাবে শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে এবং সংস্কারের মাধ্যমে আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে উচ্চশিক্ষার নতুন সমীকরণ কী হতে পারে—এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচার নিবন্ধে তার গভীর আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে সমানতালে। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সনদ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন জাগে—উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন কি কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি এর জন্য প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত পুনর্গঠন?

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন মূলত একটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। কোনো রাষ্ট্র যখন উচ্চশিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, তখন তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ সৃষ্টির শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু শিক্ষা যদি কেবল সংখ্যাগত সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার গুণগত রূপান্তর ঘটে না। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর অভাব।

আজকের বাস্তবতায় অনেক সময় মনে হয়, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেন মাশরুমের মতো বাড়ছে। বড় বড় ভবন, সমাবর্তনের চাকচিক্য কিংবা ঝলমলে বিজ্ঞাপন—সবই চোখে পড়ে, কিন্তু গবেষণাগারের নীরবতায় সেই উজ্জ্বলতার প্রতিফলন অনেক সময় অনুপস্থিত। প্রশ্ন জাগে—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র, নাকি কেবল সনদ নামক ছাপানো কাগজ তৈরির এক আধুনিক কারখানা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই এক জটিল বাস্তবতা, যেখানে একদিকে রাজনীতির প্রভাব, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের অপূর্ণতা উচ্চশিক্ষাকে ঘিরে এক ধরনের দ্বিধা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্থকতা কেবল বিপুল সংখ্যক স্নাতক তৈরিতে নয়; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার মধ্যেই তার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল জাতির মননশীলতার বাতিঘর, যেখানে মুক্তবুদ্ধি ও গবেষণার চর্চা ভবিষ্যতের দিশা দেখাবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় গুণগত উচ্চশিক্ষার সেই আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে বাধা দিচ্ছে।

Read the article 🎓 ‘শিক্ষাবিদ’ শব্দের অপপ্রয়োগে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অদৃশ্য সংকট — অধিকারপত্র | শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক 🔗

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়গুলোর একটি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা। যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন তার একাডেমিক পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যদি মেধার পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে শিক্ষার মান অবধারিতভাবেই নিম্নমুখী হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা; কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং মেধাবীরা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণস্পন্দন হলেও বাংলাদেশের বহু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার পরিবেশ এখনও দুর্বল। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, সীমিত গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক ডেটাবেইস ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং গবেষণা অবকাঠামোর দুর্বলতা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থও পর্যাপ্ত নয় কিংবা তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে মৌলিক উদ্ভাবন বা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা উভয়ই সীমিত হয়ে পড়ে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবেশকে সংকুচিত করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষক–শিক্ষার্থী মিথস্ক্রিয়া ব্যাহত হয়। ব্যক্তিগত মেন্টরিং কিংবা গভীর একাডেমিক আলোচনার সুযোগ কমে যায়, ফলে পাঠদান হয়ে ওঠে যান্ত্রিক। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমের অপ্রাসঙ্গিকতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললেও অনেক পাঠ্যক্রম এখনও পুরোনো কাঠামোয় আটকে আছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ অর্জনের পরও অনেক শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।

এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। একটি আধুনিক অর্থনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও শিল্পোন্নয়নের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সম্পর্ক এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃঢ় হয়নি। শিল্পখাত যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্ভাবন প্রত্যাশা করে, বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সময় সেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে জ্ঞান ও বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাডেমিক সততা ও নৈতিকতার সংকট। প্লেজারিজম, অনৈতিক প্রকাশনা কিংবা নম্বর বাণিজ্যের মতো অভিযোগ উচ্চশিক্ষার গরিমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন শিক্ষক বা গবেষকের সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন শিক্ষার্থীদের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে মেধাপাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে উঠেছে। যোগ্য শিক্ষক ও গবেষকেরা যখন দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ বা সম্মান পান না, তখন তারা বিদেশে পাড়ি জমান, যার ফলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ হারায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনা, মব সন্ত্রাস, মতবিরোধ এবং কখনো কখনো সহিংসতার ঘটনাও উচ্চশিক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করার বদলে অনেক সময় তা সংঘাতের রূপ নেয়। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধির পরিবেশে ভীতি বা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, তখন গবেষণা ও উদ্ভাবনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণা বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এখনো সুস্পষ্ট নিরাপত্তা নীতিমালা বা সংকট ব্যবস্থাপনার কাঠামো অনুপস্থিত। একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের নীতিমালা এখনও সুসংহতভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে সংকটের মুহূর্তে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করার প্রয়োজন, অন্যদিকে একাডেমিক স্বাভাবিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি সত্যিই জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে তাকে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, আধুনিক পাঠ্যক্রম, শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এবং শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সেই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে জাতীয় উন্নয়নের কাঠামোও স্থিতিশীল থাকে না। উচ্চশিক্ষাকে যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। আগামীর উন্নত বাংলাদেশের পথে উচ্চশিক্ষার এই রূপান্তরই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।

আগামীর উচ্চশিক্ষায় নতুন সমীকরণ: ৫টি বৈপ্লবিক সুপারিশ

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার সমাধান কেবল গুটিকয়েক দাপ্তরিক ফাইলে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে 'সনদ তৈরির কারখানা'র তকমা থেকে মুক্ত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, গবেষণায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া এবং শিল্পখাতের সাথে শিক্ষার সেতুবন্ধন তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

যদি আমরা রাজনীতিকে শিক্ষার ঊর্ধ্বে না রেখে মেধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে পারি, তবেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে আগামীর উন্নত বাংলাদেশের প্রকৃত মননশীলতার বাতিঘর। উচ্চশিক্ষার এই গুণগত রূপান্তরই হবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে 'সনদ বিতরণের কারখানা' থেকে 'জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রে' রূপান্তর করতে হলে কেবল প্রসাধনমূলক সংস্কার যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন কাঠামোগত ও নীতিগত মহাবিন্যাস।

  • রাজনীতিমুক্ত ও স্বায়ত্তশাসিত ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে। উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি—প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে একাডেমিক উৎকর্ষ ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। একটি ভয়হীন ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশই পারে মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে।
  • জিডিপির ন্যূনতম অংশ গবেষণায় বরাদ্দ: উচ্চশিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনের জন্য গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শক্তিশালী 'গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা সরাসরি বৈশ্বিক মানদণ্ডের মৌলিক গবেষণায় ব্যয় হবে।
  • শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় কৌশলগত কোলাবরেশন (Triple Helix Model): একাডেমিক পাঠ্যক্রমকে বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে শিল্পখাতের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, জয়েন্ট রিসার্চ প্রজেক্ট এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের একাডেমিক বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে 'স্কিল গ্যাপ' কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি শিক্ষার্থীদের কেবল স্নাতক নয়, বরং দক্ষ পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলবে।
  • আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর পাঠ্যক্রমের সংস্কার: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং-কে প্রতিটি ডিসিপ্লিনে একীভূত করতে হবে। পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা কেবল তথ্যের গ্রাহক না হয়ে সমস্যার সমাধানকারী (Problem Solver) হিসেবে গড়ে ওঠে।
  • জবাবদিহিতা ও একাডেমিক ইন্টিগ্রিটি সেল: প্লেজারিজম বা মেধা-চুরি রোধ এবং একাডেমিক নৈতিকতা বজায় রাখতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল থাকতে হবে। গবেষণার মান যাচাইয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

শেষ কথা: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ

একটি জাতির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কেবল কতগুলো ডিগ্রিধারী তৈরি করছে তার ওপর নির্ভর করে না, বরং সেই শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজকে কতটা সৃজনশীল ও যুক্তিমনস্ক নেতৃত্ব উপহার দিচ্ছে—সেটাই আসল পরিমাপক। আমাদের প্রত্যাশা, আগামীর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর ক্ষমতার রাজনীতির চারণভূমি থাকবে না, বরং তা হবে মেধা ও মননের অভয়ারণ্য। সংস্কারের যে দাবি আজ উঠেছে, তা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করে। যখন আমাদের গবেষণাগারগুলো থেকে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান আসবে এবং আমাদের স্নাতকগণ বিশ্ববাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাসী হবে, তখনই বুঝব উচ্চশিক্ষার নতুন সমীকরণটি সঠিক পথে মিলছে। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে উচ্চশিক্ষাকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কেন্দ্রে স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

#উচ্চশিক্ষা #বিশ্ববিদ্যালয়_সংস্কার #শিক্ষানীতি #বাংলাদেশ_শিক্ষা #EducationReform #UniversityDevelopment #শিক্ষাবিদ #শিক্ষাবিজ্ঞান #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষা_সংস্কার #অধিকারপত্র_শিক্ষা_সংস্কার_ধারাবাহিক #EducationPolicy #AcademicIntegrity #EducationReform #BangladeshEducation #Educationist



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: