odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 31st August 2026, ৩১st August ২০২৬
ট্রাম্পের ‘লেক আমেরিকা’ নামকরণের উদ্যোগের জবাবে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের ঘোষণা—কানাডায় এই হ্রদ ‘লেক অন্টারিও’ নামেই থাকবে এখন ও চিরকাল

লেক অন্টারিওর নাম বদল নিয়ে ট্রাম্প-ফোর্ডের পাল্টাপাল্টি বার্তা

Special Correspondent | প্রকাশিত: ৩১ August ২০২৬ ১২:১০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ৩১ August ২০২৬ ১২:১০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যবহারের জন্য হ্রদটির নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার উদ্যোগ নেওয়ার পর কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন কানাডায় এই হ্রদ সবসময় ‘লেক অন্টারিও’ নামেই পরিচিত থাকবে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সরকারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লেক অন্টারিওকে ‘লেক আমেরিকা’ নামে উল্লেখ করার উদ্যোগ নেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে কানাডা বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে হ্রদটির নাম পরিবর্তন কার্যকর করতে পারেন না। কানাডার কর্মকর্তারাও এরই মধ্যে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন।

ফোর্ডের পাল্টা সাইনবোর্ড

ট্রাম্পের উদ্যোগের জবাব দিতে শনিবার অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড হ্যামিলটনের ৫০ পয়েন্ট কনজারভেশন এরিয়ায় লেকের তীরে একটি সাইনবোর্ড উন্মোচন করেন। সেখানে লেখা ছিল—

‘Lake Ontario, Now and Always’

অর্থাৎ, ‘লেক অন্টারিও-এখন এবং চিরকাল।’

সাইনবোর্ড উন্মোচনের সময় ফোর্ড বলেন, কানাডীয়রা দৃঢ় ও সহনশীল এবং কোনো ‘বুলির’ কাছে তারা কখনো মাথা নত করবে না। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হ্রদটির নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও কানাডা এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে এটি লেক অন্টারিও নামেই পরিচিত থাকবে। ফোর্ড আরও বলেন, ট্রাম্পের আগে বহু বছর ধরেই এই হ্রদের নাম লেক অন্টারিও ছিল এবং ট্রাম্প চলে যাওয়ার বহু পরেও এটি একই নামে পরিচিত থাকবে।

ট্রাম্পের ব্যঙ্গাত্মক AI ভিডিও

ফোর্ডের সাইনবোর্ড উন্মোচনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ একটি AI-নির্মিত ভিডিও প্রকাশ করেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প লেকের তীরে থাকা পুরোনো ‘Lake Ontario’ সাইনবোর্ডটি সরিয়ে ফেলছেন এবং সেখানে ‘Welcome to Lake America’ লেখা একটি নতুন সাইনবোর্ড স্থাপন করছেন। এরপর ভিডিওতে তাকে সাইনবোর্ডের সামনে নাচতেও দেখা যায়। ভিডিওটি ছিল ট্রাম্পের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে কানাডার বিরোধিতার প্রতি একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া।

‘লেক অন্টারিও’ নামটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, কানাডীয়রা এই জলাশয়কে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতেও ‘লেক অন্টারিও’ নামেই ডাকবে। কার্নির মতে, ‘Ontario’ নামটির উৎস ওয়েনডাট জনগোষ্ঠীর ভাষার ‘Ontari’io’ শব্দে। এর অর্থের সঙ্গে হ্রদের সৌন্দর্য ও বিশালতার ধারণা জড়িয়ে আছে।

তিনি উল্লেখ করেন, নামটি ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। অর্থাৎ, কানাডা একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জনেরও আগে থেকেই ‘লেক অন্টারিও’ নামটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কার্নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিবর্তিত হচ্ছে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ এবং এখন জলভৌগোলিক নামও পরিবর্তনের আলোচনায় এসেছে।

লেক অন্টারিও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

লেক অন্টারিও উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ হ্রদ এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আন্তর্জাতিক সীমান্তের একটি অংশ গঠন করেছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য, অন্যদিকে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ।

দুই দেশের মধ্যে ১৯০৯ সালের Boundary Waters Treaty-এর অধীনে সীমান্তবর্তী জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কাঠামো রয়েছে। ফলে হ্রদটির নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু একটি নামের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার বিষয়ও জড়িয়ে আছে।

নাম পরিবর্তনের পেছনে বাণিজ্য বিরোধ

ট্রাম্পের ‘লেক আমেরিকা’ উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছে। ট্রাম্প কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। বিশেষ করে গাড়ি, ট্রাক, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ ও ইস্পাত শিল্পকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে।

ট্রাম্পের দাবি, কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা গাড়ির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন বাড়াতে চান। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার এবং প্রয়োজন হলে মার্কিন শুল্কের জবাব দেওয়ার কথা বলেছেন।

‘পুরো কানাডা বিষয়টির অবসান হওয়া দরকার’: ট্রাম্প

বৃহস্পতিবার নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, লেকের নাম পরিবর্তন নিয়ে তার অবস্থান বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বিরোধেরই অংশ। তিনি কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা করেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে সামরিকভাবে সুরক্ষা দিলেও এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন যথেষ্ট সুবিধা পায় না। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানাডার সঙ্গে কাজ করা কঠিন এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল।

শুধু একটি হ্রদের নাম নয়

লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে একটি ভৌগোলিক নাম নিয়ে বিরোধ মনে হলেও এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বৃহত্তর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প যেখানে ‘লেক আমেরিকা’ নামটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন, কানাডা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তাদের ভূখণ্ড ও আন্তর্জাতিক ব্যবহারে হ্রদটির নাম ‘লেক অন্টারিও’ই থাকবে। ফলে হ্রদের তীরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুই দেশের অবস্থানও যেন দুটি আলাদা বার্তা দিচ্ছে একদিকে ট্রাম্পের ‘Lake America’, অন্যদিকে ফোর্ডের ‘Lake Ontario, Now and Always’।

নাম নিয়ে এই প্রতীকী দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বৃহত্তর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কোন দিকে এগোয় তার ওপর।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: