odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 29th May 2026, ২৯th May ২০২৬
ধ্বংসস্তূপ, দুর্ঘটনা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন সিরিয়ার রেলকর্মীরা

যুদ্ধবিধ্বস্ত রেলপথে সিরিয়ার পুনর্জাগরণ: বানিয়াস থেকে আলেপ্পো পর্যন্ত এক ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রা

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২৯ May ২০২৬ ২১:১৩

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২৯ May ২০২৬ ২১:১৩

 অধিকার পত্র ডটকমের  নিউজ 

প্রকাশিত: ২৯ মে ২০২৬, ৮:৩০ পিএম

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি:

সিরিয়ার উপকূলীয় শহর বানিয়াস থেকে আলেপ্পো পর্যন্ত একটি জ্বালানিবাহী মালবাহী ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রা যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি। ধ্বংসপ্রাপ্ত রেললাইন, পুরোনো সোভিয়েত আমলের লোকোমোটিভ, ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়েও রেলকর্মীরা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সিরিয়ার সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বানিয়াস রিফাইনারি থেকে প্রতিদিন জ্বালানিভর্তি ট্যাংকার ট্রেন আলেপ্পোর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। বহু বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের অধিকাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলেও এই রেলপথ এখনো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন মাধ্যম।

রিফাইনারির ট্রেন-লোডিং বিভাগের প্রধান হুসাম হাসান জানান, বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের শেষদিকে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে এবং ট্রেন চলাচল বেড়েছে।

তিনি বলেন, “ভালো দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রেন রিফাইনারি থেকে হোমস কিংবা আলেপ্পোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এই জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ত।”

তবে বাস্তবতা এখনো ভয়াবহ। আগের সরাসরি রেলপথ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ট্রেনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়। অনেক স্থানে রেললাইন চুরি হয়ে গেছে, কোথাও আগাছা ঢেকে ফেলেছে পুরো ট্র্যাক।

সিরিয়ান রেলওয়ের কর্মকর্তা নিদাল আবদুলকাদের বলেন, “আমরা যেন আবার রেলপথের পাথরযুগে ফিরে গেছি। সিগন্যালিং ব্যবস্থা নেই, সবকিছু হাতে পরিচালিত হয়।”

তিনি জানান, যাত্রীবাহী ট্রেন কার্যত বন্ধ। কারণ কেউই নিশ্চিত হতে পারে না ট্রেন কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে।

বানিয়াস থেকে যাত্রা শুরু করা ট্রেনটিতে ছিল প্রায় ৫ হাজার টন জ্বালানি। ১৯৭০-এর দশকের পুরোনো সোভিয়েত লোকোমোটিভে চড়ে কয়েকজন অভিজ্ঞ চালক ও সহকারীর ওপর নির্ভর করেই ট্রেনটি ধীরগতিতে এগিয়ে চলে।

যাত্রাপথে ট্রেনকর্মীরা মোবাইল ফোনে স্টেশনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো স্টেশনে কর্মীরা হাতে লেখা নির্দেশনা লোকোমোটিভ চালকের হাতে তুলে দেন চলন্ত ট্রেনের পাশ থেকে।

পথিমধ্যে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি গাড়ি রেললাইন অতিক্রম করার সময় ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় চালককে উদ্ধার করা হয় স্থানীয়দের সহায়তায়।

রেলকর্মীদের ভাষ্য, এ ধরনের দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীসংকট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

রাতভর যাত্রার পর ট্রেনটি পৌঁছায় আলেপ্পো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। সেখানে জ্বালানি খালাসের পরই আবার নতুন যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়।

রেলচালক আহমেদ হামামি বলেন, “আমাদের কাজের পরিবেশ খুব খারাপ। দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, বেতনও খুব কম। কিন্তু আমরা মনে করি দেশের পুনর্গঠনের জন্য আমাদের কাজ জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা যখন দেখি কোনো শহরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, তখন মনে হয় আমাদের ত্যাগ সার্থক হয়েছে।”

দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষত এখনো স্পষ্ট সিরিয়াজুড়ে। তবু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু মানুষ প্রতিদিন দেশটিকে সচল রাখার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বানিয়াস থেকে আলেপ্পো পর্যন্ত এই ট্রেনযাত্রা যেন সেই সংগ্রামেরই প্রতীক।

 

১. বানিয়াস রিফাইনারিতে আলেপ্পোগামী জ্বালানিবাহী ট্যাংকার ওয়াগনে তেল ভর্তি করা হচ্ছে।
২. সিরিয়ার তারতুস অঞ্চলের রেল কর্মকর্তা নিদাল আবদুলকাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরছেন।
৩. পুরোনো সোভিয়েত লোকোমোটিভে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রেনচালক ও সহকারীরা।
৪. সাফসাফেহ এলাকায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি।
৫. আলেপ্পো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছেছে বানিয়াস থেকে আসা জ্বালানিবাহী ট্রেন।
৬. সূর্যোদয়ের সময় আলেপ্পোর পথে লোকোমোটিভের কেবিনে দায়িত্ব পালন করছেন চালক আহমেদ হামামি।

সূত্র: আল জাজিরা

ধ্বংসস্তূপ, দুর্ঘটনা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন সিরিয়ার রেলকর্মীরা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: