—অধিকারপত্রের সম্পাদকীয় ধারাবাহিক “জনগণের ইশতেহার” | পর্ব–২
এই কলামে ব্যবহৃত ন্যারেটিভ নির্মিত হয়েছে সরাসরি ভোটারের কণ্ঠে। এখানে আবেগের অতিরঞ্জন নয়, বরং মাঠের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও বাস্তব পর্যবেক্ষণই বক্তব্যের মূল ভিত্তি। ভাষা সচেতনভাবে সোজাসাপটা রাখা হয়েছে—কোথাও কোথাও কড়া, তবে কখনোই বাস্তবতার সীমা অতিক্রম না করে। এটি কোনো প্রচারধর্মী লেখা নয়; বরং চলমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ভোটার মানসের একটি সৎ ও নিরেট প্রতিফলন।
চাকরি শব্দটা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক ধরনের ক্লান্তির নাম। কেউ যখন আবার বলে, “আমরা ক্ষমতায় এলে লাখ লাখ চাকরি দেব”, তখন অনেক ভোটার আর উত্তেজিত হয় না। বরং একটু হাসে। সে হাসি আনন্দের না, অভিজ্ঞতার। কারণ এই কথা সে বহুবার শুনেছে, বহু বছর ধরে। আর প্রতিবারই চাকরির প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মাঝে বিশাল একটা ফাঁক রয়ে গেছে।
ভোটারের কাছে চাকরি মানে শুধু একটি নিয়োগপত্র না। চাকরি মানে নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভবিষ্যৎ। আর এই তিনটি জিনিসই আজ অনিশ্চিত। পড়াশোনা শেষ করে তরুণরা ঘুরে বেড়ায়। কেউ কোচিং করে, কেউ প্রাইভেট পড়ায়, কেউ ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে অনিশ্চিত আয় ধরে রাখে। এই তরুণেরা অলস না, তারা সুযোগহীন। এই পার্থক্যটা বোঝা না গেলে চাকরি নিয়ে সব কথাই ফাঁকা শোনায়।
গণমানুষ এখন আর সংখ্যার প্রতিশ্রুতি চায় না। “এক কোটি চাকরি” তার কাছে এখন স্লোগান। সে জানতে চায়—এই চাকরিগুলো কোথায় তৈরি হবে? কোন খাতে? কোন সময়ে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই চাকরিগুলো কি টেকসই হবে, নাকি শুধু কাগজে থাকবে? ভোটারের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, বড় সংখ্যা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তব কাজ তৈরি করা কঠিন।
এই দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। রিকশাচালক, দোকানকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—এরা দেশের অর্থনীতিকে চালায়, কিন্তু ইশতেহারে তাদের কথা খুব কমই থাকে। জনগণের ইশতেহার মানে এমন দলিল, যেখানে এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা, আয় আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা থাকবে। কারণ চাকরি শুধু অফিসে বসে কাজ করা না, চাকরি মানে সম্মানজনক জীবিকা।
তরুণ ভোটারদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভ হলো—তাদের প্রস্তুতি আছে, কিন্তু পথ নেই। তারা ডিগ্রি নেয়, প্রশিক্ষণ নেয়, পরীক্ষা দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও গিয়ে ঠেকে। সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত, বেসরকারি খাতে নিরাপত্তা নেই, আর উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে সহায়তা দরকার—সেটা শুধু বক্তৃতায় থাকে। জনগণের ইশতেহার তাই এমন হতে হবে, যেখানে তরুণদের বলা হবে—তোমাদের জন্য কোন পথটা খোলা, আর কোনটা এখনো বন্ধ।
শুধু শহরের তরুণ না, গ্রামের তরুণের অবস্থাও আলাদা করে দেখার দরকার। কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যাচ্ছে, কিন্তু বিকল্প কাজ তৈরি হয়নি। অনেক তরুণ গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে, শহর আবার তাদের জায়গা দিতে পারে না। এই ভিড়, এই হতাশা, এই অস্থিরতা—সবই কর্মসংস্থানের সংকটের ফল। গণমানুষ চায় এমন ইশতেহার, যেখানে গ্রামে কাজ থাকবে, শহরে চাপ কমবে।
নারীদের কাজের প্রশ্নেও ভোটারের চোখে স্পষ্ট বাস্তবতা আছে। শিক্ষিত নারী আছেন, দক্ষ নারী আছেন, কিন্তু নিরাপদ কর্মপরিবেশ নেই, শিশুসহায়তা নেই, স্থায়ী সুযোগ নেই। জনগণের ইশতেহার মানে নারীর কর্মসংস্থানকে আলাদা করে দেখা—শুধু অংশগ্রহণ নয়, টিকে থাকার ব্যবস্থা।
ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের কথা না বললে চাকরির আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই দেশের বহু মানুষ চাকরি চায় না, কাজ চায়। তারা দোকান দিতে চায়, ছোট কারখানা চালাতে চায়, নতুন কিছু করতে চায়। কিন্তু ঋণ পাওয়া কঠিন, নিয়ম জটিল, আর ব্যর্থ হলে কেউ পাশে দাঁড়ায় না। ভোটার এমন ইশতেহার চায়, যেখানে উদ্যোক্তা হওয়াকে উৎসাহ দেওয়া হবে বাস্তব সহায়তায়, শুধু সেমিনারে না।
আরেকটা বিষয় ভোটার খুব ভালো বোঝে—চাকরির মান। শুধু কাজ থাকলেই হবে না, কাজের পরিবেশ, আয়, নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অস্থায়ী কাজ দিয়ে স্থায়ী সমস্যা সমাধান হয় না। গণমানুষ চায় এমন ইশতেহার, যেখানে কাজের মান নিয়ে কথা থাকবে, শুধু সংখ্যা নিয়ে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—চাকরি নিয়ে রাজনীতি হয়, কিন্তু দায়িত্ব খুব কমই নেওয়া হয়। পাঁচ বছর পর আবার নতুন প্রতিশ্রুতি, পুরোনো ব্যর্থতার কোনো হিসাব নেই। জনগণের ইশতেহার মানে এমন দলিল, যেখানে বলা থাকবে—কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি, কেন হয়নি, আর সেখান থেকে কী শেখা হয়েছে।
ভোটার এখন আর বোকা নয়। সে জানে, রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু সে দেখতে চায় সততা। সে চায়, যাদের হাতে দায়িত্ব যাবে, তারা যেন কর্মসংস্থানকে স্লোগান না বানায়, পরিকল্পনা বানায়। এই পর্বে গণমানুষের দাবি খুব সরল—
চাকরি নয়, কাজ চাই।
সংখ্যা নয়, সুযোগ চাই।
প্রতিশ্রুতি নয়, পথনির্দেশ চাই।
সিরিজ নোট - পরের পর্বে আমরা কথা বলব সেই জায়গা নিয়ে, যেখানে এই কাজের আয় খরচ হয়ে যায়—বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয়। কারণ কাজ পেলেও, বাজার সামলাতে না পারলে জীবন টেকে না। পরবর্তী পর্ব: “জনগণের ইশতেহার” | পর্ব–৩: বাজার, দাম আর বেঁচে থাকার হিসাব
- অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#জনগণেরইশতেহার #ত্রয়োদশ_নির্বাচন #জাতীয়_সংসদ_নির্বাচন_২০২৬ #বাংলাদেশের_নির্বাচন #ব্যালট_উৎসব #নির্বাচনী_টুকিটাকি#ভোটারেরকথা #বাংলাদেশরাজনীতি #জাতীয়নির্বাচন #ইশতেহার #গণতন্ত্র #রাজনৈতিকসম্পাদকীয় #BangladeshPolitics #VotersVoice #ElectionManifesto #DemocracyInBangladesh #আমাদের_অধিকারপত্র #Odhikarpatra #ElectionFeatureBD

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: