নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের আকাশসীমায় সামরিক ড্রোন পাঠিয়ে যুদ্ধাবস্থা তৈরি এবং দেশে সামরিক আইন জারির অজুহাত খোঁজার অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। আজ শুক্রবার (১২ জুন) সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট হাই-প্রোফাইল এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এক মুখপাত্র আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এএফপি-কে রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক আইন জারি করে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার অন্য একটি মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রসিকিউশনের অভিযোগ
আদালতের রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে পরিচালিত ওই ড্রোন অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন শুরু থেকেই সরাসরি জড়িত ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত্রুপক্ষকে সহায়তা করার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। মামলার বিশেষ প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি দেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে বিতর্কিত সামরিক আইন জারির জন্য একটি কৃত্রিম নিরাপত্তা সংকট বা 'যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি' তৈরি করতে চেয়েছিলেন ইউন। উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে সামরিক ড্রোন পাঠিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করাই ছিল তার মূল অজুহাত।
প্রসিকিউশনের মতে, এই কর্মকাণ্ডের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং কিছু ড্রোন ভূপাতিত হওয়ায় দেশের সামরিক সক্ষমতা সংক্রান্ত গোপন তথ্যও ফাঁস হয়ে যায়। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়ার পাঠানো ওই ড্রোনগুলো থেকে তাদের ভূখণ্ডে উসকানিমূলক প্রচারপত্র ছড়ানো হয়েছিল, যা দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
অভিযোগ অস্বীকার ইউনের আইনজীবীদের
কারাগারে বন্দি সাবেক রক্ষণশীল নেতা ইউন সুক-ইওল অবশ্য শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, ইউন কখনোই এই ড্রোন অভিযানের নির্দেশ দেননি কিংবা পরে অনুমোদনও দেননি। প্রসিকিউশনের অভিযোগকে অনুমানভিত্তিক ও মিথ্যা গল্প আখ্যা দিয়ে রক্ষণশীল এই নেতার আইনজীবীরা বলেন এটি সামরিক আইন জারির কোনো নীলনকশা ছিল না।
উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনবরত আবর্জনাভর্তি বেলুন পাঠানোর প্রতিক্রিয়ায় এটি ছিল একটি আত্মরক্ষামূলক ও বৈধ পদক্ষেপ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউন চাইলে এই ৩০ বছরের কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। ইতিমধ্যেই তিনি বিদ্রোহের মামলায় পাওয়া যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
রাজনৈতিক সংকট ও বর্তমান পরিস্থিতি
সাবেক শীর্ষ প্রসিকিউটর ইউন সুক-ইওলের সামরিক আইন জারির আকস্মিক সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে ফেলেছিল। দেশটির সাংবিধানিক আদালত তার অভিশংসন বহাল রাখার পর গত বছর তাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত আগাম নির্বাচনে উদারপন্থী নেতা লি জে-মিয়ং দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। চলতি বছরের শুরুতে একটি সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয় যে, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে ড্রোন পাঠিয়েছিলেন।
বিষয়টি সামনে আসার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জনসমক্ষে দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট লি-এর এই দুঃখ প্রকাশকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং বিচক্ষণ আচরণ বলে স্বাগত জানালেও, উত্তর কোরিয়া আবারও দক্ষিণ কোরিয়াকে তাদের 'সবচেয়ে বৈরী শত্রু' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিল।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: