রিয়াদ | ইয়েমেন | ৪ জানুয়ারি ২০২৬
ঘটনার সারসংক্ষেপ
সৌদি আরব ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের সব রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীকে নিয়ে রিয়াদে একটি “সমন্বিত সংলাপ সম্মেলন” আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণে সাম্প্রতিক নাটকীয় সংঘাত এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে নজিরবিহীন সরাসরি উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে একসঙ্গে হস্তক্ষেপ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও ইউএই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে সমর্থন করায় তাদের জোটে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউএই-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC) দক্ষিণ ইয়েমেনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে।
গত মাসে STC বাহিনী পূর্ব ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে এবং দ্রুত সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। এই অভিযানের আওতায় সৌদি সীমান্তঘেঁষা তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত প্রদেশও রয়েছে।
শুক্রবার STC দাবি করে, সৌদি-সমর্থিত স্থলবাহিনী ও সৌদি বিমান বাহিনীর যৌথ হামলার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ” শুরু হয়েছে। একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় হাদরামাউতে STC-এর একটি সামরিক ক্যাম্পে অন্তত ৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এর আগে দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মুকাল্লায় বিমান হামলা চালানো হয়। সৌদি জোটের অভিযোগ, ইউএই সেখানে সামরিক সরঞ্জামবাহী জাহাজ পাঠিয়েছে। তবে ইউএই এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, পাঠানো যানবাহনগুলো অস্ত্র নয় এবং সেগুলো দেশটিতে অবস্থানরত আমিরাতি বাহিনীর ব্যবহারের জন্য ছিল।
এই ঘটনার পর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (PLC) ইউএইয়ের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব আমিরাতি বাহিনীকে ইয়েমেন ছাড়ার নির্দেশ দেয়। সৌদি আরব এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে ইউএইর কর্মকাণ্ডকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “রেড লাইন” বলে আখ্যা দেয়।
অপ্রত্যাশিতভাবে ইউএই পরে ইয়েমেন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মত হয়, যদিও বিশ্লেষকদের মতে এতে মাঠপর্যায়ে STC-এর শক্ত অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে না।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়,
“দক্ষিণ ইয়েমেনের সমস্যার ন্যায্য সমাধানের লক্ষ্যে সব দক্ষিণাঞ্চলীয় পক্ষকে নিয়ে রিয়াদে একটি সমন্বিত সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
PLC প্রধান রাশাদ আল-আলিমি STC-এর অভিযানকে “বিদ্রোহ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন,
“এই বিচ্ছিন্নতাবাদী উদ্যোগ ইয়েমেনকে আরও বিভক্ত করবে এবং পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে।”
অন্যদিকে STC মুখপাত্র আনোয়ার আল-তামিমি বিবিসিকে বলেন,
“দক্ষিণ ইয়েমেনের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনই আমাদের লক্ষ্য। এটি আমাদের জনগণের অধিকার এবং এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তার কোনো হুমকি নেই।”
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন,
“ইউএই ও সৌদি আরব ইয়েমেন ইস্যুতে কখনোই একমত হতে পারবে না। দুই দেশের বাস্তবতা ও স্বার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
মানবিক পরিস্থিতি
দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অর্থনীতি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশটির ৪ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত ও এর প্রভাবজনিত দুর্ভিক্ষে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, যাদের মধ্যে ২ লাখ ৫৯ হাজারই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: