নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
কারাকাসে ধীরে ধীরে ধোঁয়া কাটতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তারের খবরে দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কোথাও আশার আলো, কোথাও ভয় আর অনিশ্চয়তা। শনিবার সকালে কারাকাস উপত্যকায় রাতভর বিস্ফোরণের পর মানুষজন ঘর থেকে বের হতে শুরু করে। রাস্তায় দেখা গেছে উল্লাস যেমন তেমনি ক্ষোভ ও আতঙ্কও। স্থানীয় এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, আপাতত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ। মাদুরোকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। অন্তত এখন আবার সুড়ঙ্গের শেষে একটু আলো দেখতে পাচ্ছি। কারাকাসের কাছেই বসবাসকারী আরেক নাগরিক জানান মাদুরোর পতনে স্বস্তি থাকলেও সামনে দিনগুলো সহজ হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই মানুষটিকে সরিয়ে নেওয়ার পর কী হবে? এতে আমাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় না। অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে মাদুরো সমর্থকরাও রাজপথে নেমেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে তাদের নেতার মুক্তি দাবি করছেন। কারাকাসের মেয়র ও সরকারের ঘনিষ্ঠ অনুগত কারমেন মেলেনদেজ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে মাদুরোর গ্রেপ্তারকে অপহরণ বলে অভিহিত করেন। শনিবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কারাকাসে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদুরো একটি নার্কো সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছিলেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার অভিযোগে মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার মুখে ছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এই নেতা বিরোধীদের দমন ও মতপ্রকাশ দমনে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে পাচার ও অস্ত্রসংক্রান্ত মামলায় বিচারের মুখোমুখি করতে নেওয়া হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রশাসন ও তেলসম্পদ পরিচালনা করবে। যদিও মাদুরো বরাবরই মাদক পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। মাদুরোর পতনে স্বস্তি পেলেও অনেক নাগরিক ট্রাম্পের বক্তব্যে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তিনি। এরই মধ্যে ভেনিজুয়েলার জাতীয় পরিষদ যেখানে মাদুরো অনুগতদের আধিপত্য একটি আইন পাস করেছে। এতে মার্কিন নৌ অবরোধে সমর্থন জানানো ব্যক্তিদের রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করা হয়েছে। হোর্হে জানান, তিনি গতকাল সশস্ত্র মোটরসাইকেল আরোহী কোলেক্টিভোস-দের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। রুটি কিনতেও বের হতে ভয় লাগছে। এখন শুধু অপেক্ষা আর ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই। তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর প্রভাব নিয়ে। সে খুব প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ। সেনাবাহিনী যদি জনগণের পাশে না দাঁড়ায়, পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলেন হোর্হে।
মাদুরোর শাসনামলে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলা ছেড়ে পালিয়েছেন। তারা বিশ্বের নানা শহরে মাদুরোর গ্রেপ্তারের খবরে উল্লাস করছেন। এর বাইরে আরও অনেকে নিখোঁজ, কারাবন্দি, নিহত কিংবা কোনোমতে বেঁচে আছেন এটি এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি যা এতদিন কেউ গুরুত্ব দেয়নি। তিনি যোগ করেন, এটা কেবল শুরু। সামনে এখনও অনেক দীর্ঘ পথ বাকি। অবশেষে বিশ্ব ভেনিজুয়েলাবাসীর আর্তনাদ শুনতে শুরু করেছে। নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার ভেনিজুয়েলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বহু বছর ধরে দমন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দেশছাড়ার যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষের মধ্যে এটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে সেই আশার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে গভীর অনিশ্চয়তা ক্ষমতার শূন্যতা, সহিংসতার আশঙ্কা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। মাদুরো অধ্যায় শেষ হলেও ভেনিজুয়েলার পুনর্গঠন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথ এখনও দীর্ঘ ও কঠিন। দেশটির মানুষ এখন অপেক্ষায় এই পরিবর্তন সত্যিই মুক্তির সূচনা হয় নাকি আরেক অনিশ্চিত অধ্যায়ের শুরু।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: