অধিকার পত্র ডটকম প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি
বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী Albert Einstein শুধু বিজ্ঞানের ইতিহাসেই নয়, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী হিসেবেও পরিচিত। আপেক্ষিকতার তত্ত্বের জনক এই বিজ্ঞানীকে ১৯৫২ সালে নবগঠিত Israel-এর প্রেসিডেন্ট হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট Chaim Weizmann ১৯৫২ সালে মৃত্যুবরণ করলে দেশটির নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়। বিজ্ঞানী, কূটনীতিক এবং জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতাদের একজন হিসেবে ভাইৎসম্যানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। তার মৃত্যুর পর এমন একজন ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে খুঁজছিল ইসরায়েল, যিনি বিশ্বজুড়ে ইহুদি জনগোষ্ঠীর কাছে সম্মানিত এবং রাষ্ট্রটির ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন।
সেই বিবেচনায় নজর যায় আলবার্ট আইনস্টাইনের দিকে।
কীভাবে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল?
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী David Ben-Gurion-এর সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত Abba Eban আনুষ্ঠানিকভাবে আইনস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
চিঠিতে বলা হয়, ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও ইসরায়েল ইহুদি জাতির আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাই রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আইনস্টাইনের মতো একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব দেশটির জন্য বিশেষ মর্যাদা বয়ে আনবে।
তখন আইনস্টাইনের বয়স ছিল ৭৩ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির প্রিন্সটনে বসবাস করতেন এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি চাইলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে তাকে ইসরায়েলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে।
কেন না বলেছিলেন আইনস্টাইন?
প্রস্তাব পাওয়ার পর আইনস্টাইন গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানান যে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নন।
জবাবি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ইসরায়েলের সরকারের এই প্রস্তাবে তিনি গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করতে না পারায় তার দুঃখও হচ্ছে।
আইনস্টাইন ব্যাখ্যা করেন, তিনি সারাজীবন বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক পরিচালনা কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও স্বাভাবিক দক্ষতা তার নেই।
তার মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন, তা তার মধ্যে নেই। তাই দায়িত্ব গ্রহণ করলে রাষ্ট্রের জন্যও তা উপকারী হবে না।
ইহুদিদের সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক
প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতি নিজের আবেগ ও দায়িত্ববোধের কথা গোপন করেননি আইনস্টাইন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পৃথিবীতে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর থেকেই ইহুদি জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক বন্ধনে পরিণত হয়েছিল।
জার্মানিতে নাৎসি শাসনের উত্থান এবং ইহুদিদের ওপর নিপীড়নের অভিজ্ঞতা তার চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৩৩ সালে Adolf Hitler ক্ষমতায় আসার পর আইনস্টাইন জার্মানি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং আর কখনও স্বদেশে ফিরে যাননি।
জায়নবাদ সমর্থন করলেও সব বিষয়ে একমত ছিলেন না
আইনস্টাইন জায়নবাদী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী নিপীড়নের শিকার ইহুদিদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি প্রয়োজন।
তবে তার জায়নবাদ ছিল তুলনামূলক উদারপন্থী। তিনি ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং উভয় জনগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকারকে গুরুত্ব দিতেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন যেখানে দ্বন্দ্বের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং সহনশীলতা প্রাধান্য পাবে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচক ছিলেন
আইনস্টাইন জাতীয়তাবাদের চেয়ে মানবতাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদে বেশি বিশ্বাস করতেন। এ কারণে তিনি ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক প্রবণতারও সমালোচনা করেছেন।
১৯৪৮ সালে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট ইহুদি বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়া Menachem Begin এবং তার রাজনৈতিক ধারার সমালোচনা করা হয়েছিল।
চিঠিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান জানানো হয়।
বেন-গুরিয়নের দুশ্চিন্তা
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, আইনস্টাইনের প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়ন খুব একটা হতাশ হননি।
বরং তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, স্বাধীনচেতা ও স্পষ্টভাষী আইনস্টাইন যদি প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হন, তাহলে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এমনকি তিনি ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, আইনস্টাইন যদি প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তাহলে সেটি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত কে হলেন প্রেসিডেন্ট?
আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর ১৯৫২ সালে ইতিহাসবিদ ও জায়নবাদী নেতা Yitzhak Ben-Zvi ইসরায়েলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী ঘটনা
বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম ঘটনাই আছে যেখানে একটি রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালনের জন্য একজন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আর তার চেয়েও বিরল হলো, সেই বিজ্ঞানী বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আইনস্টাইনের এই সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করতেন, খ্যাতি বা মর্যাদার চেয়ে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সুযোগ পেয়েও তিনি বিজ্ঞান, মানবতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পথেই অবিচল ছিলেন।
সুত্র :বিবিসি

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: