অধিকারপত্র ডটকম, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬
গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের নতুন রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে খলিল আল-হাইয়া নির্বাচিত হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকের কাছে নেতৃত্বের পরিবর্তনের চেয়ে যুদ্ধের অবসান, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটে বিপর্যস্ত গাজার সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
যুদ্ধের কষ্টে নেতৃত্বের পরিবর্তন গৌণ
৬৩ বছর বয়সী নোমান সালেহ, যিনি ইসরায়েলি হামলায় নিজের কারখানা হারিয়েছেন, বলেন, গাজার মানুষ ক্ষুধার্ত, অপমানিত ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
তার ভাষায়, "খলিল আল-হাইয়া হোন কিংবা অন্য কেউ, এতে আমাদের বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসে না। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা দেশের প্রতি সৎ থাকবে এবং মানুষের দুর্ভোগ বুঝবে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
কঠিন সময়ের নেতৃত্ব
গাজা সিটির ৪০ বছর বয়সী এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী, নিরাপত্তার কারণে যিনি নিজের পূর্ণ নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, হামাসের ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে আল-হাইয়া নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন।
তার মতে, সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পরও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে হামাস দেখিয়েছে যে তারা সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম।
তিনি বলেন, গাজার মানুষ এমন নেতৃত্ব চায়, যারা জনগণের পাশে থাকবে, তাদের কথা শুনবে এবং তাদের কষ্ট অনুভব করবে।
‘আমরা শুধু বাঁচতে চাই’
২৮ বছর বয়সী আলি আবু আমশি যুদ্ধের সময় বাবা-মাসহ পরিবারের ২২ সদস্যকে হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত এই তরুণ বলেন, রাজনৈতিক খবর এখন আর তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, "আমরা শুধু বাঁচতে চাই। সীমান্ত খুলে যাক, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পাই, স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসুক। কে শাসন করবে, সেটি এখন আমাদের প্রধান প্রশ্ন নয়।"
আলি বলেন, যুদ্ধ তাদের জীবনে অসহনীয় ক্ষত তৈরি করেছে। তারা প্রতি বছর একই ধরনের সংঘাত দেখতে দেখতে ক্লান্ত।
হামাসের রাজনৈতিক বার্তা
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মাহমুদ হানিয়েহ মনে করেন, আল-হাইয়াকে নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে হামাস স্পষ্ট করেছে যে তারা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়।
তার মতে, ইসরায়েল আল-হাইয়াকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতাদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তাকে নেতৃত্বে আনার মাধ্যমে হামাস একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
তবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামাস কিছু রাজনৈতিক নমনীয়তা দেখালেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নীতি থেকে সরে আসেনি।
প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসনের পর হামাস এর আগে তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়।
জাতিসংঘের সমর্থনে গঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে ধাপে ধাপে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল ওই কমিটির সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। বর্তমানে কমিটির অস্থায়ী কার্যালয় মিসরের কায়রোতে পরিচালিত হচ্ছে।
আস্থার সংকট
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইব্রাহিম বলেন, দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে হামাসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গেছে।
তার ভাষায়, অনেক মানুষ এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ এবং মানবিক সংকটের অবসানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, "মানুষ জানতে চায় না কে রাজনৈতিক প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। তারা জানতে চায় নতুন নেতৃত্ব এমন কী সিদ্ধান্ত নেবে, যা যুদ্ধ বন্ধ করবে, একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে এবং তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।"
মানবিক সংকটই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, গাজার মানুষের বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের চেয়ে খাদ্য, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে হামাসের নতুন নেতৃত্ব কতটা দ্রুত এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন গাজার সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
সূত্র: আল জাজিরা

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: