— উপদেষ্টা সম্পাদকের বিশেষ কলাম
ঝরনা কলম থেকে ডট পেন, কিংবা ‘বাবা’ থেকে ‘বাপি’— আধুনিকতার দৌড়ে আমরা কি নিজেদের শিকড় হারিয়ে ফেলছি? বৃদ্ধাশ্রম, টাকার নেশা আর কৃতজ্ঞতাহীনতার এই ‘নীরব সর্বনাশ’ নিয়ে পড়ুন এক বিশেষ সামাজিক বিশ্লেষণ। জেন-জি জমানায় আমাদের সংস্কৃতি ও সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ।
তারাপদ রায় যখন লিখেছিলেন, "আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া ভেবেছিলাম... গতকাল বলাইবাবু বললেন, ওটি বানরলাঠি গাছ", তখন হয়তো তিনি নিছকই একটি ভুল চেনার গল্প বলেছিলেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে যখন আমরা আমাদের ‘জেন-জি’ (Gen-Z) সন্তানদের দিকে তাকাই, তখন বলাইবাবুর সেই অমোঘ সত্যটি আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ নয়, বরং কলার টিউন আর রিলসের মিউজিকের তোড়ে এক বিচিত্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে। আমরা বুঝতে পারছি না, আমাদের পরম যত্নে পালিত 'অ্যালসেশিয়ান' শাবকটি কেন রাতারাতি খেঁকি কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ না করে 'মিম' (Meme) ছুঁড়ে মারছে!
আমাদের সর্বনাশটা আসলে একদিনে হয়নি। ঝরনা কলম কবে যে ডট পেন হয়ে গেল, আর আমাদের শ্রদ্ধেয় 'বাবা' কবে যে স্রেফ 'পাপি' বা ’বাপি’ বা ’ডেডি’ কিংবা ‘ভাই’ যে কখন 'ব্রো' (Bro)-তে রূপান্তরিত হলেন, তা বোঝার আগেই জেন-জি প্রজন্ম আমাদের চেনা সংস্কৃতির রেললাইন থেকে গাড়িটিকে এক্কেবারে 'অফ-ট্র্যাক' করে দিয়েছে।
১. কৃষ্ণচূড়ার স্বপ্ন বনাম বানরলাঠির বাস্তবতা
বাঙালি সংস্কৃতির মূল নির্যাস ছিল 'ধ্রুপদী বিন্যাস'। আমরা প্রেম করতাম চিঠিতে, আড্ডা দিতাম বকুলতলায়, আর গুরুজনদের সামনে গেলে ভয়ে নয়, শ্রদ্ধায় মেরুদণ্ড একটু নুয়ে যেত। আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হবে সেই ‘কৃষ্ণচূড়া’, যার রূপ আর গুণ সারা বিশ্বকে মোহিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখন এক দিগভ্রান্ত ‘বানরলাঠি’ বনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।
জেন-জি প্রজন্মের কাছে জীবনটা এখন একটা ‘১৫ সেকেন্ডের রিলস’। গভীরতা এখানে বিলাসিতা। কোনো বিষয়ের গভীরে যাওয়া তাদের কাছে ‘টক্সিক’ (Toxic) বা ‘বোরিং’। তারাপদ রায়ের সেই বলাইবাবু আজ বেঁচে থাকলে দেখতেন, আমরা যে ছেলেটিকে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলাম, সে এখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘কাঁচা বাদাম’ বা ‘জাস্ট লুকিং লাইক এ ওয়াও’ বলে চিৎকার করছে। আমাদের ধ্রুপদী প্রশস্তিগুলো এখন ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে ‘Lol’ আর ‘Lmao’-এর ভিড়ে হারিয়ে গেছে। এই যে সাংস্কৃতিক রূপান্তর, এটা যে কেবল রুচির পরিবর্তন তা নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত ‘সর্বনাশ’।
২. ঝরনা কলম যখন ডিসপোজেবল ডট পেন
তারাপদ রায় আক্ষেপ করেছিলেন ঝরনা কলমের ডট পেন হয়ে যাওয়া নিয়ে। ঝরনা কলমে একটা আভিজাত্য ছিল, ছিল কালির দাগ মোছার লড়াই আর ধৈর্য। আজকের প্রজন্মের চিন্তাধারা ঠিক ওই ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ ডট পেনের মতো। তাদের সম্পর্কগুলো এখন ‘সিচুয়েশনশিপ’ (Situationship), যেখানে মায়া আছে কিন্তু দায়িত্ব নেই। তাদের ক্যারিয়ার ভাবনা এখন ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হওয়া। পরিশ্রম করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেয়ে তারা ‘ভাইরাল’ হয়ে লিফটে চড়তে বেশি পছন্দ করে।
আমাদের সময় বড়বাবু ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। আজ জেন-জি অফিসে ঢুকে বসকে বলছে, "হোয়াটস আপ ড্যুড!"। এই যে সামাজিক দূরত্বের বিলুপ্তি, অনেকে একে 'প্রগতি' বললেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা। যখন সম্পর্কের গাম্ভীর্য হারিয়ে যায়, তখন সমাজের কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে কারণ আমরা ‘কোয়ালিটি’র বদলে ‘কোয়ান্টিটি’কে বরণ করে নিয়েছি। ওই যে কবি বলেছিলেন, "আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন"—এই 'বাপি' সম্বোধনের ভেতর একটা আলগা আদর থাকতে পারে, কিন্তু সেই ছায়া দেওয়ার মতো বটবৃক্ষসুলভ ‘বাবা’ ইমেজটি আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আড়ালে ফিকে হয়ে গেছে।
৩. অ্যালসেশিয়ান না কি খেঁকি কুকুর?
প্রজন্মের এই বিচ্যুতিকে সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় তাদের আচরণের অসংলগ্নতায়। আমরা ভেবেছিলাম আধুনিক শিক্ষা আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের সন্তানরা হবে 'অ্যালসেশিয়ান'—বুদ্ধিমান, অনুগত এবং রক্ষণশীল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উন্মুক্ত চারণভূমিতে বড় হতে হতে তারা এক বিচিত্র 'খেঁকি' স্বভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সামান্য কথাতেই 'ক্যানসেল কালচার' (Cancel Culture)-এর শিকার হওয়া, বড়দের উপদেশকে 'বুমার অ্যাডভাইস' বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া—এগুলো কি বিচ্যুতি নয়?
বাংলার চিরায়ত লোকজ ঐতিহ্য, যেমন—নবান্ন, পিঠা উৎসব কিংবা পাড়ার লাইব্রেরি, আজ জেন-জির কাছে 'অ্যানালগ' জঞ্জাল। তাদের উৎসব মানেই এখন ডিজে পার্টি আর কৃত্তিম আলোর ঝলকানি। এই প্রজন্ম যত বেশি গ্লোবাল (Global) হচ্ছে, তত বেশি লোকাল (Local) শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারাপদ রায়ের ভাষায়, আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের সর্বনাশটা কখন শুরু হলো। যখন আমরা মা-বাবার হাতের রান্নার চেয়ে ইউটিউব দেখে তৈরি করা ‘পাস্তা’কে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলাম, তখনই আসলে আমাদের ডট পেনের যুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
৪. ভাষাগত বিপর্যয়: বাংলিশের রাজত্ব
ভাষার ক্ষেত্রে এই বিচ্যুতি সবচেয়ে ভয়ংকর। তারাপদ রায়ের আক্ষেপ ছিল পদমর্যাদার পরিবর্তন নিয়ে। আর আমাদের আক্ষেপ ভাষার বিকৃতি নিয়ে। জেন-জি যে ভাষায় কথা বলে, তাকে বাংলা বলা কঠিন, আবার ইংরেজি বলাও অসম্ভব। এক অদ্ভুত ‘খিচুড়ি’ ভাষায় তারা মনের ভাব প্রকাশ করছে। "আমার ক্রাশ আমাকে ঘোস্ট করেছে," কিংবা "ব্যাপারটা খুব কঞ্জুস টাইপ ভাইব দিচ্ছে"—এসব বাক্য শুনলে মনে হয়, আমাদের হাজার বছরের ভাষার ঐতিহ্য কোনো এক অদৃশ্য ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যাচ্ছে।
আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে যখন আমরা নিজের অজান্তেই সন্তানদের ইংরেজি ভার্সন স্কুলে পাঠিয়ে ভাবলাম তারা ‘অ্যালসেশিয়ান’ হবে, কিন্তু দিনশেষে তারা না শিখলো রবীন্দ্রনাথ, না শিখলো শেক্সপিয়র। তারা শুধু শিখলো কীভাবে অল্প পরিশ্রমে নিজেকে ‘কুল’ (Cool) প্রমাণ করা যায়।
৫. গন্তব্যহীন ট্রেন এবং আউট ট্র্যাকের জীবন
আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের যে ট্রেনটি একসময় সততা, ধৈর্য আর সহনশীলতার লাইনে চলত, জেন-জি তাকে ‘শর্টকাট’ নিতে গিয়ে লাইনচ্যুত করে ফেলেছে। এখনকার অস্থিরতা, মানসিক অবসাদ আর আত্মকেন্দ্রিকতা—এগুলো সবই সেই ‘আউট ট্র্যাক’ জীবনের লক্ষণ। আমরা যখন তাদের জন্য ধ্রুপদী বিন্যাসে ভবিষ্যতের নীল নকশা আঁকছিলাম, তারা তখন ডিজিটাল দুনিয়ার বানরলাঠি গাছে ঝুলে সেলফি তুলছে।
সামাজিক শিষ্টাচার এখন মৃতপ্রায়। বাসে বয়স্ক মানুষকে সিট ছেড়ে দেওয়া কিংবা গুরুজনের সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলার যে অলিখিত নিয়মগুলো ছিল, জেন-জি তাকে মনে করে ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার’ ওপর হস্তক্ষেপ। অথচ এই বাঁধনগুলোই সমাজকে এক সুতোয় গেঁথে রাখত।
৬. বৃদ্ধাশ্রমের ‘কুল’ সংস্কৃতি ও বিপন্ন মানবিকতা আমাদের এই ‘নীরব সর্বনাশের’ সবচেয়ে কুৎসিত অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে আমাদের অন্দরে, যেখানে ‘পরিবার’ নামক প্রাচীন বটবৃক্ষটি আজ শিকড়হীন হয়ে পড়ছে। আমরা যখন আমাদের সন্তানদের ‘অ্যালসেশিয়ান’ বানানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলাম, তখন খেয়ালই করিনি যে তারা কখন বড়দের সঙ্গকে ‘টক্সিক’ মনে করতে শুরু করেছে। আজ জেন-জি কিংবা আধুনিকতার নামাবলি গায়ে দেওয়া প্রজন্মের কাছে মা-বাবা কিংবা প্রবীণরা যেন ঘরের কোণে পড়ে থাকা একতাল পুরোনো আসবাব। ফলে অত্যন্ত সুকৌশলে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ বিষয়টিকে এক ধরণের আধুনিক ‘অ্যাকমোডেশন’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা চলছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ঘরকে মন্দির মনে করতেন, আজকের প্রজন্ম তাকেই কেবল একটি ‘লিভিং স্পেস’ হিসেবে দেখে, যেখানে মা-বাবার ঠাঁই হওয়াটা তাদের ভাষায় ‘স্পেস’ নষ্ট করা।
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো তাদের এই ‘ডিজিটাল মানবিকতা’। ফেসবুকের দেয়ালে কিংবা রিলসের ভিডিওতে তারা যখন বিপন্ন মানবতার জন্য ‘স্যাড ইমোজি’র বন্যায় বুক ভাসায়, তখন হয়তো তাদের নিজের ঘরের বৃদ্ধ মা বা বাবা এক গ্লাস জলের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেন। তাদের কাছে মানবিকতা মানে এখন রাস্তার ধারের ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দিয়ে সেই দৃশ্যটি ড্রোন দিয়ে শ্যুট করা। এই যে ‘কাঁদতে থাকা মানবিকতা’ (Crying Humanity), যা মূলত ক্যামেরার লেন্স আর ভিউ-র ওপর নির্ভরশীল—তা আসলে কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা নয়, বরং বানরলাঠির মতো অন্তঃসারশূন্য এক প্রদর্শনী। যখন নিজের রক্ত-মাংসের সম্পর্কগুলোকে ‘ওল্ড হোম’-এ পাঠিয়ে দিয়ে কেউ ‘সেভ হিউম্যানিটি’র হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে, তখন বুঝতে হবে আমাদের মূল্যবোধের সেই ঝরনা কলমটি কেবল শুকিয়েই যায়নি, বরং আমাদের সংস্কৃতির খাতাটিই উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে।
৭. সবিনয় নিবেদন: যখন মুদ্রাই একমাত্র মাপকাঠি
আমাদের এই ‘নীরব সর্বনাশের’ মূলে রয়েছে এক ভয়ংকর বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তারাপদ রায়ের সেই সরল যুগে মানুষের পরিচয় ছিল তার রুচিতে, তার পঠিত বইয়ের তালিকায় কিংবা তার চারিত্রিক দৃঢ়তায়। কিন্তু আজকের জেন-জি শাসিত সময়ে আমরা সবকিছুকে বিচার করছি ‘প্রাইস ট্যাগ’ দিয়ে। এখন শিক্ষা মানে জ্ঞানার্জন নয়, বরং ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ (ROI)। যে ডিগ্রি বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা যায় না, সেই শিক্ষার আজ কোনো কদর নেই। আমাদের সন্তানরা এখন আর ‘মানুষ’ হওয়ার স্বপ্ন দেখে না, তারা স্বপ্ন দেখে ‘নেট ওর্থ’ (Net Worth) বাড়ানোর। আমরাও তাদের শিখিয়েছি যে, যার পকেটে টান আছে, তার ব্যক্তিত্বে নিশ্চয়ই কোনো খুঁত আছে।
এই যে সবকিছুকে টাকা আর বিত্তের পাল্লায় মাপার সংস্কৃতি, এটি আমাদের সম্পর্কের সুতোকে করে তুলেছে অত্যন্ত পাতলা। বন্ধুত্ব এখন আর আড্ডার গভীরতায় নয়, বরং কে কোন দামি ক্যাফেতে চেক-ইন দিচ্ছে বা কার হাতে কোন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন—তার ওপর নির্ভর করে। এমনকি বিয়ে বা পারিবারিক সম্পর্কগুলো এখন স্রেফ এক একটি ‘বিজনেস ডিল’ বা ব্যবসায়িক লেনদেনে পরিণত হয়েছে। আমরা ভুলে গেছি যে, কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্য তার লাবণ্যে, তার বাজারমূল্যে নয়। বিত্তের এই অন্ধ দৌড়ে আমরা এতটাই বিভোর যে, আমাদের নৈতিকতা আর মনুষ্যত্ব আজ নিলামে উঠেছে। যখন একটি প্রজন্ম বিশ্বাস করতে শুরু করে যে টাকাই হলো সাফল্যের একমাত্র পরাকাষ্ঠা, তখন বুঝতে হবে আমাদের সেই ‘বনস্পতি’ হওয়ার স্বপ্নটি এক অতি সাধারণ ‘বানরলাঠি’র অসারতায় পর্যবসিত হয়েছে।
আপনার প্রবন্ধের গাম্ভীর্য এবং বিষয়বস্তুর গভীরতা বজায় রেখে ‘কৃতজ্ঞতাবোধের অভাব ও ব্লেম গেম’ বিষয়ক অনুচ্ছেদটি নিচে দেওয়া হলো। এটি আপনি পূর্বের পয়েন্টগুলোর সাথে যুক্ত করতে পারেন:
৮. কৃতজ্ঞতার নির্বাসন: ‘দশ বনাম এক’-এর নিষ্ঠুর সমীকরণ
আমাদের এই সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় যে বিচ্যুতিটি ঘটেছে, তা হলো ‘কৃতজ্ঞতাবোধের’ (Gratitude) চূড়ান্ত বিলুপ্তি। আগেকার দিনে কেউ কারও একবার উপকার করলে মানুষ তা আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে রাখত। আর এখনকার ‘ইনস্ট্যান্ট’ যুগে সমীকরণটি দাঁড়িয়েছে—‘দশ বিয়োগ এক সমান শূন্য’। অর্থাৎ, আপনি কারও জন্য দশবার জীবন উজাড় করে দিলেন, কিন্তু এগারো বারের মাথায় কোনো সঙ্গত কারণে একবার ‘না’ বললেন—অমনি আপনার আগের দশবারের ত্যাগ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আপনাকে ‘ভিলেন’ বা ‘টক্সিক’ ঘোষণা করা হবে। জেন-জি জমানায় মানুষের স্মৃতিশক্তি এখন ডট পেনের কালির চেয়েও দ্রুত শুকিয়ে যায়।
উপকার গ্রহণ করাটা এখন তাদের কাছে এক ধরণের ‘অধিকার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সেই উপকারের প্রতিদান বা নূন্যতম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা তাদের কাছে ‘ক্ষ্যাত’ বা সেকেলে বিষয়। একবার প্রত্যাশা পূরণ না হলেই শুরু হয় নির্দয় ‘ব্লেম গেম’ বা দোষারোপের সংস্কৃতি। এই যে সামান্যতেই মানুষকে ছুড়ে ফেলা কিংবা অতীতের সমস্ত ভালো কাজকে এক নিমেষে অস্বীকার করা—এটি একটি চরম আত্মকেন্দ্রিক সমাজের লক্ষণ। তারাপদ রায়ের সেই বলাইবাবু আজ দেখলে অবাক হতেন যে, আমরা যে প্রজন্মকে বিনয় আর কৃতজ্ঞতার ‘কৃষ্ণচূড়া’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম, তারা আসলে চরম অসহিষ্ণু এক একটি ‘বানরলাঠি’ হয়ে বড় হচ্ছে। যেখানে কৃতজ্ঞতার শিকড় নেই, সেখানে যে কোনো সম্পর্কই বালির বাঁধের মতো ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য।
উপসংহার: তবুও কি ফেরার পথ আছে?
তারাপদ রায় তার কবিতায় কোনো সমাধানের কথা বলেননি, তিনি শুধু এক ভয়াবহ উপলব্ধির কথা বলে শেষ করেছেন। কিন্তু আমাদের তো সমাধান খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জেন-জির এই বিচ্যুতি কেবল তাদের দোষ নয়, বরং আমাদেরও ব্যর্থতা। আমরাই তো তাদের হাতে ঝরনা কলমের বদলে ডট পেন তুলে দিয়েছি। আমরাই তো বাবার ‘গম্ভীর শাসন’ বাদ দিয়ে ‘বাপি’ সেজে বন্ধুর মতো তাদের ভুল পথে লাইক দিয়েছি।
এখন সময় এসেছে বলাইবাবুর মতো কাউকে আবার খুঁজে বের করার, যিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন যে গাছটি আমরা পূজা করছি তা আসলে কৃষ্ণচূড়া নয়। আমাদের সন্তানদের আবার মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে, তাদের শেখাতে হবে যে ‘ভাইরাল’ হওয়া মানেই ‘বিখ্যাত’ হওয়া নয়।
নাহলে একদিন আমরা সত্যিই টের পাবো, আমাদের ঝরনা কলম চিরতরে শুকিয়ে গেছে, আমাদের বড়বাবুরা হেড অ্যাসিস্ট্যান্টের চেয়েও নিচে নেমে গেছেন, আর আমাদের ঐতিহ্যের কৃষ্ণচূড়া গাছটি স্রেফ একটা অসার বানরলাঠি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন আর আক্ষেপ করারও জায়গা থাকবে না। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে—এই সত্যটি তখন আর কবিতার লাইন থাকবে না, হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় পরিচয়।
নতুন ২০২৬ সালের প্রভাতে একটি ছোট্ট মিনতি রেখে যাই—হাসুন, ভাবুন; কিন্তু অপমান নয়, সংলাপই হোক আমাদের পথ।
শুভ নববর্ষ ২০২৬!
- প্রফেসর ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#GenZCulture #SocialCrisis #BengaliTradition #GenerationGap #Values #CulturalShift #নীরব_সর্বনাশ #বাঙালি_সংস্কৃতি #মূল্যবোধের_অবক্ষয় #জেন_জি #বৃদ্ধাশ্রম #মানবিকতা #Editorial #Bangladesh

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: