ছবি আল-জাজিরার
অধিকারপত্র ডটকম অনলাইন ডেক্স | আল-জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা, ৩ নভেম্বর ২০২৬: দিনে একবেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে। এমনকি সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক পোশাকশ্রমিক। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে এবার রাজপথে নেমেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের হাজার হাজার শ্রমিক।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশের এই শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে অর্ধেকই নারী। তাঁদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম ১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরি দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। তাই ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন তাঁরা।.jpg)
ছবি, আলজেরিয়ার
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম, মজুরি আন্দোলন এবং শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
একবেলা খাবার জোটানোও কঠিন লাইলী বেগমের
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৩৭ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক লাইলী বেগমের জীবনসংগ্রামের কথা। ঢাকার কাছে একটি পোশাক কারখানায় অভিজ্ঞ সেলাই অপারেটর হিসেবে কাজ করেন তিনি। মাসে তাঁর আয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে তা বেড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা হয়।
কিন্তু এই আয়েও সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাভাবে তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ও ১২ বছর বয়সী ছেলে চলতি বছর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে।
আলজাজিরাকে লাইলী বলেন, তাঁদের দিনে একবেলা ঠিকমতো খাবার জোটানোও কঠিন। কখনো সকালে মুড়ি ও চানাচুর খেয়েই দিন কাটাতে হয়। দুপুরে খাবার থাকে না। রাতে কিছু ভালো খাবার পাওয়া যাবে—এই আশায় অপেক্ষা করেন তাঁরা।
পরিবারের দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর ছেলের শরীর এতটাই শুকিয়ে গেছে যে বুকের পাঁজরের হাড় পর্যন্ত দেখা যায়।
চার দিনে গড়াল আন্দোলন, বন্ধ শত শত কারখানা
আলজাজিরার প্রতিবেদনে সোমবার পর্যন্ত ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ এবং যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার প্রায় ৭০০ কারখানা বন্ধ ছিল। সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। Reuters +1
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যরা রয়েছেন।
শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার নতুন মজুরি কাঠামো দ্রুত নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। The Daily Star +1
মূল্যস্ফীতিতে কমেছে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিক রাসেল খান জানান, অতিরিক্ত সময় কাজ করেও মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করে পরিবারের ব্যয় মেটাতে পারছেন না। প্রয়োজন মেটাতে তাঁর প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। Al Jazeera
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর দায় নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, জারা, লেভি স্ট্রস, ওয়ালমার্ট ও প্রাইমার্ক। গত অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি।
বিজিএমইএর কর্মকর্তা ও শিল্পোদ্যোক্তা শেখ হোসেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজের বক্তব্য, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য পাওয়া জরুরি। অন্যদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকারবিষয়ক গবেষক ও আইনজীবী তাকবির হুদা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মূল্য নির্ধারণ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। Al Jazeera
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিকদের জীবনমান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান আয়ে খাদ্য, বাসস্থান ও সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে কারখানার মালিকেরা উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহের চাপের কথা বলছেন।
মজুরি বোর্ডের আলোচনায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মালিকদের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ন্যায্য মূল্য প্রদানের বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়, তার ওপর নির্ভর করছে এই সংকটের পরবর্তী গতিপথ।
ছবি আল-জাজিরার , তথ্যসূত্র[Al Jazeera —
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ডেস্ক | অধিকার পত্র ডটকম
