নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্রর
ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫২০ জনেরও বেশি এবং ধসে পড়া শত শত ভবনের নিচে এখনও অন্তত ২০০ মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরার ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবিতদের খুঁজে বের করতে সময়ের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালাচ্ছেন।
শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ
গত বুধবার (২৪ জুন) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, দ্বিতীয় কম্পনটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। সংস্থাটির প্রাথমিক পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে যে, মোট নিহতের সংখ্যা চূড়ান্তভাবে কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলেও কম্পন অনুভূত হয়েছে এবং সেখানে ভবন খালি করে দেওয়া হয়।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয়
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ১৩৮টিরও বেশি আফটারশক (অনুকম্পন) রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, মূলত লা গুয়াইরা এবং কারাকাস অঞ্চলে ২৫০টিরও বেশি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কারাকাসের সান আগুস্তিন এলাকার ২০ বছর বয়সী বাসিন্দা আন্তোয়ান মারিন এই ভয়াবহতার বিবরণ দিয়ে জানান, "মনে হচ্ছিল পুরো বাড়িটি দুই ভাগে ফেটে যাবে। আমাদের এলাকার বেশিরভাগ ঘরবাড়িই অপরিকল্পিতভাবে তৈরি, যা ভূমিকম্প সহনশীল নয়।" তিনি আরও জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরের বহুতল ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং উদ্ধারকারীরা এখনও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
দুর্যোগের কারণে কারাকাসের প্রধান বিমানবন্দর সিমোন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশের স্কুল-কলেজ সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে সেগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জরুরি অবস্থা ও আন্তর্জাতিক সাহায্য
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন বা অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং দুর্গতদের সহায়তার জন্য প্রাথমিকভাবে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছেন। একই সাথে ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভারী যন্ত্রপাতি চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।জাতীয় এই দুর্যোগ মোকাবেলায় রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হোর্হে রদ্রিগেজ।
ইতিমধ্যে জাতিসংঘ (UN), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, স্পেন এবং কাতারের বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানবিক সহায়তা ও লজিস্টিকস দ্রুত পৌঁছানোর জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর 'সাউদার্ন কমান্ড' (SOUTHCOM) সরাসরি কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং এর পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বর্তমানে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এক বিশাল প্রশাসনিক পরীক্ষা।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: