odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 16th June 2026, ১৬th June ২০২৬
বিআরটিএর আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানার নামে ব্যাংক তথ্য হাতিয়ে নিত চক্রটিবিআরটিএর আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানার নামে ব্যাংক তথ্য হাতিয়ে নিত চক্রটি

বিআরটিএর ওয়েবসাইট ক্লোন করে ট্রাফিক মামলার নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ৩

Special Correspondent | প্রকাশিত: ১৬ June ২০২৬ ১৭:৪৫

Special Correspondent
প্রকাশিত: ১৬ June ২০২৬ ১৭:৪৫

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

অফিসের ব্যস্ততা কিংবা দিনের কর্মব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে, জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সঙ্গে দেওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি হুবহু লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও আইনি ঝামেলার ভয়, সেই সঙ্গে দ্রুত জরিমানা দিলে ৫০ শতাংশ ছাড়ের প্রলোভন! ব্যস, এই ফাঁদে পা দিয়ে মুহূর্তেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

বিআরটিএর ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া সাইট (ওয়েব ক্লোন) তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানার নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং তথ্য ও ওটিপি (OTP) হাতিয়ে নেওয়া এই চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সানা শামিনুর রহমান এসব তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও অভিযান

প্রযুক্তিগত তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের আভিযানিক দল দেশের বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—

১. মো. রাব্বি শেখ (২৪) – বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় (তাঁকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়)।

২. মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) – বাড়ি ফেনীর সদর (সোনাগাজী) এলাকায়।

৩. মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১) – ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার।

সিআইডি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তদন্তে এই চক্রটির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যেভাবে চলত প্রতারণার ফাঁদ

ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান জানান, ডিএমপির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই সুযোগটিকে কাজে লাগায় প্রতারকেরা। চক্রটি প্রথমে বিআরটিএর ওয়েবসাইটের অনুরূপ একটি ভুয়া ফিশিং লিংক ও ওয়েবসাইট তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে জানায়, তাদের গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করায় মামলা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করলে ৫০% ছাড়ের প্রলোভনও দেওয়া হতো।

এসএমএসে থাকা লিংকে প্রবেশ করলে ভুক্তভোগীরা হুবহু আসল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি পেমেন্ট পোর্টালে পৌঁছাতেন। সেখানে জরিমানা পরিশোধের নামে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের লগইন আইডি এবং ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) চাওয়া হতো। ভুক্তভোগীরা তথ্য দেওয়ার পরপরই প্রতারকেরা ওটিপি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব থেকে নিজেদের অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করে নিত।

৩ লাখ টাকা হারালেন এক ভুক্তভোগী

সংবাদ সম্মেলনে এক ভুক্তভোগীর উদাহরণ দিয়ে সিআইডি জানায়, ওই ভুক্তভোগী তাঁর মোবাইলে বিআরটিএর নামে একটি জরিমানাসংক্রান্ত এসএমএস পান। লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখেন, তাঁর অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা হয়েছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দিলে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিলেই হবে। বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, জরিমানা পরিশোধ তো দূরের কথা, উল্টো তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে এই ধরনের আরও দুটি অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নামে সিআইডি।

আসল ট্রাফিক মামলার নিয়ম কী? সতর্ক করল সিআইডি

সিআইডির এই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানান, ডিএমপির এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যেসব ট্রাফিক মামলা করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো এসএমএস পাঠানো হচ্ছে না। ডিএমপির পক্ষ থেকে ম্যানুয়ালি চালকের ঠিকানায় নোটিশ বা চিঠি পাঠানো হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে শুধু ইউসিবি ব্যাংক (UCB) ও কমিউনিটি ব্যাংকের মাধ্যমে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে। ট্রাফিক জরিমানার নামে কেউ মোবাইলে এসএমএস, ফোনকল বা অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য বা টাকা চাইলে সেটি নিশ্চিতভাবেই প্রতারণা।

এ ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ করে ব্যাংক তথ্য, কার্ড নম্বর বা ওটিপি না দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করেছে সিআইডি।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: