০১:৩০ পিএম | ২৮ আগস্ট, ২০২৬
বিদেশ থেকে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে দেশের দ্বিতীয় অর্ডন্যান্স উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনায় বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির (বিওএফ) সম্প্রসারণ হিসেবে এ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে জমি ও স্থাপনা হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনার কথা জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
সেনাপ্রধান বলেন, শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানি করে যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। দেশের প্রয়োজনীয় ফায়ারিং সরঞ্জাম ও সামরিক উপকরণ নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে। এ লক্ষ্যেই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন এ কারখানায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদিত অতিরিক্ত সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে একদিকে সমরাস্ত্র আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে এ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও যোগাযোগগত সুবিধাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ঘেরা অবস্থান সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সহায়ক। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি এবং ভবিষ্যতে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে লজিস্টিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগও এ অঞ্চলের শিল্প স্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনা প্রতীকী মূল্যে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার জমি ও স্থাপনা হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তিতে বিটিএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে মিলিটারি এস্টেট অফিসার মিসেস সাজিয়ে তাহের স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গাজীপুর সেনানিবাসে বিদ্যমান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির পর সীতাকুণ্ডে দ্বিতীয় উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে দেশীয় উৎপাদন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পর্যায়ে যেতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা ও উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি সমরাস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও অনুমোদন প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি প্রকৌশল, ধাতু, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন সহযোগী শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরি ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সমরাস্ত্র বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ডের এ কারখানা শুধু দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে নয়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আমদানিনির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতা এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
কিওয়ার্ড: বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, বিওএফ, সীতাকুণ্ড, ফৌজদারহাট, চট্টগ্রাম, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, প্রতিরক্ষা শিল্প, সমরাস্ত্র উৎপাদন, গোলাবারুদ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সমরাস্ত্র রপ্তানি, জলিল টেক্সটাইল মিল, বিটিএমসি

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: