odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 8th January 2026, ৮th January ২০২৬
সিন্ডিকেটের অরণ্য ও মধ্যবিত্তের হাহাকার: বঙ্কিম-নজরুলের চশমায় বাজার পরিস্থিতির করুণ ব্যবচ্ছেদ।

'পথিক, তুমি কি আসলেই পকেট হারাইয়াছো?' : সিন্ডিকেটের অরণ্যে দ্রব্যমূল্যের 'তাতা থৈথৈ'

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৭ January ২০২৬ ১৩:০৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৭ January ২০২৬ ১৩:০৮

অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (নবম পর্ব)

'পথিক, তুমি কি আসলেই পকেট হারাইয়াছো?'—বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা ও নজরুলের বিদ্রুপের আশ্রয়ে ২০২৫-এর দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও সিন্ডিকেটের অরাজকতার এক নিপুণ ব্যবচ্ছেদ পড়ুন অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (নবম পর্ব)- বঙ্কিম ও নজরুলের সাহিত্যের আলোকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির রম্য বিশ্লেষণ। জানুন কীভাবে 'আধুনিক কাপালিক' সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে বলি দিচ্ছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই দুর্গম বনপথ আজ কাঁচাবাজারে রূপান্তরিত হয়েছে, আর কপালকুণ্ডলার সেই অপার্থিব কণ্ঠের বদলে আজ শোনা যায় আলু-পেঁয়াজের হাঁকডাক। বঙ্কিমের নবকুমার যখন পথ হারিয়েছিলেন, তখন তিনি এক কাপালিকের হাতে বলির অপেক্ষায় ছিলেন। আজ ২০২৫ সালের বাংলাদেশের একজন সাধারণ গৃহস্থ যখন বাজারের থলে হাতে নিয়ে কারওয়ান বাজার কিংবা পাড়ার মোড়ে দাঁড়ান, তখন তাঁর অবস্থাও সেই দিকভ্রান্ত নবকুমারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে তফাত হলো—নবকুমারকে বলি দিতে চেয়েছিল এক কাপালিক, আর আজকের সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন তিলে তিলে বলি দিচ্ছে 'ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট' নামক একদল আধুনিক কাপালিক।

বঙ্কিম ও নজরুলের সেই কালজয়ী সাহিত্যের চশমা দিয়ে আজ আমাদের লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া দ্রব্যমূল্য সিন্ডিকেটের ১৮০০ শব্দের এক করুণ অথচ রম্য-ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

১. নবকুমারের 'পেঁয়াজ' বিভ্রম ও সিন্ডিকেটের ঝাউবন

বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসে নবকুমারকে তাঁর সহযাত্রীরা নির্জন বনে ফেলে চলে গিয়েছিল। আজকের বাজারে সাধারণ ক্রেতার অবস্থাও ঠিক তেমনই। সরকার, প্রশাসন আর তদারকি সংস্থাগুলো যেন সেই সহযাত্রী, যারা ক্রেতাকে বাজারের এই দুর্ভেদ্য অরণ্যে একা ফেলে দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

নবকুমার পথ হারিয়ে কপালকুণ্ডলার দেখা পেয়েছিলেন। কিন্তু আজকের ক্রেতা যখন পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা দেখে থমকে দাঁড়ান, তখন কোনো সুন্দরী নয়, বরং এক কালোবাজারি আড়তদার বঙ্কিমী ঢঙেই জিজ্ঞেস করে— "পথিক, তুমি কি পকেট হারাইয়াছো?" বঙ্কিমচন্দ্র আজ বাজারে গেলে নিশ্চয়ই দেখতেন, সাধারণ মানুষ চালের বস্তার পাশে দিশেহারা হয়ে বসে আছে। তিনি হয়তো তাঁর ডায়েরিতে লিখতেন, "যাহারা গুদামজাত করিয়া কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তাহারা কি দয়ামায়া হারাইয়াছে না কি নরকের পথ চিনায়ে দিতেছে?" আজ আর কোনো কপালকুণ্ডলা এসে পথ দেখায় না, বরং সয়াবিন তেলের বোতল আজ ইশারায় পথিককে জিজ্ঞেস করে— "পথিক, তুমি কি তেল কিনিবার সামর্থ্য হারাইয়াছো?"

২. নজরুলের 'দুর্দিনের যাত্রী' ও আড়তদারের রক্ত-তিলক

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর 'দুর্দিনের যাত্রী' প্রবন্ধে তরুণদের রক্ত-যজ্ঞের পূজারি হতে বলেছিলেন। আজ দ্রব্যমূল্যের বাজারে সেই রক্ত-যজ্ঞ চলছে প্রতিনিয়ত। নজরুলের প্রবন্ধে এক 'কাপালিক' ছিল, যার কপালে ছিল রক্ত-তিলক। আমাদের বাজারের আজকের কাপালিক হলো— 'আমদানিকারক আড়তদার সিন্ডিকেট'

পড়ুন — অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (অষ্টম পর্ব)। 'পথিক, তুমি কি আসলেই নদী হারাইয়াছো?’: বুড়িগঙ্গা থেকে পশুর—মৃতপ্রায় জলপথের ময়নাতদন্তে বঙ্কিম-নজরুল (সাথে আছেন রবীন্দ্রনাথ ও মাইকেল মধুসূদন)

এই কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরের মতো কোল্ড স্টোরেজ আর গুদাম ঘর গড়েছে। মন্দিরের শুভ্র বেদি যেমন রক্তে ভেসে যেত, আমাদের মধ্যবিত্তের সঞ্চয় আজ সিন্ডিকেটের লোভের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে। নজরুল যে 'ভৈরব-গান' গেয়েছিলেন জাগরণের জন্য, তা আজ সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের নিচে চাপা পড়ে আছে।

সিন্ডিকেটের সর্দাররা আজ নজরুলের সেই কাপালিকের মতো হাতে খড়্গ (প্রাইস ট্যাগ) নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রতিদিন দাম বাড়ায় আর ডম্বরু বাজায়। ভক্তরা (সাধারণ ক্রেতা) আজ নজরুলের ঢঙেই চিৎকার করে বলে— "মাভৈঃ! আমরা ক্ষুধা হারাই নাই, আমরা শুধু সবজি কিনিবার সাধ্য হারাইয়াছি!"

৩. কাঁচাবাজারের হাহাকার: সেই 'রক্ত-আঁকা' মূল্যতালিকা কোথায়?

নজরুল লিখেছিলেন, "এই বনের পথই আমাদের চির চেনা পথ... সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক-কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা।" আমাদের কাঁচাবাজারগুলো আজ নজরুলের সেই "নিবিড় অরণ্য"। ব্রয়লার মুরগি থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ—সবই আজ "সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত"।

বঙ্কিমচন্দ্র আজ কোনো সুপার শপে গেলে দেখতেন, সেখানে আভিজাত্যের মোড়কে লুণ্ঠন চলছে। তিনি নিশ্চয়ই আক্ষেপ করে বলতেন, "ওগো আধুনিক নবকুমার, তুমি কি পুষ্টির পথ হারাইয়া কেবল ভাতের ফেনের অরণ্যে ঘুরিতেছো?" নজরুলের সেই "রক্ত-ভুখারিনির তৃষ্ণাবিহ্বল জিহ্বা" আজ যেন বাজারের সিন্ডিকেট, যারা টপটপ করে সাধারণ মানুষের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু (টাকা) শুষে নিচ্ছে।

৪. দ্রব্যমূল্যের ব্যবচ্ছেদ: এক নজরে বাজারের ‘তাতা থৈথৈ’ (ডাটা টেবিল)

কেন আমাদের পকেটের পথিকরা বার বার পথ হারায়? নিচের টেবিলটি যেন আমাদের জাতীয় বাজেটের এক ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্ট’:

৫. বাজার তদারকি সংস্থা: ডিজিটাল কাপালিকের তান্ডব নৃত্য

নজরুল লিখেছিলেন, "রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল।" আমাদের বাজার তদারকি সংস্থা বা মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম অনেক সময় নজরুলের সেই "তান্ডব নৃত্যের" মতো—অনেক ঘটা করে জরিমানা করা হয়, কিন্তু পরদিন সকালে আড়তদাররা আবার সেই জায়গাতেই দাম বাড়িয়ে 'তাতা থৈথৈ' নাচ শুরু করে।

বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা যেমন নবকুমারকে সতর্ক করেছিলেন, অর্থনীতিবিদরা আজ আমাদের তেমনি সতর্ক করে বলছেন— "পথিক, তুমি যদি সিন্ডিকেট না ভাঙো, তবে তুমি দারিদ্র্যের অরণ্যে চিরতরে হারিয়ে যাবে।" কিন্তু এই ডিজিটাল কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরে প্রতি রাতে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন বলি দিচ্ছে কেবল নিজেদের কোটি টাকা মুনাফার বিনিময়ে।

৬. আমদানি ও লজিস্টিকস: নজরুলের বিদ্রোহ বনাম বঙ্কিমের আভিজাত্য

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় আভিজাত্য ছিল, যা আমাদের বড় বড় আমদানিকারকদের পাজেরো গাড়ির জৌলুসের সাথে মেলে। কিন্তু সেই আভিজাত্যের আড়ালে নজরুলের সেই "দস্যি মেয়ের কড়া নাড়া"র মতো লুকিয়ে আছে শুল্ক ফাঁকি আর এলসি (LC) জটিলতা।

এলসি সংকটের দোহাই দিয়ে যে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়, বঙ্কিমচন্দ্র আজ সেই হিসাব দেখলে নিশ্চয়ই তাঁর চশমা খুলে বলতেন, "ওগো বণিক, তোমরা কি পণ্য আনিতেছো নাকি লুণ্ঠনের জাহাজ ভরাইতেছো?" নজরুলের সেই "সিংহ-শার্দূল" তেজ আজ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নেই, তারা কেবল খুচরা বিক্রেতাকে ধরে জরিমানা করে, মূল কাপালিকদের (আমদানিকারক) ছোঁয়াও যায় না।

৭. অগ্নিরথ ও মুদ্রাস্ফীতি: যখন 'উন্নয়ন' কেবলই মরীচিকা

নজরুল লিখেছিলেন, "আকাশ থেকে অগ্নিরথ নেমে এল। বলিদানের তরুণরা তাতে চড়ে ঊর্ধ্বে উঠে যেতে লাগল।" আমাদের জন্য সেই 'অগ্নিরথ' হলো আজকের মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। এই রথ যত উপরে উঠছে, সাধারণ মানুষ তত নিচে নামছে।

উন্নয়নের ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে বিলাসপুরী গাড়ি চলে যায়, আর নিচে বাজারের ব্যাগে আধা কেজি চাল নিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষটি বঙ্কিমের সেই লাইনের কথা ভাবে— "পথিক, তুমি কি সাশ্রয়ের পথ হারাইয়া ঋণের সাগরে ভাসিতেছো?" নজরুলের সেই "ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ" আজ আর বাজারের মানুষের মুখে শোনা যায় না; সেখানে শোনা যায় কেবল ক্ষুধার আর্তনাদ।

৮. শেষ কথা: বাজারের শিব জাগাবার পথ কি মিলিবে?

নজরুল বলেছিলেন, "ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে।" আমাদের বাজারের সেই 'শিব' হলো সুস্থ প্রতিযোগিতা আর ন্যায্যমূল্য। বাজারকে কেবল 'সিন্ডিকেটের যজ্ঞশালা' আর 'লুণ্ঠনের খনি' না বানিয়ে একে মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে রক্ষা করতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যেমন অবশেষে ঘর পেয়েছিলেন, আমাদের সাধারণ ক্রেতারাও যেন একদিন শান্তিতে দু'মুঠো ডাল-ভাত খাবার নিশ্চয়তা পায়।

উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে আমাদের শেষ কথা— ফ্লাইওভারের কংক্রিট দিয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষের খাবারের থালার তৃপ্তি দিয়ে একটি দেশের উন্নয়নের বিচার করা হয়। নজরুলের সেই 'অগ্নিরথ' যেন কেবল সিন্ডিকেটের মুনাফার বাহন না হয়, বরং তা যেন হয় কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর রথ।

যদি কোনোদিন কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা আমাদের জিজ্ঞেস করে, "পথিক, তোমরা কি প্রতিবাদের পথ হারাইয়াছো?" আমরা যেন বঙ্কিমী মৌনতায় না ডুবে নজরুলের তেজে উত্তর দিতে পারি— "আমরা পথ হারাই নাই! আমরা শপথ লইলাম, ওই সিন্ডিকেটের মন্দির আমরা গুঁড়িয়ে দিয়ে ন্যায়ের বাজার প্রতিষ্ঠা করিবই!"

আপনার মতামত আমাদের জন্য অমূল্য। কলামটি ভালো লাগিলে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট বক্সে আপনার ভাবনা জানান।

 পরের পর্ব (চোখ রাখুন): 'পথিক, কি আসলেই দেশি পণ্য হারাইয়াছো?' : শিল্পায়নের ধোঁয়া আর আমদানির জোয়ারে দেশীয় শিল্পের 'তাতা থৈথৈ'— অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (দশম পর্ব)

— অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#CommodityPrice #PriceHikeBD #BangladeshEconomy #Syndicate #Inflation #DrobboMullo #দ্রব্যমূল্য #বাজার_সিন্ডিকেট #Odhikarpatra #EditorialColumn #Satire #DrMahbubLitu #BanglaLiterature #Bankimchandra #KaziNazrulIslam #SocialSatire #অধিকারপত্র#Bangladesh2025 #MiddleClassStruggle #ConsumerRights #MarketMonitor

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: