odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 9th September 2026, ৯th September ২০২৬
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগে বাড়ছে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়তেই ১০০ ডলার ছাড়াল ব্রেন্ট তেলের দাম

Special Correspondent | প্রকাশিত: ৯ September ২০২৬ ১৮:২০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ৯ September ২০২৬ ১৮:২০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠে গেছে। বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে সাময়িকভাবে ১০০ ডলার ছুঁয়ে যায়। জুলাইয়ের পর এটিই ব্রেন্টের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাম। পরে দাম কিছুটা কমলেও বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)-এর দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৯৪ ডলারে পৌঁছায়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেই বাড়ছে তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র গালফ অব ওমান এলাকায় চারটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং খার্গ দ্বীপের কাছে আরও একটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করার প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হয়।

ইরানের খার্গ দ্বীপ দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ওই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেল ও অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে তেল উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তেল ব্যবসায়ীরা তাই প্রতিনিয়ত হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

বাড়ছে পেট্রোল-ডিজেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই জ্বালানি পণ্যের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার জাতীয় পর্যায়ে ডিজেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৫ দশমিক ৯০ ডলারে পৌঁছায়, যা দেশটির জন্য রেকর্ড পর্যায়ের দাম। বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, ডিজেল, জেট ফুয়েল, জাহাজের জ্বালানি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম একসঙ্গে বাড়লে তা বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। এতে মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য অর্থ কমে যেতে পারে।

চলতি বছরে তেলের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে। বছরের শুরু থেকে সংঘাত ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একদিকে দাম দ্রুত বেড়েছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে আবার কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড চলতি বছরের ১২ মার্চ প্রথমবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে দাম আরও বাড়লেও জুনে তা নেমে প্রায় ৭২ ডলারে পৌঁছায়।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতার পর বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংঘাত অব্যাহত থাকায় তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করে। জুলাইতেও ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। এরপর কিছুটা ওঠানামার পর মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবার সকালে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ১০০ ডলারের সীমা স্পর্শ করে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ব্রেন্ট ও মার্কিন অপরিশোধিত তেল দুটির দামই ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা

তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ জ্বালানি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও কৃষি—প্রায় সব খাতেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।

ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকলে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানোর পরিবর্তে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে বা প্রয়োজনে বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের S&P 500 সূচক ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। যদিও সূচকটি আগস্টের মাঝামাঝি রেকর্ড উচ্চতার তুলনায় ২ শতাংশেরও কম নিচে রয়েছে, তবু তেলের দাম দ্রুত বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যতে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ডের সুদহারও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্যের অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করছেন।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মূল নজর এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সংঘাতের বিস্তারের দিকে। চীনের তেলের চাহিদাও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমিয়ে রাখায় বাজারে কিছুটা চাপ কম ছিল। তবে দেশটির তেল আমদানি আবার বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তত বাড়বে। আর সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বর্তমান দাম আরও ওপরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর।

এক নজরে

ব্রেন্ট ক্রুড: ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার স্পর্শ করেছে

মার্কিন WTI: প্রায় ৯৪ ডলার

ব্রেন্টের বৃদ্ধি: চলতি বছরে ৬০ শতাংশের বেশি

WTI-এর বৃদ্ধি: চলতি বছরে ৬০ শতাংশের বেশি

মূল ঝুঁকি: হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়া

প্রধান প্রভাব: পেট্রোল-ডিজেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার

বাজারের নজর: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও তেল সরবরাহ পরিস্থিতি

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: