odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 17th April 2026, ১৭th April ২০২৬
খেলার ছলে শেখার কথা ছিল—কিন্তু শুরুতেই শিক্ষার অসমতা, কোথাও বইয়ের বোঝা, কোথাও শূন্য সুযোগ: বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের রূপান্তর গুরুত্ব এবং বৈষম্যের সমাজতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ

হাতেখড়ির আগেই বিভক্ত পথ এবং শৈশবের প্রথম দরজাতেই বৈষম্য: একই দেশে দুই শিশুর দুই পৃথিবী —বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৭ April ২০২৬ ০১:২৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৭ April ২০২৬ ০১:২৪

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

গ্রামের রাহিম আর শহরের তারা—দুজনই একই বয়সের শিশু, কিন্তু তাদের শিক্ষার শুরু দুই ভিন্ন জগতে। পরিসংখ্যান, বাস্তবতা ও নীতির আলোকে বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্যের গভীর বিশ্লেষণ। বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। একদিকে সরকারি উদ্যোগ, পাইলট প্রকল্প ও নীতিগত অগ্রগতি—অন্যদিকে ভয়াবহ বৈষম্য, সীমিত প্রবেশাধিকার এবং মানগত সংকট। এই অনুসন্ধানধর্মী ফিচারে উঠে এসেছে শিশুদের শুরুর শিক্ষাজীবনের বাস্তব চিত্র—যেখানে সুযোগ নির্ধারণ করে জন্ম, অবস্থান ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য। প্রশ্ন একটাই: হাতেখড়ির প্রথম দরজা কি সবার জন্য সমানভাবে খোলা?

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাৎপর্য: একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা

বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা (Pre-Primary Education - PPE) বর্তমানে একটি জটিল এবং যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-4) সমাপ্ত হওয়ার প্রাক্কালে এবং ২০২৬ সাল থেকে পঞ্চম পর্যায়ের (PEDP-5) মহাপরিকল্পনা গ্রহণের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই প্রাথমিক ধাপটির গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জগুলো নতুনভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে । একটি শিশুর জীবনের প্রথম আট বছর, বিশেষ করে তিন থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালটি তার মস্তিষ্কের গঠন এবং ভবিষ্যৎ শিখন ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল সময় । বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও ২০২৩ সাল থেকে দুই বছর মেয়াদী (৪+ এবং ৫+ বছর বয়সী শিশুদের জন্য) কার্যক্রমের পাইলটিং শুরু হয়েছে, যা ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রার সাথে সরাসরি যুক্ত । তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং শিক্ষা ধারার বিভাজনের কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার গোড়াতেই যে বৈষম্যের শেকড় প্রোথিত হচ্ছে, তা জাতীয় উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ছোট্ট হাত, বড় প্রশ্ন: শৈশবের শুরুতেই দুই পৃথিবী

সকালবেলার নরম আলোয় ভেজা একটি গ্রাম। স্কুলের উঠানে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ বছরের রাহিম। হাতে নতুন খাতা, চোখে অচেনা এক সংশয়—সে কি ভেতরে যাবে, নাকি ফিরে যাবে মায়ের আঁচলের নিরাপদ আশ্রয়ে? এই প্রথম স্কুল, এই প্রথম অজানা এক জগতে পা রাখা। এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে, একই বয়সী তারা বসে আছে একটি ঝকঝকে কিন্ডারগার্টেনের শ্রেণিকক্ষে। তার হাতে রঙিন বই, ঠোঁটে ইংরেজি ছড়া, চারপাশে সাজানো খেলনা আর আকর্ষণীয় দেয়ালচিত্র। শেখা এখানে খেলাধুলার মতোই সহজ, আর স্কুল যেন এক আনন্দভ্রমণ।

দুজনই একই দেশের শিশু, একই বয়স, একইরকম স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছে—তবুও তাদের শুরুর গল্প যেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত চিত্র। একদিকে সম্ভাবনার উজ্জ্বল দরজা, অন্যদিকে বৈষম্যের অদৃশ্য দেয়াল।

হাতেখড়ির প্রথম রেখা: শিক্ষা, নাকি জীবনের ভিত্তি?

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেবল অক্ষর চেনা বা সংখ্যা শেখার বিষয় নয়—এটি একটি শিশুর জীবনের প্রথম সুসংগঠিত অভিজ্ঞতা। এখানেই গড়ে ওঠে তার চিন্তা, অনুভূতি, সামাজিক আচরণ আর আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি। খেলার ছলে শেখা, গল্প শোনা, ছবি আঁকা—এসবের ভেতর দিয়েই শিশুরা পৃথিবীকে চিনতে শেখে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই স্তরের শিক্ষায় অংশ নেয়, তারা পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকে। তাদের ঝরে পড়ার হার কম, শেখার আগ্রহ বেশি, আর আত্মবিশ্বাস দৃঢ়। অর্থাৎ, এই ছোট্ট শুরুটাই নির্ধারণ করে অনেক দূরের পথ।

আরো পড়ুন: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ধারাবাহিক যাত্রায় ছন্দপতন: গুরুগৃহ থেকে ৯৮% এনরোলমেন্ট—তারপর হঠাৎ পতন! বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা কোন পথে? অর্জনের শিখর ছুঁয়ে কেন অনিশ্চয়তায়—বিগত অন্তবর্তীকালীন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বাজেট কাটছাঁট ও অস্থিরতায় শিশুদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন

পরিসংখ্যানের আয়নায় শৈশব

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ লাখ শিশু কোনো না কোনোভাবে প্রারম্ভিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। সহজ করে বললে, প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে মাত্র একজন এই সুযোগের মুখ দেখে। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) আরও গভীর এক সংকেত দেয়—এই বয়সী শিশুদের মাত্র ১৮.৯ শতাংশ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশ নেয়, আর প্রায় ২৫.৫ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক বিকাশের পথে নেই। এই সংখ্যাগুলো নিছক তথ্য নয়; এগুলো এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, যেখানে অনেক শিশুই শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণও সতর্ক করে—এই স্তরে শিক্ষার ঘাটতি একটি দেশের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

স্বপ্নের দোলনায় ঝুলে থাকা ভবিষ্যৎ

কুমিল্লার চার বছরের আরাফাত সকালে মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়। সে গল্প শোনে, ছবি আঁকে, নতুন বন্ধু বানায়। সে সেই অল্পসংখ্যক শিশুর একজন, যারা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায়। কিন্তু তার মতো আরও অসংখ্য শিশু আছে—যারা এখনো এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কেউ ঘুমিয়ে থাকে, কেউ খেলায় মেতে থাকে, আবার কেউ জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় জড়িয়ে পড়ে। তাদের জন্য স্কুল এখনো এক দূরের স্বপ্ন।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই যে সুযোগ, এটি কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত? নাকি এটি একটি সীমিত পরিসরের সোনার হরিণ?

স্বপ্নের ফ্রেম: লক্ষ্য, বাস্তবতা সম্ভাবনা

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য শিশুর ওপর চাপ সৃষ্টি করা নয়, বরং তাকে বিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এখানে শেখানো হয় কীভাবে নিজের পরিচয় দিতে হয়, কীভাবে অন্যের সঙ্গে মিশতে হয়, কীভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে হয়। এটি মূলত জীবনের প্রথম সামাজিক পাঠ। সাধারণভাবে এই স্তরকে দুই ভাগে দেখা হয়—নার্সারি বা প্লে-গ্রুপ (৩-৫ বছর) এবং প্রাক-প্রাথমিক বা কিন্ডারগার্টেন (৫-৬ বছর)। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থায় মূলত ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এক বছরের কার্যক্রম চালু আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়সীমা যথেষ্ট নয়। দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, এই পর্যায়ের মানসম্মত শিক্ষা একটি শিশুর বুদ্ধিবিকাশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সক্ষম—বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। শহরের সচ্ছল পরিবারগুলোর শিশু যেখানে উন্নত পরিবেশে শেখার সুযোগ পায়, গ্রামের বা দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুই সেই দোরগোড়ায় পৌঁছাতেই পারে না। এই গল্প তাই কেবল রাহিম, তারা বা আরাফাতের নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর গল্প। প্রশ্ন শুধু একটাই: আমরা কি তাদের সবার জন্য সমানভাবে হাতেখড়ির সেই প্রথম দরজাটি খুলে দিতে পারছি?

আরো পড়ুন: ছয়টি ভিন্ন শিক্ষা ধারার শিক্ষা বনাম একটি খণ্ডিত জাতি—আমরা কি একই মানচিত্রের নিচে তিনটি আলাদা দেশ গড়ছি? সংবিধানের কান্না ও ১৭ অনুচ্ছেদের হাহাকার—এক স্বপ্ন, বহু বাস্তবতা, আর এক জাতির সন্ধান: ৫৪ বছরেও কেন মেলেনি একমুখী শিক্ষার স্বাদ?

বিকাশের ভিত্তিপ্রস্তর: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বহুমাত্রিক প্রভাব

একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাযাত্রা শুরু হয় প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে—যেখানে বিদ্যালয় মানে শুধু বই-পুস্তক নয়, বরং একটি নতুন পৃথিবীর দরজা। সাধারণত ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নির্মিত এই স্তরটি এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে তারা খেলার মধ্য দিয়ে শেখে, ভয় কাটিয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে সামাজিক আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়। এখানে শেখার উপকরণ কোনো কঠোর পাঠ্যক্রম নয়; বরং গল্প বলা, ছবি আঁকা, গান গাওয়া এবং দলগত খেলাধুলার মধ্য দিয়েই শিশুর চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়। এই পরিবেশ শিশুকে শেখায়—বিদ্যালয় মানে চাপ নয়, আনন্দ; শেখা মানে বোঝা নয়, অনুভব করা।

শিক্ষাবিদদের মতে, মানব জীবনের জ্ঞানীয় বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয় পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই। ফলে এই সময়কালটি শিশুর জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই পর্যায়ে একটি সৃজনশীল, নিরাপদ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং তার মধ্যে নতুন কিছু জানার আগ্রহ—যাকে আমরা ‘curiosity’ বলি—ক্রমশ বিকশিত হয়। এই কৌতূহলই তাকে আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, এই সময়টি যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে তার প্রভাব পরবর্তী শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিফলিত হয়—শেখার প্রতি অনীহা, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা সামাজিক যোগাযোগে সংকোচ—এসব সমস্যার সূত্রপাত অনেকাংশেই এই প্রাথমিক পর্যায়ের ঘাটতি থেকে।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশেরও ভিত্তি স্থাপন করে। এই স্তরে শিশুরা প্রথমবারের মতো ঘরোয়া পরিবেশের বাইরে এসে সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশা করে। এর মাধ্যমে তারা শিখে ভাগাভাগি করা, সহযোগিতা করা, অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারা এবং দলগতভাবে কাজ করা। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে সহানুভূতি, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি শিশুর ‘মানুষ হয়ে ওঠার’ প্রক্রিয়া শুরু হয় এখান থেকেই।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে বাস্তবতা বলছে—এই এক বছর সময় শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। যে বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়, সেই সময়কে যদি আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ শিক্ষানভিজ্ঞতার মাধ্যমে লালন করা না যায়, তবে শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

সব মিলিয়ে, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। এখানে গড়ে ওঠা কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা এবং শেখার আনন্দই তার পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিত্ব নির্মাণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই এই স্তরকে অবহেলা করা মানে কেবল একটি শিক্ষাস্তরকে নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।

অর্থনীতি থেকে সমতা: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার রূপান্তরমূলক বহুমাত্রিক তাৎপর্য

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কোনো একক শিক্ষাস্তর নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক কাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যখন একটি শিশু প্রাথমিক শিক্ষার আগেই একটি শক্তিশালী ভিত্তি পায়, তখন তার শেখার গতি বৃদ্ধি পায়, ক্লাসে ফেল করার বা একই শ্রেণিতে বারবার আটকে থাকার প্রবণতা কমে যায়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ হ্রাস পায় এবং সরকারের ব্যয় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ শুধু একটি শিশুর উন্নয়ন নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের আর্থিক দক্ষতারও প্রতিফলন।

এই শিক্ষার বহুমাত্রিক তাৎপর্যকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে তা চারটি আন্তঃসম্পর্কিত স্তম্ভে প্রতিফলিত হয়—ব্যক্তিগত বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, অর্থনৈতিক রিটার্ন এবং জেন্ডার সমতা। প্রথমত, ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে এই স্তরটি শিশুর অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতাকে উন্মোচিত করে। খেলার ছলে শেখা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং নিজের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ শিশুর আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে। একই সঙ্গে, সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তার সামাজিক দক্ষতা বিকশিত হয়, যা তাকে একটি পরিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার ভিত্তি প্রদান করে।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি অপরিহার্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এই স্তরের শিক্ষায় অভ্যস্ত শিশুরা বিদ্যালয়ের পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, ফলে তাদের মধ্যে স্কুলভীতি কম থাকে এবং শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ঝরে পড়ার হার কমানোর ক্ষেত্রে এবং প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার বাড়াতে। অর্থাৎ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে, যা একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব আরও গভীর। এই স্তরে বিনিয়োগের ফলে শিশুরা ভবিষ্যতে দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত হয়। তারা কর্মক্ষেত্রে উচ্চতর দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। একই সঙ্গে, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমে, ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরও সুদৃঢ় হয়। এই কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কাঠামো, বিশেষ করে United Nations–এর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা SDG 4.2–এ ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশুর জন্য মানসম্মত প্রারম্ভিক বিকাশ ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

সবশেষে, জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের জন্য এই স্তরটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত থাকার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। এর ফলে বাল্যবিবাহ, ঝরে পড়া এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলো কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে, ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রেও এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করে, যেখানে তারা শুধু উপার্জনক্ষমতা নয়, বরং শিক্ষাগত ও সামাজিক দক্ষতার দিক থেকেও সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার এই বহুমাত্রিক তাৎপর্য আমাদের সামনে একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা তুলে ধরে—এটি কেবল একটি শিক্ষার ধাপ নয়, বরং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সমাজ—সবকিছুর রূপান্তরের ভিত্তি। তাই এই স্তরের শিক্ষাকে শক্তিশালী করা মানেই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমতাভিত্তিক পথে এগিয়ে নেওয়া।

Read More কানার হাটে জ্ঞানের শিশিরবিন্দু খোঁজে: দৃষ্টিভ্রমের পাঠশালায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেনো আন্দাজে পোঁতা খুঁটি! - সনদের বাণিজ্য নাকি প্রকৃত জ্ঞান? 'কানার হাট' থেকে মুক্তির উপায় কী?

শৈশবের দরজায় কড়া নাড়া: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার দীর্ঘ অভিযাত্রা

বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গল্পটি যেন এক ধীর, ধৈর্যশীল নদীর মতো—কখনও অদৃশ্য স্রোতে, কখনও স্পষ্ট গতিতে, কিন্তু কখনও থেমে না থাকা এক যাত্রা। এই যাত্রার শুরু প্রাচীন সময়ের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিমণ্ডলে, আর আজ তা পৌঁছেছে নীতিনির্ধারণ থেকে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায়।

প্রাচীন বাংলায় শিক্ষার দৃশ্যপট ছিল সরল, কিন্তু মানবিক। গ্রামের বটগাছের ছায়ায়, মন্দিরের উঠোনে কিংবা পাড়ার পাঠশালায় শিশুদের হাতে ধরা পড়ত বর্ণমালা। শিক্ষা ছিল ধর্মীয়, সামাজিক এবং জীবনঘনিষ্ঠ। কিন্তু সেখানে ‘প্রাক-প্রাথমিক’ বলে আলাদা কোনো ধারণা ছিল না—শৈশব আর শিক্ষার সীমানা তখনো আলাদা করে টানা হয়নি।

ঔপনিবেশিক যুগে এসে শিক্ষার কাঠামোতে কিছু পরিবর্তনের আভাস মিললেও ছোট শিশুদের জন্য আলাদা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তখনো প্রান্তিকই রয়ে যায়। ১৮৩৫ সালে উইলিয়াম অ্যাডামের প্রতিবেদনে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব উঠে এলেও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা তখনো নীতির কেন্দ্রে জায়গা পায়নি। পরে ১৯৪৪ সালের সার্জেন্ট কমিশন প্রথমবারের মতো এই স্তরের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে—কিন্তু দেশভাগের অস্থিরতায় সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াতে পারেনি।

পাকিস্তান আমলে শিক্ষা নিয়ে নানা পরিকল্পনা হলেও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ছিল যেন এক অদেখা অধ্যায়। ১৯৫৯ সালের শিক্ষা কমিশন এর গুরুত্ব স্বীকার করলেও বাস্তব উদ্যোগের ঘাটতি ছিল প্রকট। শহরের কিছু ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেন ছাড়া এই শিক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। গ্রামবাংলার শিশুদের জন্য শৈশব তখনো ছিল অনিয়ন্ত্রিত, অপ্রস্তুত এক শুরু।

স্বাধীনতার পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে—ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে। ১৯৭৪ সালের কুদরত-ই-খুদা কমিশন প্রথমবারের মতো শিশুদের জন্য আলাদা প্রস্তুতিমূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এরপর একের পর এক কমিশন—মফিজউদ্দিন আহমেদ (১৯৮৮), জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি (১৯৯৭)—সবাই একই সুরে কথা বলেছে: শিশুর শুরুর শিক্ষাটাই হতে হবে সবচেয়ে যত্নের।

কিন্তু কাগজের সুপারিশ থেকে বাস্তবের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে সময় লেগেছে অনেক। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে, যেখানে প্রথমবারের মতো ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ঘোষণা আসে। এর পরপরই ২০১১ সালে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘স্কুল রেডিনেস’ কার্যক্রম। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালু হয় ‘শিশু শ্রেণি’—যেখানে ছোট্ট শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার স্বাদ পেতে শুরু করে।

গত এক দশকে এই খাতে এসেছে এক নীরব বিপ্লব। প্রায় ৩৮ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু হয়েছে। ভর্তির হার বেড়েছে, লিঙ্গসমতা অর্জনে বাংলাদেশ দেখিয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তবে বাস্তবতা এখনো দ্বৈত—একদিকে সরকারি উদ্যোগ, অন্যদিকে শহরকেন্দ্রিক প্রায় পাঁচ হাজার বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের ওপর নির্ভরতা।

এই গল্পের সাম্প্রতিক অধ্যায় আরও আশাব্যঞ্জক। ২০২৩ সালে সরকার ৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করে। দেশের ৩,২১৪টি বিদ্যালয়ে চালু হওয়া এই উদ্যোগ যেন শৈশবকে আরও সময়, আরও যত্ন দেওয়ার এক নতুন প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, বান্দরবান ও মাগুরার মতো পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এই উদ্যোগ পেয়েছে মানবিক মাত্রা।

এই প্রকল্প শুধু একটি কর্মসূচি নয়—এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিশুকে শুধু স্কুলে ভর্তি করানো নয়, তাকে শেখার জন্য প্রস্তুত করে তোলা—আনন্দের মধ্য দিয়ে, নিরাপদ পরিবেশে, তার নিজস্ব গতিতে। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নতুন কারিকুলাম তৈরি করেছে, গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে এর কার্যকারিতা।

২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বলছে, এই উদ্যোগের ভিত মজবুত। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে চ্যালেঞ্জ আছে, সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু আশার আলোও স্পষ্ট।

আরো পড়ুন: আইন আছে, শিক্ষা নাই: ৩৫ বৎসর পরও শিশুদের হারাইতেছে বাংলাদেশ/ ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন—কাগজে কঠোর, বাস্তবে অকার্যকর; কোথায় কমিটি, কোথায় জবাবদিহি?

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস এক চলমান গল্প—স্বপ্ন, সীমাবদ্ধতা আর অদম্য অগ্রগতির গল্প। শৈশবকে যত্নে গড়ে তোলার এই প্রয়াস এখন আর কেবল নীতির ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়; তা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের হাসিমুখে, প্রতিটি শিশুর প্রথম শেখার আনন্দে।

আলো-ছায়ার এই সময়: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান প্রতিচ্ছবি

বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মানচিত্রে আজ এক অদ্ভুত সহাবস্থান—সাফল্যের উজ্জ্বল আলো আর সীমাবদ্ধতার দীর্ঘ ছায়া। একদিকে অর্জনের গল্প, অন্যদিকে অপূর্ণতার নীরব দীর্ঘশ্বাস। দেশের প্রায় ৩৮ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু। সংখ্যার এই বিস্তার নিঃসন্দেহে এক বড় সাফল্য। ভর্তির হার বেড়েছে, ছেলে-মেয়ের মধ্যে অংশগ্রহণের ব্যবধান কমেছে—যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। কিন্তু এই অর্জনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক কঠিন প্রশ্ন: সব শিশুই কি এই সুযোগ পাচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১১.৩ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে মাত্র ৩.৫ মিলিয়ন কোনো না কোনো প্রারম্ভিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুই এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ শুরুর ধাপ থেকে বঞ্চিত। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ মাত্র ১৮.৯ শতাংশ, আর প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু স্বাভাবিক বিকাশের ধারায় নেই। এই সংখ্যাগুলো নিছক তথ্য নয়—এগুলো হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার অদৃশ্য হিসাব।

তবে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা-ও কম নয়। দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয় শিশুদের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে—যা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি বড় সুবিধা। অনেক বিদ্যালয়ে খেলার জন্য উন্মুক্ত স্থান রয়েছে, যা শিশুদের জন্য আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক।

কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত মসৃণ নয়। অনেক বিদ্যালয়ে এখনো নেই সীমানা প্রাচীর। প্রায় ৩০ শতাংশ স্কুল খোলা, অরক্ষিত। চার-পাঁচ বছরের একটি শিশুর জন্য এটি শুধু অবকাঠামোগত ঘাটতি নয়, বরং নিরাপত্তার সরাসরি ঝুঁকি। অভিভাবকের দুশ্চিন্তা, শিক্ষকের অস্বস্তি—সব মিলিয়ে শেখার পরিবেশে এক ধরনের অদৃশ্য অস্থিরতা থেকে যায়।

শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও একই রকম চাপা সংকট। যদিও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য আলাদা কক্ষ আছে, কিন্তু ছোট (৪+) ও বড় (৫+) শিশুদের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। ফলে একই কক্ষে ভিন্ন বয়সী শিশুদের নিয়ে পাঠদান করতে হয়। নির্ধারিত জায়গা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতি শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্থান নিশ্চিত করা যায় না—বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। এতে খেলার মাধ্যমে শেখার যে স্বাভাবিক পরিবেশ, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে।

স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় শিশু-বান্ধব নয়। ট্যাপ বা বেসিন অনেক সময় শিশুদের নাগালের বাইরে, টয়লেট ব্যবস্থাও সবখানে উপযোগী নয়। বর্ষাকালে উপকূলীয় ও নদীবিধৌত অঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একটি শিশুর জন্য শেখার প্রথম অভিজ্ঞতা যদি অস্বস্তিকর হয়, তবে তার শেখার আগ্রহও নিঃশব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষক সংকট আরেকটি বড় বাস্তবতা। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও প্রাক-প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা—শিশু মনোবিজ্ঞান, খেলা-ভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি, ধৈর্য আর সংবেদনশীলতা। অনেক শিক্ষকই ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন ডিগ্রিধারী হলেও এই বিশেষ প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী বা কেয়ারগিভারের স্বল্পতা—যা এই বয়সী শিশুদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংকট তৈরি হচ্ছে শিখন-দর্শনে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মূল কথা ছিল আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় শিশুদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে বইয়ের বোঝা, হোমওয়ার্কের চাপ, এমনকি পরীক্ষার উদ্বেগ। খেলার জায়গা দখল করে নিচ্ছে প্রতিযোগিতা। শৈশবের স্বাভাবিক ছন্দ সেখানে হারিয়ে যাচ্ছে।

এই চিত্র আরও জটিল হয়ে ওঠে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। অনেক অভিভাবক এখনো মনে করেন, “খেলা মানেই সময় নষ্ট”—তাই তারা সরাসরি প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তির দিকে ঝোঁকেন বা কোচিংয়ের পথে হাঁটেন। অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ সরকারি স্কুলের বদলে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ইংরেজি মাধ্যম, সাজানো পরিবেশ আর প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার আকর্ষণ সেখানে প্রবল। ফলে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য বিভাজন—সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থার মধ্যে।

বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যেও আছে দ্বৈততা। কোথাও উন্নত পরিবেশ, আবার কোথাও অতিরিক্ত চাপ। তিন-চার বছরের শিশুদেরও নিয়মিত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে—শুধু এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতায়। এক শিক্ষিকার কথায়, “অভিভাবকরা চান তাদের সন্তান সবার আগে থাকুক, কিন্তু তারা ভুলে যান—এই বয়সে শিশুর প্রথম অধিকার খেলা।”

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান চিত্রটি এক জটিল ক্যানভাস। এখানে অগ্রগতি আছে, আছে সীমাবদ্ধতা; আছে স্বপ্ন, আবার বাস্তবতার টানাপোড়েনও। তবুও এই যাত্রা থেমে নেই—কারণ প্রতিটি শিশুর হাসিমুখে লুকিয়ে আছে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ, যাকে যত্নে গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শৈশবেই বিভক্ত পথ: বৈষম্যের নীরব জন্মকথা

বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কথা উঠলেই আমরা প্রায়শই বলি—এটাই শিশুর জীবনের প্রথম ধাপ, সমান সুযোগের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি অনেক বেশি জটিল, কখনও কখনও বেদনাদায়কও। এই স্তরেই নীরবে তৈরি হচ্ছে বৈষম্যের বীজ, যা পরে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে অসমতার এক বিশাল বৃক্ষে।

একটি শিশুর জন্ম কোথায়, তার পরিবার কতটা স্বচ্ছল, সে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে—এসবই তার শিক্ষাজীবনের শুরুতেই ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “কিউমুলেটিভ অ্যাডভান্টেজ”—যেখানে আগে থেকেই এগিয়ে থাকা শিশুরা আরও সুযোগ পায়, আর পিছিয়ে থাকা শিশুরা ক্রমেই আরও দূরে সরে যায়। ফলে শিক্ষা, যা হওয়ার কথা ছিল সমতার সেতুবন্ধন, তা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠছে বিভাজনের সূতিকাগার।

বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো নিজেই যেন এক বিভক্ত মানচিত্র। একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্যদিকে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন, আরেকদিকে মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা। এই তিন ধারার মধ্যে ব্যয়ের যে বৈষম্য, তা শুধু সংখ্যার পার্থক্য নয়—এটি একটি গভীর সামাজিক বৈপরীত্যের প্রতিফলন। একটি কিন্ডারগার্টেনে যেখানে একজন শিশুর পেছনে মাসে গড়ে ৫৩১ টাকার বেশি ব্যয় হয়, সেখানে একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় সেই ব্যয় নেমে আসে প্রায় ১০ টাকায়। এই বিপুল ব্যবধান শেখার পরিবেশ, উপকরণ এবং মানের মধ্যে এক গভীর ফারাক তৈরি করে।

এই বৈষম্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ধনী পরিবারের শিশুরা যেখানে সহজেই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার পায়, দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুর জন্য সেই দরজাটিই অর্ধেক খোলা থাকে। দারিদ্র্য এখানে কেবল আয়ের সংকট নয়—এটি স্বপ্ন দেখার সীমাবদ্ধতা। অনেক পরিবারে স্কুল নয়, জীবিকার চাপই অগ্রাধিকার পায়। অপুষ্টি, শিক্ষাসামগ্রীর অভাব—সব মিলিয়ে শিক্ষার শুরুটাই হয়ে ওঠে অসম।

ভৌগোলিক বাস্তবতাও এই বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে। শহরের আধুনিক শ্রেণিকক্ষের বিপরীতে বস্তির অনিশ্চিত পরিবেশ, আর তারও বাইরে হাওর, চর ও পাহাড়ের বিচ্ছিন্ন জীবন—সব মিলিয়ে এক দেশে যেন একাধিক বাস্তবতা। কোথাও স্কুল হাতের নাগালে, কোথাও স্কুলে পৌঁছানোই এক দৈনিক সংগ্রাম।

শিক্ষাক্রম শিখন পরিবেশ: কাগজের স্বপ্ন, বাস্তবের সংকট

বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম কাগজে-কলমে অত্যন্ত সময়োপযোগী, শিশু-কেন্দ্রিক এবং ‘আনন্দদায়ক শিখন’-এর দর্শনে গড়া। এখানে শেখার কথা খেলার ভেতর দিয়ে, কৌতূহলের ছন্দে, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা চারটি শিখন কর্ণার—ব্লক, কল্পনা, শিল্পকলা ও বই—যেখানে শিশু নিজের মতো করে শেখার জগৎ গড়ে তুলবে।

কিন্তু বাস্তবের শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। অনেক বিদ্যালয়ে ছোট্ট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসে আছে কয়েক ডজন শিশু—কখনো সংখ্যাটি পৌঁছে যায় ৯০-এর কাছাকাছি। সেখানে দৌড়ানোর জায়গা নেই, খেলাধুলার অবকাশ নেই, এমনকি স্বাধীনভাবে নড়াচড়ারও সুযোগ সীমিত। খেলার মাধ্যমে শেখার যে মূল দর্শন, তা যেন ভিড়ের চাপে হারিয়ে যায়।

শিক্ষকরা অনেকেই এখনো প্রথাগত শিক্ষার ধারা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেননি। বর্ণমালা মুখস্থ করানো, খাতায় লেখা—এসবই হয়ে ওঠে প্রধান কাজ। ফলে শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনা আর আনন্দময় শেখার সুযোগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও অনেক শিক্ষক স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তবুও ‘কেন’ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আলাদা—এই মৌলিক ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। এমনকি অনেক প্রধান শিক্ষকও এই স্তরের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত নন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অভিভাবকদের প্রত্যাশা—তারা চান শিশু দ্রুত পড়তে-লিখতে শিখুক। ফলে শিক্ষকরাও বাধ্য হন পুরোনো পদ্ধতির আশ্রয় নিতে।

ভূগোলের দেয়াল: যেখানে পথই সবচেয়ে বড় বাধা

বাংলাদেশের প্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি তা শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। চরাঞ্চল, হাওর, পার্বত্য এলাকা—এই অঞ্চলগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এখনো অনেকাংশে অধরা। বর্ষাকালে হাওরের স্কুল ডুবে যায় পানির নিচে, চরাঞ্চলে নদীভাঙনে বদলে যায় মানচিত্র, পাহাড়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছানোই হয়ে ওঠে এক বড় পরীক্ষা। ফলে এই অঞ্চলের শিশুরা নিয়মিত শিক্ষার ধারায় থাকতে পারে না।

কোথাও কোথাও বিকল্প উদ্যোগ—যেমন পার্বত্য অঞ্চলের ‘পাড়া কেন্দ্র’—আশার আলো দেখায়, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে নতুন করে যোগ হয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন—সব মিলিয়ে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ছে বারবার। নমনীয় সময়সূচি বা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।

ছোট ছোট অভাব, বড় প্রভাব: স্বাস্থ্য ওয়াশের বাস্তবতা

একটি শিশুর জন্য স্কুল শুধু পড়ার জায়গা নয়—এটি তার প্রথম সামাজিক অভিজ্ঞতা। সেখানে স্বস্তি, নিরাপত্তা আর পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে টয়লেট সুবিধা শিশুদের নাগালের মধ্যে নয়। ট্যাপ, বেসিন অনেক সময় এত উঁচুতে বসানো যে শিশুরা ব্যবহারই করতে পারে না। মাত্র ৬০ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিশু-বান্ধব স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে।

এই ছোট ছোট অসুবিধাগুলোই শিশুর মনে বড় প্রভাব ফেলে। স্কুল তখন তার কাছে আনন্দের জায়গা না হয়ে অস্বস্তির জায়গা হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ভেতরে বৈষম্যের যে জাল বোনা হয়েছে, তা কেবল অর্থনীতি বা অবকাঠামোর নয়—এটি দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তবতা আর সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রতিফলন। শৈশবের এই প্রথম ধাপেই যদি সমতার ভিত্তি দৃঢ় করা না যায়, তবে পরবর্তী সব প্রচেষ্টাই হয়ে উঠবে অসম এক দৌড়ের গল্প।

সংখ্যার ভেতরে লুকানো শৈশব: পরিসংখ্যানের ভয়াল সত্য আগামী পথের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা বোঝার জন্য শুধু গল্প বা অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়—সংখ্যার দিকে তাকালেই যেন খুলে যায় এক কঠিন, কখনও শীতল সত্যের দরজা। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যা নয়, এগুলো অগণিত শিশুর অসমাপ্ত শৈশবের প্রতিচ্ছবি।

জন্ম নিবন্ধনের অসম্পূর্ণতার কারণে প্রাক-প্রাথমিক বয়সী শিশুদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করাও এখনো একটি চ্যালেঞ্জ। তবুও প্রাক্কলন বলছে, এই স্তরের শিশুর সংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ ২০ হাজার। অন্যদিকে, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী মোট শিশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখের কাছাকাছি। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ লাখ শিশু কোনো না কোনো প্রারম্ভিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ বিপুল একটি অংশ এখনো শিক্ষার প্রথম ধাপ থেকেই বাইরে রয়ে যাচ্ছে।

‘মিকস’ জরিপের তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। এই বয়সী শিশুদের মাত্র ১৮.৯ শতাংশ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশ নিচ্ছে, আর প্রায় ২৫.৫ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক বিকাশের ধারায় নেই। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো এক একটি সম্ভাবনার হারিয়ে যাওয়ার গল্প, যা হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপকের কথায়, “প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শুধু প্রস্তুতি নয়, এটি শিশুর মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকাল। এই সময়টিতে বঞ্চিত হওয়া মানে সারা জীবনের জন্য পিছিয়ে পড়া।” এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সমস্যার গভীরতা।

আরো পড়ুন: শিক্ষক গড়ার কারখানায় কার স্বপ্ন?—সামাজিক ন্যায়বিচার, গোঁজামিল আর উন্নয়ন-সঙ্গীর নব্য রূপকথা [সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন বনাম সার্টিফিকেটের বাস্তবতা—শিক্ষক তৈরির অন্তর্লীন সংকটের অনুসন্ধান : প্রশিক্ষণ নাকি অভিনয়?—শিক্ষক শিক্ষার অস্বস্তিকর সত্য

২০২৫-২৬ পরবর্তী পথচলা: সম্ভাবনা সংকটের সন্ধিক্ষণ

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো কেবল নীতিনির্ধারণের নয়, বরং বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে।

  • প্রথমত, শিক্ষক সংকট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি প্রশাসনিক চাপ—ভোটার তালিকা হালনাগাদ, টিকাদান কর্মসূচি, জরিপ—এসব কাজ তাদের মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে সময় কমে যাচ্ছে, আর শিশুদের সঙ্গে নিবিড় কাজ করার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। গড়ে ৬৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক—এই অনুপাত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে একটি বড় অন্তরায়।
  • দ্বিতীয়ত, বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা। একজন প্রাথমিক শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে তার পক্ষে পেশায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—এটাই বাস্তবতা। বর্তমান বেতন কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ বিশ্বে দেখা গেছে, যেখানে শিক্ষককে সম্মান ও যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে, সেখানেই শিক্ষার মানে এসেছে বড় পরিবর্তন।
  • তৃতীয়ত, কোভিড-১৯ মহামারি ও সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব এখনো কাটেনি। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় যে ‘শিখন দারিদ্র্য’ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ছোট শিশুদের ওপর। তারা হারিয়েছে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ, শেখার প্রথম অভিজ্ঞতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনের মতো বাস্তবতা—যা উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থাকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে।
  • চতুর্থত, আইনগত ও নীতিগত অস্পষ্টতা। প্রাথমিক শিক্ষা আইনে শিশুদের বয়সসীমা নির্ধারিত হলেও প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বয়স কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়। চার বছর, না পাঁচ বছর—কোন বয়সে শিশুকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা উচিত, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এই অস্পষ্টতা নীতি বাস্তবায়নকে জটিল করে তোলে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে অর্জনের ভিত্তি, অন্যদিকে অমীমাংসিত প্রশ্ন আর চ্যালেঞ্জের স্তূপ। সংখ্যাগুলো আমাদের সতর্ক করে, বাস্তবতা আমাদের ভাবায়—আর ভবিষ্যৎ আমাদের আহ্বান জানায়। কারণ শৈশবের এই প্রথম ধাপটিই ঠিক করে দেয় একটি জাতির আগামী পথচলা কতটা দৃঢ় হবে।

আশার আলোকবর্তিকা: উদ্ভাবনী মডেল থেকে ভিশন ২০৪১

বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গল্প শুধু সীমাবদ্ধতার নয়—এটি সম্ভাবনারও গল্প। নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জন্ম নিয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, যা দেখিয়ে দিয়েছে—ইচ্ছা আর উদ্ভাবন একসঙ্গে থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে ছড়িয়ে থাকা ‘পাড়া কেন্দ্র’গুলো যেন সেই সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ইউনিসেফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা চার হাজারের বেশি এই কেন্দ্র শুধু শিক্ষা দেয় না, গড়ে তোলে আস্থা। এখানে শিশুরা তাদের নিজের মাতৃভাষায় শেখে—গানের ছন্দে, গল্পের ভেতর দিয়ে, পরিচিত সংস্কৃতির আবহে। ফলে স্কুল আর তাদের কাছে অপরিচিত বা ভীতিকর কিছু থাকে না; বরং হয়ে ওঠে আনন্দের জায়গা। প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার শিশু এই কেন্দ্রগুলো থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার আলো পায়—যা শুধু সংখ্যা নয়, বরং এক একটি আলোকিত শৈশবের গল্প।

অন্যদিকে, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝেও থেমে নেই শিক্ষার পথচলা। বর্ষাকালে যখন চারদিক পানিতে ডুবে যায়, তখন ভেসে ওঠে নৌকা বিদ্যালয়—ব্র্যাকের এক অভিনব উদ্যোগ। এই ভাসমান স্কুলগুলো শিশুদের কাছে গিয়ে পৌঁছে দেয় শিক্ষা। নৌকার ভেতরে গান, গল্প, হাসি আর শেখার এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়। এখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গুরুত্ব পায় আনন্দ, বন্ধুত্ব আর অংশগ্রহণ। ফলে ঝরে পড়ার হার কমে, স্কুল হয়ে ওঠে শিশুদের কাছে প্রিয় জায়গা। —এই স্থানীয় উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষা একরকম হতে পারে না—এটি হতে হবে স্থানভিত্তিক, সংস্কৃতিনির্ভর এবং শিশুকেন্দ্রিক।

বৃহৎ স্বপ্নের পথে: পিইডিপি- ভিশন ২০৪১

এই বিচ্ছিন্ন সাফল্যের গল্পগুলোকে একটি বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে জাতীয় পর্যায়ে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি—পিইডিপি-৫—সেই বড় স্বপ্নেরই অংশ। প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার এই কর্মসূচি শুধু একটি প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার একটি ভিত্তিপ্রস্তর। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য শুধু স্কুলে ভর্তি বাড়ানো নয়, বরং শেখার মান উন্নত করা। বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে দক্ষতার হার যেখানে ৩৯ শতাংশ, তা ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে বাংলায় দক্ষতা ৫১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অর্থ, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, বাস্তব জীবনের দক্ষতায়ও এগিয়ে যাবে।

শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোও এই কর্মসূচির একটি বড় লক্ষ্য। নিট ভর্তি হার প্রায় ৯৪.৫৫ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা যেমন উচ্চাভিলাষী, তেমনি জরুরি। কারণ এখনো অনেক শিশু—বিশেষ করে প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের—এই ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। একই সঙ্গে ঝরে পড়ার হার কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার পরিবেশকেও শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো সিঙ্গেল শিফট স্কুলের সম্প্রসারণ। বর্তমানে ডাবল শিফটে চলা অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সময় সীমিত হয়ে যায়। এই সমস্যা দূর করতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ হাজার স্কুলকে একক শিফটে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা আরও সময় পাবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে আরও নিবিড়, আর শেখার পরিবেশ হবে আরও কার্যকর।

এই বৃহৎ পরিকল্পনার ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নও। প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যক্তিভিত্তিক শেখার সুযোগ তৈরি করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এখন এক সন্ধিক্ষণে—যেখানে স্থানীয় উদ্ভাবন আর জাতীয় পরিকল্পনা মিলিত হয়ে তৈরি করছে ভবিষ্যতের পথরেখা। তবে এই স্বপ্ন বাস্তব হবে কি না, তা নির্ভর করছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—কাগজের পরিকল্পনাকে কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা আর আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি পরিকল্পনার সাফল্য মাপা হবে একটি জায়গায়—শ্রেণিকক্ষের সেই ছোট্ট শিশুর হাসিতে, যে প্রথমবারের মতো শেখার আনন্দ খুঁজে পায়।

একই আকাশের নিচে: শৈশব, সমতা আগামীর অঙ্গীকার

বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করছে। একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে শিক্ষার গোড়াতেই যে বৈষম্যের রেখা টানা হচ্ছে, সেটি মুছে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কারণ শুরুটাই যদি অসম হয়, তবে শেষের সমতা কেবল স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।

এই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি সত্য—শুধু নতুন ভবন, বড় বাজেট বা পরিকল্পনার কাগজ দিয়ে শিক্ষা বদলায় না। বদলায় তখনই, যখন শিক্ষক সম্মান পান, প্রশিক্ষণ পান, এবং একটি শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পরিবেশ পান। তাই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি।

  • প্রথমত, একটি একীভূত শিক্ষা কাঠামো তৈরি করা দরকার—যেখানে সরকারি, বেসরকারি ও মাদ্রাসা—সব ধারার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি মানসম্মত নীতিমালার আওতায় আসবে। এতে সম্পদ ও সুযোগের ব্যবধান কমবে, আর প্রতিটি শিশুর জন্য ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষক পেশার মর্যাদা ও বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা অপরিহার্য। একজন শিক্ষক যদি নিজের জীবিকা নিয়েই অনিশ্চিত থাকেন, তবে তার পক্ষে শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করা কঠিন। মেধাবী তরুণদের এই পেশায় আনতে হলে শিক্ষকতাকে হতে হবে সম্মানজনক ও আকর্ষণীয়।
  • তৃতীয়ত, ভৌগোলিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে হাওর, চর ও পার্বত্য অঞ্চলের জন্য বিশেষ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বোট স্কুল, পাড়া কেন্দ্র—এসব উদ্ভাবনী মডেল শুধু ব্যতিক্রম নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা হতে পারে।
  • চতুর্থত, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি ক্ষুধার্ত বা অসুস্থ শিশু কখনোই শেখার পূর্ণ সুযোগ পায় না। তাই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এসবকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

আগামীর পথনকশা: পরিকল্পনা থেকে প্রয়োগ

সাম্প্রতিক গবেষণা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা। অবকাঠামো উন্নয়ন—বিশেষ করে নিরাপদ সীমানা প্রাচীর, শিশু-বান্ধব ওয়াশ ব্লক এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা—প্রতিটি স্কুলে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও জোর দিতে হবে। শুধু শিক্ষক বাড়ানো নয়, তাদেরকে আধুনিক, খেলা-ভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলা জরুরি। প্রতিটি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে সহকারী শিক্ষক বা কেয়ারগিভার নিয়োগ এই বয়সী শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিখন উপকরণের ক্ষেত্রেও স্থানীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ব্যয়বহুল খেলনার বদলে দেশীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি খেলনা শুধু সাশ্রয়ীই নয়, বরং শিশুদের বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সংযোগ তৈরি করে।

ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতায় নমনীয় সময়সূচি চালু করা এখন সময়ের দাবি। বন্যা বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ স্কুল বা বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা গেলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিভাবক ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। গণমাধ্যম, কমিউনিটি উদ্যোগ—সব মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। কারণ সচেতনতা ছাড়া কোনো নীতি বাস্তবতা পায় না।

শেষকথা: একটি গল্প, দুটি বাস্তবতা

কুমিল্লার ছোট্ট আরাফাত প্রতিদিন স্কুলে যায়। গল্প শোনে, ছবি আঁকে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলে। তার কাছে স্কুল মানে আনন্দ। অন্যদিকে পাশের গ্রামের লতিফা এখনো বাড়ির উঠোনে বসে থাকে। তার বাবা মনে করেন, “এই বয়সে স্কুলে গিয়ে কী হবে?”—এই একটি বাক্যই তার শিক্ষার পথ বন্ধ করে দেয়। —এই দুই শিশুর গল্প আসলে দুই বাংলার গল্প—একটি সুযোগের, আরেকটি বঞ্চনার।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি, তা কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার নয়—এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের দাবি।

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে—একদিকে সম্ভাবনার দরজা, অন্যদিকে বৈষম্যের দেয়াল। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের: আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ব, যেখানে আরাফাত আর লতিফার গল্প আলাদা হবে না?

কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুরু হয় তার শিশুদের হাত ধরে। আর সেই হাত যদি সমানভাবে শক্ত ভিত্তি না পায়, তবে উন্নয়নের সব স্বপ্নই থেকে যাবে অসম্পূর্ণ এক ছবির মতো।

 অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#প্রাকপ্রাথমিকশিক্ষা #শৈশবেরঅধিকার #EducationForAll #বাংলাদেশশিক্ষা #Pre-Primary #EarlyChildhoodDevelopment #শিক্ষায়বৈষম্য #ChildRightsBD #SmartBangladesh2041 #InclusiveEducation #শিশুরভবিষ্যৎ #EducationReform #LearningCrisis #SDG4 #সমতারশুরু



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: