odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 8th January 2026, ৮th January ২০২৬
— অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (অষ্টম পর্ব)

'পথিক, তুমি কি আসলেই নদী হারাইয়াছো?’: বুড়িগঙ্গা থেকে পশুর—মৃতপ্রায় জলপথের ময়নাতদন্তে বঙ্কিম-নজরুল (সাথে আছেন রবীন্দ্রনাথ ও মাইকেল মধুসূদন)

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ১৮:৫১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ১৮:৫১

অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (অষ্টম পর্ব)

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা'র সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্যপট কল্পনা করুন। সমুদ্রতীরের সেই বনাঞ্চল, যেখান দিয়া লোনা জলপ্রবাহ বয়ে যেত, আর নবকুমার সেই প্রবাহের গর্জন শুনিয়া দিকভ্রান্ত হইতেন। কিন্তু আজ ২০২৫ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে কোনো নবকুমার যদি নদীর খোঁজে সদরঘাট বা তুরাগ তীরে যান, তবে তিনি সমুদ্রের গর্জন পাইবেন না; পাইবেন পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধ আর দখলদারদের 'তাতা থৈথৈ' তান্ডব নৃত্য। বঙ্কিম ও নজরুলের সেই চিরন্তন সাহিত্যিক আবেশকে সঙ্গী করিয়া আজ আমাদের 'নদী রক্ষা' জলবায়ু সংকটের এক করুণ অথচ শ্লেষাত্মক ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

নবকুমারের বিষাক্ত তর্পণ ও বুড়িগঙ্গার ঝাউবন

বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যখন সমুদ্রের তীরে পথ হারাইয়াছিলেন, তখন প্রকৃতি ছিল পবিত্র। আর আজকের নবকুমার যখন বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়া দাঁড়ান, তখন তিনি পথ হারান না, বরং দম হারাইয়া ফেলেন। নদীর জল আজ কপালকুণ্ডলার চুলে মাখানো কালির চেয়েও ঘন কৃষ্ণবর্ণ।

বঙ্কিমচন্দ্র আজ সদরঘাটের টার্মিনালে দাঁড়াইলে নিশ্চয়ই দেখিতেন, নদী দখল করিয়া বড় বড় অট্টালিকা গড়া হইয়াছে। তিনি হয়তো তাঁর ডায়েরিতে লিখিতেন, "যাহারা নদীর কপালে কলঙ্ক তিলক দিয়াছে, তাহারা কি পথ হারাইয়াছে না কি এটাই মানবতা?" আজ কোনো কপালকুণ্ডলা নদী তটে আসিয়া পথিককে জিজ্ঞেস করে না 'পথ হারাইয়াছো কি না', বরং নদী নিজেই আজ আর্তনাদ করিয়া পথিককে জিজ্ঞেস করে— "পথিক, তুমি কি তোমার বিবেক হারাইয়াছো?"

নজরুলের 'দুর্দিনের যাত্রী' ও দখলের কাপালিক

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁহার 'দুর্দিনের যাত্রী' প্রবন্ধে তরুণদের মশাল হাতে বাহির হইতে বলিয়াছিলেন। আজ নদী রক্ষায় সেই মশালের বড় প্রয়োজন। নজরুলের প্রবন্ধে এক 'কাপালিক' ছিল, যাহার কপালে ছিল রক্ত-তিলক। আমাদের নদীগুলোর জন্য আজকের কাপালিক হইল— 'নদী দখলদার সিন্ডিকেট'

আরো পড়ুন: ‘পথিক, তুমি কি আসলেই মাঠ হারাইয়াছো?’ —ফুটবলের উল্টো যাত্রা, ক্রিকেটীয় উন্মাদনা ও ট্রফিহীনতার মরুভূমিতে বঙ্কিম–নজরুল —অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (Odhikarpatra Editorial Feature Column Series) - সপ্তম পর্ব।

এই কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরের মতো নদীর বুকে শিল্পকারখানা আর অবৈধ স্থাপনা গড়িয়াছে। মন্দিরের শুভ্র বেদি যেমন রক্তে ভেসে যেত, আমাদের নদীগুলো আজ শিল্পবর্জ্য আর বিষাক্ত কেমিক্যালের রক্তে ভেসে যাচ্ছে। নজরুল যে 'ভৈরব-গান' গেয়েছিলেন জাগরণের জন্য, তা আজ বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার কচুরিপানার নিচে গুমরে মরছে। ভক্তরা আজ নজরুলের ঢঙেই চিৎকার করে বলে— "মাভৈঃ! আমরা নদী হারাই নাই, আমরা শুধু নদীর সীমানা খুঁটি হারাইয়াছি!"

বিপন্নআমাদের ছোট নদী হারানো স্বচ্ছ সলিলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’ কেবল একটি কবিতা নয়, বরং তা ছিল বাংলার শাশ্বত জললগ্না প্রকৃতির এক জীবন্ত মানচিত্র। যে নদীর বাঁকে বাঁকে একদা প্রাণের স্পন্দন খেলা করত, যেখানে কবির বর্ণনায়— চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, / একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা, আজ সেখানে বালির সেই রুপালি আভা হারিয়ে গেছে পচা বর্জ্যের কর্দমাক্ত আস্তরণে। বৈশাখ মাসে যে নদীতে ‘হাঁটু জল’ থাকত পরম আশীর্বাদের মতো, বর্তমানের মুমূর্ষু বাংলাদেশে সেই নদী আজ দখলদারদের থাবায় শীর্ণকায় এক নর্দমা মাত্র। তীরের সেই আমবন-তালবন আজ কংক্রিটের জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য, আর শিশুদের ‘গামছায় জল ভরি গায়ে ঢালা’র সেই নির্মল প্রবাহ আজ রাসায়নিকের বিষে নীল। আষাঢ়ের সেই ‘ভর ভর’ কলকল কোলাহল আজ আর দুই কূলে উৎসবের সাড়া জাগায় না; বরং নদীর রুদ্ধশ্বাস আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আসলে আমাদের অস্তিত্বের ধমনীকেই কেটে ফেলছি। রবিঠাকুরের সেই ছোট নদী আজ আর সহজ ছন্দে চলে না, বরং সে আজ দূষণ আর দখলের কারাগারে শৃঙ্খলিত হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

পশুর ও মেঘনার হাহাকার: সেই 'রক্ত-আঁকা' জলপথ কোথায়?

নজরুল লিখেছিলেন, "এই বনের পথই আমাদের চির চেনা পথ... সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক-কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা।" আমাদের নদীপথগুলো এককালে ছিল বাঙালির লাইফলাইন। আজ সেই মেঘনা বা পশুর নদী যেন নজরুলের সেই "নিবিড় অরণ্য"। জাহাজডুবি আর কয়লার কারখানার প্রভাবে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীগুলো আজ মুমূর্ষু।

বঙ্কিমচন্দ্র আজ সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর পাড়ে দাঁড়াইলে দেখিতেন, বনের হরিণগুলো আর তৃষ্ণা মেটাতে নদীতে নামিতে পারিতেছে না। নোনা জল আর তেলের আস্তরণ নদীকে নজরুলের সেই "রক্ত-ভুখারিনির তৃষ্ণাবিহ্বল জিহ্বা"র মতো ভয়ঙ্কর করিয়া তুলিয়াছে। তিনি নিশ্চয়ই আক্ষেপ করে বলতেন, "ওগো আধুনিক নবকুমার, তুমি কি নদীর পথ হারাইয়া কেবল কয়লার ধোঁয়ার অরণ্যে ঘুরিতেছো?"

মহাকবির মনস্তত্ত্ব বর্তমানের তৃষ্ণার্ত জলরেখা

বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা নজরুলের সমান্তরালে বাংলার মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনে নদীর প্রভাবকে সবচেয়ে সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সুদূর ভার্সাই নগরীর নির্জনতায় বসে যখন তিনি বঙ্গভূমির স্মৃতির অতলে ডুব দিতেন, তখন তাঁর তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে কেবল কপোতাক্ষ নদের কলকল ধ্বনিই শান্তির পরশ বুলিয়ে দিত। কবির গভীর মনস্তত্ত্বে নদী কেবল একটি জলধারা ছিল না, তা ছিল তাঁর অস্তিত্বের শেকড়—এক পরম আশীর্বাদ। তিনি লিখেছিলেন— সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে / সতত তোমার কথা ভাবি বিরলে। কপোতাক্ষকে তিনি দেখেছিলেন জননীর স্নেহে, যাকে তিনি তুলনা করেছিলেন— দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে হিসেবে।

কিন্তু আজ ২০২৬ সালের বিষাক্ত বর্তমানের পটে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সেই ‘দুগ্ধ-স্রোতোরূপী’ নদীর দিকে তাকাই, তখন সেখানে কেবল দূষণ আর দখলের করাল ছায়া দেখি। কবির সেই “স্নেহের তৃষ্ণা” মেটানোর মতো স্বচ্ছ সলিল আজ আর কোথাও অবশিষ্ট নেই। যে কপোতাক্ষকে কবি সখা-রীতে মিনতি জানিয়েছিলেন তাঁর নাম বঙ্গের সংগীতে গেয়ে যেতে, সেই নদী আজ বর্জ্যের ভাগাড়ে রুদ্ধশ্বাস, মুমূর্ষু। মানুষের লালসা আর অদূরদর্শী উন্নয়নের থাবায় আজ আমাদের মনস্তত্ত্ব থেকেও সেই প্রশান্তির নদীটি হারিয়ে যাচ্ছে। আজ যদি মহাকবি ফিরে আসতেন, তবে হয়তো কপোতাক্ষের সেই মায়ামন্ত্রধ্বনির পরিবর্তে কেবল দখলদারদের ‘তাতা থৈথৈ’ তান্ডব আর মুমূর্ষু নদীর আর্তনাদই তাঁর কানে আসত। আমরা কি তবে সত্যিই এমন এক সময়ে উপনীত হয়েছি, যেখানে কবির সেই ‘জন্মভূমি-স্তনের’ অমৃতধারা আজ বিষাক্ত নর্দমায় পরিণত হইয়াছে

রবীন্দ্রনাথের ‘পালিত জীবন’ বর্তমানের মরণাপন্ন জলরেখা

বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার কিংবা নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার সমান্তরালে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনেও নদী ছিল এক অবিচ্ছেদ্য এবং পবিত্র সত্তা। কবিগুরু নদীকে কেবল ভূগোলের অংশ হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন প্রাণের ধাত্রী হিসেবে। তাঁর ‘জন্মদিনে’ কাব্যে গভীর কৃতজ্ঞতায় নদীকে নিজের অস্তিত্বের কারিগর মেনে তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন— নদীর পালিত জীবন আমার”কবির চোখে যে নদী ছিল ‘বিশ্বের দূতী’, যা দূরকে নিকটে আনত এবং অজানার অভ্যর্থনা বয়ে আনত, আজকের বাংলাদেশে সেই ‘আশীর্বাদ’ আজ দখল আর দূষণের বিষাক্ত আলিঙ্গনে মুমূর্ষু। ‘বলাকা’র সেই ‘বিরাট নদী’ যার প্রবাহে ‘শুচি করি মৃত্যুস্নানে বিশ্বের জীবন’ হওয়ার কথা ছিল, আজ বুড়িগঙ্গা থেকে পশুর—প্রতিটি জলপথই বর্জ্যের কৃষ্ণবর্ণ কলঙ্কে ম্লান। যে কোপাই কিংবা ধলেশ্বরীর রূপ কবিকে মুগ্ধ করেছিল, আজ তারা দখলদারদের ‘তাতা থৈথৈ’ তান্ডবে নিজের সীমানা হারিয়ে আর্তনাদ করছে। ‘সোনার তরী’র সেই নিঃসঙ্গ মাঝির মতো আমাদের নদীগুলো আজ তীরের কাছে রিক্ত বেশে পড়ে আছে, যেন তারা পথিককে শেষবারের মতো শুধাইতেছে— “তুমি কি কেবল নদীই হারাইয়াছো, নাকি নিজের বিবেক ও অস্তিত্বকেও বিপন্ন করিয়াছ?”

জীবনানন্দ দাশের নদী-ভাবনা এবং বর্তমানের বিপন্নতা

বঙ্কিমচন্দ্রের আভিজাত্য আর নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার সমান্তরালে জীবনানন্দ দাশের কুয়াশাচ্ছন্ন বাংলায় নদী ছিল এক চিরন্তন আত্মীয়া, এক ম্লান চোখের প্রশান্তি। যেখানে অন্যরা নদীর গর্জন বা বিপ্লব খুঁজেছেন, সেখানে জীবনানন্দ নদীকে দেখেছিলেন এক সলজ্জ বালিকা বা শান্ত জননী হিসেবে। কবির সেই চিরায়ত বিস্ময়ভরা প্রশ্ন ছিল— নদী, তুমি কোন্ কথা কও?”। তিনি নদীর বুকে রামধনুর মতো মাছরাঙার ওড়াউড়ি কিংবা শাদা পদ্মের নিস্তব্ধ দ্বীপ দেখেছিলেন, যেখানে নদী তার নিজের সুর পৃথিবীর ক্ষেতে-মাঠে ছড়িয়ে দিত। কিন্তু আজ ২০২৬ সালের এই মৃতপ্রায় জলপথের ময়নাতদন্তে দাঁড়ালে সেই মায়াবী সুর আর শোনা যায় না। আজ বুড়িগঙ্গা কিংবা পশুর নদীর কৃষ্ণবর্ণ সলিলে কেবল বিষের হাহাকার । কবির ভাষায় যে নদীর জল ছিল তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল, তা আজ শিল্পবর্জ্য আর তেলের আস্তরণে ঢাকা পড়ে এক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে । দখলদার কাপালিকদের আগ্রাসনে নদী আজ তার সমস্ত শ্রী হারিয়ে এক মুমূর্ষু বালিকার মতো ম্লান চুলে ধুলোয় পড়ে আছে। যে ধানসিঁড়ি নদীর তীরে কবি বারবার ফিরে আসার আকুতি জানিয়েছিলেন, সেই নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে। আমাদের এই মৃতপ্রায় জলপথগুলো আজ আর কথা কয় না, বরং মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখে বিষণ্ণ নির্জনতায় কেবল মৃত্যুর দিন গোনে।

নদী খাতের ব্যবচ্ছেদ: এক নজরে মরণাপন্ন জলরেখা (ডাটা টেবিল)

কেন আমাদের জলজ পথিকরা বার বার পথ হারায়? নিচের টেবিলটি যেন আমাদের নদী রক্ষার এক ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্ট’:

নদী রক্ষা কমিশন: ডিজিটাল কাপালিকের তান্ডব নৃত্য

নজরুল লিখেছিলেন, "রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল।" আমাদের নদী রক্ষায় যে কমিটি বা কমিশন হয়, তাদের কার্যক্রম অনেক সময় নজরুলের সেই "তান্ডব নৃত্যের" মতো—অনেক ঘটা করে উচ্ছেদ অভিযান চলে, কিন্তু দিনশেষে দখলদারেরা আবার সেই জায়গাতেই 'তাতা থৈথৈ' নাচ শুরু করে।

বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা যেমন নবকুমারকে সতর্ক করেছিলেন, নদী বিশেষজ্ঞরা আজ আমাদের তেমনি সতর্ক করে বলছেন— "পথিক, তুমি যদি নদী হারো, তবে তুমি জীবনের মানচিত্র হারাবে।" কিন্তু এই ডিজিটাল কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরে প্রতি রাতে নদীর নাব্যতা বলি দিচ্ছে কেবল নিজেদের হীন স্বার্থের বিনিময়ে।

বালু উত্তোলন ও ড্রেজিং: নজরুলের বিদ্রোহ বনাম বঙ্কিমের আভিজাত্য

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় আভিজাত্য ছিল, যা আমাদের বড় নদীগুলোর প্রমত্তা রূপের সাথে মানানসই। কিন্তু আজ সেই আভিজাত্য বালু দস্যুদের ড্রেজারের নিচে পিষ্ট। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল শোষকের বিরুদ্ধে। আজ নদীর ওপর যে শোষণ চলছে, বালু উত্তোলনের নামে যে গর্ত করা হচ্ছে, তা যেন নজরুলের সেই "কাপালিকের রক্ত-পূজার মন্দির"।

আরো পড়ুন: বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়ন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং আইনি সুরক্ষার বাস্তব চিত্র নিয়ে একটি সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত। 'অর্ধেক আকাশ ও একমুঠো শেকল: নারী ক্ষমতায়নের গোলকধাঁধায় বঙ্কিম-নজরুল' — অধিকারপত্র বিশেষ কলাম (৬ষ্ঠ পর্ব) 

ড্রেজিং-এর নামে যে কোটি কোটি টাকার হরিলুট চলে, বঙ্কিমচন্দ্র আজ সেই হিসাব দেখলে নিশ্চয়ই তাঁর চশমা পরিষ্কার করে বলতেন, "ওগো রাষ্ট্র, তোমরা কি নদী খুঁড়িতেছো নাকি দুর্নীতির গর্ত খুঁড়িতেছো?" নজরুলের সেই "সিংহ-শার্দূল" তেজ আজ নদী রক্ষকদের নেই, তারা কেবল টেবিলের ওপর ম্যাপ এঁকে সময় পার করে।

পথিকের আর্তি বিলুপ্তপ্রায় নদীর হাহাকার

বঙ্কিম-নজরুল কিংবা রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদী নদী-বন্দনার বাইরে সমকালীন নাগরিক বিষণ্ণতায় পথিক নবীর সেই হাহাকার মেশানো সুর আজ আমাদের রূঢ় বাস্তবতার এক মূর্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন তিনি গেয়ে ওঠেন— নদীর জল ছিল না, কূল ছিল না / ছিল শুধু ঢেউ / আমার একটা নদী ছিল / জানলো না তো কেউ, তখন তা কেবল বিরহের গান থাকে না, হয়ে ওঠে বর্তমান বাংলাদেশের মুমূর্ষু জলপথের এক করুণ ময়নাতদন্ত। দখলদারের আগ্রাসনে নদীর কূল আজ বিলীন, স্বচ্ছ সলিলের জায়গায় সেখানে আজ কেবল বিষাক্ত বর্জ্যের ঢেউ। যে নদীর বাঁকে বাঁকে একদা প্রাণের মেলা বসত, আজ সেই বাঁকগুলোই প্রভাবশালী দখলদারদের থাবায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। ড্রেজারের কর্কশ শব্দ আর কলকারখানার রাসায়নিকের ভিড়ে নদী আজ ‘সাঁতার ভোলা’ এক মুমূর্ষু সত্তা, যার অস্তিত্বের খবর রাখার মতো সংবেদনশীল মানুষও আজ বিরল। পথিক নবীর সেই ‘কেউ না জানা’ নদীর মতো আমাদের অসংখ্য ছোট নদী ও শাখা নদী আজ জনমনিষ্যির ভিড়ে মৃতপ্রায় এক কঙ্কাল। এই উন্নয়নের ডামাডোলে আমরা আসলে আমাদের চিরচেনা ‘সুজন’ অর্থাৎ সেই প্রাণদায়ী নদীকেই হারাইয়া ফেলিয়াছি, আর স্মৃতির পটে পড়ে আছে কেবল তার নিঃস্ব গর্ভ।

অগ্নিরথ ও নীল অর্থনীতি: যখন 'উন্নয়ন' কেবলই মরীচিকা

নজরুল লিখেছিলেন, "আকাশ থেকে অগ্নিরথ নেমে এল। বলিদানের তরুণরা তাতে চড়ে ঊর্ধ্বে উঠে যেতে লাগল।" আমাদের নদীগুলোর ওপর দিয়ে বড় বড় ব্রিজ আর ফ্লাইওভার হচ্ছে—এগুলোই যেন আমাদের 'অগ্নিরথ'। কিন্তু সেই রথ যখন নদীর প্রবাহ বন্ধ করিয়া দেয়, তখন বঙ্কিমের সেই লাইনটিই মনে পড়ে— "পথিক, তুমি কি উন্নয়নের জোয়ারে নদীর পথ হারাইয়াছো?"

নজরুলের সেই "ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ" আজ আর নদী তীরের মানুষের মুখে শোনা যায় না; সেখানে শোনা যায় ড্রেজারের বিকট শব্দ। উন্নয়ন হইয়াছে সত্য, কিন্তু নদী বাঁচানোর সেই 'বজ্র-ঘোষবাণী' আজ রাজনীতির দালানে চাপা পড়িয়াছে।

শেষ জিজ্ঞাসা: নদীর শিব জাগাবার পথ কি মিলিবে?

নজরুল বলেছিলেন, "ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে।" আমাদের নদীর সেই 'শিব' হলো নির্মল জলপ্রবাহ আর নাব্যতা। নদীকে কেবল 'বর্জ্য ফেলার ড্রেন' আর 'বালু উত্তোলনের খনি' না বানিয়ে একে ধরিত্রীর ধমনী হিসেবে রক্ষা করতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যেমন অবশেষে ঘর পেয়েছিলেন, আমাদের নদীগুলোও যেন তাদের হারানো যৌবন আর গতিপথ ফিরে পায়।

উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে আমাদের শেষ কথা— ফ্লাইওভারের কংক্রিট দিয়ে নয়, বরং নদীর জলের স্বচ্ছতা দিয়ে একটি দেশের সভ্যতার বিচার করা হয়। নজরুলের সেই 'অগ্নিরথ' যেন কেবল বালি উত্তোলনের বাহন না হয়, বরং তা যেন হয় নদীর বুক চিরে আবার পাল তোলা নৌকা চালানোর রথ।

যদি কোনোদিন মৃতপ্রায় নদীগুলো আমাদের জিজ্ঞেস করে, "পথিক, তোমরা কি বিবেকের পথ হারাইয়াছো?" আমরা যেন বঙ্কিমী মৌনতায় না ডুবে নজরুলের তেজে উত্তর দিতে পারি—

"আমরা পথ হারাই নাই দেবী! আমরা শপথ লইলাম, ওই রক্ত-পথের মতো আমরা নদী জাগাবার পথও চিনিয়া লইব!"

আপনার মতামত আমাদের জন্য অমূল্য। কলামটি ভালো লাগিলে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট বক্সে আপনার ভাবনা জানান।

পরের পর্ব (চোখ রাখুন): নবম পর্ব - 'পথিক, তুমি কি আসলেই পকেট হারাইয়াছো?' : সিন্ডিকেটের অরণ্যে দ্রব্যমূল্যের 'তাতা থৈথৈ' অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (নবম পর্ব)

— অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#নদীহারানো #পথিক #বুড়িগঙ্গা #পশুর #নদীরআর্তনাদ #LostRivers #EnvironmentalJustice #Bangladesh #নদীরময়নাতদন্ত #পথিক #Rivers #ClimateCrisis #SustainableDevelopment #EnvironmentalGovernance #RiversOfBangladesh #ClimateStory



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: