—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
সৃজনশীলতার নামে পুরোনো মুখস্থ বিদ্যার চর্চা আর বিদেশের ধার করা কারিকুলাম—কোথায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? লালন আমাদের শিশুরা তথ্যের 'খুঁটি' পুঁততে শিখছে, কিন্তু শিখছে না জীবনের আসল সীমানা। মুখস্থ বিদ্যার আস্ফালনে আমরা গড়ে তুলছি এক 'বাজারি প্রজন্ম'। অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকে আজ আমরা খুঁজবো সেই দৃষ্টির আলো, যা আমাদের 'কানা মন'কে সুস্থ করবে। সাকিবের মতো ডিগ্রিধারী শিক্ষিত হওয়া নাকি নিজের শেকড়কে চেনা—আসলে কোনটি প্রকৃত শিক্ষা? জিপিএ-৫ বনাম জীবনবোধ: দৃষ্টিভ্রমের পাঠশালায় আমরা কোন পথে? এক কানা যখন আরেক কানাকে পথ দেখায়, গন্তব্য তখন অন্ধকার। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ ও সনদ বিক্রির অন্তরালের গল্প।
বাংলার দুই সাধক—লালন ও রবীন্দ্রনাথ—যুগভেদে একই সত্যের দুই পিঠ উন্মোচন করেছেন। একজন আমাদের সামাজিক অন্ধত্বকে বিদ্রূপ করেছেন ‘কানার হাট বাজার’ বলে, অন্যজন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন ঘরের কোণের ‘শিশিরবিন্দু’ অবহেলার দায়ে। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের যে আলাপ চারদিকে প্রকম্পিত, তাতে এই দুই দর্শনের সমন্বয় ছাড়া মুক্তি মেলা ভার। আমাদের মূল লেখায় আমরা দেখেছি, কীভাবে ‘কানা মন’ সুস্থ হওয়ার নামে আমরা আবারও পুরোনো সেই ‘আন্দাজে খুঁটি গাড়ার’ স্বপ্নে বিভোর। এবার আরও গভীরে যাওয়া যাক—দৃষ্টিভ্রমের সেই পাঠশালায়, যেখানে আমরা সবাই একসঙ্গে শিক্ষক আর শিক্ষার্থী।
আন্দাজে খুঁটি ও সনদের বাণিজ্য
লালন সাঁই গেয়েছিলেন, “আন্দাজে এক খুঁটি গেড়ে, চেনে না সীমানা কার।” আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যেন ঠিক এই আন্দাজে পোঁতা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা তুলে দিচ্ছি, জিপিএ-৫ এর নেশায় বুঁদ করে রাখছি, কিন্তু শিখাচ্ছি না জীবনের আসল সীমানা। এখানে বর্তমানের জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মুখস্থ বিদ্যার আস্ফালনটিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি কী করে তথ্যের ‘খুঁটি’ পুঁততে হয়, কিন্তু শিখাচ্ছি না সেই জ্ঞানের সীমানা কোথায় বা তার প্রয়োগ কোন পথে। একটি উদাহরণ দিই। ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় রসায়নে ভালো নম্বর পেতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মুখস্থ করেছিল পর্যায় সারণির সব মৌলের পারমাণবিক ভর। কিন্তু তাদের কাউকে জিজ্ঞেস করুন, এই মৌলগুলো দৈনন্দিন জীবনে কোথায় কাজে লাগে—অধিকাংশই থতমত খাবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এমন এক ‘বাজারি’ রূপ নিয়েছে যেখানে সবাই বড় হতে চায়, কিন্তু সেই বড় হওয়া মানে কেবল বিত্ত আর পদের উচ্চতা, চিন্তার গভীরতা নয়। আমরা বিদেশের ডিগ্রিরূপী ‘সিন্ধু’ দেখার মোহে ঘরের পাশের ধানের শিষের ‘শিশিরবিন্দু’ অর্থাৎ—মৌলিক নৈতিকতা, সততা এবং স্বাজাত্যবোধকে পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছি।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মানুসন্ধান, অথচ আমরা গড়ে তুলছি এমন এক ‘বাজারি’ প্রজন্ম যারা কেবল সম্পদের উঁচু গম্বুজ মাপতে জানে। আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো আজ একেকটি ‘কানার হাট বাজার’, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার ‘অন্ধ’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সবাই। আমরা বিদেশের ডিগ্রি আর ধার করা কারিকুলামের ‘সিন্ধু’ দেখতে মরিয়া, অথচ ঘরের কোণে ধানের শিষের ওপর জমে থাকা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও নৈতিকতার ‘শিশিরবিন্দু’ আজ অবহেলায় বাষ্প হয়ে যাচ্ছে।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিবের গল্প বলা যাক। সে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যেতে চায়। তার সিভিতে আছে তিনটি আন্তর্জাতিক অনলাইন কোর্সের সার্টিফিকেট, গবেষণাপত্রের নামে দুটি প্রস্তাবনা। কিন্তু সে জানে না তার নিজের পাড়ার নর্দমার পানি কোথায় পড়ে, জানে না স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলটিতে কতজন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ক্লাস বন্ধ থাকে। তার শিক্ষা তাকে বিশ্বের মানচিত্র চিনিয়েছে, কিন্তু নিজের বাসার ঠিকানা ভোলাতে শিখিয়েছে। এটাই ‘কানা মন’—যা দূরের সিন্ধু দেখে, কিন্তু ঘরের শিশিরবিন্দু উপেক্ষা করে।
যখন অন্ধরাই দিশারী
লালনের সেই অমোঘবাণী— “এক কানা কয় আর এক কানারে চল এবার ভবপারে”—আজ আমাদের শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতি-নির্ধারক থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাদানকারীরাও যখন গন্তব্যহীন, তখন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। আমরা এমন এক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি যেখানে:
- বেদ-বিধির অন্ধ অনুকরণ: সৃজনশীলতার চেয়ে প্রথা ও বিধির জালে আমরা বেশি বন্দী।
- মদনা কানার বাহার: অজ্ঞতা আর অহংকারকে যখন আমরা পাণ্ডিত্য বলে চালিয়ে দিই, তখন শিক্ষার মূল সুরটিই হারিয়ে যায়।
আমাদের শিক্ষা সংস্কারের বড় ট্র্যাজেডি হলো লালনের সেই দৃশ্যকল্প: “এক কানা কয় আর এক কানারে চল এবার ভবপারে।” নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যখন এমন সব মানুষ বসে থাকেন যারা নিজেরাই গন্তব্য চেনেন না, তখন তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকেই নিয়ে যান।
মনে করুন, একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলছেন, “আমরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেব।” কিন্তু সেই শিক্ষক নিজে গত বিশ বছর ধরে একই লেকচার শিট বদলাননি। তার হাতে নেই আধুনিক শিক্ষাকৌশলের কোনো প্রশিক্ষণ, নেই নিজের সৃজনশীল চর্চার সুযোগ। তিনি যখন ক্লাসে দাঁড়িয়ে ‘প্রজেক্ট ভিত্তিক শিক্ষা’ বলতে যান, আসলে তিনি দিচ্ছেন পুরোনো সেই মুখস্থের নির্দেশনা—শুধু নাম বদলে। তখন শিক্ষার্থীরা জানে, এটাও আরেক পরীক্ষার ‘খেলা’।
আমরা বৈশ্বিক উন্নয়নের গালভরা বুলি বা বিদেশের ধার করা কারিকুলাম নিয়ে মেতে আছি, কিন্তু ভুলে গেছি যে— “বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা আর এক কানা মন আমার।” বাইরের পাঠ্যবই যত আধুনিকই হোক না কেন, যদি শিক্ষার্থীর ভেতরের ‘মন’ বা আত্মানুসন্ধানের আলো না জ্বলে, তবে সেই শিক্ষা কেবল অন্ধকারই বাড়াবে।
এক শিক্ষকের কাছেই শুনেছি, “নতুন বইয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে অধ্যায় আছে। কিন্তু আমি কী করে শেখাবো, যখন আমার নিজের বোধেই মুক্তিযুদ্ধ মানে শুধু কিছু তারিখ আর রণকৌশলের গল্প? চেতনা তো বুকের ভেতর থাকা দরকার, তা কি মুখস্থ করানো যায়?” সত্যিই, চেতনাকে যদি আমরা মুখস্থের খাতায় নামাই, তবে সেটি কেবল আরেকটি ‘কানার হাটে’র পণ্যে পরিণত হয়।
বোবার রসগোল্লা বনাম বাণিজ্যিক জ্ঞান
লালন বলেছিলেন, “বোবাতে খায় রসগোল্লা গো”। অর্থাৎ সত্যের স্বাদ যারা পায়, তারা অনেক সময় নির্বাক হয়ে যায়। আজকের দিনে আমাদের সত্যিকারের মেধাবীরা কোণঠাসা। তাদের কণ্ঠস্বর বাজারের কোলাহলে হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে, একদল মানুষ ‘মদনা কানা’র মতো ঘুমের ঘোরে নিজেদের অসম্পূর্ণ জ্ঞানকে জাহির করে যাচ্ছে। শিক্ষার সংস্কার বলতে আমরা কেবল অবকাঠামো বুঝি, কিন্তু হৃদয়ের সংস্কার বা ‘দৃষ্টির ছানি’ কাটার কোনো কার্যকর উদ্যোগ সেখানে নেই।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি আমরা কেবল বাণিজ্যিকীকরণ আর সনদ বিক্রির কেন্দ্র বানিয়ে রাখি, তবে লালনের সেই ‘ভবপার’ হওয়া আর কোনোদিনই সম্ভব হবে না। আসুন, সিন্ধুর মায়া কাটিয়ে একবার ধানের শিষের দিকে তাকাই। সেই ক্ষুদ্র শিশিরবিন্দুতেই লুকিয়ে আছে আমাদের মুক্তির মহাকাব্য।
ঘরের দু’পা দূরেই কি মুক্তি?
রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন যে, অনেক অর্থ ব্যয় করে পর্বত আর সিন্ধু দেখতে গেলেও ঘরের দু’পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের শিশিরবিন্দুটি আমাদের দেখা হয় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও তাই। আমরা বিদেশের অক্সফোর্ড-হার্ভার্ডের অনুকরণে ব্যস্ত, কিন্তু আমাদের চারপাশের সামাজিক সমস্যা, মানুষের দুঃখ-বেদনা আর মাটির গন্ধমাখা দেশজ জ্ঞানকে উপেক্ষা করছি। শিক্ষা সংস্কারের মূল চাবিকাঠি এখানেই নিহিত:
- দৃষ্টি পরিবর্তন: তথ্যের বোঝা নয়, বরং চিন্তার স্বচ্ছতা তৈরি করা।
- শেকড়ে প্রত্যাবর্তন: বিদেশের ‘সিন্ধু’ দেখার আগে নিজের ধানের শিষের ‘শিশিরবিন্দু’ অর্থাৎ দেশজ কৃষ্টি ও নৈতিকতাকে চিনতে শেখানো।
- অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ: ‘এক কানা’ যেন অন্যকে পথ না দেখায়, সেজন্য যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের হাতে শিক্ষার ব্যাটন তুলে দেওয়া।
শিশিরবিন্দুতে জাতীয় মুক্তি
রবীন্দ্রনাথের সেই “দুই পা ফেলিয়া এ ঘর হতে, না দেখি গ্রামের পথ, না দেখি সেথায় শিশিরবিন্দু পড়ে রয়েছে ঘাসের উপর”—সত্য দেখার আহ্বান আমাদের দেশজ শিক্ষার মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ছিল। আমরা বিদেশের তত্ত্বে শিক্ষিত হয়ে পাড়ার নর্দমা বা সামাজিক কুসংস্কারের প্রতি অন্ধ থাকি। এই ‘নিকট-অন্ধত্ব’ আমাদের এমন এক জাতিতে পরিণত করছে যারা অনেক কিছু জানে, কিন্তু কিছুই বোঝে না।
আসুন, শিশিরবিন্দুর অনুপস্থিতির কয়েকটি স্তর চিহ্নিত করি—
- প্রথমত, শিক্ষা যখন বিলাসিতা: আমরা কঠিন সব তত্ত্ব মুখস্থ করি, অথচ সাধারণ মানুষের প্রতি মমতা বা সত্যবাদিতার ‘শিশিরবিন্দুটি’ আমাদের চোখে পড়ে না। একটি উচ্চমানের স্কুলের শিক্ষার্থী রাত জেগে ক্যালকুলাসের জটিল অঙ্ক আয়ত্ত করে, কিন্তু রাস্তার পাশে ক্ষুধার্ত শিশুটিকে দেখে তার মন উদাসীন থাকে। শিক্ষার নামে ‘কৃতিত্ব’ অর্জন করলেও মানবিকতায় সে দেউলিয়া।
- দ্বিতীয়ত, মদনা কানার বাহার: অজ্ঞতাকে পাণ্ডিত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেছে, তা লালনের সেই “ঘুমের ঘোরে বাহার” ছাড়া আর কিছু নয়। একজন শিক্ষার্থী প্রকল্প জমা দেয় ইন্টারনেট থেকে কপি করে, শিক্ষক তা ‘অসাধারণ’ বলে গ্রেড দেন—কারণ তিনিও সেই একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি চান। এই বাহারে কেউ কখনও জানে না, আসলে কে কতটুকু জানে। শিক্ষা মূল্যায়ন হয়ে ওঠে কপি-পেস্টের প্রতিযোগিতা।
- তৃতীয়ত, ‘হাট’-এর দর্শন: ‘কানার হাট বাজার’ শুধু অন্ধত্বের জায়গা নয়, এটি এক অস্বচ্ছ বাজারের রূপক। যেখানে ক্রেতা জানে না কী কিনছে, বিক্রেতা জানে না কী বেচছে—শুধু লেনদেনের আনন্দে সবাই মেতে থাকে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সনদের বাণিজ্য’ সেই হাটেরই আধুনিক সংস্করণ। অভিভাবক টাকা দেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সনদ দেয়, শিক্ষার্থী ‘পাস’ হয়—কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা নামক ‘শিশিরবিন্দু’টি কোথাও বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।
বাস্তবের গল্প: যখন ‘কানা মন’ সনদ খোঁজে
ময়মনসিংহের একটি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে শুনলাম এক হতাশার গল্প। “আমাদের ছেলেমেয়েরা খুব মেধাবী,” তিনি বলেন, “কিন্তু তারা যা চায়, তা হচ্ছে ‘যেন পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল’—সৃজনশীলতা নয়। অভিভাবকরা ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্যার, প্রজেক্টে না এলে কি নম্বর কাটা যাবে?’ আসলে তারা চান একদম পরীক্ষামুখী শিক্ষা।”
এই দাবির জবাবে সংস্কার কখনও কখনও আত্মসমর্পণ করে। শিক্ষকরা জানেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে ‘খুঁটি গাড়া’ সময়সাপেক্ষ। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট না এলে তদন্ত কমিটি বসে। তাই সমঝোতা: নতুন বই, পুরোনো পদ্ধতি। ক্লাসের একাংশ সময় যায় ‘নতুন সৃজনশীল বই পড়ার’ ভান করতে, বাকি সময় চলে পুরোনো মডেল টেস্ট।
লালনের আরেকটি পংক্তি প্রাসঙ্গিক— “কানারে কানায় যদি যাই, তবে কেমন করে দিশা পাই?” অর্থাৎ, এক অন্ধ যখন আরেক অন্ধকে পথ দেখায়, তখন গন্তব্য তো দূরের কথা, চলার পথটাই অচেনা থেকে যায়। আমাদের শিক্ষা সংস্কারের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা কি সত্যিই ‘চক্ষুষ্মান’? না কি তাঁরাও সেই ‘কানার হাটে’র দর্শকমাত্র?
শিশিরবিন্দুর সন্ধানে: কয়েকটি পথনির্দেশ
আমরা যদি সত্যিই চাই আমাদের শিক্ষা ‘কানা মন’কে সুস্থ করুক, তাহলে দরকার লালন-রবীন্দ্রের সমন্বয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। শিশিরবিন্দুর সন্ধানে কয়েকটি মঞ্চ—
- নিকটের শিক্ষা: বিদেশি তত্ত্বের পাশাপাশি স্থানীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি জেলার লোকসংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস শিক্ষার অংশ হোক। শিশিরবিন্দু মানেই সেই ক্ষুদ্র, কাছের সত্য।
- মূল্যায়নের বিপরীতগতি: পরীক্ষায় কেবল সঠিক উত্তর নয়, প্রশ্ন করার ক্ষমতা, ভুল স্বীকার করার সাহস, সহমর্মিতার মতো মানবিক গুণাবলি যুক্ত করতে হবে। কানার চোখে যদি আঙুল দিতে হয়, তবে তাকে দেখতে শেখার চেয়েও বড় শিক্ষা হলো ‘অন্ধত্ব স্বীকার করা’।
- শিক্ষকের পুনর্জাগরণ: শিক্ষক প্রশিক্ষণ যেন কেবল ‘পদ্ধতি’ না শেখায়, বরং ‘মন’কে প্রস্তুত করে। শিক্ষককে দিতে হবে স্বাধীনতা, শ্রদ্ধা এবং সময়। তবেই তিনি শিশিরবিন্দুর সৌন্দর্য দেখতে পাবেন, আর তা শিক্ষার্থীর চোখে ফোটাতে পারবেন।
- হাট ভাঙার উদ্যোগ: ‘সনদের বাণিজ্য’ বন্ধ করতে হবে নৈতিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে, যেখানে পাশের হার নির্ধারণ করবে সততা ও দায়িত্ববোধ—কেবল মুখস্থ জ্ঞান নয়।
শেষ কথা: চেনার শেষ সুযোগ
শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল সিলেবাস পরিবর্তন নয়, বরং লালনের ‘কানা মন’কে চেনা এবং রবীন্দ্রনাথের ‘চক্ষু মেলিয়া’ দেখার শক্তির পুনর্জাগরণ। যে জাতি ধানের শিষের ওপরের শিশিরবিন্দুর স্বচ্ছতা বুঝতে পারে না, তারা কখনোই সিন্ধুর বিশালতাকে ধারণ করতে পারবে না।
আমাদের শিক্ষা যদি আমাদের নিজের ঘরের সত্যকে দেখতে না শেখায়, তবে আমরা সেই ‘কানার হাট বাজারেই’ সারাজীবন ঘুরে মরব। ভবপারে যাওয়ার আগে অর্থাৎ বিশ্বায়নের এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার আগে, আমাদের প্রয়োজন নিজের আলোকবর্তিকাটি চিনে নেওয়া।
লালন বলেছিলেন, “আপনারে চিনলি না রে, তুই আপনারে চিনলি না।” আমাদের শিক্ষা সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের ‘আপনার’ চিনতে পারবে—যেখানে কানা মন যেমন আন্দাজে খুঁটি গাড়ে, তেমনি শিশিরবিন্দু তাকে দেখায় আলোর পথ। কিন্তু সেই পথ পেতে হলে হাট ছেড়ে বাড়ি ফেরা দরকার। ফিরতে হবে নিজের চোখে দেখার সাহসে। তবেই না কানা মন সুস্থ হবে, তবেই না শিক্ষা নামক বাতিঘর আমাদের ভবপারের পথ দেখাবে।
আর সেই পথ দেখার আগ পর্যন্ত, আমরা হয় কানার হাটে টাকার বিনিময়ে সনদ কিনব, নয় শিশিরবিন্দুর সন্ধানে ঘাসের ওপর ঝুঁকে পড়ব—পছন্দ আমাদেরই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্ধকারে হাটলেও একদিন পা থমকে যায়। আলো চাই, সেই আলো নিজের ভেতরের চোখে দেখার আলো।দৃষ্টিভ্রমের পাঠশালা: ‘কানার হাট’ থেকে ‘শিশিরবিন্দুর’ সন্ধানে
️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #লালন_রবীন্দ্রনাথ #অধিকারপত্র #কানার_হাট #শিশিরবিন্দু #শিক্ষা_দর্শন #বাংলাদেশ #LifeLearning #Odhikarpatra #EducationReform #CriticalThinking #OdhikarpatraNews #SustainableEducation #নৈতিক_শিক্ষা #শিক্ষাব্যবস্থা #বাস্তবতা #দৃষ্টিভ্রমের_পাঠশালা #ViralEducation #BangladeshEducation #Odhikarpatra #লালন #রবীন্দ্রনাথ #শিক্ষা #দৃষ্টিভ্রম #Awareness

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: