odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 30th April 2026, ৩০th April ২০২৬
ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে প্রাণহানি; সচেতনতা ও সঠিক পূর্বাভাসই হতে পারে জীবন রক্ষার চাবিকাঠি

জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণ: বজ্রপাতকে কি আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে

Special Correspondent | প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ০০:৫৫

Special Correspondent
প্রকাশিত: ৩০ April ২০২৬ ০০:৫৫

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনে বজ্রপাতে অন্তত ৪০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে প্রতি বছর এই নিঃশব্দ ঘাতকের থাবায় গড়ে ৩০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। ২০১৫ সালে সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও সচেতনতার অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস এই প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হওয়ার কারণ

বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের মতে ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনই এর মূল কারণ। 

ভৌগোলিক অবস্থান ও বাতাসের সংঘাত: বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস এবং উত্তরে হিমালয় থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসের মিলনস্থলে তৈরি হয় দানবীয় ‘বজ্রমেঘ’ বা কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)। এই দুই বিপরীতধর্মী বাতাসের সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

উঁচু গাছের অভাব: একসময় গ্রামবাংলার মাঠে প্রচুর তালগাছ বা বটগাছ ছিল, যা প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। বর্তমানে এই গাছগুলো উজাড় হয়ে যাওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি খোলা মাঠে থাকা মানুষ বা গবাদিপশুর ওপর আঘাত হানছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন: গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বাষ্পায়নের হার বাড়ছে, যা বজ্রঝড়কে আরও শক্তিশালী করছে।

বায়ুদূষণ: বাতাসে সালফেট ও কার্বন কণার পরিমাণ বাড়লে তা বজ্রমেঘ তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে জরুরি করণীয়

একটু সচেতনতাই পারে এই অকাল মৃত্যু ঠেকাতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন অবস্থানে থাকা অবস্থায় আপনার করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. বাড়ির ভেতরে থাকলে:

করণীয়: ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটারসহ সকল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্লাগ দ্রুত খুলে রাখুন। বাড়ির মেইন সুইচ বন্ধ করে রাখা আরও নিরাপদ।

বর্জনীয়: জানালার কাছাকাছি থাকা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাতের সময় গোসল করা বা কলতলায় পানি ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ পানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে।

২. খোলা মাঠে থাকলে:

করণীয়: কোনো নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে যত দ্রুত সম্ভব নিচু হয়ে দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে গুটিসুটি হয়ে বসে পড়ুন। এতে বজ্রপাতের আঘাতের ঝুঁকি কমে।

বর্জনীয়: কখনোই বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ারের নিচে দাঁড়াবেন না। এছাড়া মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়াও অত্যন্ত বিপজ্জনক।

৩. জলাশয়ে থাকলে:

করণীয়: মাছ ধরা বা নৌকা চালানোর অবস্থায় থাকলে দ্রুত পানি থেকে উঠে কোনো পাকা দালান বা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিন।

বর্জনীয়: বজ্রপাতের সময় পুকুর বা নদীতে গোসল করা, সাঁতার কাটা বা ছোট নৌকায় অবস্থান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।

৪. ভ্রমণে বা রাস্তায় থাকলে:

করণীয়: যদি গাড়িতে থাকেন, তবে জানালার কাঁচ বন্ধ করে গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করুন। গাড়ির ধাতব বডি আপনাকে সুরক্ষিত রাখবে।

বর্জনীয়: বজ্রপাতের সময় বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল বা খোলা রিকশায় চলাচল করা এড়িয়ে চলুন। রাস্তার পাশের টিনের চালা বা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

বিশেষ মনে রাখতে হবে শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর নিরাপদ আশ্রয় থেকে বের হওয়া উচিত। এই ছোট সতর্কতাটুকুই আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন বাঁচাতে পারে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

ভৌগোলিক কারণে দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা ও রাজশাহী জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে খোলা জায়গায় কাজ করার সময় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

মোবাইল টাওয়ার কি দায়ী?

সাম্প্রতিক সময়ে অপরিকল্পিত মোবাইল টাওয়ারের বিস্তার নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। উঁচু ধাতব টাওয়ারগুলো বিদ্যুতের সুপরিবাহী হওয়ায় মেঘ থেকে চার্জ আকৃষ্ট করে। সঠিক আর্থিং ব্যবস্থা না থাকলে এই বিদ্যুৎ আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে মানুষ ও গবাদিপশুর ক্ষতি করতে পারে।

বজ্রপাতকে আমরা হয়তো রোধ করতে পারব না, কিন্তু সঠিক পূর্বাভাস এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার মাধ্যমে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। আকাশ কালো হয়ে এলে বা মেঘের গর্জন শুনলে দেরি না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াই জীবন বাঁচানোর শ্রেষ্ঠ উপায়।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: