নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের কয়েক সপ্তাহ পর আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত জানান ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় দুই দশকের পথচলার পর মেসির এই বিদায় বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একটি আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের ফাইনালটি যে তাঁর আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ ছিল, সেটি এখন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
২০ বছরের পথচলার পর বিদায়
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে জাতীয় দলের জার্সিতে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
একসময় আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে। একাধিক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছেও শিরোপা না পাওয়ার হতাশা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি জিতেছেন কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর সাফল্যের এই অধ্যায় তাঁকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালেই শেষ ম্যাচ
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত পথ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে। শিরোপার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই ম্যাচটিই ছিল মেসির জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ উপস্থিতি।
ফাইনালের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছিলেন মেসি। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর তিনি অবসরের সিদ্ধান্তটি প্রকাশ্যে আনেন।
আবেগঘন বিদায়বার্তা মেসির
অবসরের ঘোষণা দিয়ে মেসি সমর্থকদের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না।
মেসির ভাষায়, দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে ভাবার পর তিনি বুঝেছেন যে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়। সিদ্ধান্তটি তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। জাতীয় দলের হয়ে নিজের দায়িত্বের কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, শুধু সাফল্যের শেষ কয়েক বছর নয়, পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই তিনি আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন।
তিনি জানান, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল সমর্থকদের আনন্দ দেওয়া এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইনদের গর্বিত করা।
বাবার মৃত্যুতে আরও ভারী হলো বিদায়ের মুহূর্ত
মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সময়টি আরও আবেগঘন হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক বেদনাদায়ক ঘটনার কারণে। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর বাবা মারা যান। ফলে পেশাদার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত শোকও বহন করতে হচ্ছে আর্জেন্টাইন তারকাকে।
বিদায়বার্তায় মেসি তাঁর পরিবার, কোচ, সতীর্থ এবং সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ ও কঠিন এই যাত্রায় যারা তাঁর পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, একসঙ্গে তাঁরা এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, যেগুলো একসময় কেবল স্বপ্ন ছিল।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির উত্তরাধিকার
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ার শুধু পরিসংখ্যান বা শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গল্পে রয়েছে হতাশা, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক সাফল্য। একসময় আন্তর্জাতিক শিরোপা না পাওয়ার কারণে মেসিকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয় সেই সমালোচনার অনেকটাই বদলে দেয়।
বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপ জয় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলার মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হয়।
শেষ হলো একটি যুগ
মেসির আন্তর্জাতিক অবসর শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তিও বটে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অসংখ্য প্রজন্মের সমর্থককে আনন্দ দিয়েছেন। তাঁর পায়ের জাদু, নেতৃত্ব এবং আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি দীর্ঘদিনের দায়বদ্ধতা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় খেলোয়াড়দের একজন করে তুলেছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হার দিয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা হয়তো প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার কোনো একটি ম্যাচের ফলাফলে মুছে যাওয়ার নয়।
মেসি নিজেই তাঁর বিদায়বার্তায় যে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, তাতে স্পষ্ট আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল পেশাগত নয়, ছিল গভীর আবেগের। দুই দশকের সেই পথচলা শেষ করে মেসি বিদায় নিলেন। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম, তাঁর অর্জন এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি দীর্ঘদিন অমলিন থাকবে।
“Thank you God for making me Argentine.” এই আবেগঘন কথার মধ্য দিয়েই আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের অধ্যায়কে বিদায় জানিয়েছেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: