odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 2nd July 2026, ২nd July ২০২৬
রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি ও পাওলো ফ্রেইরের কাল্পনিক বৌদ্ধিক সংলাপে উঠে আসে শিক্ষক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন, Due Process এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্বের মৌলিক প্রশ্ন।

শিক্ষক কি শুধু কর্মচারী, নাকি জাতির বৌদ্ধিক বিবেক?│শিক্ষকের স্বাধীনতা নাকি প্রতিষ্ঠানের নীরবতা? ১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে চার দার্শনিকের কাল্পনিক সংলাপ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২ July ২০২৬ ০৪:০৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২ July ২০২৬ ০৪:০৯

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক স্পেশালদ্বিতীয় দিনের মতো কল্পিত রাউন্ড টেবিল আলোচনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সাহিত্যধর্মী দার্শনিক সংলাপে চার বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ কল্পনার টেবিলে বসে আলোচনা করেন শিক্ষক স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার, Due Process, Duty of Care, সাইবার হয়রানি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এই ফিচার মূলত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর আত্মসমালোচনামূলক বৌদ্ধিক অন্বেষণ।

অধিকারপত্র স্টুডিও বিশেষ আয়োজনকাল্পনিক রাউন্ড টেবিল সংলাপ

১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষক স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সন্ধানে একটি কাল্পনিক রাউন্ড-টেবিল সংলাপ। স্টুডিওর আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মাঝখানে একটি গোল টেবিল। টেবিলের চারদিকে বসে আছেন চার ভিন্ন সময়ের চার বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাদার্শনিক—রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি এবং পাওলো ফ্রেইরে। তাঁদের সামনে রাখা আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাস, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, শিক্ষকতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ।

টেবিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন আজকের সঞ্চালক—অধ্যাপক . মাহবুব লিটু। ক্যামেরা ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। সঞ্চালক: অধ্যাপক . মাহবুব লিটু

"আসসালামু আলাইকুম। অধিকারপত্রের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাই।" "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। অধিকারপত্র স্টুডিওর পক্ষ থেকে দেশে ও দেশের বাইরে থেকে যারা আমাপদের এই আলোচনা উপভোগ করছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাচ্ছি।

আজকের এই বিশেষ গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত আছেন বিশ্ব শিক্ষা ও রাজনৈতিক দর্শনের চারজন কালজয়ী চিন্তাবিদ—রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি এবং পাওলো ফ্রেইরে। অবশ্যই এটি একটি কল্পিত বৌদ্ধিক সংলাপ, যেখানে তাঁদের সুপরিচিত দর্শন ও রচনার আলোকে আমরা আমাদের সময়ের কিছু মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে চাই।

প্রথমেই আমি আপনাদের চারজনকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের এই কাল্পনিক উপস্থিতি আমাদের দর্শক, পাঠক, শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বিরল বৌদ্ধিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।"

আপনারা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারছেন, অধিকারপত্র স্টুডিওতেই এর আগে আমাদের একটি দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল—'১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: আত্মার সন্ধানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়' শীর্ষক বিশেষ আয়োজনে। সেই আলোচনায় আপনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার দর্শন, ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের চেতনা, একাডেমিক স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র, শিক্ষক নেতৃত্ব, গবেষণা সংস্কৃতি, জ্ঞান উৎপাদন এবং ভবিষ্যতের পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছিলেন।

প্রথম দিনের গোল টেবিল আলোচনা সম্পর্কে জানতে পড়ুন: ১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: আত্মার সন্ধানে এক বিশ্ববিদ্যালয় │ চার দার্শনিকের আলোয় সংকট, স্বাধীনতা ও আগামী শতকের স্বপ্ন —রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি ও পাওলো ফ্রেইরির কল্পিত সংলাপে পুনর্পাঠ করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শন, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক নিগ্রহ, গবেষণার সংকট এবং ভবিষ্যতের পুনর্জাগরণের পথরেখা।

বিশেষ করে আপনারা আলোচনা করেছিলেন—কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি শুধু তার ভবন, বাজেট বা র‌্যাঙ্কিংয়ে নয়; বরং তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষণা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের ওপর নির্ভর করে।

সেই আলোচনার এক পর্যায়ে আপনারা আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কর্মজীবন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক, শিক্ষক শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনারা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করতে পারিনি। তবে আজকের অনুষ্ঠানের শুরুতেই আমি একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে চাই। আজকের আলোচনা কোনো ব্যক্তির আত্মপক্ষসমর্থনের জন্য নয়। এটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ঘটনার বিচারসভাও নয়। বরং আমরা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অভিজ্ঞতাকে একটি আলোচ্য কেস (illustrative case) হিসেবে ব্যবহার করে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাই।

সেই প্রশ্নগুলো হলো—

  • একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বাধীনতা কী?
  • একাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত অর্থ কী?
  • অভিযোগের মুখোমুখি হলে একজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষার্থীর অধিকার কীভাবে সমানভাবে রক্ষা করা যায়?
  • প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও Due Process-এর গুরুত্ব কতখানি?
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের Duty of Care বা তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কী?
  • এবং ডিজিটাল যুগে সাইবার হয়রানি, সামাজিক অপপ্রচার ও মানসিক নিরাপত্তার মতো নতুন বাস্তবতাগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে মোকাবিলা করবে?

আমি বিশ্বাস করি, আজকের আলোচনা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নৈতিকতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক পরিসরে রূপ নেবে। তাহলে আর দেরি না করে আমরা আজকের আলোচনা শুরু করি।

প্রথমেই আমি অধ্যাপক জন ডিউইর কাছে জানতে চাই—একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে Academic Freedom এবং Due Process-এর সম্পর্ক আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?"

এ পর্যায়ে সঞ্চালক আলোচকদের মনে করিযে দিতে বললেন,

"আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের এই আয়োজন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। এটি কোনো আত্মপক্ষসমর্থনও নয়। এটি কোনো বিচারসভাও নয়। এটি একটি বৌদ্ধিক সংলাপ—একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে, শিক্ষকতাকে এবং জ্ঞানচর্চাকে নতুন করে ভাবার একটি বিনীত প্রচেষ্টা।"

"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ ১০৫ বছরের পথ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য শিক্ষক তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা, ত্যাগ ও নেতৃত্ব দিয়ে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একটি জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র নির্মাণে অবদান রেখেছেন।"

"কিন্তু প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যেগুলোর উত্তর কখনো সম্পূর্ণ হয় না। বরং প্রতিটি নতুন প্রজন্মকে সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হয়।"

জন ডিউই:

জন ডিউই মৃদু হেসে টেবিলের ওপর রাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশটির দিকে একবার তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে উপস্থিত সবার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন— "আপনার প্রশ্নটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের দর্শন, জ্ঞানচর্চার নৈতিকতা এবং একটি সভ্য সমাজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত প্রশ্ন। Academic Freedom এবং Due Process—এই দুটি ধারণাকে অনেকেই আলাদা বিষয় মনে করেন। কিন্তু আমার কাছে তারা একই বৃক্ষের দুটি শাখা। একটিকে বাদ দিলে অন্যটিও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে না।"

তিনি কিছুক্ষণ থামলেন, "আমি বহুবার বলেছি, গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি একটি mode of associated living—অর্থাৎ একসঙ্গে বেঁচে থাকা, শেখা, মতবিনিময় করা এবং সত্য অনুসন্ধানের একটি সামাজিক সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয় সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলনক্ষেত্র। এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকেরা কোনো চূড়ান্ত সত্যের মালিক নন; তাঁরা সবাই সত্যের অনুসন্ধানী।"

"এই কারণেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে সবসময় একটি Community of Inquiry হিসেবে কল্পনা করেছি। একটি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব; মতভেদ বিভাজন নয়, বরং জ্ঞান উৎপাদনের শক্তি; আর সমালোচনা কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য নয়, বরং যুক্তিকে আরও পরিশীলিত করার জন্য।"

ডিউই এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন— "Academic Freedom-এর অর্থ কখনোই সীমাহীন স্বাধীনতা নয়। এটি এমন একটি নৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক গবেষণা করতে পারবেন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারবে, নতুন ধারণা উপস্থাপন করা যাবে এবং প্রচলিত বিশ্বাসকেও যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করা যাবে—ভয়, প্রতিশোধ কিংবা রাজনৈতিক চাপের আশঙ্কা ছাড়াই। কারণ ভীত মানুষের পক্ষে সত্যের অনুসন্ধান করা সম্ভব নয়।"

"কিন্তু এখানেই আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন আসে। যদি কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, যদি কেউ মনে করেন তাঁর আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি লঙ্ঘন করেছে, তখন কী হবে? তখনই Due Process-এর প্রয়োজন হয়।"

তিনি শান্ত কণ্ঠে বলতে থাকলেন—"Due Process মূলত ন্যায্যতার প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা। এটি কোনো আইনি কারিগরি বিষয়মাত্র নয়; এটি গণতান্ত্রিক নৈতিকতার বাস্তব রূপ। এর অর্থ হলো—কাউকে আগেভাগে দোষী ধরে নেওয়া যাবে না; অভিযোগ স্পষ্টভাবে জানাতে হবে; প্রমাণ যাচাই করতে হবে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দিতে হবে; নিরপেক্ষভাবে তথ্য মূল্যায়ন করতে হবে; এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও থাকতে হবে।"

"মনে রাখবেন, ন্যায়বিচার শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ন্যায্য পদ্ধতিতে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ কেবল ফলাফলের ওপর আস্থা রাখে না; তারা প্রক্রিয়ার ওপরও আস্থা রাখতে চায়।"

ডিউই এবার চারজনের দিকে তাকিয়ে বললেন—"এখানেই Academic Freedom এবং Due Process একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায্য প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে শিক্ষক কখনোই স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে সাহস পাবেন না। আবার যদি একাডেমিক স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে Due Process কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। স্বাধীনতা ন্যায়বিচারকে অর্থবহ করে, আর ন্যায়বিচার স্বাধীনতাকে নিরাপদ করে।"

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে ফিরে এলেন, "একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি এই নয় যে সেখানে কখনো অভিযোগ উঠবে না। বরং তার শক্তি হলো—অভিযোগ উঠলেও প্রতিষ্ঠান আবেগ, জনচাপ বা রাজনৈতিক মেরুকরণের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। সে সত্য অনুসন্ধান করবে, প্রমাণ মূল্যায়ন করবে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়ের মর্যাদা সমানভাবে রক্ষা করবে।"

সঞ্চালক:

সঞ্চালক এ পর্যায়ে মসাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন, এবং কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বললেন—"আমার কাছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার ভবন, বাজেট বা আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে নয়। তার পরিচয় নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে—সেখানে কি একজন তরুণ শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে? একজন শিক্ষক কি নির্ভয়ে গবেষণা করতে পারেন? এবং কোনো সংকট দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান কি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার প্রতি অবিচল থাকে?"

পওলো ফ্রেইরি:

 এ পর্যায়ে ফ্রেইরি: মৃদু হাসি দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন— "যে বিশ্ববিদ্যালয়ে Academic Freedom আছে কিন্তু Due Process নেই, সেখানে স্বাধীনতা অচিরেই অনিরাপদ হয়ে পড়ে। আবার যেখানে Due Process আছে কিন্তু স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ নেই, সেখানে ন্যায়বিচারও প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় এই দুইয়ের সমন্বয়েই বিকশিত হয়। কারণ জ্ঞান তখনই বিকশিত হয়, যখন স্বাধীন অনুসন্ধান এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া পরস্পরকে শক্তিশালী করে।"

তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।, তারপরে জিজ্ঞাসা করলেন,"একজন শিক্ষক আসলে কে? তিনি কি কেবল একজন সরকারি কর্মচারী? নাকি তিনি স্বাধীন জ্ঞানচর্চার একজন রক্ষক?"

তার প্রশ্ন উত্থাপন চলমান রইল, "একজন শিক্ষক কি শুধুই পাঠদান করেন, নাকি তিনি একটি জাতির বৌদ্ধিক বিবেক নির্মাণ করেন? "আর যখন কোনো শিক্ষক বিতর্ক, অভিযোগ, সামাজিক চাপ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হন—তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব কী?"

স্টুডিওতে নীরবতা নেমে আসে।

সঞ্চালক:

এবার ড. লিটু আবার বলতে শুরু করেন— 

"আজকের আলোচনায় আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেও একটি 'কেস' বা আলোচ্য উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি। তবে সেই অভিজ্ঞতার সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণ করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমরা সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলতে চাই—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, ন্যায্য প্রক্রিয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অধিকার, মানসিক নিরাপত্তা এবং একাডেমিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো কীভাবে বিবেচিত হওয়া উচিত?"
"এই আলোচনায় ব্যক্তির চেয়ে নীতি বড়। অভিজ্ঞতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায়। আর মতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তি, প্রমাণ এবং মানবিক মূল্যবোধ।"

তিনি চারজন দার্শনিকের দিকে তাকালেন।

"এই কারণেই আজ আমরা ইতিহাসের চারজন মহান চিন্তাবিদকে—কাল্পনিকভাবে হলেও—এক টেবিলে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তাঁদের প্রত্যেকের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিক্ষা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ক্ষমতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মুক্তি।"
"আজকের আলোচনা তাই কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। আজকের আলোচনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজিজ্ঞাসা। একটি জাতির জ্ঞানচর্চার আত্মসমালোচনা। এবং আগামী একশ বছরের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন—আমরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় রেখে যেতে চাই?"

তিনি মৃদু হাসলেন।"তাহলে শুরু করা যাক। প্রথমেই আমি জন ডিউইর কাছে জানতে চাই..." স্টুডিওর ক্যামেরা ধীরে ধীরে জন ডিউইর দিকে ঘুরে যায়। সংলাপ শুরু হয়।

সঞ্চালক ড. মাহবুব লিটু

"আজ আমি নিজের কথা বলার জন্য এখানে বসিনি। আমি একটি প্রশ্ন তুলতে চাই। ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বহু বছর ধরে গবেষণা করেন, নতুন কোর্স চালু করেন, শিক্ষক শিক্ষা উন্নয়নে কাজ করেন, কারিকুলাম সংস্কারে অংশ নেন, শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারপর এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে তিনি হঠাৎ সামাজিক আক্রমণের মুখে পড়লেন। সাইবার বুলিং হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার হলো। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল। ধরা যাক—তিনি মনে করছেন অভিযোগের সবগুলো সঠিক নয়। এবং তিনি মনে করছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান তাঁকে শোনার আগেই তাঁর থেকে দূরে সরে গেছে।

আসলে প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়। প্রশ্নটি হচ্ছে— একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু অভিযোগ শুনবে? নাকি অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয়ের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করবে?"

জন ডিউই, "আপনি আসলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বগত প্রশ্ন তুলেছেন। আমি কখনো বিশ্ববিদ্যালয়কে অফিস হিসেবে দেখিনি। আমি যাকে বলেছি—Community of Inquiry. সেখানে বিচার হবে অনুসন্ধানের মাধ্যমে। যদি কোনো শিক্ষক অভিযুক্ত হন—

  • প্রথম প্রশ্ন হবে—What happened?
  • দ্বিতীয় প্রশ্ন—What is the evidence?
  • তৃতীয় প্রশ্ন—Was due process followed?
  • আসলে আমার মতে, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় কখনো জনমতকে তদন্তের বিকল্প হতে দেয় না।"

পাওলো ফ্রেইরে, "আমি আরও যোগ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজের শিক্ষককে নিরাপদ অনুভব করাতে না পারে— তাহলে সে শিক্ষার্থীকেও মুক্ত শিক্ষা দিতে পারবে না। কেননা, Fear destroys dialogue. Dialogue destroys fear. — কিন্তু এ দুটি একসঙ্গে থাকতে পারে না। কেননা যেখানে শিক্ষক ভীত, সেখানে শিক্ষার্থীও স্বাধীন থাকে না।"

আন্তোনিও গ্রামশি: "আমার কাছে এটি ক্ষমতার প্রশ্ন।

  • Political power.
  • Institutional power.
  • Cultural power.

এই তিনটি যখন একই দিকে চলে যায়— তখন ব্যক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ক্ষমতার অংশ হওয়া নয়। বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র নয়। বিশ্ববিদ্যালয় জনতার আদালতও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সত্য অনুসন্ধানের প্রতিষ্ঠান।"

রোজা লুক্সেমবার্গ: "আমি সবসময় বলেছি— Freedom is always the freedom of those who think differently. এই বাক্যটি শিক্ষার্থীর জন্য যেমন সত্য, শিক্ষকের জন্যও তেমনি সত্য। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতেই পারে। একজন শিক্ষার্থীও ভুল করতে পারে। একজন প্রশাসকও ভুল করতে পারেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব হলো—কোনো পক্ষকে আগেভাগে দোষী না বানিয়ে, ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। আসলে সমস্যা হচ্ছে, গণতন্ত্রের পরীক্ষা জনপ্রিয় সময়ে হয় না। গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয় সংকটের সময়।"

. মাহবুব লিটু: "আমি আজ একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছি না। আমি একটি প্রজন্মের প্রশ্ন করছি।

  • বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক—
  • যদি সামাজিকভাবে আক্রমণের শিকার হন—
  • যদি তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং হয়—
  • যদি তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে—
  • যদি তিনি মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়েন—

তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কী করবে? শুধু নীরব থাকবে? নাকি বলবে— 'অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু আমাদের শিক্ষকও একজন মানুষ। তাঁর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায্য প্রক্রিয়ার অধিকার রয়েছে।'" এরপরে একটু থেমে গভীর একটি নিশ্বাস নিয়ে অনেকটা আবেগঘন কন্ঠে আবারো সঞ্চালক বলতে থাকলেন, "আজকের আলোচনায় আমি নিজেকে একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি আলোচ্য কেস (illustrative case) হিসেবে দেখতে চাই। কারণ একজন শিক্ষক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কী প্রশ্ন তোলে।

জন ডিউই:  "হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, মিশিগান, স্ট্যানফোর্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ— আসলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই নিখুঁত নয়। তাদেরও ভুল হয়। কিন্তু একটি বিষয় তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে—Faculty Due Process. অভিযোগ উঠলে—Investigation; Confidentiality; Representation; Appeal. এবং প্রয়োজনে

  • Counselling,
  • Legal assistance,
  • Security assessment,
  • Administrative leave

—সবই নীতিমালার মধ্যে থাকে। কারণ একজন শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানহীন করে দিলে, বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই দুর্বল হয়ে যায়।"

পাওলো ফ্রেইরে (সমাপনী): "আজকের আলোচনার বিষয় মাহবুব লিটু নন। আজকের আলোচনার বিষয়— বিশ্ববিদ্যালয় কি তার শিক্ষককে শুধু কর্মচারী হিসেবে দেখে, নাকি জ্ঞান-উৎপাদনের অংশীদার হিসেবে দেখে? কারণ একজন শিক্ষককে রক্ষা করা মানে কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়। এটি ভবিষ্যতের জ্ঞানচর্চাকে রক্ষা করা।"

আন্তোনিও গ্রামশি: (মৃদু হেসে সঞ্চালকের দিকে তাকিয়ে): “ডক্টর লিটু, আমরা আপনার সম্পর্কে কিছুটা জেনেছি। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষা গবেষণা এবং শতবর্ষ উদযাপনে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কেও কিছু শুনেছি। বিশেষ করে গবেষণা সংস্কৃতি, শিক্ষক উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন–মিশন প্রণয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে আপনার কাজ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই—” “আপনি বহুবার গবেষণার কথা বললেন, একাডেমিক স্বাধীনতার কথা বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বললেন। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়।”

“আপনি কি নিজেকে একজন শিক্ষক মনে করেন, একজন গবেষক মনে করেন, নাকি একজন প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা (Institution Builder) মনে করেন?”

তিনি একটু থামলেন। “কারণ আমি আমার Prison Notebooks-এ লিখেছিলাম, প্রতিটি সমাজের প্রয়োজন ‘Organic Intellectual’—এমন বুদ্ধিজীবী, যিনি কেবল বই লেখেন না; বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজকে রূপান্তর করার চেষ্টা করেন।”

“আমাদের জানানো হয়েছে যে আপনি শতবর্ষ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা নৈতিকতা, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গবেষণার মতো বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে আমার প্রশ্ন প্রশংসার জন্য নয়।” “আমি জানতে চাই—

  • আপনি যখন একটি নতুন ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনতে চেয়েছেন, সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ কোথা থেকে এসেছে?
  • রাজনৈতিক সংস্কৃতি?
  • আমলাতান্ত্রিক জড়তা?
  • পরিবর্তন-ভীতি?
  • নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি?”

গ্রামশি সামান্য ঝুঁকে আরও বললেন—“আরও একটি প্রশ্ন। একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার পরিচয় বড়, নাকি একজন প্রশাসনিক সংস্কারক হিসেবে? কারণ ইতিহাসে বহু মানুষ গবেষণা করেছেন, বহু মানুষ প্রশাসকও হয়েছেন। কিন্তু খুব কম মানুষ এমন আছেন, যারা প্রতিষ্ঠানকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।”

এরপরে আরো বলরেন, “আপনি যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের প্রথম একশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাহলে বলুন—পরবর্তী ২৫ বছরে কোন তিনটি কাঠামোগত সংস্কার না হলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না?”

স্টুডিও নিস্তব্ধ। চারজন দার্শনিকের চোখ এখন সঞ্চালকের দিকে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে জুম করছে।

অধ্যাপক . মাহবুব লিটু মৃদু হাসলেন। তিনি বললেন—“প্রফেসর গ্রামশি, আপনার প্রশ্নটি আমার ব্যক্তিকে নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎকে স্পর্শ করেছে। আমার উত্তরও তাই ব্যক্তিগত হবে না; হবে প্রাতিষ্ঠানিক।”

পাউলো ফ্রেইরে (মৃদু হাসলেন। তারপর গ্রামশির দিকে ফিরে বললেন): “প্রিয় আন্তোনিও, আপনি ডক্টর লিটুকে একজন Organic Intellectual হিসেবে দেখার প্রশ্ন তুলেছেন। আমার মনে হয়, তাঁর কাজের আরও একটি দিক আমাদের আলোচনায় আসা উচিত। কারণ একজন শিক্ষাবিদকে কেবল তিনি কী লিখেছেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং তিনি জ্ঞানকে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে কতটা পৌঁছে দিতে পেরেছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি ড. মাহবুব লিটুর দিকে তাকালেন। “ডক্টর লিটু, আমি আপনার কাজ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনেছি। আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে যে, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।”

ফ্রেইরে বললেন— “আমরা জেনেছি, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগে আপনি একটি ফ্ল্যাগশিপ এক্সটেনশন প্রোগ্রাম চালু করেছেন—‘Advanced Course on Disability, Autism and Inclusive Education’।এটি কেবল একটি সার্টিফিকেট কোর্স নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক দায়বদ্ধতার (University Social Responsibility) এক বাস্তব রূপ। কারণ এই কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবক, বিশেষ শিক্ষা পেশাজীবী, শিক্ষক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।” 
এরপরে একটু তেমে বরলেন, “আমার Pedagogy of the Oppressed-এ আমি লিখেছিলাম—শিক্ষা তখনই মুক্তিকামী হয়, যখন তা নিপীড়িত মানুষের জীবনকে পরিবর্তনের শক্তি দেয়। আপনার এই উদ্যোগে আমি সেই দর্শনেরই একটি ব্যবহারিক প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।”

তিনি আবার বললেন—“আমি আরও জেনেছি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন National Academy for Autism and Neurodevelopmental Disabilities (NAAND)-এর জন্য আপনি প্রশিক্ষণ কারিকুলাম, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং প্রশিক্ষণ কাঠামো প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর “এই কাঠামোর মাধ্যমে সাত দিনের Foundation Training এবং একুশ দিনের Advanced Training পরিচালিত হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা এবং অভিভাবক অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।” এবার তিনি বললেন, সত্যি বরতে কি, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে এটি কেবল একাডেমিক অবদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা নির্মাণের (Capacity Building) কাজ।”

এবার রোজা লুক্সেমবার্গ জন ডিউইয়ের দিকে তাকালেন। তারপরে বলতে শুরু করলেন, “জন, আপনার মনে আছে, আপনি বলতেন—”‘Education is not preparation for life; education is life itself.’ আসলে আমার মতে ডক্টর লিটুর কাজ আমাকে সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। কেননা  তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়াননি; বরং জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক তৈরির কাঠামো নির্মাণেও অবদান রেখেছেন।”

এবার জন ডিউই বললেন— “আমরা আরও জানতে পেরেছি যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রথমবারের মতো Pedagogy-কে একটি স্বতন্ত্র প্রশিক্ষণ মডিউল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে উন্নত Pedagogy বিষয়ক আবাসিক প্রশিক্ষণও চালু হয়।” তিনি একটু থেমে বরলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশের উচ্চশিক্ষার মান নির্ভর করে কেবল পাঠ্যক্রমের ওপর নয়; বরং শিক্ষক কীভাবে শেখান, তার ওপরও।”

এবার ফ্রেইরে জন ডিউইকে থামতে ইংগিত করলেন, ডিইউ  কিছুক্ষণের মধ্যে  থামলেই তিনি বলতে শুরু করলেন,

  • “আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।”
  • “রোহিঙ্গা সংকটের সময় কক্সবাজারে Education in Emergencies-এর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে যে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি হয়েছিল, সেটি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে প্রস্তুত হয়েছিল।”
  • “আমার জানা মতে, এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাডেমিক পর্যায়ে সরাসরি সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।”

ফ্রেইরে এবার গ্রামশির দিকে ফিরে বললেন— “আন্তোনিও, এখন আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই। আপনি জানতে চেয়েছিলেন, ডক্টর লিটু একজন শিক্ষক, গবেষক, নাকি Institution Builder? তবে আমার উত্তর হবে—” তিনি চেষ্টা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করতে।’ আর আমি এটিকে বলি, ‘Praxis’—“যেখানে তত্ত্ব কেবল বইয়ে থাকে না, যেখানে গবেষণা কেবল জার্নালে প্রকাশিত হয় না।এমনকি যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেয় না।বরং মানুষের জীবন বদলানোর জন্য নিজের জ্ঞানকে সমাজে নিয়ে যায়।”

তিনি ড. মাহবুব লিটুর দিকে তাকিয়ে বললেন—“তবে ডক্টর লিটু, আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি এতদিন প্রতিবন্ধী শিশু, তাদের পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজের জন্য কাজ করেছেন। আপনি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেছেন। আপনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন।”

এবার একটু থেমে বিস্ময় ভরা চোখে বললেন, “কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার অর্থে Inclusive University হয়ে উঠেছে?’ আপনার বিশেষ শিক্ষা বিভাগের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং নীতিগত কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলুন— আমরা কি এখনও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের “অতিথি” হিসেবে দেখি, নাকি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে শিখেছি?”

স্টুডিও আবার নীরব। গ্রামশি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। রোজা লুক্সেমবার্গ গভীর মনোযোগে ড. মাহবুব লিটুর দিকে তাকিয়ে আছেন। জন ডিউই তাঁর নোটবুক খুলেছেন।

রোজা লুক্সেমবার্গ (মৃদু হেসে ড. মাহবুব লিটুর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন):“ডক্টর লিটু, এতক্ষণ আমরা আপনার কাজ সম্পর্কে অন্যদের কাছ থেকে শুনলাম। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি—কোনো সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষকরা কতটা স্বাধীন, কতটা প্রস্তুত এবং কতটা চিন্তাশীল।”

তিণি আবারো বললেন, আপনার কাজের যে অংশটি আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হলো—আপনি কেবল শিক্ষার্থীকে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককেও শিক্ষার্থী হিসেবে দেখেছেন।”

তিনি একটু থামলেন। তারপর বললেন— “আমরা জেনেছি, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের জন্য আপনি একটি অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP)-এ আপনি উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের জন্য একটি একাডেমিক শিক্ষক-শিক্ষা (Academic Teacher Education) কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেন। আপনি এর নাম দেন—”‘Postgraduate Diploma in Higher Education Teaching (PGDipHET)

“নামটি শুনেই আমি মুগ্ধ হয়েছি।”

রোজা বললেন—“আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য বিষয়জ্ঞানকে যথেষ্ট মনে করা হয়। কিন্তু কেউ খুব ভালো পদার্থবিদ হতে পারেন, তাই বলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন দক্ষ শিক্ষক হয়ে যান না। কেউ অসাধারণ অর্থনীতিবিদ হতে পারেন, কিন্তু তিনি কীভাবে শেখাবেন, কীভাবে শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগাবেন, কীভাবে সমালোচনামূলক চিন্তার পরিবেশ তৈরি করবেন—সেটিও একটি স্বতন্ত্র দক্ষতা।”

তিনি ডিউইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—“জন, আমি কি ভুল বলছি?”

জন ডিউই মৃদু হাসলেন। “একদমই না। আমার কাছে Teaching ছিল একটি পেশা, কিন্তু একই সঙ্গে একটি বিজ্ঞান এবং একটি শিল্প।”

রোজা আবার বললেন—“ডক্টর লিটু, আপনি যখন এই ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের নাম দিলেন Postgraduate Diploma in Higher Education Teaching, তখন আসলে আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন। আপনি বলতে চেয়েছিলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জন্মগতভাবে তৈরি হন না; তাঁকেও প্রস্তুত করতে হয়। এটি শুধু একটি কোর্সের নাম নয়। এটি উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে একটি নতুন দর্শন।”

তিনি আরও বললেন— “আমি জেনেছি, এই কর্মসূচি শুধু চালুই হয়নি; বরং সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা একটি স্বতন্ত্র পেশাগত দক্ষতা—এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমার কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

রোজা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন— “ডক্টর লিটু, আমি আপনার বিভিন্ন কাজের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র দেখতে পাচ্ছি:

  • “বিশেষ শিক্ষা।”
  • “অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা।”
  • “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শিক্ষা।”
  • “শিক্ষক প্রশিক্ষণ।”
  • “গবেষণা সংস্কৃতি।”
  • “প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নীতিগত কাজ।”
  • “রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য জরুরি শিক্ষা।”

— আসলে আমি বুঝতে পারছি, আপনবার সবগুলো কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিষয়—”মানুষ।”

তিনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন—“আমি বহু আগে বলেছিলাম— ‘স্বাধীনতা সবসময়ই ভিন্নমতাবলম্বীর স্বাধীনতা।’ আজ আপনার কাজ দেখে আমার মনে হচ্ছে— শিক্ষাক্ষেত্রে এর আরেকটি রূপ হতে পারে— শিক্ষা তখনই সত্যিকার শিক্ষা, যখন সেটি সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।’”

রোজা এবার একটি কঠিন প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন—“কিন্তু আমার একটি উদ্বেগ আছে। আপনি যে ধরনের শিক্ষক-শিক্ষা কর্মসূচি, পেডাগজি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেছেন—সেটি কি ব্যক্তি-নির্ভর থাকবে? নাকি বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠবে?”

তিনি সামান্য ঝুঁকে বললেন— “ডক্টর লিটু, আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো একটি কোর্স চালু করা নয়। আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে— যদি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন, যেখানে আপনার উপস্থিতি ছাড়াও সেই ধারণাগুলো বেঁচে থাকে।”

স্টুডিও আবার নীরব। জন ডিউই ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। গ্রামশি নোটবুকে একটি শব্দ লিখলেন—“Institutional Legacy.”

পাওলো ফ্রেইরে মৃদু হেসে বললেন— “একজন শিক্ষক সফল তখনই হন, যখন তাঁর চিন্তা তাঁর নিজের চেয়ে দীর্ঘজীবী হয়।”

ক্যামেরা ধীরে ধীরে ড. মাহবুব লিটুর দিকে ঘুরে যায়। স্টুডিওর আলো স্থির।

যদিও এবার উত্তর দেওয়ার পালা সঞ্চালকের। কিন্তু রোজা লুক্সেমবার্গ সঞ্চালকের দিকে চেয়ে ফ্লোর নিয়ে বললেন, এক মিনিট! সঞ্চালক এত হেসে দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। তারপরে একটু মৃদু হেসে রোজা লুক্সেমবার্গ বললেন: “ডক্টর লিটু, আপনার জীবনবৃত্তান্ত পড়ে আমার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—আপনি পদ বা প্রশাসনিক পরিচয়ের চেয়ে ধারণা (ideas) নির্মাণে বেশি আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধিতা গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণ—এসব ক্ষেত্রে আপনার কাজ একই সুতোয় গাঁথা। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কীভাবে সমাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেতুবন্ধন গড়তে পারেন, তার একটি বাস্তব উদাহরণ আপনার কর্মজীবন।”

জন ডিউই যোগ করলেন: “আমি আপনার জীবনবৃত্তান্তে দেখলাম, আপনি শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি; বরং নতুন একাডেমিক প্রোগ্রাম, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ মডেল এবং কারিকুলাম উন্নয়নের কাজও করেছেন। এটাই একজন প্রকৃত শিক্ষাবিদের পরিচয়। একজন অধ্যাপক শুধু জ্ঞান উৎপাদন করেন না, তিনি শেখার নতুন পদ্ধতিও সৃষ্টি করেন।”

গ্রামশি বললেন:“আপনার CV-তে আমি একটি ধারাবাহিকতা দেখেছি। আপনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি; বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। এটিই আমি বলি—institutional leadership through intellectual work।”

পাওলো ফ্রেইরে মৃদু হেসে বললেন:

“ডক্টর লিটু, আপনার জীবনবৃত্তান্তে সবচেয়ে যে বিষয়টি আমাকে স্পর্শ করেছে, তা হলো—আপনার গবেষণার বড় অংশই শ্রেণিকক্ষের বাইরের মানুষের জন্য। শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিবন্ধী শিশু, রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক—আপনি জ্ঞানকে কেবল বইয়ের মধ্যে রাখেননি; মানুষের জীবনে নিয়ে গেছেন। এটাই ‘Praxis’—চিন্তা ও কর্মের ঐক্য।”

রোজা লুক্সেমবার্গ: "আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি"

রোজা লুক্সেমবার্গ কিছুক্ষণ ড. লিটুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—"ড. লিটু, আমি আপনার কাজের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে গভীরভাবে দেখি, তা হলো—আপনি জ্ঞানকে কখনোই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আপনার গবেষণা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য, আপনার শিক্ষক শিক্ষা কর্মসূচি শিক্ষকদের জন্য, আপনার কারিকুলাম উন্নয়নের কাজ সমগ্র দেশের জন্য।"

"আপনি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কথা বলেন, সেটি কেবল একটি শিক্ষাদর্শ নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একজন শিশুকে শিক্ষার অধিকার দেওয়া মানে কেবল তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা নয়; বরং তাকে মর্যাদা দেওয়া। আপনার গবেষণা ও নীতিগত কাজ সেই মর্যাদার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছে।" এরপরে বললেন, "যে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত গণবিশ্ববিদ্যালয়। আপনার কাজ আমাকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নই মনে করিয়ে দেয়।"

জন ডিউই: "আপনি শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষক তৈরির শিক্ষক" এরপরে জন ডিউই মৃদু হাসলেন। "আমি সারাজীবন বলেছি—শিক্ষার গুণগত মান নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। কিন্তু একজন শিক্ষককে কে তৈরি করবে?" এরপরে আবার বললেন, "আপনার কাজের দিকে তাকালে দেখি, আপনি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। আপনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (CPD), Outcome-Based Curriculum, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উন্নয়ন, Teaching Evaluation, শিক্ষকতার মানোন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে যে কাজ করেছেন, তা একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; একটি জাতির শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণের কাজ।"

"বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য একাডেমিক শিক্ষক শিক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষক মূল্যায়ন কাঠামো এবং শিক্ষক উন্নয়ন নীতিমালা তৈরিতে আপনার অংশগ্রহণ আমাকে আনন্দিত করেছে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার ভবন নয়; তার শিক্ষক। আর একজন শিক্ষককে উন্নত করা মানে হাজারো শিক্ষার্থীকে উন্নত করা।"

আন্তোনিও গ্রামশি: "আপনি একজন অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল" গ্রামশি চেয়ারে সামান্য এগিয়ে এসে বললেন—"আমার ভাষায় একজন 'Organic Intellectual' কেবল বই লেখেন না; তিনি সমাজের জ্ঞান-ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের জন্য কাজ করেন। আপনার সিভিতে আমি দেখলাম—আপনি শিক্ষক, গবেষক, কারিকুলাম প্রণেতা, নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য, গবেষণা প্রকল্পের প্রধান, আন্তর্জাতিক সহযোগী, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সংস্কারক—একসঙ্গে অনেক ভূমিকা পালন করেছেন।"

"জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম সংস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উন্নয়ন নীতিমালা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে Outcome-Based Education নিয়ে গবেষণা, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, UNESCO, UNHCR, UGC, NAEM, শিক্ষা মন্ত্রণালয়—এসব জায়গায় কাজ করা মানে কেবল গবেষণা করা নয়; বরং জ্ঞানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক কাঠামো নির্মাণ করা। — আর এটাই একজন অর্গানিক বুদ্ধিজীবীর পরিচয়।"

পাওলো ফ্রেইরে: "আপনি শিক্ষা দিয়েছেন মুক্তির ভাষায়" পাওলো ফ্রেইরে গভীর আবেগ নিয়ে বললেন—"আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, শিক্ষা মানুষের মুক্তির জন্য। আপনার কাজেও আমি সেই দর্শনের প্রতিফলন দেখি।" এরপরে তিনি বলতে লাগলেন, "আপনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উন্নত কোর্স চালু করেছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে বই সম্পাদনা করেছেন, শিক্ষক শিক্ষা কর্মসূচি তৈরি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন হায়ার এডুকেশন টিচিং (PGDHET) কর্মসূচির নকশা তৈরি করেছেন, শিক্ষক উন্নয়ন ম্যানুয়াল লিখেছেন, জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কাঠামো নির্মাণ করেছেন।"

"এগুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো এমন মানুষের হাতে জ্ঞান তুলে দেওয়ার কাজ, যারা পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তুলবেন। একজন শিক্ষককে বদলে দেওয়া মানে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া। আমি বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছি এই কারণে যে, আপনি শিক্ষা, প্রতিবন্ধিতা, প্রযুক্তি, মানবাধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে একই দর্শনের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। এটিই মুক্তিকামী শিক্ষার প্রকৃত রূপ।"

রোজা লুক্সেমবার্গ: “ড. লিটু, আপনি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নন; আপনি শিক্ষা-ব্যবস্থায় সামাজিক ন্যায়বিচারের একজন স্থপতি। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আপনার দীর্ঘ গবেষণা, জাতীয় কারিকুলাম সংস্কারে আপনার অংশগ্রহণ, এবং শিক্ষা যেন সবার অধিকার হয়—এই সংগ্রাম আমার ‘Freedom for the different’ দর্শনেরই এক বাস্তব প্রতিফলন।”

জন ডিউই: “আমি সবসময় বলেছি, শিক্ষা হলো জীবনের প্রস্তুতি নয়—শিক্ষাই জীবন। আপনার কর্মজীবনে আমি সেই দর্শনের প্রতিফলন দেখি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, Outcome-Based Curriculum, Teaching Evaluation, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উন্নয়ন, এবং বাংলাদেশে শিক্ষকতার মানোন্নয়নের জন্য আপনি যে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিয়েছেন, তা শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছে।”

আন্তোনিও গ্রামশি: “একটি সমাজ পরিবর্তন করতে চাইলে ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ তৈরি করতে হয়। আপনি কেবল গবেষণাপত্র লেখেননি; রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম, নীতি প্রণয়ন এবং জ্ঞান উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন শিক্ষাবিদ সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিতে পারেন। এটাই প্রকৃত সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব।”

পাওলো ফ্রেইরে: “শিক্ষা যদি মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হয়, তবে শিক্ষককে হতে হবে পরিবর্তনের সহযাত্রী। আপনি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শিক্ষক শিক্ষা ডিপ্লোমা—Post Graduate Diploma in Higher Education Teaching (PGDHET)—নকশা ও চালু করার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, শিক্ষক তৈরি করাও একটি মুক্তিকামী রাজনৈতিক ও মানবিক কাজ। আপনি শিক্ষকদের শুধু পাঠদান নয়, সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাদর্শের পথে আহ্বান জানিয়েছেন।” 

চার দার্শনিকের সম্মিলিত বক্তব্য

  • রোজা লুক্সেমবার্গ: “তিনি ন্যায়বিচারের ভাষায় শিক্ষা পড়েছেন।”
  • জন ডিউই: “তিনি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা বদলাতে চেয়েছেন।”
  • আন্তোনিও গ্রামশি: “তিনি জ্ঞানকে ক্ষমতার পরিবর্তে জনগণের সম্পদে পরিণত করতে কাজ করেছেন।”
  • পাওলো ফ্রেইরে: “তিনি শিক্ষককে কেবল বক্তা নয়, পরিবর্তনের সহযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন।”

চার দার্শনিকের সম্মিলিত মূল্যায়ন

এরপর চারজন একে অপরের দিকে তাকালেন।

  • রোজা লুক্সেমবার্গ বললেন:"তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।"
  • জন ডিউই বললেন:"তিনি শিখিয়েছেন, একজন ভালো বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে আগে ভালো শিক্ষক গড়তে হয়।"
  • আন্তোনিও গ্রামশি বললেন:"তিনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন শুধু; তিনি নীতি, কারিকুলাম এবং প্রতিষ্ঠানেরও শিক্ষক।"
  • পাওলো ফ্রেইরে বললেন: "তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের মর্যাদা ও মুক্তিকে শক্তিশালী করে।

এবার জন ডিউই হালকা হাসি দিয়ে ড. লিটুর দিকে তাকিয়ে): "ড. লিটু, আপনার জীবনবৃত্তান্ত পড়তে পড়তে আমি একটি বিষয় বারবার লক্ষ্য করেছি। আপনি কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেননি; আপনি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। আর আমি তো সারাজীবন এ কথাই বলেছি—শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা ঘটে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।"

এরপরে একটু বিরতি দিয়ে আবারো বরতে লাগলেন, "আপনি ছাত্রজীবনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ. এফ. রহমান হল ডিবেটিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ সেই সংগঠন জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত। একটি বিতর্ক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা মানে শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন করা নয়; বরং যুক্তিবাদী নাগরিক তৈরির বীজ বপন করা। আমি এটিকে শিক্ষারই সম্প্রসারিত রূপ বলব।"

এরপরে জোরের সহিত বললেন, "পরে একজন শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আপনাকে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মডারেটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উইমেন্স সোসাইটি, ড্যান্স সোসাইটি এবং অন্যান্য সহশিক্ষা সংগঠনের শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে আপনি নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করেছেন। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের মঞ্চে দাঁড়াতে শেখান, তখন তিনি কেবল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন না; তিনি আত্মবিশ্বাসী মানুষ গড়ে তোলেন।"

পাওলো ফ্রেইরে: "আমি আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। আপনি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহশিক্ষা কার্যক্রম কমিটির সদস্য হিসেবে শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেননি। আপনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরে নিয়ে গেছেন, দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, নবীনবরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা—এসবকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন।" তিনি আরো যোগ করেন, "আমি একে বলি 'মানুষকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে শিক্ষা দেওয়া'। কারণ শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার নম্বরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে মানুষ পূর্ণতা লাভ করে না।"

রোজা লুক্সেমবার্গ: "কিন্তু যে ঘটনাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, তা হলো কোভিড-১৯ মহামারির সময় আপনার ভূমিকা। যখন বহু শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, তখন আপনি কেবল সহানুভূতি প্রকাশ করেননি; নিজ উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছিলেন।" তিনি আরো বলেন, "একজন শিক্ষক তখনই প্রকৃত শিক্ষক হয়ে ওঠেন, যখন তিনি শিক্ষার্থীর নম্বরের আগে তার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রশ্নটি দেখেন। সামাজিক ন্যায়বিচার শুরু হয় এমন ছোট ছোট মানবিক কাজ থেকেই।"

আন্তোনিও গ্রামশি: "আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। আপনি সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি এবং ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেছেন।" এরপরে বলেন, "একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক যদি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে তিনি জ্ঞান বিতরণ করেন। কিন্তু যখন তিনি শিক্ষার্থীদের সমাজ পরিবর্তনের কাজে সম্পৃক্ত করেন, তখন তিনি অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল তৈরি করেন।"

জন ডিউই (আবার কথা বলেন): "আমি আরও জানতে পেরেছি, আপনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চাকরিপ্রত্যাশী গ্র্যাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। আপনি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের শুধু পরামর্শ দেননি; তাঁদের অধিকার, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদার জন্যও পাশে থেকেছেন।" এরপরে মতামত দেন, "এটাই প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সফল হয়, যখন তার জ্ঞান সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটির জীবনেও আলো পৌঁছে দেয়।"

পাওলো ফ্রেইরে: "আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—আপনি শিক্ষার্থীদের কেবল 'স্টুডেন্ট' হিসেবে দেখেননি। আপনি তাঁদের স্বপ্ন, সংকট, সম্ভাবনা এবং মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কখনও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন, কখনও পড়াশোনায়, কখনও গবেষণায়, কখনও ব্যক্তিগত সংকটে।" এবং "আমি সবসময় বলেছি—'শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে শেখেন।' আপনার কাজের মধ্যে আমি সেই সম্পর্কেরই প্রতিফলন দেখি।"

চার দার্শনিকের সম্মিলিত মন্তব্য

  • জন ডিউই:"তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পড়াননি; শেখার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।"
  • রোজা লুক্সেমবার্গ:"তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছেন।"
  • আন্তোনিও গ্রামশি:"তিনি সহশিক্ষা কার্যক্রমকে নেতৃত্ব তৈরির রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ে রূপ দিয়েছেন।"
  • পাওলো ফ্রেইরে:"তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবিকতা। শিক্ষা তখনই মুক্তিকামী হয়, যখন শিক্ষক শিক্ষার্থীর পাশে মানুষ হিসেবে দাঁড়ান।"

. মাহবুব লিটু (কিছুক্ষণ নীরব থেকে, গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন)

ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। চার দার্শনিক তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। ড. লিটু ধীরে ধীরে চোখ তুলে প্রথমে পাওলো ফ্রেইরের দিকে, তারপর একে একে জন ডিউই, রোজা লুক্সেমবার্গ এবং আন্তোনিও গ্রামশির দিকে তাকালেন।

কিছুক্ষণ পর ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন—"প্রফেসর ফ্রেইরে, আসলে এখানেই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময় শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছি। শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকেও তাদের জন্য সময় দিয়েছি, সহশিক্ষা কার্যক্রমে পাশে থেকেছি, আর্থিক সংকটে সহযোগিতা করেছি, গবেষণায় উৎসাহ দিয়েছি, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু একসময় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে আমার সম্পর্কে এমন সব অভিযোগ উত্থাপিত হলো, যা আমি আমার জীবন ও কর্মের সঙ্গে কখনোই মিলিয়ে দেখতে পারিনি।"

এরপরে নিজের উপলব্দি সম্পর্কে বলতে লাগলেন, "আমার অনুভূতি ছিল—রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে আমার আচরণ ও উদ্দেশ্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে যে শাসন, যে একাডেমিক শৃঙ্খলা বা পরীক্ষার সততা রক্ষার চেষ্টা করেছি, সেগুলোর কিছু ঘটনাকেও পরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। একজন শিক্ষক কখনও কখনও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই কঠোর হন। কিন্তু সেই কঠোরতা যদি প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিচার করা হয়, তাহলে সেটি অন্য অর্থ ধারণ করতে পারে।"

তিনি কিছুক্ষণ থামলেন। "এর চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছি যখন আমার চরিত্র, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ নিয়েও নানা ধরনের অপপ্রচার শুনেছি। আমি একটি ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছি। তাই আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন অভিযোগও যখন শুনেছি, তখন একজন মানুষ হিসেবে গভীরভাবে আহত হয়েছি। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই যখন একজন মানুষের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন সেই ক্ষত সহজে শুকায় না।" 

"আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমি আমার প্রতিষ্ঠান থেকে যে নৈতিক সমর্থন প্রত্যাশা করেছিলাম, তা সবসময় অনুভব করতে পারিনি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে মানসিকভাবে খুব কষ্ট দিয়েছে। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করেছিভালো কিছু করার চেষ্টা কি কখনও কখনও মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়?"

তিনি মৃদু হেসে আবার বললেন—"তারপরও আমি কলম ছাড়িনি, শ্রেণিকক্ষ ছাড়িনি, গবেষণা ছাড়িনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষককে শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজ দিয়েই বিচার করা উচিত। ইতিহাস যদি কখনও বিচার করে, আমি চাই সে আমার কাজ দেখুক, গুজব নয়; আমার শিক্ষার্থীদের দেখুক, অপপ্রচার নয়; আমার গবেষণা দেখুক, ক্ষণিকের বিতর্ক নয়।"

চারদিকে আবার নীরবতা নেমে এল। এবার প্রথম কথা বললেন পাওলো ফ্রেইরে। তাঁর চোখে ছিল গভীর সহমর্মিতা।

নিচের সংলাপটি সম্পূর্ণ সাহিত্যিক কাল্পনিক। এখানে চার দার্শনিক ড. মাহবুব লিটুর বর্ণিত অভিজ্ঞতার সত্যতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না; বরং একজন শিক্ষকের মর্যাদা, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষকের জবাবদিহিতা, ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া এবং শিক্ষাদর্শের আলোকে নীতিগত আলোচনা করছেন।

গভীর নীরবতা ভেঙে পাওলো ফ্রেইরে ধীরে ধীরে বললেন, "মাহবুব, তোমার কষ্টের কথা শুনে আমি প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। কোনো শিক্ষকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। যদি কোনো শিক্ষার্থী কষ্ট পায়, অভিযোগ করে বা নিজেকে অবিচারগ্রস্ত মনে করে, তবে সেই অভিযোগ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে, ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শোনা উচিত। কারণ শিক্ষা কখনোই ক্ষমতার একমুখী প্রয়োগ হতে পারে না।"

তিনি একটু থামলেন। "কিন্তু একই সঙ্গে আমি এটাও বলব—অভিযোগ আর রায় এক জিনিস নয়। অভিযোগের অস্তিত্বই কাউকে দোষী প্রমাণ করে না। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করে, তবে সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়েরই মর্যাদা, বক্তব্য এবং অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।"

জন ডিউই ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। "আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে সবসময় একটি 'Community of Inquiry' বলেছি—অনুসন্ধানী মানুষের সম্প্রদায়। সেখানে সত্য খোঁজা হয়, পক্ষ বেছে নেওয়া নয়।" এরপরে আবারো বললেন, "একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন, পরীক্ষার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, একাডেমিক মান রক্ষা করতে পারেন। আবার একজন শিক্ষার্থীও শিক্ষকের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হলো—প্রক্রিয়াটি কি ন্যায্য ছিল? সিদ্ধান্ত কি প্রমাণ, সাক্ষ্য, সংলাপ এবং যুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে?"

তিনি ড. লিটুর দিকে তাকালেন। "যদি কোনো শিক্ষক অনুভব করেন যে তাঁর বহু বছরের অবদান বিবেচনায় না এনে তাঁকে কেবল একটি ঘটনার আলোকে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তাহলে সেটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়। একইভাবে, যদি কোনো শিক্ষার্থীর অভিযোগ থাকে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিচার হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি এখানেই—সে কোনো পক্ষকে আগেভাগে নায়ক বা খলনায়ক বানায় না।"

আন্তোনিও গ্রামশি এবার টেবিলের ওপর আঙুল রেখে ধীরস্বরে বললেন—

প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সিদ্ধান্ত ব্যক্তি-আবেগের নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়ের ওপর দাঁড়ায়। আমি ক্ষমতার ভাষা নিয়ে লিখেছি। ক্ষমতা কখনো রাষ্ট্রের হাতে থাকে, কখনো জনমতের হাতে, কখনো প্রতিষ্ঠানের হাতে। এই তিনটির ভারসাম্য নষ্ট হলে বিচারও প্রভাবিত হতে পারে। তাই একজন শিক্ষক বা একজন শিক্ষার্থী—কারও ক্ষেত্রেই জনমতকে বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে দেওয়া উচিত নয়।...একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অভিযোগ তদন্ত হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে, এবং সিদ্ধান্ত হবে তথ্যের ভিত্তিতে। কারণ ন্যায়বিচার শুধু হতে হবে না; ন্যায়বিচার হয়েছে—এ বিশ্বাসও সবার মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে।

রোজা লুক্সেমবার্গ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন— "আমি স্বাধীনতার কথা বলেছি। কিন্তু স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। ...একজন শিক্ষকের একাডেমিক স্বাধীনতা যেমন সুরক্ষিত হতে হবে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীর নিরাপদে কথা বলার অধিকারও নিশ্চিত হতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ।"..."যদি কোনো শিক্ষক মনে করেন, তাঁর অবদান উপেক্ষিত হয়েছে—তাঁর কথা শোনা উচিত। যদি কোনো শিক্ষার্থী মনে করেন, তিনি অন্যায়ের শিকার—তাঁর কথাও শোনা উচিত। সত্যের প্রতি আনুগত্য মানে কোনো পক্ষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়।"
পাওলো ফ্রেইরে . লিটুর দিকে তাকিয়ে বললেন,  "তুমি একটি প্রশ্ন করেছিলে—'ভালো কিছু করা কি খুবই খারাপ?' আমি সেই প্রশ্নের উত্তর অন্যভাবে দেব।" এরপরে আবারো বলথে থাকলেন, "ভালো কাজ করার অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ কখনো ভুল করবেন না, কিংবা তাঁকে কখনো সমালোচনার মুখে পড়তে হবে না। আবার সমালোচিত হওয়ার অর্থও এই নয় যে তাঁর সমস্ত অবদান মূল্যহীন হয়ে গেল। একজন শিক্ষকের জীবন সবসময়ই আত্মসমালোচনা, সংলাপ এবং শেখার জীবন।..."তোমার কাজ যদি সত্যিই মানুষের জীবন বদলে থাকে, তাহলে সেই কাজের মূল্য ইতিহাস দেবে। আর যদি কোথাও ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভুল থেকেও শিক্ষা নেওয়া একজন শিক্ষকেরই পরিচয়।"

জন ডিউই (সমাপনী মন্তব্য): "একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই মহান হয়, যখন সে একই সঙ্গে তিনটি কাজ করতে পারে—শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। এই তিনটির একটিও হারিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে; জ্ঞানের সম্প্রদায় হয়ে উঠতে পারে না।"

ড. মাহবুব লিটু নীরবে শুনছিলেন। তাঁর চোখে তখন আর কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়—বরং একজন শিক্ষকের দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, আত্মসমালোচনা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের প্রতিফলন ফুটে উঠছিল। কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। মনে হলো, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভার আর টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন না। তিনি গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খেলেন। তারপর মৃদু হাসলেন।

. মাহবুব লিটু:

"আসুন, আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আর কথা না বলি। ব্যক্তি আসবে, ব্যক্তি চলে যাবে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, শিক্ষকতা থাকবে, শিক্ষার্থীরা থাকবে। আমি বরং এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, যা আমার একার নয়বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষকের বাস্তবতা।"

"একজন শিক্ষকের জীবন বাইরে থেকে যতটা সম্মানজনক মনে হয়, ভেতর থেকে ততটাই কঠিন। বিশেষ করে বাংলাদেশে শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপপূর্ণ একটি দায়িত্ব। একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠদান, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, কারিকুলাম উন্নয়ন, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, সমাজসেবাঅসংখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। অথচ অনেক সময় তাঁর সৃজনশীল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক শান্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত হয় না।"

"তারপরও প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষক নতুন করে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের সামনে বসে আছে আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। একজন ভালো শিক্ষক নিজের জন্য কাজ করেন না; তিনি এমন মানুষের জন্য কাজ করেন, যাদের সাফল্যের ভেতরেই তাঁর নিজের সার্থকতা নিহিত থাকে।" কথা শেষ হতেই টেবিলে আবার নীরবতা নেমে এল।

জন ডিউই

"এই কারণেই আমি সবসময় বলেছি, শিক্ষা কেবল শিক্ষার্থীর বিষয় নয়; শিক্ষকেরও বিষয়। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকের পেশাগত বিকাশ, মর্যাদা এবং কাজের পরিবেশে বিনিয়োগ করে না, সে রাষ্ট্র শিক্ষার ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে। একজন শিক্ষককে শুধু দায়িত্ব দেওয়া যথেষ্ট নয়; তাঁকে সেই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও দিতে হয়।"

পাওলো ফ্রেইরে

"আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলব—একজন শিক্ষক যদি নিজেই ভয়, অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখাবেন কীভাবে? শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা মানে শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করা। কারণ শিক্ষা কখনোই কেবল পাঠ্যবই নয়; এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি মানবিক সম্পর্ক।"

আন্তোনিও গ্রামশি

"একটি জাতির সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সেই নেতৃত্বের কারিগর হচ্ছেন শিক্ষকরা। যদি সমাজ তাদের কেবল কর্মচারী হিসেবে দেখে, তবে সমাজ নিজেই তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। শিক্ষককে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারবেন, নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারবেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সমালোচনামূলক চিন্তার শিক্ষা দিতে পারবেন।"

রোজা লুক্সেমবার্গ

"একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মান নির্ধারণ করা যায়, সে তার শিক্ষক ও জ্ঞানচর্চাকে কতটা সম্মান করে তা দিয়ে। শিক্ষক যদি মর্যাদা হারান, তবে ধীরে ধীরে জ্ঞানও মর্যাদা হারায়। আর যে সমাজ জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে।"

ড. মাহবুব লিটু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হাসলেন। সেই হাসির ভেতরে যেন গভীর ক্লান্তি।

. মাহবুব লিটু:

"প্রফেসর ডিউই, প্রফেসর ফ্রেইরে, আমি সবসময় বিশ্বাস করেছিএকজন শিক্ষক কখনোই তাঁর শিক্ষার্থীর প্রতিপক্ষ হতে পারেন না। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়; দায়িত্বের।...দ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই অস্থির সময়ে আমি এমন একটি অবস্থানে ছিলাম, যা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রভোস্টিয়াল (Provostial) দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। একদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, অন্যদিকে আমার নিজের শিক্ষার্থীরাএই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রতিদিন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছি।"

এরপরে আবারো বলতে লাগলেন, "আমার নিজের স্মৃতিতে আছে, আমি অনেক শিক্ষার্থীর খোঁজ নিতে গিয়েছি, আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়েছি, উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছি, প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, আটক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করেছি এবং যেখানেই পেরেছি মানবিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে তখন একজন শিক্ষার্থী প্রথমে শিক্ষার্থীতারপর অন্য কোনো পরিচয়।"

তিনি কিছুক্ষণ থামলেন, "কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন শুনলাম, আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে যে আমি নাকি জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম, তখন সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। কারণ আমার নিজের উপলব্ধি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি মনে করতাম, আমি পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও যতটা সম্ভব মানবিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি।"

"আমি বুঝি, সংকটের সময় মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। কেউ হয়তো ঘটনাকে একভাবে দেখেছেন, কেউ অন্যভাবে। তাই আমি আমার অভিজ্ঞতার কথাই বলতে পারি। আমি চাই, ইতিহাস যদি কখনো এই সময়কে মূল্যায়ন করে, তবে তা হোক দলিল, সাক্ষ্য, বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা এবং ন্যায়সঙ্গত অনুসন্ধানের ভিত্তিতেশুধু আবেগ বা গুজবের ভিত্তিতে নয়।...আজও যদি কোনো শিক্ষার্থী আমার কাছে আসে, আমি তাকে ফিরিয়ে দেব না। কারণ আমার কাছে শিক্ষকতার শপথ কোনো রাজনৈতিক সময়ের চেয়ে বড়"

পাওলো ফ্রেইরে

ফ্রেইরে গভীর মনোযোগে শুনলেন। "একজন শিক্ষক যখন সংঘাতের সময়ে পড়েন, তখন তাঁর সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হয়—কীভাবে তিনি একই সঙ্গে তাঁর নৈতিক দায়িত্ব, শিক্ষার্থীর কল্যাণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করবেন। এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।"..."কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—এমন সময়ে কোনো ব্যক্তির ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হলে তা হওয়া উচিত প্রমাণ, সাক্ষ্য, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। একজন শিক্ষকের নিজের অভিজ্ঞতা যেমন শোনা উচিত, তেমনি শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও শোনা উচিত। শিক্ষা আমাদের শেখায়—সংলাপ সত্যকে আরও স্পষ্ট করে, আর পূর্বধারণা সত্যকে আড়াল করে।" ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। আলোচনাটি এবার ব্যক্তিগত অভিযোগের সীমা ছাড়িয়ে একাডেমিক নৈতিকতা, শিক্ষকতার দায়িত্ব এবং ইতিহাসের ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়নের প্রশ্নে পৌঁছে গেল।

অধিকারপত্রের সঞ্চালক

সঞ্চালক চার দার্শনিকের কথাগুলো একসূত্রে গেঁথে বললেন— "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে অসংখ্য শিক্ষক জ্ঞান বিতরণ করেছেন। কিন্তু কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁরা শুধু পাঠদান করেন না; তাঁরা শিক্ষা-ব্যবস্থার ভিত নির্মাণ করেন। ড. মাহবুব লিটুর কর্মজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষক শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়ন, জাতীয় কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষা নীতি, শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় তাঁর সম্পৃক্ততা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক করার দীর্ঘ এক যাত্রার অংশ। একজন ব্যক্তির সাফল্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তখন তাঁর নির্মিত প্রতিষ্ঠান, তাঁর গড়ে তোলা শিক্ষক, তাঁর অনুপ্রাণিত শিক্ষার্থী এবং তাঁর রেখে যাওয়া বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার।"

এরপর সঞ্চালক  ড. লিটু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর পাওলো ফ্রেইরের দিকে তাকিয়ে বললেন—"প্রফেসর ফ্রেইরে, আমি একটি বিষয় জানতে চাই। ব্যক্তিগত ঘটনা বাদই দিলাম। আমি বরং একটি নীতিগত প্রশ্ন করতে চাই।"..."বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষক যদি কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েন, যদি তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং হয়, অপপ্রচার হয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, কিংবা তিনি সামাজিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন—তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী করে?"

তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।, "আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল, আমি সেই সময়ে যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাইনি। আমি মনে করেছি, আমার নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা কিংবা পেশাগত মর্যাদা রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারত। এই অনুভূতি ঠিক না ভুল—সেটি ইতিহাস বিচার করবে। কিন্তু আমি জানতে চাই, বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী ধরনের নীতি অনুসরণ করা হয়?"

পাওলো ফ্রেইরে

ফ্রেইরে শান্তভাবে উত্তর দিলেন। "প্রথম কথা, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শিক্ষককে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে না। কিন্তু একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষককে জনতার বিচারের হাতেও ছেড়ে দেয় না।"..."ব্রাজিল, পর্তুগাল, কানাডা কিংবা ইউরোপের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনো শিক্ষক জনসমালোচনার মুখে পড়েন, বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণত তিনটি কাজ করে—

  • ১. নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
  • ২. অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে।
  • ৩. তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষককে আগেভাগে দোষী হিসেবে ঘোষণা করে না।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয় জানে, একজন শিক্ষকের মর্যাদা নষ্ট করা খুব সহজ; কিন্তু সেই মর্যাদা পুনর্গঠন করতে অনেক বছর লেগে যায়।"

জন ডিউই

ডিউই বললেন—"যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে Faculty Handbook-এ স্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি Duty of Care রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষক যদি হয়রানি, সাইবার আক্রমণ, হুমকি বা জনচাপের মুখে পড়েন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো তাঁর নিরাপত্তা, আইনগত অধিকার এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।"..."Academic Freedom কেবল শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনভাবে পড়ানোর অধিকার নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি, যেখানে শিক্ষক ভয় ছাড়াই গবেষণা করতে, মত প্রকাশ করতে এবং শিক্ষা দিতে পারবেন।"

আন্তোনিও গ্রামশি

গ্রামশি বললেন—"আমি এটিকে সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রশ্ন হিসেবে দেখি। আসলে যে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষককে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যাগ করে, সেখানে ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়ে।"..."একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তি-নির্ভর নয়; নীতিনির্ভর। প্রশাসন পরিবর্তিত হতে পারে, সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচারের নীতি পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়।"

রোজা লুক্সেমবার্গ

রোজা ধীর কণ্ঠে বললেন—"গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সংকটের সময় হয়।...যখন একজন শিক্ষক জনপ্রিয়, তখন তাকে রক্ষা করা সহজ। কিন্তু যখন তিনি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন, তখনও যদি প্রতিষ্ঠান তাঁর ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে—সেখানেই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।...আমি কখনো বলব না যে কোনো শিক্ষক অভিযোগের ঊর্ধ্বে। কিন্তু আমি এটাও বলব, কোনো শিক্ষক যেন অভিযোগ ওঠার মুহূর্তেই বিচারহীনভাবে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দণ্ডিত না হন।"

পাওলো ফ্রেইরে (সমাপনী মন্তব্য)

"মাহবুব, তুমি যে প্রশ্ন করেছ, সেটি তোমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়। এটি পৃথিবীর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন।..."একজন শিক্ষক যদি সত্যিই ভুল করেন, তবে ন্যায্য তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনে জবাবদিহি করবেন। কিন্তু যদি তিনি নির্দোষ হন, তবে প্রতিষ্ঠানকে তাঁর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যও সমান আন্তরিক হতে হবে।...একটি মহান বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সত্য অনুসন্ধান করে না; যারা সেই সত্য অনুসন্ধানের কাজ করেন, তাদের জন্যও একটি নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।"

অধিকারপত্রের সঞ্চালক

"চার দার্শনিকের আলোচনার সারমর্ম একটিই—বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শক্তি কেবল গবেষণাগার, র‍্যাঙ্কিং বা নোবেলজয়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রকৃত শক্তি হলো এমন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, যেখানে অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার অভিযোগের মুখে পড়া শিক্ষক বা শিক্ষার্থীরও ন্যায্য প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং আইনি অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়। একাডেমিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা—এই দুটি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একটি সুস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অপরিহার্য স্তম্ভ।

আলোচনার এ পর্যায়ে সঞ্চালক আবার বলতে লাগলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫ বছরে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য শিক্ষক জ্ঞান সৃষ্টি করেছেন, গবেষণা করেছেন, প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, জাতি গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—যখন কোনো শিক্ষক বিতর্ক, অভিযোগ, সামাজিক চাপ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?...আমি কোনো অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমি বরং জানতে চাই—বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচারের দর্শন কী?"

জন ডিউই 

"প্রশ্নটি অত্যন্ত মৌলিক। আমি সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়কে 'Community of Inquiry' বলেছি। সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রক্রিয়া (process) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রথম দায়িত্ব হলো অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু একই সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযুক্ত শিক্ষকের ন্যায্য প্রক্রিয়ার অধিকার (Due Process) নিশ্চিত করা। ন্যায্য প্রক্রিয়া ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সত্য অনুসন্ধান করতে পারে না; কেবল প্রতিক্রিয়া দেখায়।"

পাওলো ফ্রেইরে

"আমি এখানে 'সংলাপ'-এর প্রশ্ন তুলব। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান থাকে, যখন সেখানে ভয়ের পরিবর্তে সংলাপ থাকে। যদি শিক্ষক মনে করেন তিনি কথা বলতে পারবেন না, যদি শিক্ষার্থী মনে করেন তাঁকে শোনা হবে না—তাহলে উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। শিক্ষা কখনোই একপক্ষের বিজয় নয়; শিক্ষা হলো পারস্পরিক মানবিকীকরণের (humanization) প্রক্রিয়া।"

আন্তোনিও গ্রামশি

"আমি এটিকে সাংগঠনিক সংস্কৃতির (institutional culture) প্রশ্ন হিসেবে দেখি।

  • প্রশাসন পরিবর্তিত হবে।
  • সরকার পরিবর্তিত হবে।
  • জনমতও পরিবর্তিত হবে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত সংস্কৃতি যদি প্রতিবার পরিবর্তিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান তার ধারাবাহিকতা হারায়। একটি মহান বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তি নয়, নীতিকে রক্ষা করে।"

রোজা লুক্সেমবার্গ

"আমি স্বাধীনতার প্রশ্নটি অন্যভাবে দেখি। একাডেমিক স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি জ্ঞানচর্চার পূর্বশর্ত। একজন শিক্ষককে যেমন সমালোচনা করা যাবে, তেমনি তাঁকে ন্যায্যভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দিতে হবে। স্বাধীনতা ও জবাবদিহি—দুটিই একসঙ্গে থাকতে হবে। এগুলোর একটিকে বাদ দিলে অন্যটিও টেকে না।"

ড. মাহবুব লিটু

"ধরুন, একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেছেন, নতুন কোর্স চালু করেছেন, শিক্ষক শিক্ষা উন্নয়নে অবদান রেখেছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করেছেন। তারপর কোনো এক সংকটময় সময়ে তিনি অভিযোগের মুখোমুখি হলেন। এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কাজ কী? অভিযোগ তদন্ত? নাকি শিক্ষককে রক্ষা? নাকি দুটোই?"

জন ডিউই

"দুটোই। এবং একই সঙ্গে। এটাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো আদালত নয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের নীতিগুলো তাকে অনুসরণ করতে হয়। এ কারণেই উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়—

  • তদন্তের স্বাধীনতা,
  • অভিযুক্তের ন্যায্য অধিকার,
  • এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা।"

পাওলো ফ্রেইরে

"আরেকটি বিষয় যোগ করব। আজকের পৃথিবীতে সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ডিজিটাল হয়রানি—এসব একজন শিক্ষকের মানসিক সুস্থতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শিক্ষক সুরক্ষা এখন শুধু শারীরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি মানসিক নিরাপত্তারও বিষয়। যে শিক্ষক নিরাপদ বোধ করেন না, তিনি মুক্তভাবে শিক্ষা দিতে পারেন না।"

আন্তোনিও গ্রামশি

"বিশ্ববিদ্যালয়ের Duty of Care এখানেই। প্রতিষ্ঠানের কাজ কোনো ব্যক্তিকে সমর্থন করা নয়। প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো— প্রক্রিয়াকে রক্ষা করা। মানবিক মর্যাদাকে রক্ষা করা। প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তকে রক্ষা করা। কারণ ব্যক্তি হারালে একজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু ন্যায্য প্রক্রিয়া হারালে পুরো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।"

রোজা লুক্সেমবার্গ

"আমি আরও একটি ভারসাম্যের কথা বলব। শিক্ষকের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন পরিবেশ গড়তে হবে যেখানে—শিক্ষার্থী অভিযোগ করতে ভয় পাবে না, আবার শিক্ষকও অভিযোগ উঠলেই সামাজিকভাবে দণ্ডিত হবেন না। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপক্বতার পরিচয়।"

ড. মাহবুব লিটু (সমাপনী প্রতিফলন)

"আজকের আলোচনা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিচার নয়। বরং এটি আমাদের সকলের জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে আমরা কি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে—একজন শিক্ষক স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারেন, অভিযোগ গুরুত্ব পায়, অভিযুক্ত ন্যায্য প্রক্রিয়া পান, প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি নয়, নীতিকে রক্ষা করে, এবং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও একাডেমিক সম্প্রদায়ের পারস্পরিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা খুঁজে পাই, তাহলে এই আলোচনা কোনো ব্যক্তির গল্প থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী শতকের জন্য একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা।"

সঞ্চালকের শেষ কথা

"একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহত্ত্ব তার ভবনের উচ্চতায় নয়, বরং তার নৈতিক উচ্চতায়। শিক্ষক স্বাধীনতা, শিক্ষার্থীর অধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া—এই চারটি স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়। ব্যক্তি নয়, নীতিই শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।"

উপসংহার: বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ভবনে নয়, ন্যায়বোধে

দীর্ঘ আলোচনার শেষে গোলটেবিলের চারপাশে যেন আর কোনো একক কণ্ঠস্বর শোনা যায় না; বরং চারটি ভিন্ন দর্শন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সত্যে এসে মিলিত হয়। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব কিংবা মুক্তিকামী শিক্ষা—পথ আলাদা হলেও তাঁদের প্রত্যেকেই যেন একই কথাই স্মরণ করিয়ে দেন: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় সে কত বড় ক্যাম্পাস গড়েছে, কত উঁচু ভবন নির্মাণ করেছে কিংবা বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে কোথায় অবস্থান করছে, তা দিয়ে নয়; বরং সংকটের মুহূর্তে সে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং যুক্তির প্রতি কতটা অবিচল থাকতে পেরেছে, তা দিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ পাঁচ বছরের ইতিহাসও আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। এই ইতিহাস কেবল অর্জনের নয়, আত্মসমালোচনারও; কেবল গৌরবের নয়, দায়িত্বেরও। কারণ জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে জবাবদিহি; আর জবাবদিহি তখনই ন্যায়সংগত হয়, যখন তা ন্যায্য প্রক্রিয়া, প্রমাণ, সংলাপ এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একই জ্ঞানসমাজের অংশীদার হিসেবে দেখার মধ্যেই একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিহিত।

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিচার, অপপ্রচার, মেরুকরণ এবং জনমতের তীব্র চাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এমন সময়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পক্ষ নেওয়া নয়; বরং নীতি রক্ষা করা। অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া যেমন অপরিহার্য, তেমনি অভিযোগের মুখে পড়া ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাও সমানভাবে নিশ্চিত করা একটি সভ্য প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য। কারণ ন্যায়বিচার কেবল সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার প্রতি সবার আস্থা সৃষ্টি করাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছর পূর্তি শুধু একটি উদ্‌যাপনের উপলক্ষ নয়; এটি ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে প্রশ্ন করারও সময়। আগামী শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয় কি হবে মুক্তচিন্তার আশ্রয়, নাকি ভয়ের? সেখানে কি মতভেদকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে, নাকি জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে? শিক্ষক কি কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ হয়ে থাকবেন, নাকি তিনি স্বাধীন অনুসন্ধান, নৈতিক সাহস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারক হবেন?

এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর কোনো একক ব্যক্তি, কোনো প্রশাসন বা কোনো প্রজন্ম দিতে পারবে না। উত্তর লিখতে হবে প্রতিদিন—শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, সিনেটে, সিন্ডিকেটে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংলাপে এবং সমাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। কারণ একটি মহান বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান সৃষ্টি করে না; সে ন্যায়বোধ সৃষ্টি করে, আস্থা সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সাহস জাগিয়ে তোলে। আর সেই সাহসই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

–লেখক: অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

পরিশিষ্ট (কলাম/স্বাক্ষর)

  • প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন: অধিকারপত্রের সম্মানিত উপদেষ্টা সম্পাদক মহোদয়ের নেতৃত্বে অধিকারপত্র স্টুডিওর গবেষণা ও সম্পাদনা দল
  • সঞ্চালনা: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
  • কল্পনায়: রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি, পাওলো ফ্রেইরি
  • অধিকারপত্র স্টুডিও: স্বীকৃতিহীনতার বিরুদ্ধে স্বীকৃতির আসর, সত্যের সন্ধানে নিরলস।

#ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয়১০৫ #শিক্ষক_স্বাধীনতা #AcademicFreedom #DueProcess #বিশ্ববিদ্যালয় #উচ্চশিক্ষা #শিক্ষানীতি #একাডেমিক_স্বায়ত্তশাসন #InstitutionalJustice #TeacherDignity #HigherEducation #RosaLuxemburg #JohnDewey #AntonioGramsci #PauloFreire #অধিকারপত্র #দার্শনিক_সংলাপ #বাংলাদেশ_উচ্চশিক্ষা #গবেষণা #জ্ঞানচর্চা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: