odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 23rd June 2026, ২৩rd June ২০২৬
চার শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্ত ঘিরে নতুন বিতর্ক—বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন।

প্রতিবাদে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বিবৃতি│‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত’—সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৩ June ২০২৬ ২০:৩৫

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ June ২০২৬ ২০:৩৫

ঢাকা, ২৩ জুন: অধিকারপত্র নিউজ ডেস্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ এ সিদ্ধান্তকে একাডেমিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, ন্যায্য বিচার, মুক্ত জ্ঞানচর্চা, বহুমতের সহাবস্থান এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে চলমান জাতীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। সংগঠনটির দাবি, এই সিদ্ধান্ত কেবল কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার ওপর একটি গুরুতর আঘাত।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম প্রদীপ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা মতাদর্শগত ভিন্নতার ভিত্তিতে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কোনো গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিনির্ভর আলোচনা, জ্ঞানচর্চা এবং বহুমতের সহাবস্থান নিশ্চিত করা উচিত। সেই পরিবেশ ক্ষুণ্ন হলে উচ্চশিক্ষার মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া চারজন শিক্ষক হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন, লোক প্রশাসন বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়া। সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন।

প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের দাবি, যথাযথ তদন্ত, স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যা স্বাধীন গবেষণা ও মুক্ত মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাব শুধু শিক্ষক সমাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, গবেষণা কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশের ওপরও। শিক্ষক সমাজের ভাষ্য, সংবিধানে স্বীকৃত চিন্তা, বিবেক ও বাক্‌-স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়লে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জ্ঞানভিত্তিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ অবিলম্বে চার শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার, বয়কট, একাডেমিক শাস্তি ও সাময়িক বরখাস্তের যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনারও দাবি জানানো হয়েছে।

সংগঠনটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা এবং ন্যায়সংগত প্রশাসনিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তারা মনে করে, মতের ভিন্নতা দমন নয়, বরং সংলাপ, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের মাধ্যমেই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব।

প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বক্তব্য: ‘এটি যেন সক্রেটিসের বিচারের পুনরাবৃত্তি

প্রতিবাদী শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গৃহীত এই সাময়িক বরখাস্তের প্রক্রিয়া ইতিহাসের সেই সক্রেটিসের বিচারের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে স্বাধীন চিন্তা ও ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাঁদের ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয় যদি প্রশ্ন করার, যুক্তি উপস্থাপনের এবং ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা হারায়, তবে তা শুধু শিক্ষকদের নয়, পুরো সমাজের জ্ঞানচর্চার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে।

শিক্ষকদের মতে, কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বচ্ছ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ এবং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। কিন্তু যদি পূর্বনির্ধারিত ধারণা বা রাজনৈতিক মতভেদের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। তাঁরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মতের ভিন্নতা কখনো শাস্তির কারণ হওয়া উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত মুক্ত বিতর্ক ও জ্ঞানচর্চার শক্তি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার বহুমত, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে নিহিত। তাই প্রশাসনের প্রতি তাঁদের আহ্বান, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হোক, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা, শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে।

প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের এক শিক্ষকের বক্তব্য

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের একজন শিক্ষক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স) বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসনের উচিত এই অধ্যাদেশের চেতনা ও বিধানকে সম্মান করা এবং তার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

তিনি আরও বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান, যেখানে শিক্ষকরা নিজস্ব একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণার অবস্থান এবং আদর্শিক বিশ্বাস নিয়ে কাজ করবেন। মতের ভিন্নতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি, দুর্বলতা নয়। যদি শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা বা নিজস্ব মতাদর্শ ধারণ করার পরিবেশ সংকুচিত হয়, তাহলে একাডেমিক স্বাধীনতা এবং জ্ঞানচর্চার মূল ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"

ওই শিক্ষক আরও মন্তব্য করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখতে আইন, অধ্যাদেশ এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। তাঁর ভাষায়, "ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং সংলাপ, যুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারে।"

ডেস্ক  প্রতিফলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিটি শিক্ষকেরও রয়েছে ন্যায্য বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার পাওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত নিশ্চয়তা।

বিশ্ববিদ্যালয় তখনই তার প্রকৃত মর্যাদা বজায় রাখতে পারে, যখন সেখানে ভিন্নমতকে দমনের পরিবর্তে যুক্তি, সংলাপ এবং স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মতবিরোধের সমাধান করা হয়। ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ যে একাডেমিক স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন এবং মুক্ত জ্ঞানচর্চার আদর্শ ধারণ করে, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে পারে। ফলে এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে প্রত্যাশা—যে কোনো সিদ্ধান্ত হবে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষার নীতির ভিত্তিতে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার ভবন বা প্রশাসনিক কাঠামোতে নয়; বরং তার স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে নিহিত।

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, নিউজ ডেস্ক

প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও ইন্টারভিউ

#ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #AcademicFreedom #একাডেমিক_স্বাধীনতা #মতপ্রকাশের_অধিকার #UniversityAutonomy #DUOrdinance1973 #উচ্চশিক্ষা #শিক্ষকসমাজ #গণতন্ত্র #FreedomOfExpression #HigherEducation #Bangladesh #অধিকারপত্র #বিশেষ_প্রতিবেদন



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: