odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 24th February 2026, ২৪th February ২০২৬
এক মাওলানার শিক্ষা বিপ্লব থেকে বাংলাদেশের মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত সংস্কারের বাস্তব দিকনির্দেশনা।

একজন মাওলানার গল্প থেকে শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা—ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভাবনা (পর্ব ৫/১)

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৪ February ২০২৬ ০৭:৫৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৪ February ২০২৬ ০৭:৫৮

অধিকারপত্র: শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৫/১)

“অধিকারপত্র: শিক্ষা সংস্কার” ধারাবাহিকে আমরা তুলে ধরব এক মাওলানার অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প—কীভাবে মক্কায় জন্ম নেওয়া এক আলেম ভারতবর্ষে এসে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত করে সামগ্রিক সংস্কারের পথ রচনা করেছিলেন। তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি; বরং সমগ্র জাতির শিক্ষা উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। অন্যদিকে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—আমাদের মাওলানারা কী ভূমিকা পালন করছেন? ক্ষমতার নিকটবর্তী হয়েও যিনি নির্লোভ ও সমদর্শী থাকতে পারেন, সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করতে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন—এমন নেতৃত্বই তো আজ প্রয়োজন। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব, কীভাবে এক ভারতীয় মাওলানা জ্ঞান বিস্তারের লক্ষ্যে ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সৃজনশীল সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন; কীভাবে তিনি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাকে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে রূপ দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপ্রচেষ্টা আমাদের জন্য হতে পারে শিক্ষা সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা।

শিক্ষা সংস্কারে এক মাওলানার গল্প: বদলে দেওয়া ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা

বাংলাদেশে আজ মাওলানাদের অবস্থা দেখলে মানুষের মনে এক ধরনের ভীতি জন্ম নেয়। কেউ বেহেশতের টিকিট বিক্রির ভাষণে ধর্মকে ব্যবসায়ে পরিণত করছেন, কেউ কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যায় বিভ্রান্তির আবরণ ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ অহংকারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্বমানের শিক্ষক বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। অথচ ধর্মের মূল শিক্ষা তো ছিল বিনয়, প্রজ্ঞা ও মানবতার দীপ্ত আলো। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের হৃদয় থেকে উচ্চারিত হয় এক গভীর আকুতি—বর্তমান বাংলাদেশে আমরা চাই ইসলামী শিক্ষার সংস্কার, বিশেষ করে মাওলানা তৈরির প্রক্রিয়ার সংস্কার।

কেন এক মাওলানার গল্পে শিক্ষা সংস্কারের ধারণা তুলে ধরা প্রয়োজন? কারণ ব্যক্তি দিয়েই শুরু হয় পরিবর্তনের ইতিহাস। আমাদের এখন মাওলানার দেখানো পথে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। যদি আমাদের মাওলানারা প্রতিটি মাদ্রাসাকে এক একটি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মতো আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক, জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারতেন—যেখানে কিতাবের পাশে বিজ্ঞান, ফিকহের পাশে প্রযুক্তি, তাফসিরের পাশে দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান স্থান পায়—তাহলে এই দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। মাদ্রাসাগুলো কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র না হয়ে উঠত আধুনিক শিক্ষা ও ইলমের হাব; আর সেই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে হতো শিক্ষা সংস্কারকেই।

একজন মাওলানা, যিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে পড়েননি, তিনিই যদি একটি বিশাল দেশের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার রূপকার হতে পারেন, তবে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য কেন তা অসম্ভব হবে? প্রশ্নটি মেধার নয়, প্রশ্নটি দৃষ্টিভঙ্গির। আজাদের “কালি ও কলমের জিহাদ” আমাদের শেখায়—সত্যিকার শিক্ষা মানুষের শিকল ভাঙে, তাকে নতুন চিন্তার আকাশ দেয়; শিক্ষা কখনোই মানুষের চেতনায় শিকল পরায় না। জ্ঞান তখনই পবিত্র, যখন তা মুক্তির পথ দেখায়।

সে মাওলানার জীবন থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দালান বা সার্টিফিকেটের মুখাপেক্ষী নয়। পারিবারিক সচেতনতা, জিজ্ঞাসু মন এবং আত্মশিক্ষার সাধনা থাকলে প্রথাগত কাঠামোর বাইরেও একজন মানুষ বিশ্বমানের পণ্ডিত হতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত পণ্ডিত তিনি-ই, যিনি তাঁর জ্ঞানকে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেন না; বরং দেশ ও জাতির আধুনিকায়নে বিলিয়ে দেন—বিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেন।

পড়ুন: এই শিক্ষা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? — অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক | পর্ব ০৪/ ডিগ্রির জৌলুস নাকি নৈতিকতার সংকট?—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত অবক্ষয়, নাগরিকত্বের ঘাটতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জরুরি প্রশ্ন

তাই আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কেমন মাওলানা চাই? এমন মাওলানা, যিনি ভয় নয়, আলোর ভাষা শিখাবেন; বিভাজন নয়, সংলাপের সংস্কৃতি গড়বেন; অন্ধ আনুগত্য নয়, সমালোচনামূলক চিন্তার দীক্ষা দেবেন। আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে মাওলানা তৈরি হবে কেবল মঞ্চের বক্তা হিসেবে নয়, সমাজের রূপকার হিসেবে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম পদক্ষেপ—ইসলামী শিক্ষার সাহসী, সুদূরপ্রসারী ও মানবিক সংস্কার।

আমাদের বাংলাদেশের সমাজে মাওলানা বা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এখনই সময় আত্মমূল্যায়নের—আমাদের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে এগোচ্ছে, তার শক্তি ও দুর্বলতা কোথায়, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার। বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী শিক্ষার কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন আমরা দেশের কিছু মাওলানার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করি। প্রশ্ন জাগে—তাঁরা কী করছেন, আর সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

এ দৃশ্য মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। কেউ বেহেশতের টিকিট বিক্রির ভাষণে মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলছেন; কেউ কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করছেন; আবার কেউ অহংকারের মিনারে দাঁড়িয়ে নিজেকে অক্সফোর্ডের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বলে দাবি করছেন। ধর্ম, যা হওয়ার কথা ছিল শান্তি ও প্রশান্তির আশ্রয়, তা কখনো কখনো বিভাজন ও উসকানির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। তাই হৃদয়ের গভীর থেকে এক অনিবার্য প্রশ্ন উচ্চারিত হয়—কবে আসবে সেই সত্যিকারের মাওলানা, যিনি ধর্মকে ভয়ের নয়, প্রজ্ঞা ও মানবতার আলোয় আলোকিত করবেন?

তাই তো আমরা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাই, আর অপেক্ষার প্রহর গুনি সেই প্রত্যাশিত মাওলানার জন্য। প্রশ্ন থেকেই যায়—সেই মাওলানা কবে হবে, যিনি মাদ্রাসার জানালায় নতুন ভোরের আলো ঢুকিয়ে দেবেন; কিতাবের পাশে বিজ্ঞানের বই স্থান দেবেন; যুক্তির সাথে ঈমানের সেতুবন্ধন গড়ে তুলবেন? যিনি শিশুর কচি হাতে বেত নয়, স্বপ্নের কলম তুলে দেবেন; ভয় নয়, ভালোবাসায় শিক্ষা দেবেন। যিনি উপলব্ধি করবেন—ইসলাম মানে সংকীর্ণতার আবরণ নয়, বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবতার উন্মুক্ত দিগন্ত।

জনমনে অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন জাগে—সেই মাওলানা কবে আসবেন, যিনি শিক্ষার সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে আলোর প্রদীপ প্রজ্বলিত করবেন? অন্ধ অনুকরণের শৃঙ্খল ভেঙে সত্যের পথ চিনিয়ে দেবেন? যার কথায় থাকবে না তলোয়ারের ঝনঝনানি, থাকবে জ্ঞানের দীপ্তি; যিনি নসীহত করবেন করুণার ভাষায়—বিভেদের আহ্বান নয়, ঐক্যের ডাক দিয়ে।

মন আরও জানতে চায়—সেই মাওলানা কবে হবেন, যিনি ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে মানুষের দুয়ারে পৌঁছাবেন; ক্ষুধার্তের পাশে বসে দোয়া করবেন, নিজের রুটির অংশ নির্লোভ হাতে ভাগ করে নেবেন? যিনি নিজেকে বড় ভাববেন না; সেবাকেই ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করবেন; বুঝবেন—মানুষের কল্যাণই ধর্মের প্রকৃত রূপ।

সেই মাওলানা কবে আসবেন—যিনি ফ্যাসাদের আগুনে আর ঘি ঢালবেন না; মসজিদের মিনার থেকে শান্তির বাণী উচ্চারণ করবেন; মানুষকে ভয়ের মাধ্যমে নয়, আল্লাহর প্রেমের আহ্বানে ডাকবেন। যার চোখে থাকবে সত্যের দীপ্ত আলো, কণ্ঠে করুণার সুর, আর জীবনে দয়ার অবিরাম অনুশীলন।

হে সময়, বলো—কবে জন্ম নেবে সেই আলোর পথিক? যার পরিচয় পদবীতে নয়, চরিত্রে; যার ইসলাম হবে দয়া, আর দয়াই হবে তার একমাত্র পরিচয়।

আজ অধিকারপত্রের শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকে সেই কাঙ্খিত মাওলানার পরিচয় ও অবদান তুলে ধরে শিক্ষা সংস্কারের এজন্ডা সামনে আনার চেষ্টা করবে।

একজন মাওলানার গল্প: যখন পাণ্ডিত্য প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা হার মানায়

শৈশবের চেনা ক্লাসরুম নেই, নেই কোনো ধরাবাঁধা সিলেবাস বা ব্ল্যাকবোর্ডের খসখসে শব্দ। অথচ তার ধীশক্তি আর প্রজ্ঞা আধুনিক ভারতের শিক্ষার মেরুদণ্ড গড়ে দিয়েছিল। আমরা বলছি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কথা। আজকের 'অধিকারপত্র' ধারাবাহিকে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং চিন্তার মুক্তি এবং সংস্কারের সাহস।

পারিবারিক বিদ্যাপীঠ এক অনন্য শৈশব

মাওলানা আজাদের শিক্ষাজীবন কোনো প্রথাগত স্কুল বা মাদ্রাসার চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত 'পারিবারিক শিক্ষায়' শিক্ষিত। ১৮৮৮ সালে মক্কায় জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের পিতা মাওলানা খায়রুদ্দিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত। তিনি নিজের বাড়িতেই ছেলের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।

কোনো নির্দিষ্ট প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আজাদের ঝুলিতে ছিল না, কিন্তু বাড়িতেই তিনি আরবি, ফারসি, দর্শন, গণিত এবং ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়গুলোতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি নিজের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী ছাত্রদের পড়াতেন এবং ১৬ বছর বয়সেই প্রথাগত পাঠ্যক্রম শেষ করেন—যা সাধারণের চেয়ে অন্তত নয় বছর এগিয়ে ছিল।

মাওলানা আজাদের শিক্ষাজীবন কোনো প্রথাগত স্কুল বা মাদ্রাসার চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত 'পারিবারিক শিক্ষায়' শিক্ষিত। তার পিতা মাওলানা খায়রুদ্দিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি নিজের বাড়িতেই ছেলের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। কোনো নির্দিষ্ট প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট তার ঝুলিতে ছিল না, কিন্তু বাড়িতেই তিনি আরবি, ফারসি, দর্শন, গণিত এবং ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়গুলোতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।

পিতামাতাই সন্তানের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আর তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তাঁর পিতা, মুহাম্মদ খায়রুদ্দিন বিন আহমেদ আল হুসাইনি, ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম; তিনি বারোটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তাঁর হাজার হাজার শিষ্য ছিল, এবং তিনি নিজেকে এক মহৎ বংশের উত্তরসূরি বলে পরিচয় দিতেন। অপরদিকে তাঁর মাতা, শেখ আলিয়া বিনতে মোহাম্মদ, ছিলেন শেখ মোহাম্মদ বিন জাহের আল-ওয়াত্রীর কন্যা—যিনি মদিনার একজন খ্যাতিমান পণ্ডিত হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। অর্থাৎ আজাদের জন্ম হয়েছিল এক গভীর জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ পরিবারে।

শৈশব থেকেই মা-বাবার সান্নিধ্যে প্রতিদিনের কথোপকথন, শিক্ষা ও অনুশাসনের মধ্য দিয়ে আবুল কালাম আজাদ ধর্ম, সমসাময়িক বিশ্বপরিস্থিতি এবং ইসলামী শাস্ত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে পারিবারিক পরিবেশেই। একই সঙ্গে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করার যে ইসলামী চেতনা—তা-ও তিনি পরিবার থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবসেবার এই সমন্বিত বীজই পরবর্তীকালে তাঁকে এক অনন্য চিন্তাবিদ ও শিক্ষা সংস্কারকের পথে পরিচালিত করে।

আজাদের এই জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রথাগত কাঠামোর বাইরেও যদি শিক্ষার মূল নির্যাস বা 'মানহাজ' সঠিক থাকে, তবে সেখান থেকে বিশ্বমানের চিন্তাবিদ বেরিয়ে আসা সম্ভব। তার কাছে শিক্ষা ছিল একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, যা পরীক্ষার হলের বাইরে বিস্তৃত।

শিক্ষা সংস্কারের শিক্ষা আজাদ তার বাল্যকালেই পেয়েছেন। আজাদের জীবন প্রমাণ করে, শিক্ষার মান প্রতিষ্ঠানের দালানের ওপর নয়, বরং জিজ্ঞাসু মন এবং সঠিক নির্দেশনার (Mentorship) ওপর নির্ভর করে। আমাদের মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় যে 'পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার' আকাল চলছে, আজাদের জীবনী তার একটি সফল বিকল্প মডেল।

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: শিক্ষার ফাংশনাল রিকনস্ট্রাকশন

মাওলানা আজাদের শৈশব ও শিক্ষা পদ্ধতি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এক অনন্য 'ফাংশনাল রিকনস্ট্রাকশন'। তাঁর পিতা মাওলানা খায়রুদ্দিন তৎকালীন প্রচলিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল বর্জন করেননি, বরং শিক্ষার সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, পরিবারের প্রধান কাজ হলো সন্তানের 'ইলম' (জ্ঞান) এবং 'তাজকিয়া' (পরিশুদ্ধ আত্মা) নিশ্চিত করা।

তাত্ত্বিকভাবে একে বলা যায় 'ব্যক্তিমাধুর্যের উপযোগী শিক্ষা'। আজাদের মতো প্রখর স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন বালকের জন্য গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল একটি সীমাবদ্ধতা। পরিবার এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষার একটি উচ্চতর পরিমণ্ডল হিসেবে কাজ করেছে। হিন্দু পুরোহিতের কাছে সংস্কৃত পাঠ এবং মুসলিম পণ্ডিতদের কাছে দর্শনের পাঠ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর মধ্যে শৈশবেই 'সামাজিক সংহতি' (Social Cohesion) এবং 'বহুত্ববাদী চিন্তার' বীজ বপন করা হয়েছিল। এটি আধুনিক শিক্ষা দর্শনের সেই ধারাকে সমর্থন করে, যেখানে শিক্ষার্থীর স্বকীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ কেন আজাদের মতো ‘মাওলানা’ চায়?

বর্তমান বাংলাদেশে এক ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট—একদিকে রাজনৈতিক এজেন্ডাপ্রধান ধর্মীয় নেতৃত্ব, অন্যদিকে শেকড়বিচ্ছিন্ন আধুনিকতাবাদী শিক্ষাচিন্তা। মাওলানা আজাদ ছিলেন এই দুই মেরুর মধ্যে এক সেতুবন্ধন। তিনি দলীয় রাজনীতির শীর্ষে থেকেও শিক্ষাকে কখনো দলীয় স্বার্থের অধীন করেননি। আজ আমাদের এমন আলেম প্রয়োজন, যারা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে পাঠ্যপুস্তক সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।

তিনি কুরআন-হাদিসের অগাধ পণ্ডিত হয়েও ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ভারতের রূপকার। তাঁর জীবন দেখায়—নিজ ধর্মে অবিচল থেকে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া সম্ভব। আলীগড় ও জামিয়ার মাধ্যমে তিনি যে সমন্বিত শিক্ষা মডেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যকার বিভাজন দূর করার এক কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আমাদের দেশে যদি মাওলানারা মাদ্রাসাগুলোকে এক একটি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় (যা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে র‌্যাংকিং এ প্রথম স্থানে আছে) রূপান্তরিত করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের চেহারাই পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ‘শিক্ষক’ পরিচয়ে গর্বিত হবেন এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে নতুন পথ নির্মাণ করবেন। মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার জন্য আজাদের ‘জামিয়া মডেল’ হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক শক্তিশালী প্রেরণা।

(চলবে)

আগামীকাল প্রকাশিতব্য এই নিবন্ধে উঠে আসছে এমন এক মাওলানার শিক্ষা-দর্শন, যিনি স্বাধীনতাকে দেখেছিলেন কেবল রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে নয়, বরং মানসিক মুক্তির প্রকল্প হিসেবে। মুক্তচিন্তা, ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনের যে রূপরেখা তিনি দিয়েছিলেন—তা আজও প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ী। তাঁর কলমের “জিহাদ” থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নীতিনির্ধারণ—সবখানেই ছিল এক গভীর বিশ্বাস: শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করে, বিভাজন নয়—ঐক্য গড়ে। কেন তাঁর শিক্ষাচিন্তা আজকের বাংলাদেশেও নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে—জানতে চোখ রাখুন আগামী সংখ্যায়।

 অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিক্ষা_সংস্কার #মাওলানা_আবুল_কালাম_আজাদ #ইসলামী_শিক্ষা #মাদরাসা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #জামিয়া_মিলিয়া_মডেল #সমন্বিত_শিক্ষা #ধর্ম_ও_বিজ্ঞান #শিক্ষানীতি #জাতীয়_পুনর্গঠন #শিক্ষাদর্শ #মানসিক_মুক্তি #সাম্প্রদায়িকতা_বিরোধী #নৈতিক_শিক্ষা #বিজ্ঞানমনস্কতা #গণশিক্ষা #বুদ্ধিবৃত্তিক_পুনর্জাগরণ #শিক্ষায়_মানবিকতা #শিক্ষা_ও_গণতন্ত্র #EducationReform #Azad #IslamicEducation #BangladeshEducation #MadrasahReform #IntegratedCurriculum #KnowledgeAndFreedom



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: