odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 21st October 2026, ২১st October ২০২৬
তেলের দাম বৃদ্ধি, রুশ জ্বালানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে ওয়াশিংটনের মনোযোগের পরিবর্তন—তেহরান সংকটে রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের পাশে রাশিয়া, তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে কি লাভবান হচ্ছে মস্কোও?

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ২৩:৫৯

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২০ October ২০২৬ ২৩:৫৯

অধিকারপত্র ডটকম | আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি :

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে মস্কো। তবে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি এই সংকট থেকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে রাশিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, রুশ জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক হিসাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মস্কোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ১৯ অক্টোবর তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রতি মস্কোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানে সহায়তার আগ্রহ জানান। লাভরভের এই সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানকে সহায়তার ক্ষেত্রে রাশিয়া এখন পর্যন্ত খুব বেশি কিছু করছে না।

তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার আয় বৃদ্ধি

ইরান সংঘাতের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। আল জাজিরার ২০ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার থাকলেও মার্চ ও এপ্রিলে তা বেড়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। ২০ অক্টোবরও দাম ছিল ১০৯ ডলারের ওপরে।

তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার মতো বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ বেশি আয় করার সুযোগ পায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে রয়টার্সের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এপ্রিল নাগাদ রাশিয়ার প্রধান তেল কর থেকে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় কিছু ক্রেতা বিকল্প উৎস হিসেবে রুশ তেলের দিকে ঝুঁকেছে।

রুশ জ্বালানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ

সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র রুশ জ্বালানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রে আগে থেকেই বোঝাই করা রুশ তেল বিক্রির ক্ষেত্রে মার্চ থেকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ছাড় দিয়েছে। চলতি মাসে রুশ ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে একদিকে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর পশ্চিমা চাপ বজায় রাখার নীতিতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও সমালোচনা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে জ্বালানির বাজার, সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ মার্কিন নীতির ওপর।

 ইউক্রেন যুদ্ধেও কি সুবিধা পাচ্ছে মস্কো?

ইরানকে ঘিরে সংঘাত আন্তর্জাতিক কূটনীতির মনোযোগের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনকে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে ইউক্রেন যুদ্ধের আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ হিসেবে দেখছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক জন লফ আল জাজিরাকে বলেছেন, ক্রেমলিন ইরান সংকটের সুযোগ নিয়ে ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের মিল তৈরির চেষ্টা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

 রাশিয়া কি চায় সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হোক?

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত চলতে থাকলে উচ্চ তেলের দাম ও জ্বালানি বিক্রির সুযোগ থেকে রাশিয়া লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের মনোযোগ বিভক্ত থাকলে মস্কো কূটনৈতিক সুবিধাও পেতে পারে।

তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে রাশিয়ার জন্য ঝুঁকিও তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মূল্যায়ন হলো, মস্কোর কিছু স্বার্থ সংঘাত অব্যাহত থাকার সঙ্গে জড়িত হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক—এমনটি দেশটি নাও চাইতে পারে।

 মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাশিয়ার ভূমিকা

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মস্কোর কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার সুযোগও তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৯ অক্টোবর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে রাশিয়া কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে সংঘাতরত পক্ষগুলোর আস্থা, আলোচনার অগ্রগতি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইরান সংকট রাশিয়ার জন্য একদিকে জ্বালানি আয়ের সুযোগ এবং অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুবিধা কত দিন থাকবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, তেলের বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

সূত্র: আল জাজিরা, ২০ অক্টোবর ২০২৬; ইউরোনিউজ, ১৯ অক্টোবর ২০২৬।