odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 28th September 2026, ২৮th September ২০২৬
আইন আছে, তথ্য কর্মকর্তাও আছেন—তবু সরকারি তথ্য পেতে নাগরিকের দীর্ঘ অপেক্ষা। শিক্ষা ও পাঠ্যবইয়ের মতো জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা কেন জরুরি?

তথ্য অধিকার দিবস: তথ্যের দরজা বন্ধ থাকলে গুজবই জানালা খোঁজে

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৮ September ২০২৬ ২১:২২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৮ September ২০২৬ ২১:২২

অধিকারপত্র বিশেষ ফিচার • দেশচিন্তা • আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যপ্রাপ্তি দিবস ২০২৬

কোনো শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের একটি তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলল, কোনো অভিভাবক সন্তানের পরীক্ষার নম্বর পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করলেন, কিংবা কোনো গ্রামবাসী জানতে চাইলেন—তাঁদের এলাকার সড়ক সংস্কারের বরাদ্দ কোথায় গেল। প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে আছে একই নাগরিক প্রত্যাশা: যে সিদ্ধান্ত বা সেবা তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য তাঁরা জানতে পারবেন। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও আছেন; তবু তথ্য পেতে দেরি, অসম্পূর্ণ উত্তর, জটিল আপিল এবং নথির নাগাল না পাওয়ার অভিযোগ রয়ে গেছে। এই ফাঁক শুধু প্রশাসনিক অসুবিধা নয়। যেখানে প্রামাণ্য তথ্য অনুপস্থিত, সেখানে গুজব ও কুসংস্কার জায়গা করে নেয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ সেই শূন্যতাকে পণ্য বানান। বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবসে তাই প্রশ্নটি শুধু আইন মানা হচ্ছে কি না—তা নয়; প্রশ্ন, সত্য জানার পথটি সাধারণ মানুষের জন্য আদৌ খোলা কি না।

২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় তথ্য জানার সর্বজনীন অধিকারের আন্তর্জাতিক দিবস। বাংলাদেশে ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে সরকারি ও নির্দিষ্ট কিছু কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য চাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকা আর সময়মতো, বোধগম্য ও ব্যবহারযোগ্য তথ্য পাওয়া এক বিষয় নয়। তথ্য কমিশনের দীর্ঘদিনের অকার্যকারিতা, আপিলের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল স্বপ্রণোদিত প্রকাশ এবং জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া এ অধিকারের বাস্তব প্রয়োগকে কঠিন করেছে। ২০২৬ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশ তথ্যের সংজ্ঞা ও প্রকাশের কিছু বিধান বিস্তৃত করলেও নোটশিটের মতো নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ নথি বাদ পড়া এবং কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই তথ্যশূন্যতা নাগরিকসেবা, স্থানীয় জবাবদিহি, সামাজিক গুজব ও ডিজিটাল তথ্য-বাণিজ্যের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা আলোচনায় এসেছে। বিশেষভাবে দেখা হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যবই তৈরির প্রক্রিয়া: কারা বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেন, কোন যুক্তিতে সংশোধন হয়, ভুল ধরা পড়লে কীভাবে তা জানানো হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর গোপন থাকলে শিক্ষার্থীর শেখা ও সত্য যাচাই দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিবন্ধটি তথ্য অধিকারকে কাগুজে বিধান থেকে কার্যকর নাগরিকসেবায় রূপ দেওয়ার বাস্তব পথও তুলে ধরে।

পাঠকের জন্য মূল কথা

তথ্য অধিকার কেবল আবেদন করে নথি পাওয়ার ব্যবস্থা নয়। কার্যকর অধিকার মানে—গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই প্রকাশিত থাকা, আবেদন সহজ হওয়া, সময়মতো উত্তর পাওয়া, প্রত্যাখ্যানের লিখিত কারণ জানা, কার্যকর আপিল থাকা, তথ্য ব্যবহারযোগ্য ও প্রবেশগম্য হওয়া, এবং নাগরিকের সেই তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা থাকা।

২৮ সেপ্টেম্বরের তাৎপর্য: তথ্যের অধিকার একটি নাগরিক অধিকার

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর গৃহীত প্রস্তাবে [A/RES/74/5, “Proclamation of 28 September as the International Day for Universal Access to Information”] ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যপ্রাপ্তি দিবস ঘোষণা করে। প্রস্তাবটি তথ্য খোঁজা, পাওয়া ও অন্যকে জানানোর অধিকারকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ তথ্যপ্রাপ্তি কেবল প্রশাসনের কাছ থেকে একটি কাগজ সংগ্রহের বিষয় নয়; মানুষ কীভাবে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং জনপরিসরে অংশ নেবেন, তার সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে এর অর্থ খুব বাস্তব। একজন অভিভাবক বিদ্যালয়ের ভর্তি বা বৃত্তির নিয়ম জানতে চান; একজন কৃষক জানতে চান জমির নথিতে পরিবর্তন কেন হলো; একটি এলাকার বাসিন্দারা জানতে চান রাস্তার কাজের জন্য কত টাকা বরাদ্দ ছিল। তাঁরা সবাই সরকারি সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করেন। সেই সিদ্ধান্তের প্রাসঙ্গিক তথ্য জানার সুযোগ তাঁদের থাকা উচিত। তথ্য প্রকাশ মানুষের ওপর প্রশাসনের অনুগ্রহ নয়; জবাবদিহিমূলক শাসনের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

টেকসই উন্নয়নের হিসাবেও তথ্যের জায়গা আছে

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬ শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা বলে। এর লক্ষ্য ১৬.১০ জনসাধারণের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার সঙ্গে মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষাকে যুক্ত করেছে। UNESCO-র Access to Information: A New Promise for Sustainable Development প্রকাশনায়ও দেখানো হয়েছে, তথ্য অধিকারকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নারীর অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধের সরবরাহ কত, তা না জানলে রোগীর পক্ষে ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব না জানা থাকলে অভিভাবকের পক্ষে প্রয়োজনের তুলনা করা কঠিন। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য প্রযোজ্য সহায়তার নিয়ম প্রকাশিত না থাকলে তাঁর অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করাও কঠিন। এসব উদাহরণে তথ্য নিজে কোনো সেবা নয়, কিন্তু সেবাটি পাওয়ার এবং তার মান যাচাইয়ের পথ খুলে দেয়।

UNESCO-র ২০১৯ সালের প্রকাশনাটি আরও একটি প্রাসঙ্গিক সতর্কতা দিয়েছিল: বহু দেশে তথ্য অধিকার আইন বাড়লেও আবেদন ও আপিলের হিসাব রাখা, স্বপ্রণোদিত প্রকাশ এবং তদারকির কার্যকারিতা উন্নত করা প্রয়োজন। আইন প্রণয়নের পর তাই কাজ শেষ হয় না। কোন তথ্য কোথায় আছে, আবেদন কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে কী প্রকাশ করছে—এসবই অধিকারের বাস্তব রূপ নির্ধারণ করে।

তথ্য না পেলে প্রশ্নের জায়গা নেয় গুজব

একটি বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে ভুল তথ্য আছে—এমন পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বইয়ের ছবি দিলেন, কেউ বললেন নতুন সংস্করণে ইতিহাস বদলে গেছে, কেউ আবার দাবি করলেন বিষয়টি পরিকল্পিত। কিন্তু কোন সংস্করণের বই, কোন পৃষ্ঠায় কী পরিবর্তন, সংশোধনের কারণ কী—এসব যাচাই করার মতো সরকারি নথি বা সহজ ব্যাখ্যা যদি এক জায়গায় না থাকে, তাহলে সত্য অনুসন্ধানের আগেই দাবি ও পাল্টা দাবি ছড়িয়ে পড়ে। তথ্যের অভাব কেবল অন্ধকার নয়; তা এমন এক ফাঁকা জায়গা, যেখানে অনুমান নিজের মতো করে মানচিত্র আঁকে।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে তথ্য জানার সর্বজনীন অধিকারের আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ২০১৫ সালে দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়; দিনটির লক্ষ্য তথ্যপ্রাপ্তির আইন ও তার কার্যকর প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরা। বাংলাদেশেও তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা আর নাগরিকের হাতে সময়মতো, পূর্ণাঙ্গ ও বোধগম্য তথ্য পৌঁছানো এক কথা নয়। সরকারি দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হয়েছে—এটিও প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আবেদন কীভাবে করতে হবে, কোন নথি পাওয়া যাবে, কত দিনে পাওয়া যাবে, না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব না জানলে অধিকারটি দরজায় লেখা নামফলকের মতোই থেকে যায়, দরজা খোলার চাবি হয় না।

Listen to the two new songs produced by Odhikarpatra to mark the International Day for Universal Access to Information 2026 on YouTube, and reflect on the realities and importance of the right to information in Bangladesh│@Odhikarpatra_Song Playlist: তথ্য অধিকার আসে যায় 🎶 Keys in the Sea | Bangla & English Satirical Folk Fusion 2026 │তথ্য জানার সর্বজনীন অধিকারের আন্তর্জাতিক দিবস-2026 উপলক্ষে অধিকারপত্রের প্রযোজনায় তৈরি নতুন আকর্ষণীয় গানটি শুনুন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্য অধিকারের বাস্তবতা ও গুরুত্ব নিয়ে ভাবুন।

তথ্য অপ্রাপ্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সেই মানুষের ওপর, যাঁর হাতে বিকল্প উৎস, পরিচিত কর্মকর্তা কিংবা আইনি সহায়তার সুযোগ নেই। তখন একটি সেবার নিয়ম জানতে দালালের কাছে যেতে হয়, একটি সিদ্ধান্তের কারণ বুঝতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ খুঁজতে হয়, আর একটি ভুল তথ্য যাচাই করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে ভরসা করতে হয়। তথ্যের পথ বন্ধ থাকলে সত্যের চাহিদা কমে না; বরং সেই চাহিদা পূরণ করে এমন কেউ, যার কাছে যাচাইয়ের চেয়ে মনোযোগ ও মুনাফা বেশি জরুরি।

তথ্যের অন্ধকারের ইতিহাস: ঔপনিবেশিক রাজস্ব থেকে আজকের দালালনির্ভরতা

বাংলার মানুষের তথ্য থেকে দূরে থাকার ইতিহাস এক দিনে তৈরি হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসনে তথ্য ছিল শাসন ও রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার; কিন্তু তথ্যের প্রবেশাধিকার সবার সমান ছিল না। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের সঙ্গে কোম্পানি সরকারের রাজস্ব-সম্পর্ক নির্দিষ্ট করলেও কৃষকের জমি, খাজনা ও অধিকারসংক্রান্ত তথ্য অনেক ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে থাকত। ঔপনিবেশিক প্রশাসন জরিপ, খতিয়ান ও রাজস্ব-নথি তৈরি করেছিল মূলত ভূমি ও আয় পরিচালনার প্রয়োজনে; সাধারণ কৃষকের পক্ষে সেই নথি বোঝা, যাচাই করা বা নিজের দাবি প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা সহজ ছিল না। বাংলার ভূমি-ব্যবস্থা নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণায়ও দেখা যায়, স্থানীয় তথ্যভিত্তি দুর্বল থাকা এবং জমিদার ও প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্বের অস্পষ্টতা তথ্যের অসমতা বাড়িয়েছিল। এই ইতিহাসকে সরলভাবে “সব তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়েছিল” বলে বর্ণনা করা ঠিক হবে না; তবে নথি, ভাষা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক যোগাযোগে যাঁদের প্রবেশাধিকার ছিল, তাঁরা তুলনামূলক সুবিধা পেয়েছিলেন—আর প্রজাদের অনেকেই নির্ভরশীল ছিলেন মধ্যস্থতাকারীদের ওপর।

ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও তথ্য ও প্রশাসনের দূরত্ব এক ঝটকায় ঘোচেনি। পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলোতে দাপ্তরিক গোপনীয়তার সংস্কৃতি, জটিল বিধি, নথির দুর্বল সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের সীমিত আইনি ও প্রশাসনিক জ্ঞান তথ্য জানার পথকে কঠিন করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিকের তথ্য চাওয়ার অধিকার স্বীকার করে এই ঐতিহাসিক ব্যবধান কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু অধিকারটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নির্ভর করে তথ্যের সহজলভ্যতা, কর্মকর্তার জবাবদিহি, আপিলব্যবস্থা এবং নাগরিকের তথ্য-সাক্ষরতার ওপর। আইন থাকা সত্ত্বেও তথ্য কমিশনের দীর্ঘ অকার্যকারিতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে; ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশনে প্রায় ৮৫০টি আবেদন জমে থাকার কথা জানানো হয়।

জমি-জমার বিষয়টি এই অসমতার একটি পরিচিত উদাহরণ। জমির মালিকানা, খতিয়ান, নামজারি, দাগ নম্বর, মৌজা-মানচিত্র, উত্তরাধিকার বা রেকর্ড সংশোধনের তথ্য বিভিন্ন নথি ও দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ নথির ভাষা, ধাপ ও পারস্পরিক সম্পর্ক না বুঝলে সঠিক তথ্য পেতেও অসুবিধায় পড়েন। তখন তিনি পরিচিত ব্যক্তি বা দালালের সহায়তা নিতে পারেন—কখনো পথ চিনতে, কখনো কাগজ সংগ্রহ করতে, আবার কখনো কাজ দ্রুত করানোর আশায়। সব মধ্যস্থতাকারী প্রতারণা করেন—এমন দাবি প্রমাণসাপেক্ষ; কিন্তু প্রক্রিয়া যত জটিল ও অস্পষ্ট থাকে, নাগরিকের অসহায়তা থেকে অন্যের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তত বাড়ে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে খতিয়ান সংগ্রহ, নামজারি, রেকর্ড সংশোধন ও মৌজা-মানচিত্রের মতো ভূমিসেবাকে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভূমি-নথিতে অসম্পূর্ণতা ও একাধিক খতিয়ানের সমস্যার কথাও নথিভুক্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। কোনো দল বা জনপ্রতিনিধি প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়, সিদ্ধান্তের কারণ কিংবা প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি প্রকাশ না করলে নাগরিকের পক্ষে বক্তব্য যাচাই করা কঠিন হয়। তথ্যের এই ঘাটতি কখনো ইচ্ছাকৃত গোপনীয়তা থেকে, কখনো দুর্বল নথি-ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক উদাসীনতা থেকে তৈরি হতে পারে; সব ক্ষেত্রকে একই উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তবে ফল এক হতে পারে: তথ্যের অভাবে নাগরিক গুজব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা রাজনৈতিক প্রচারের ওপর নির্ভর করেন। তাতে যারা তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তারা জনমতকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান; নাগরিকের পক্ষে জবাবদিহি দাবি করা কঠিন হয়।

ধর্মীয় তথ্যের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। ধর্মীয় জ্ঞান ও ব্যাখ্যা বহু মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আলেম বা বিশ্বাসীদের সবাইকে “ভুল তথ্যদাতা” বলা অন্যায় ও ভিত্তিহীন হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি যাচাইহীন ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত ধর্মীয় বিধান বলে প্রচার করে, ভিন্নমতকে বিদ্বেষে রূপ দেয়, কিংবা ভয় ও বিভেদকে অনুসারী বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের উপায় বানায়, তাহলে তার ক্ষতি সমাজজুড়ে ছড়ায়। এখানে সমাধান বিশ্বাসকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং উৎস যাচাই, প্রামাণ্য জ্ঞান, দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা এবং ভুল তথ্যের শান্তিপূর্ণ সংশোধনের সুযোগ নিশ্চিত করা।

প্রশ্ন তাই শুধু—কেউ তথ্য গোপন করছেন কি না। প্রশ্ন হলো, তথ্য কার হাতে, নাগরিক তা পেতে কত ধাপ পেরোন, নথি বুঝতে কী সহায়তা পান, এবং তথ্য না দিলে প্রতিকার কোথায়। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে পারে; কিন্তু আবেদন কঠিন, নথি দুর্লভ, সিদ্ধান্তের যুক্তি অপ্রকাশিত এবং আপিল অকার্যকর থাকলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব থেকেই যায়। তথ্যের এই অসমতা কেবল অতীতের উত্তরাধিকার নয়—বর্তমানের প্রশাসনিক পদ্ধতি, রাজনৈতিক প্রণোদনা ও দুর্বল নাগরিক সক্ষমতার মধ্য দিয়েও তা পুনরুৎপাদিত হতে পারে। সেই বৃত্ত ভাঙতে দরকার সহজে পাওয়া যায় এমন সরকারি নথি, বোধ্য ভূমি-রেকর্ড, সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ব্যাখ্যা, সচল তথ্য কমিশন এবং ছোটবেলা থেকে তথ্য-সাক্ষর নাগরিক গড়ে তোলা। তথ্যের দরজা খোলা থাকলে মধ্যস্থতাকারীর ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমে; আর মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে জানলে ক্ষমতাবানদের বক্তব্যও প্রমাণের মুখোমুখি হয়।

বাংলাদেশে তথ্য অধিকারের প্রধান সংকট: আইন আছে, কার্যকর পথ কোথায়?

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে মৌলিক প্রতিশ্রুতি হলো—সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য নাগরিক চাইতে পারবেন। আইনে সাধারণত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস হতে পারে। কিন্তু নাগরিকের অভিজ্ঞতায় আবেদনপদ্ধতি, সঠিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তথ্যের সম্ভাব্য অবস্থান এবং প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিলের ধাপ সব সময় সহজে বোঝা যায় না। ধরুন, কোনো অভিভাবক জানতে চান তাঁর সন্তানের বৃত্তির আবেদন কেন বাতিল হলো। সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ, প্রযোজ্য যোগ্যতার নিয়ম এবং আপিলের ঠিকানা একসঙ্গে না পেলে তাঁকে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হতে পারে। আইনগত সময়সীমা থাকলেও আবেদন জমা দেওয়ার প্রমাণ রাখা, নির্দিষ্ট নথি চাওয়া এবং উত্তর না এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার মতো বাস্তব জ্ঞান নাগরিকের ওপরই এসে পড়ে।

দ্বিতীয় সংকট হলো তথ্য চাওয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। নাগরিককে প্রতিটি বাজেট, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সেবা-নিয়ম বা সিদ্ধান্ত জানতে আলাদা আবেদন করতে হলে তথ্যপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া ধীর ও ব্যয়বহুল হয়। কার্যকর স্বপ্রণোদিত প্রকাশ থাকলে বহু প্রশ্নের উত্তর আবেদন ছাড়াই পাওয়া সম্ভব। ২০২৬ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশে সিদ্ধান্ত, ব্যয়, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সম্পন্ন বা প্রস্তাবিত কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশের বিধান যুক্ত হয়েছে। তবে ওয়েবসাইটে একটি বিভাগ বা নথির তালিকা থাকাই যথেষ্ট নয়; তথ্য হালনাগাদ, অনুসন্ধানযোগ্য, পাঠযোগ্য ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য হতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারে অসুবিধা আছে এমন নাগরিকের জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, তথ্য না পেলে প্রতিকার পাওয়ার পথ কার্যকর থাকা জরুরি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তথ্য কমিশনে কমিশনার নিয়োগে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে কমিশনের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রায় ৮৫০টি আবেদন জমে থাকার কথা জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় কোনো কর্মকর্তা আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে, অসম্পূর্ণ উত্তর দিলে বা সময়সীমা অতিক্রম করলে নাগরিকের আপিল নিষ্পত্তি বিলম্বিত হতে পারে। কমিশন অকার্যকর থাকলে আইনটি বাতিল হয় না, কিন্তু তার প্রয়োগ দুর্বল হয়: আবেদনকারী জানেন না তাঁর অভিযোগের কার্যকর শুনানি কবে হবে, আর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন প্রতিকারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

চতুর্থত, কোন তথ্য প্রকাশযোগ্য আর কোনটি গোপন রাখা যাবে—তার সীমা স্পষ্ট ও যুক্তিসংগত হওয়া দরকার। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা বা চলমান তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য সংরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু এসব কারণ দেখিয়ে পুরো নথি আটকে দিলে জনস্বার্থের তথ্যও নাগালের বাইরে চলে যায়। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে তথ্যের সংজ্ঞা বিস্তৃত হয়েছে—স্মারক, মানচিত্র, চুক্তি, শ্রবণ-দৃশ্য উপকরণ ও ইলেকট্রনিক নথিও এর অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে সরকারি নোটশিট বাদ পড়া নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রশ্ন রয়েছে; কারণ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি ও বিবেচনাপ্রক্রিয়া বুঝতে এ ধরনের নথি কখনো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তথ্য জানার সর্বজনীন অধিকারের আন্তর্জাতিক দিবস-2026 উপলক্ষে অধিকারপত্রের প্রযোজনায় তৈরি নতুন আকর্ষণীয় গানটি শুনুন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্য অধিকারের বাস্তবতা ও গুরুত্ব নিয়ে ভাবুন │ Song 1: তথ্য অধিকার আসে যায় (Totto Odhikar Ase Jay)! Bangla Folk Satire Song | Truth & Right To Information

শিক্ষা খাতে এ সমস্যার বাস্তব তাৎপর্য স্পষ্ট। কোনো পাঠ্যবইয়ের তথ্য বদলালে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক জানতে চাইতে পারেন—কোন সংস্করণে পরিবর্তন এসেছে, সংশোধনের কারণ কী, বিষয়টি কারা পর্যালোচনা করেছেন এবং ভুল ধরা পড়লে কীভাবে তা সংশোধিত হবে। শুধু চূড়ান্ত বই প্রকাশ করে এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। পাঠ্যক্রম, পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন এবং মুদ্রণ-প্রক্রিয়ার প্রাসঙ্গিক নথি সহজে পাওয়া গেলে বিতর্ক প্রমাণের ভিত্তিতে এগোয়; নথি দুর্লভ হলে গুজব ও অনুমান জায়গা পায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ২০২৫ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রয়োজন তুলে ধরেছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের ভুল বা ইচ্ছাকৃত প্রতারণার প্রমাণ নয়; বরং শিক্ষার মতো জনস্বার্থের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখার গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করে।

তথ্য অধিকারকে কার্যকর করতে তাই কয়েকটি কাজ একসঙ্গে প্রয়োজন: তথ্য কমিশন সচল করা; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হালনাগাদ যোগাযোগ ও আবেদনপদ্ধতি সহজে প্রকাশ করা; গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিত স্বপ্রণোদিতভাবে উন্মুক্ত করা; প্রত্যাখ্যানের কারণ লিখিতভাবে জানানো; আংশিক প্রকাশ সম্ভব হলে গোপনীয় অংশ বাদ দিয়ে বাকি নথি দেওয়া; এবং পুরোনো নথি সংরক্ষণ ও অনুসন্ধানের ব্যবস্থা উন্নত করা। পাশাপাশি নাগরিককে তথ্য-সাক্ষর করে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে, প্রমাণ যাচাই করতে এবং প্রত্যাখ্যাত হলে প্রতিকার চাইতে পারেন। অধিকারটি তখনই কাগজ থেকে জীবনে পৌঁছাবে, যখন তথ্য চাওয়া সহজ হবে, তথ্য দেওয়া হবে নিয়মমাফিক, আর না দিলে জবাবদিহির পথও বাস্তবে খোলা থাকবে।

তথ্যের অধিকার থেকে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা: ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশের প্রশ্ন

তথ্য পাওয়ার অধিকার নিয়ে আলোচনা একসময় প্রধানত একটি প্রশ্নে সীমিত ছিল: নাগরিক চাইলে রাষ্ট্র কি নথি দেবে? ডিজিটাল যুগে তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে: নাগরিক যে তথ্য পাচ্ছেন, সেটি সময়মতো প্রকাশিত, নির্ভরযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য কি না? একটি সরকারি সিদ্ধান্তের মূল নথি সহজে পাওয়া না গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার খণ্ডিত ছবি, পুরোনো সংস্করণ বা মনগড়া ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন তথ্যের অভাব এবং ভুল তথ্যের আধিক্য একই সঙ্গে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যপ্রাপ্তি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য—“ডিজিটাল যুগে তথ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখা: তথ্য-বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় তথ্যপ্রাপ্তির ভূমিকা”—বাংলাদেশের জন্য তাই বিশেষ প্রাসঙ্গিক। জাতিসংঘের দিবসসংক্রান্ত বক্তব্যের মূল কথা হলো, তথ্যের প্রাচুর্যই যথেষ্ট নয়; মানুষের প্রয়োজন সময়োপযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য। রাষ্ট্র যদি সিদ্ধান্ত, ব্যয়, সেবার নিয়ম ও সংশোধিত উপাত্ত নিজে থেকে প্রকাশ করে, সাংবাদিক ও গবেষকেরা তা যাচাই করতে পারেন, আর নাগরিকেরা গুজবের সঙ্গে মূল উৎসের পার্থক্য বুঝতে পারেন। তবে সরকারি উৎস থেকে প্রকাশিত তথ্যকেও নির্ভুল ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই: প্রকাশের তারিখ, ব্যবহৃত পদ্ধতি, পরবর্তী সংশোধন এবং অন্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.১০.২: আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ—দুটি পৃথক প্রশ্ন

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সূচক ১৬.১০.২ পর্যবেক্ষণ করে দেশগুলো জনসাধারণের তথ্যপ্রাপ্তির জন্য সাংবিধানিক, আইনগত বা নীতিগত নিশ্চয়তা গ্রহণ করেছে কি না এবং তা বাস্তবায়ন করছে কি না। UNESCO এ সূচকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। ফলে কেবল তথ্য অধিকার আইন আছে কি না, সেটিই মূল্যায়নের বিষয় নয়; আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কার, আবেদন ও আপিলের তথ্য রাখা হয় কি না, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কি না এবং নাগরিকদের সচেতন করার উদ্যোগ আছে কি না—এসবও বিবেচনায় আসে।

 Bangladesh – 2025 Survey on Public Access to Information (SDG Indicator 16.10.2) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উত্তরগুলো দুটি ভাগে সাজানো: আইনগত কাঠামো গ্রহণ এবং সেই কাঠামোর বাস্তবায়ন। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের সব নাগরিকের অভিজ্ঞতার জরিপ নয়; এটি মূলত নির্দিষ্ট সূচক অনুযায়ী জমা দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর ও পরিসংখ্যানের সংকলন। তাই এর স্কোর দিয়ে একজন আবেদনকারী বাস্তবে কত সহজে, কত দ্রুত এবং কত ভালো মানের তথ্য পেয়েছেন—সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে: আইনে অধিকার, কর্তৃপক্ষে দায়িত্ব

প্রতিবেদনে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-কে বাংলাদেশের তথ্যপ্রাপ্তির প্রধান আইনগত নিশ্চয়তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে তথ্যপ্রাপ্তি তদারকির জন্য তথ্য কমিশনের বিধান, সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোতে তথ্যের আবেদন সামলানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের প্রয়োজন এবং কমিশনের তদারকি, আপিল, পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগসংক্রান্ত ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনটিতে কিছু তথ্য প্রকাশ না করার অনুমোদিত ক্ষেত্রও রয়েছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের উত্তর অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অপরাধ প্রতিরোধ বা তদন্ত এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো বিষয় এসব ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।

এ কাঠামোর তাৎপর্য একটি সাধারণ উদাহরণে বোঝা যায়। কোনো ইউনিয়নে পানির প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হলো, অথচ কয়েকটি এলাকায় পানি পৌঁছায়নি। বাসিন্দারা যদি প্রকল্পের অনুমোদন, বরাদ্দ, ঠিকাদারের কাজের পরিধি এবং কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রতিবেদন চাইতে পারেন, তবে আলোচনা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে নথির ভিত্তিতে এগোতে পারে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, তাঁর কাছে কীভাবে আবেদন করতে হবে কিংবা উত্তর না পেলে কোথায় যেতে হবে—এসব অস্পষ্ট থাকলে কাগজের অধিকার নাগরিকের কাজে লাগে না। আইন একটি দরজা তৈরি করে; দরজাটি ব্যবহারযোগ্য রাখা প্রশাসন ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের যে হিসাব পাওয়া যায়

ইউনেস্কো ২০২৫ সালে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে অংশগ্রহণকারী ১২৩টি দেশ ও অঞ্চলে অগ্রগতি এবং এখনো রয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারক, নাগরিক সমাজের সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য তুলনামূলক বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, স্বেচ্ছায় জাতীয় পর্যালোচনা (ভিএনআর) থেকে উদাহরণ এবং উত্তম চর্চার বিবরণ দেয়। এসবের মাধ্যমে দেখানো হয়, তথ্যপ্রাপ্তি কীভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, অধিক ক্ষমতায়িত জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখে।

ইউনেস্কোর জনসাধারণের তথ্যপ্রাপ্তি-বিষয়ক এই  জরিপ প্রতিবেদন বলছে, তথ্য অধিকার এখন আর কেবল জাতীয় আইনের বিষয় নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.১০.২-এর অগ্রগতি পরিমাপেরও অংশ। ওই বছর ১২৩টি দেশ ও অঞ্চল জরিপে অংশ নেয়—২০২০ সালের তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৪টি। একই সময়ে ১৪১টি দেশ ও অঞ্চলে তথ্যপ্রাপ্তির আইনি নিশ্চয়তা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেয় সংশ্লিষ্ট দেশের তথ্যপ্রাপ্তি আইন তদারকির দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান—যেমন তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন বা ন্যায়পাল—অথবা উপযুক্ত সরকারি সংস্থা। ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইনি নিশ্চয়তার পাশাপাশি তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং তথ্য বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক। বৈশ্বিক এই অগ্রগতির পরিসংখ্যানের পাশে তাই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও জরুরি: আইন ও কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কতটা সহজে তথ্য পাচ্ছে, আর প্রত্যাখ্যান বা বিলম্ব হলে প্রতিকারের পথ কতটা কার্যকর?

UNESCO-এর এই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সর্বশেষ উল্লিখিত পরিসংখ্যানের সময়কাল জানুয়ারি–ডিসেম্বর ২০২৪। এই বৈশ্বিক প্রতিবদেনের বাংলাদেশ অংশটি পর্যালোচনা করে সেখানে তথ্যের আনুষ্ঠানিক আবেদন ও আপিল বিষয়ে নিচের সংখ্যাগুলো পাওৗয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডে অনেক পিছিয়ে:

প্রতিবেদনে   উল্লিখিত বিষয়

২০২৪ সালের   সংখ্যা

প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক তথ্যের আবেদন

১২,১২৬

সম্পূর্ণ মঞ্জুর হিসেবে নথিভুক্ত আবেদন

১২,১২৬

বিচারাধীন হিসেবে নথিভুক্ত আবেদন

১৯৮

অযোগ্য হিসেবে খারিজ আবেদন

৭৭১

প্রত্যাখ্যাত হিসেবে নথিভুক্ত আবেদন

০

প্রাপ্ত আপিল

২৫১

সম্পূর্ণ মঞ্জুর হিসেবে নথিভুক্ত আপিল

১৬৫

বিচারাধীন আপিল

৯

এই হিসাব সরলভাবে যোগ করে সাফল্যের হার বের করা যায় না। কারণ প্রাপ্ত আবেদন ও সম্পূর্ণ মঞ্জুর আবেদন—উভয় ক্ষেত্রেই ১২,১২৬ দেখানোর পাশাপাশি ১৯৮টি বিচারাধীন এবং ৭৭১টি অযোগ্য হিসেবে খারিজের তথ্য দেওয়া হয়েছে। আপিলের ক্ষেত্রেও ২৫১টি প্রাপ্ত আপিলের বিপরীতে ১৬৫টি মঞ্জুর ও ৯টি বিচারাধীন দেখানো হলেও বাকিগুলোর নিষ্পত্তি এই সারণি থেকে স্পষ্ট হয় না। সংখ্যাগুলো ভিন্ন সময়ের আবেদনকে নির্দেশ করছে কি না, শ্রেণিবিন্যাসে একাধিক গণনা রয়েছে কি না, অথবা তথ্য জমার ক্ষেত্রে অসংগতি ঘটেছে কি না—প্রতিবেদনটি নিজে তার ব্যাখ্যা দেয় না।

এখানে আরও একটি সীমা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথ্য প্রকাশ না করা বা আংশিক প্রকাশের কারণভিত্তিক পৃথক পরিসংখ্যান রাখা হয় না। ফলে কোন ধরনের নথি বেশি আটকে যায়, কোন ছাড়ের বিধান কতবার ব্যবহৃত হয় এবং একটি দপ্তরের সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য কী—এসব প্রশ্নে এ তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। জনসাধারণের জন্য প্রকাশিত পরিসংখ্যান তখনই কার্যকর, যখন তার বিভাগ, গণনার নিয়ম এবং সংখ্যাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিষ্কার থাকে।

স্কোর ৯: কী বোঝায়, কী বোঝায় না

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট স্কোর ৯: আইনগত কাঠামো গ্রহণে ৫ এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত নির্বাচিত প্রশ্নে ৪। এটি জরিপের নির্ধারিত প্রশ্ন ও স্কোর পদ্ধতি অনুযায়ী পাওয়া ফল। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক তথ্যপ্রাপ্তিতে ‘১০-এর মধ্যে ৯’ অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, কিংবা তথ্যের গুণমান ও কমিশনের বর্তমান সক্ষমতা একই হারে সন্তোষজনক।

এই পার্থক্যটি জনআলোচনায় বজায় রাখা জরুরি। কোনো দেশের আইনে কমিশন থাকার বিধান থাকতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কমিশনে প্রয়োজনীয় নিয়োগ, শুনানি ও নিষ্পত্তির সক্ষমতা আছে কি না, তা আলাদাভাবে দেখতে হয়। আবার সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে—এমন উত্তর থেকে কত মানুষ অধিকারটি জেনেছেন এবং নিজে আবেদন করতে পারছেন, তা বোঝা যায় না। সূচক অগ্রগতি দেখার একটি মানচিত্র; নাগরিকের অভিজ্ঞতা বুঝতে আরও বিস্তারিত প্রমাণ প্রয়োজন।

সচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তি: কারা তথ্য চাইতে পারছেন?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তথ্য কমিশন বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ, সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং আবেদন ও আপিলের পরিসংখ্যান রাখার কাজ করেছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। একই প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, বার্ষিক বা অন্য প্রতিবেদনে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে নারী ও পুরুষ কতজন আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদনের ফলাফলে পার্থক্য আছে কি না—এই জরিপ থেকে জানা যায় না।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় তথ্যপ্রাপ্তির সাম্য বুঝতে আরও প্রশ্ন দরকার। গ্রাম ও শহরের আবেদনকারীরা কি সমান সুবিধা পান? প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কি ব্যবহারযোগ্য বিন্যাসে নথি পান? কম ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি অনলাইন ব্যবস্থা ছাড়া আবেদন করতে পারেন? ভূমি, ভাতা বা স্বাস্থ্যসেবার তথ্য চাইতে গিয়ে মানুষ কি নিজের অধিকার প্রয়োগ করছেন, নাকি দালাল বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছেন? এগুলো প্রতিবেদনে পরিমাপ করা নাগরিক অভিজ্ঞতার ফল নয়; বরং প্রতিবেদনের সীমা থেকে উঠে আসা পরবর্তী গবেষণা ও নীতিগত প্রশ্ন।

তথ্য-বিশৃঙ্খলা কমাতে প্রকাশের পদ্ধতিও বদলাতে হবে

ভুল তথ্য মোকাবিলায় শুধু ‘গুজবে কান দেবেন না’ বলা যথেষ্ট নয়। ধরুন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি বদলেছে বলে একটি পোস্ট ছড়াল। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে যদি পুরোনো বিধি থাকে, নতুন সিদ্ধান্তের তারিখ অস্পষ্ট থাকে এবং সংশোধিত নথি খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে নাগরিকের পক্ষে সত্য যাচাই করা কঠিন হবে। একইভাবে বন্যার সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবা, ভূমি-রেকর্ড বা সরকারি সহায়তার তালিকা দেরিতে কিংবা অস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হলে অনিশ্চয়তার জায়গাটি গুজব পূরণ করতে পারে।

তাই তথ্যের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারি প্রকাশনার ন্যূনতম কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার: নথির প্রকাশ ও সংশোধনের তারিখ, সিদ্ধান্তের মূল উৎস, পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, উপাত্ত তৈরির পদ্ধতি, পুরোনো সংস্করণ দেখার সুযোগ এবং ভুল ধরা পড়লে সংশোধনের দৃশ্যমান রেকর্ড। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠককে শিখতে হবে কীভাবে মূল নথির সঙ্গে প্রচারিত দাবি মিলিয়ে দেখতে হয়। এটি তথ্য অধিকার এবং তথ্য-সাক্ষরতার মিলনস্থল।

বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী কাজ: অধিকারকে ব্যবহারযোগ্য প্রমাণে রূপ দেওয়া

UNESCO জরিপ বাংলাদেশের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ভিত্তিচিত্র দিয়েছে: আইন রয়েছে, নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও তদারকির কাঠামো রয়েছে, আবেদন ও আপিলের হিসাবও জমা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই হিসাব আরও সুসংগত, বিস্তারিত ও যাচাইযোগ্য করা। প্রাপ্ত, নিষ্পত্তিকৃত, প্রত্যাখ্যাত, অযোগ্য ও বিচারাধীন আবেদনকে একই সংজ্ঞা ও নির্দিষ্ট সময়কাল অনুযায়ী প্রকাশ করতে হবে; আংশিক প্রকাশ ও তথ্য না দেওয়ার কারণ আলাদা করে জানাতে হবে; এবং বয়স, লিঙ্গ, অঞ্চল বা প্রবেশগম্যতার মতো প্রাসঙ্গিক বৈষম্য বোঝার উপযোগী তথ্য সংগ্রহ করতে হবে—ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে।

সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যেন তথ্য পেতে প্রথমে অনুমান, তদবির বা মধ্যস্থতাকারীর আশ্রয় নিতে বাধ্য না হন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই প্রকাশিত থাকবে; আরও নির্দিষ্ট নথি চাইলে আবেদন করা সহজ হবে; উত্তর না পেলে প্রতিকার কার্যকর হবে; আর প্রকাশিত তথ্য ভুল হলে তা সংশোধনের পথ থাকবে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের সামনে এই পূর্ণ প্রশ্নটিই রেখেছে: তথ্য কি শুধু কোথাও সংরক্ষিত আছে, নাকি মানুষ তা সময়মতো পেয়ে, বুঝে, যাচাই করে নিজের জীবন ও সমাজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করতে পারছেন?

আইনটির প্রতিশ্রুতি এবং তার সীমা

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিককে সরকারি কর্তৃপক্ষসহ আইনে সংজ্ঞায়িত নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য চাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের নবম ধারায় সাধারণত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য সরবরাহের বিধান রয়েছে; একাধিক তথ্য ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে। জীবন-মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা কারাগার থেকে মুক্তি-সম্পর্কিত তথ্যের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ার কথা। অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে কারণ জানানোর বিধানও আছে। এ বিধানগুলোর তাৎপর্য হলো—তথ্য দেওয়া কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বিষয় নয়, এটি নির্ধারিত দায়িত্ব।

তবে প্রত্যেক নথি সব পরিস্থিতিতে প্রকাশযোগ্য নয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা আইনসম্মতভাবে সংরক্ষিত কিছু তথ্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে। সমস্যাটি ব্যতিক্রম থাকার মধ্যে নয়; সমস্যা দেখা দেয় যখন ব্যতিক্রমের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট হয়, একটি সংবেদনশীল অংশের অজুহাতে গোটা নথিই আটকে রাখা হয়, অথবা আবেদনকারীকে জানানো হয় না কোন বিধানের ভিত্তিতে তথ্য দেওয়া যাচ্ছে না। আইনটি এ ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রেখেছে: কোনো নথির কিছু অংশ প্রকাশ অযোগ্য হলেও যুক্তিসংগতভাবে পৃথক করা গেলে প্রকাশযোগ্য অংশ দিতে হবে। প্রতিবন্ধী নাগরিকের তথ্য পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও আইনে রয়েছে।

তথ্য অধিকারকে সংবাদমাধ্যমের একচেটিয়া বিষয় ভাবারও কারণ নেই। কোনো পরিবার সরকারি ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা ও আবেদনের অবস্থা জানতে পারে; কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফল বা সনদসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের নথি চাইতে পারে; কোনো নাগরিক উন্নয়নকাজের অনুমোদন, বরাদ্দ বা নিরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারে। এ ধরনের তথ্য নাগরিককে শুধু উত্তর দেয় না, সেবার নিয়ম বুঝতে এবং নিজের প্রতি করা সিদ্ধান্তের যথার্থতা যাচাই করতে সাহায্য করে। আইনটির প্রতিশ্রুতি সেখানেই: কর্তৃপক্ষের নথি মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দাপ্তরিক সম্পদ নয়।

২০২৬ সালের সংশোধন: অগ্রগতি, অসম্পূর্ণতা

তথ্য অধিকার আইনে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন আনা হয়, যা পরদিন প্রকাশ্যে জানানো হয়। সংশোধনে তথ্যের সংজ্ঞায় স্মারক, মানচিত্র, চুক্তি, শ্রবণ-দৃশ্য উপকরণ এবং কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমসংক্রান্ত ইলেকট্রনিক বা কম্পিউটারে সংরক্ষিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ব্যয় এবং সম্পন্ন বা প্রস্তাবিত কার্যক্রমের তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্য দিতে অবহেলা বা ব্যর্থতার জরিমানাও বাড়ানো হয়েছে। এগুলো স্বচ্ছতা জোরদার করার সম্ভাব্য পদক্ষেপ।

তবে সংশোধন নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রশ্নও রয়েছে। সরকারি নোটশিট বা তার অনুলিপি তথ্যের সংজ্ঞা থেকে বাদ গেছে—অথচ অনেক সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি বোঝার জন্য নোটশিট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি চুক্তি বা লাইসেন্সের অধীনে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা এবং নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে আইনের আওতায় আনার মতো প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। তথ্য অধিকার ফোরাম ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা সংশোধনী অধ্যাদেশের পরিধি সীমিত বলে সমালোচনা করেছেন; একই সঙ্গে তাঁরা তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

আইন সংশোধন কাগজে অধিকার বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রয়োগের প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে নাগরিক তার সুফল পাবেন না। আবার কমিশন থাকলেও যদি আইনের ব্যতিক্রমের তালিকা বিস্তৃত বা অস্পষ্ট হয়, কিংবা প্রকাশের সংস্কৃতি না গড়ে ওঠে, তাহলে আবেদন ও আপিলের চাপ বাড়তেই থাকবে। তাই সংশোধনের বিচার শুধু নতুন সংজ্ঞা বা বাড়তি জরিমানায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; দেখতে হবে তথ্যপ্রার্থী সহজে আবেদন করতে পারছেন কি না, প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন কি না এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করছে কি না।

তথ্য কমিশন অচল হলে আপিলের সিঁড়ি ভাঙে

বাংলাদেশের তথ্য অধিকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোর একটি হলো তথ্য কমিশনের কার্যকারিতা। ২০২৪ সালের আগস্টে কমিশনাররা বিদায় নেওয়ার পর নতুন কমিশনার নিয়োগে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে কমিশনের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, প্রায় ৮৫০টি তথ্য অধিকার আবেদন কমিশনে জমে আছে; একই প্রতিবেদনে কমিশনারবিহীন অবস্থার কারণে নাগরিকের আপিল নিষ্পত্তি ব্যাহত হওয়ার কথা এসেছে।

তথ্য অধিকার আইনের কাঠামোয় কমিশন কেবল অভিযোগের বাক্স নয়। কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য না দিলে, অসম্পূর্ণ দিলে বা যুক্তিহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করলে নাগরিকের জন্য এটি প্রতিকার চাওয়ার পথ। সেই পথ কার্যকর না থাকলে আইন প্রয়োগের ঝুঁকি একপাশে ঝুঁকে পড়ে: আবেদনকারী সময়, শ্রম ও কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি নেন; কিন্তু দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে কি না, তা অনিশ্চিত থাকে। এর ফলে নাগরিক আবেদন করেও আস্থা হারাতে পারেন, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আইন মানার প্রণোদনা দুর্বল হয়।

Listen to the new song produced by Odhikarpatra to mark the International Day for Universal Access to Information 2026 on YouTube, and reflect on the realities and importance of the right to information in Bangladesh│Song 2: Keys in the Sea 📢 English Parody Song | World Information Rights Day | Folk Fusion Band

কমিশন নিয়োগে বিলম্বের কারণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা থাকতে পারে; সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু ব্যাখ্যা যাই হোক, আপিলব্যবস্থা দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা নাগরিকের অধিকারের জন্য গুরুতর সমস্যা। কমিশনার নিয়োগের স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ পদ্ধতি, মামলার হালনাগাদ তালিকা, নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশ—এসব ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা ফিরবে না। আইন সংশোধনের পাশাপাশি কমিশনকে সচল করাই তাই জরুরি। কারণ সিঁড়ি বানিয়ে তার মাঝখানের ধাপ ভেঙে রাখলে ছাদে ওঠার অধিকার বাস্তবে কারও কাজে লাগে না।

সেবার তথ্য না পেলে ব্যয় বাড়ে, বৈষম্যও

ধরা যাক, কোনো অভিভাবক জানতে চাইলেন সন্তানের বৃত্তির আবেদনে কী ঘাটতি আছে। দপ্তরের ওয়েবসাইটে নিয়ম নেই, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগাযোগ নম্বর অকার্যকর, আর কাউন্টারে তাঁকে বলা হলো “পরে আসেন”। রাজধানীতে থাকলে পরিচিত কাউকে ফোন করা বা আরেকবার দপ্তরে যাওয়া সম্ভব হতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী, দিনমজুর পরিবার, প্রতিবন্ধী নাগরিক কিংবা একা সন্তান লালনকারী অভিভাবকের জন্য একই অস্পষ্টতার দাম অনেক বেশি: যাতায়াতভাড়া, হারানো কর্মঘণ্টা, অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে আবেদন বাতিল, অথবা মধ্যস্বত্বভোগীকে অর্থ দেওয়া।

সেবা সম্পর্কে তথ্য অপ্রকাশিত থাকলে প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও নষ্ট হয়। কোনো সুবিধার যোগ্যতা কী, আবেদন কোথায় জমা দিতে হবে, কোন নথি লাগবে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোথায় আপিল করা যাবে—এসব প্রকাশ্যে না থাকলে নাগরিক ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হন। তখন একই নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা বোঝা কঠিন হয়। তথ্যের এই অসম বণ্টন অদৃশ্য করের মতো: দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে বেশি সময়, অর্থ ও যোগাযোগের পুঁজি খরচ করতে হয়।

এ অবস্থার সমাধান শুধু আরও আবেদন-ফরম ছাপানো নয়। সরকারি সেবার নিয়ম, ফি, সময়সীমা, যোগ্যতার মানদণ্ড, আবেদন নিষ্পত্তির অবস্থা এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সহজ ভাষায় ও একাধিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। তথ্য অনলাইনে দেওয়া হলে তা মোবাইল ফোনে পড়ার উপযোগী, হালনাগাদ এবং প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য ব্যবহারযোগ্য হওয়া দরকার। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা যেন একমাত্র পথ না হয়: যাঁদের ইন্টারনেট বা ডিজিটাল দক্ষতা নেই, তাঁদের জন্য সরাসরি সহায়তা বজায় রাখতে হবে। তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হলে শুধু স্বচ্ছতা বাড়ে না; সেবার পেছনে নাগরিকের অপ্রয়োজনীয় সময় ও অর্থ ব্যয়ও কমে।

পাঠ্যবইয়ের তথ্য: সত্য যাচাইয়েরও পাঠ

বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই রাষ্ট্রের অনুমোদিত জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিশু সেখানে ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভাষা ও সমাজ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায়। তাই পাঠ্যবইয়ে কোনো ভুল, পক্ষপাত, অস্পষ্টতা বা হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা শুধু সম্পাদনার সমস্যা নয়; প্রশ্ন ওঠে, বিষয়বস্তুটি কে নির্ধারণ করেছেন, কোন প্রমাণের ভিত্তিতে, কোন পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় এবং পরিবর্তনের কারণ জনসমক্ষে আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর না দিলে পাঠ্যবইয়ের ওপর আস্থা ক্ষয়ে যায়। একে ইচ্ছাকৃত প্রতারণা বলে ঘোষণা করা যায় না—তার জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ দরকার—তবে নথি ও ব্যাখ্যা অপ্রকাশিত থাকলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতারণার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পান না।

পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার মানে শুধু চূড়ান্ত বইয়ের পিডিএফ প্রকাশ করা নয়। পাঠ্যক্রমের খসড়া, পর্যালোচক ও সম্পাদনা কমিটির দায়িত্ব, অনুমোদনের ধাপ, সংশোধনের তালিকা, মুদ্রণ ও বিতরণের চুক্তি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং ভুল শনাক্ত হলে সংশোধনের প্রক্রিয়া—এসব তথ্যও জনস্বার্থের অংশ। ব্যক্তিগত তথ্য বা আইনসম্মতভাবে গোপনীয় অংশ বাদ দিয়ে নথির বাকি অংশ প্রকাশ করা যায়। শিক্ষার্থীরা তখন বুঝতে পারে জ্ঞান কীভাবে তৈরি ও সংশোধিত হয়; শিক্ষকও নির্ভরযোগ্য সংস্করণ শনাক্ত করতে পারেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওয়েবসাইটে আইন, প্রতিবেদন, শিক্ষাক্রম এবং তথ্য অধিকারসংক্রান্ত বিভাগ রয়েছে। কিন্তু ওয়েবসাইটে বিভাগ থাকা আর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়মিত, অনুসন্ধানযোগ্য ও সহজ ভাষায় প্রকাশ করা এক বিষয় নয়। ২০২৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনায় স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়; তাদের বক্তব্যে পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণের দায়িত্ব বদলানোর আগে প্রতিষ্ঠানের শাসনগত দুর্বলতা সমাধানের প্রয়োজনও তুলে ধরা হয়। এই বিতর্কে মূল শিক্ষা হলো—দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের, তা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সিদ্ধান্তের নথি ও জবাবদিহি নাগরিকের নাগালে আছে কি না, সেটিই আস্থার ভিত্তি।

তথ্যের অখণ্ডতা: সত্য বলার দায়িত্ব শুধু নাগরিকের নয়

জাতিসংঘের Global Principles for Information Integrity তথ্যের পরিবেশ নিয়ে পাঁচটি পরস্পরসম্পর্কিত নীতি তুলে ধরে: সামাজিক আস্থা ও সহনক্ষমতা, সুস্থ প্রণোদনা, জনগণের সক্ষমতা, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক সংবাদমাধ্যম এবং স্বচ্ছতা ও গবেষণা। এর মূল প্রশ্ন হলো—মানুষ কি বৈচিত্র্যময় ও নির্ভরযোগ্য উৎস পাচ্ছেন, তথ্য কীভাবে ছড়াচ্ছে তা বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন, এবং প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নীতিগুলোর একটি সরল পরীক্ষা হতে পারে সরকারি ঘোষণার পরের কয়েক ঘণ্টা। সিদ্ধান্তটির মূল আদেশ কি প্রকাশিত হয়েছে? সেখানে কার্যকর হওয়ার তারিখ আছে? আগের নিয়মের সঙ্গে পার্থক্য বোঝানো হয়েছে? ভুল ব্যাখ্যা ছড়ালে কর্তৃপক্ষ কি মূল নথি দেখিয়ে তা সংশোধন করতে পারছে? যদি উত্তরগুলো অনিশ্চিত হয়, তবে শুধু নাগরিককে ‘গুজব বিশ্বাস করবেন না’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না। নির্ভরযোগ্য তথ্যের পথটিও খোলা রাখতে হয়।

জাতিসংঘের নীতিমালায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রযুক্তি কোম্পানি, বিজ্ঞাপনদাতা, সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বের কথা আছে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দায়িত্বটি দ্বিমুখী: জনস্বার্থের তথ্য সহজলভ্য করা এবং ভুল তথ্য মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষিত রাখা। কোনো দাবিকে ‘ভুল’ আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন করার জায়গা বন্ধ করে দিলে তথ্যের ওপর আস্থা আরও কমতে পারে। ভুলের জবাব হওয়া উচিত যাচাইযোগ্য প্রমাণ, স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনমতো সংশোধন। [উৎস: জাতিসংঘের Global Principles for Information Integrity: Recommendations for Multi-stakeholder Action (২০২৪)।]

পাঠ্যবইয়ের পেছনের সিদ্ধান্তটিও জনস্বার্থের বিষয়

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের হাতে শেষ পর্যন্ত একটি মুদ্রিত বই পৌঁছায়। কিন্তু সেই বইয়ের পেছনে থাকে বিষয়বস্তু নির্বাচন, বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন ও মুদ্রণের ধাপ। জনআলোচনায় ভুল বা বিতর্ক দেখা দিলে শুধু বইয়ের চূড়ান্ত পৃষ্ঠা দেখিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না। কোন সংস্করণে কোন পরিবর্তন এসেছে এবং তার যুক্তি কী—এমন তথ্য প্রকাশের একটি নিয়মিত পদ্ধতি থাকলে শিক্ষকও শ্রেণিকক্ষে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেন।

এখানে প্রত্যেক খসড়া বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য অবাধে প্রকাশের কথা বলা হচ্ছে না। প্রাসঙ্গিক গোপনীয়তা রক্ষা করেও সংস্করণভিত্তিক পরিবর্তনের তালিকা, সংশোধনের কারণ, অনুমোদনের তারিখ এবং ভুল জানানোর পদ্ধতি প্রকাশ করা সম্ভব কি না, সেটিই নীতিগত প্রশ্ন। উদাহরণস্বরূপ, একটি পাঠ্যবইয়ে পরিসংখ্যান সংশোধিত হলে কর্তৃপক্ষ ‘আগের সংস্করণে কী ছিল, নতুন সংস্করণে কী হলো, কেন হলো’—এই তিনটি বিষয় জানাতে পারে। এতে ভুল স্বীকার ও সংশোধন প্রশাসনিক দুর্বলতার লক্ষণ না হয়ে দায়িত্বশীলতার চর্চা হয়।

ডিজিটাল মঞ্চে দৃশ্যমানতা কীভাবে তৈরি হয়

সরকারি নথি প্রকাশ করলেই মানুষ সেটি দেখবেন, এমন নয়। অনেকেই খবর পান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও বা অন্যের পাঠানো বার্তা থেকে। UNESCO-র Guidelines for the Governance of Digital Platforms মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নকশা, কনটেন্ট বাছাই ও প্রদর্শনের নিয়মও তথ্য পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। এ ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা, মানবাধিকারসম্মত সিদ্ধান্ত এবং ব্যবহারকারীর অভিযোগের প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে পাঠ্যবই নিয়ে একটি যাচাইহীন ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, অথচ মূল সংশোধনী বিজ্ঞপ্তিটি খুঁজে পেতে কয়েকটি ওয়েবপাতা ঘুরতে হতে পারে। এর প্রতিকার কেবল ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমিত রাখা যায় না। কর্তৃপক্ষকে মূল নথি সহজে খুঁজে পাওয়ার মতো করে প্রকাশ করতে হবে; সংবাদমাধ্যমকে নথির সঙ্গে দাবি মিলিয়ে দেখতে হবে; প্ল্যাটফর্মকেও কনটেন্ট পরিচালনার নিয়মে জবাবদিহি রাখতে হবে। UNESCO-র নির্দেশিকায় ভুল তথ্য ও বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্টের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি মতপ্রকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুরক্ষার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। [উৎস: UNESCO, Guidelines for the Governance of Digital Platforms: Safeguarding Freedom of Expression and Access to Information through a Multistakeholder Approach (২০২৩)।]

গুজব থেকে বিদ্বেষ: প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয় কখন

সব ভুল তথ্য বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নয়। আবার কোনো কঠোর সমালোচনাকেও কেবল অস্বস্তিকর বলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বলা যায় না। তবে যাচাইহীন দাবি যখন কোনো ধর্মীয়, জাতিগত বা অন্য পরিচয়ের মানুষকে লক্ষ্য করে ভয় ও শত্রুতা তৈরি করে, তখন তথ্যের ভুলের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়। জাতিসংঘের #NoToHate উপকরণ নতুন যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের বিস্তার এবং তার সামাজিক ক্ষতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

UNESCO-র ২০২৬ সালের Media and Information Literacy: Combating Hate Speech in the Digital Age বিষয়ক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনের গুরুত্ব এখানেই। এতে শুধু ক্ষতিকর বক্তব্য শনাক্ত করার কথা নেই; তথ্যের উৎস পরীক্ষা, নিজের পূর্বধারণা বুঝতে শেখা, সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা এবং অন্যের মর্যাদা বজায় রেখে আলোচনা করার দক্ষতার কথাও আছে। প্রতিবেদনটি সতর্ক করে যে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সর্বজনস্বীকৃত একটিমাত্র সংজ্ঞা নেই; প্রেক্ষাপট ও মতপ্রকাশের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি বিচার করতে হয়।

বিদ্যালয়ে এর প্রয়োগ হতে পারে একটি পাঠ থেকে। শিক্ষার্থীরা একটি আলোচিত পোস্ট দেখবে, তার মূল উৎস খুঁজবে, ছবির তারিখ মিলিয়ে দেখবে, তারপর আলোচনা করবে—পোস্টটি কোনো ভুল দাবি করছে কি না এবং সেটি কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে কি না। এই শেখা শুধু শিশুদের জন্যও নয়। শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের তথ্যপরিবেশও বদলাচ্ছে; তাঁদের জন্যও নিয়মিত শেখার সুযোগ প্রয়োজন। [উৎস: জাতিসংঘের “#NoToHate” উপকরণ এবং UNESCO, Media and Information Literacy: Combating Hate Speech in the Digital Age (২০২৬)।]

সবার জন্য তথ্য চাইলে তথ্যের রূপও বদলাতে হবে

একটি সরকারি ওয়েবসাইটে স্ক্যান করা ছবি হিসেবে নথি আপলোড হলো। অনেকে সেটি পড়তে পারছেন, কিন্তু স্ক্রিন রিডার ব্যবহারকারী একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাগরিক নথির লেখা শনাক্ত করতে পারছেন না। একটি জরুরি ভিডিওতে বক্তব্য আছে, কিন্তু সাবটাইটেল বা সংকেতভাষার ব্যবস্থা নেই। দুটো ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, ‘তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে’; সংশ্লিষ্ট নাগরিক বলতে পারেন, ‘আমি তথ্যটি ব্যবহার করতে পারছি না।’ তথ্যপ্রাপ্তির বাস্তব মাপকাঠি এই ব্যবধানেই।

UNESCO Disability Inclusion Strategy 2026–2029-এর যোগাযোগ ও তথ্যসংক্রান্ত অংশে সহজে ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল বিন্যাস, সাবটাইটেল, ট্রান্সক্রিপ্ট, অডিও বিবরণ, সরল নেভিগেশন ও সংকেতভাষার মতো ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের কোনো সরকারি দপ্তরের সেবার মূল্যায়ন নয়; বাংলাদেশের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নীতিগত দিশা। শিক্ষা বোর্ডের ঘোষণা, ভর্তি নির্দেশনা, দুর্যোগের সতর্কতা বা তথ্যের আবেদনের ফরম তৈরি করার সময় শুরু থেকেই বিভিন্ন মানুষের ব্যবহার বিবেচনা করা যায়। তথ্যের দরজা সবার জন্য খুলতে হলে একই নথি সবার পক্ষে একইভাবে ব্যবহারযোগ্য ধরে নেওয়া চলবে না। [উৎস: UNESCO, Disability Inclusion Strategy 2026–2029, বিশেষত “Communication and Information” অংশ।]

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের বাজার

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের প্রবাহ দ্রুত এবং বহুমুখী। কোনো ঘটনা বা সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মানুষ প্রথমে সেখানেই জানতে পারেন। একই সঙ্গে এই মাধ্যমগুলোতে যাচাইহীন দাবি, পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে প্রচার, কাটছাঁট করা ভিডিও এবং আবেগ উসকে দেওয়া ব্যাখ্যাও দ্রুত ছড়ায়। কিছু নির্মাতা দর্শকসংখ্যা, বিজ্ঞাপন বা অনুসারী বাড়াতে এমন উপস্থাপন বেছে নিতে পারেন যা জটিল সত্যকে সরল করে, সন্দেহকে নিশ্চিত দাবি বানায়, কিংবা “গোপন তথ্য ফাঁস” বলে অযাচাইকৃত বক্তব্য বিক্রি করে। এদের সবাইকে একইভাবে চিহ্নিত করা যায় না; অনেকেই সৎভাবে সংবাদ ও অভিজ্ঞতা ভাগ করেন। কিন্তু তথ্যের বাজারে প্রমাণের চেয়ে আকর্ষণীয় গল্পের দাম বেশি হয়ে উঠলে ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই ঝুঁকিকে শুধু নাগরিকের “সচেতনতার অভাব” বলে ব্যাখ্যা করলে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় আড়াল হয়। কোনো নীতি বা পাঠ্যবই সংশোধনের নির্ভরযোগ্য নথি সহজে পাওয়া না গেলে, গুজবের দাবিকে যাচাই করতে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন? সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো ওয়েবসাইট, ভাঙা সংযোগ, অস্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি বা দীর্ঘ নীরবতা তথ্যের শূন্যতা বাড়ায়। সেই শূন্যতায় অনুমান সত্যের বিকল্প হয়ে ওঠে। গবেষকেরা বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো ও যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণায় সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী যাচাইকারী ও ব্যবহারকারীদের সক্ষমতা এবং সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন।

তথ্য উন্মুক্ত করলেই গুজব উধাও হবে না; মানুষকে উৎস যাচাই, তারিখ দেখা, ছবি-ভিডিওর প্রেক্ষাপট বোঝা এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস মিলিয়ে পড়ার শিক্ষা দিতে হবে। তবে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত, দ্রুত ও বোধগম্য তথ্যপ্রকাশ সেই যাচাইকে বাস্তবসম্মত করে। ভুল হলে সংশোধনও দৃশ্যমান হতে হবে: কী ভুল ছিল, কোন সংস্করণে, কখন এবং কীভাবে সংশোধন হলো। নীরব সংশোধন পুরোনো ভুলের ছায়া রেখে যায়। স্বচ্ছ সংশোধন বরং মানুষকে শেখায়—তথ্য বদলাতে পারে, কিন্তু প্রমাণসহ বদলানোই জ্ঞানের সততা।

গোপনীয়তার যুক্তি ও প্রকাশের দায়

তথ্যের সর্বজনীন প্রবাহের পক্ষে কথা বলার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি নথিই জনসমক্ষে তুলে দিতে হবে। ব্যক্তির চিকিৎসা, ঠিকানা, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য বা শিশুদের সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত নথি প্রকাশ করলে ক্ষতি হতে পারে। চলমান তদন্ত, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও বাস্তব। তাই তথ্য অধিকার এবং গোপনীয়তা—দুটির মধ্যে ভারসাম্য দরকার। কিন্তু “গোপনীয়তা” শব্দটি যেন জনস্বার্থের নথি আটকে রাখার সহজ ঢাল না হয়ে ওঠে। কোন তথ্য গোপন, কেন গোপন, কত দিন গোপন থাকবে এবং তা আংশিকভাবে প্রকাশ করা যায় কি না—এসব সিদ্ধান্তে লিখিত কারণ ও আপিলের সুযোগ থাকা উচিত।

অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোও বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা বলেন: নথি সংরক্ষণের দুর্বলতা, জনবলস্বল্পতা, পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাল না হওয়া, একই তথ্য বারবার চাওয়ার চাপ এবং আবেদন অস্পষ্ট হওয়ার সমস্যা। এসব বক্তব্যকে অস্বীকার করে “সব তথ্য ইচ্ছা করেই লুকানো হয়” বলা ন্যায্য নয়। কিন্তু সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দায়িত্বকে বিলুপ্ত করে না। কোন নথি নেই, কোন দপ্তরে আছে, খুঁজতে কত সময় লাগবে—তা নাগরিককে জানানোও জবাবদিহির অংশ। পুরোনো নথির ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তথ্যের শ্রেণিবিন্যাসে স্পষ্ট নিয়ম করা প্রশাসনের কাজ।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশে তথ্যের পরিধি বিস্তৃত হলেও নোটশিট বাদ পড়ার বিষয়টি বিতর্ক তৈরি করেছে। নীতিনির্ধারণের পেছনের যুক্তি সবসময় প্রকাশ করা যাবে কি না, সেটি আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে বিবেচনার বিষয়; তবে পুরো সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া গোপন রাখার ফলে নাগরিকের বোঝাপড়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সঠিক ভারসাম্য মানে অবাধ প্রকাশ নয়; বরং নির্দিষ্ট ক্ষতির যুক্তি দেখিয়ে সীমিত গোপনীয়তা, এবং জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য অংশের সর্বোচ্চ সুযোগ।

তথ্য সংস্কৃতির জন্য করণীয়

তথ্য অধিকারকে কার্যকর করতে প্রথমেই তথ্য কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করা এবং কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ করা জরুরি। আবেদনকারীর আপিল মাসের পর মাস পড়ে থাকলে আইনের সময়সীমা কাগজে কার্যকর হলেও বাস্তবে তা অর্থহীন। কমিশনের সিদ্ধান্ত, নিষ্পত্তির গড় সময়, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং প্রতিষ্ঠানের সম্মতি বা অমান্যতার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। ২০২৬ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশের বিধানগুলো কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে—বিশেষ করে স্বপ্রণোদিত প্রকাশ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও সরকারি ব্যয়ের তথ্য—তারও পর্যবেক্ষণ দরকার। শুধু জরিমানা বাড়িয়ে লাভ হবে না; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সহায়তা এবং স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।

প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে তথ্য অধিকার অংশটি সহজে খুঁজে পাওয়ার মতো হতে হবে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ পরিচিতি, আবেদনপদ্ধতি, ফি, সময়সীমা, আবেদন-ফরম, তথ্যের তালিকা এবং আগের উত্তরগুলো রাখা যেতে পারে। তথ্যপ্রার্থীর পরিচয় বা আবেদন-প্রকৃতি প্রকাশ করে তাঁকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, কম ডিজিটাল দক্ষতার মানুষ এবং বাংলা ভাষায় তথ্য প্রয়োজন এমন নাগরিকের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সহায়তা কেন্দ্র ও নাগরিকসেবা ডেস্ক এই ব্যবধান কমাতে পারে।

শিক্ষা খাতে একটি উন্মুক্ত ও অনুসন্ধানযোগ্য পাঠ্যবই-তথ্যভান্ডার গড়া সম্ভব। সেখানে প্রতিটি বইয়ের সংস্করণ, প্রকাশের তারিখ, সংশোধনের তুলনামূলক তালিকা, পর্যালোচনা প্রক্রিয়া, অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য এবং ভুল সংশোধনের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে থাকবে। পাঠ্যবই নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কর্তৃপক্ষের উচিত নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা ও সংস্করণ ধরে জবাব দেওয়া, যাচাইয়ের প্রমাণ দেখানো এবং ভুল পাওয়া গেলে সংশোধনের সময়সীমা জানানো। শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে তথ্য যাচাই ও উৎস-সচেতনতার শিক্ষা দেওয়াও জরুরি। এভাবে পাঠ্যবই কেবল উত্তর মুখস্থ করার উপকরণ থাকবে না; জ্ঞান কীভাবে যাচাই হয়, তার জীবন্ত পাঠ হয়ে উঠবে।

তথ্য-সাক্ষরতার একটি সমন্বিত সংজ্ঞা

তথ্য-সাক্ষরতা (Information Literacy) হলো কোনো প্রশ্ন, সিদ্ধান্ত বা সমস্যার জন্য কখন এবং কেন তথ্য প্রয়োজন, কী ধরনের তথ্য দরকার, তা কোন উৎসে ও কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে—এসব বুঝে তথ্য শনাক্ত, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য। এর মধ্যে তথ্যের উৎসের প্রাসঙ্গিকতা, নির্ভরযোগ্যতা, সময়োপযোগিতা, প্রমাণভিত্তি ও সম্ভাব্য পক্ষপাত সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করা; বিভিন্ন উৎসের তথ্য তুলনা ও সমন্বয় করা; এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তথ্য কার্যকরভাবে ব্যবহার করার দক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে তথ্য যথাযথভাবে উদ্ধৃত করা, মেধাস্বত্ব ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্মান করা, আইন ও নৈতিকতার সীমা মেনে চলা এবং নিজের অনুসন্ধানের ফল দায়িত্বশীলভাবে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ বা ভাগ করে নেওয়াও তথ্য-সাক্ষরতার অংশ।

অতএব, তথ্য-সাক্ষর ব্যক্তি কেবল তথ্য খুঁজে পান না; তিনি বুঝতে পারেন কোন তথ্যটি তাঁর প্রয়োজন মেটায়, সেটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে কি না, এবং তা ব্যবহার বা প্রচার করলে কারও অধিকার বা নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হতে পারে কি না। তথ্যকে প্রশ্নের উত্তর, সমস্যা সমাধান ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগানোর এই সম্পূর্ণ সক্ষমতাই তথ্য-সাক্ষরতা।

UNESCO–CLD-এর ‘গ্লোবাল স্ট্রেস টেস্ট’: আইন আছে, আবেদন করলে উত্তর আসে কি?

বাংলাদেশের তথ্য অধিকার নিয়ে আগের অংশে UNESCO-র ২০২৫ সালের জরিপের হিসাব এসেছে। সেখানে আইনগত কাঠামো, তথ্য কমিশনের দায়িত্ব এবং কর্তৃপক্ষের জমা দেওয়া আবেদন-আপিলের পরিসংখ্যান দেখা যায়। কিন্তু নাগরিকের অভিজ্ঞতার একটি প্রশ্ন থেকে যায়: একটি নির্দিষ্ট নথি চেয়ে আবেদন পাঠালে দপ্তর আসলে কী করে? এই প্রশ্ন পরীক্ষা করতে Centre for Law and Democracy (CLD) UNESCO-র সহায়তায় তথ্য অধিকার আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক Global Stress Test পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যপ্রাপ্তি দিবসে এর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।l

পরীক্ষার পদ্ধতিটি ছিল সরাসরি। বিভিন্ন দেশে স্বেচ্ছাসেবীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে একই ধরনের দুটি তথ্যের আবেদন করেন। একটিতে চাওয়া হয় ২০২০–২০২২ সময়কালে কেনা কোভিড-১৯ টিকার নাম ও ডোজসংখ্যার নথি; অন্যটিতে চাওয়া হয় ২০২১–২০২৩ সময়কালের ব্যয়বহুল পরিবেশগত ঘটনাগুলোর প্রতিকারব্যয় ও প্রতিবেদন। প্রশ্ন দুটির উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন দেশে আবেদন গ্রহণ, প্রাপ্তিস্বীকার, তথ্য সরবরাহ এবং উত্তর দিতে সময় লাগার অভিজ্ঞতা তুলনা করা।

প্রতিবেদনে ৭৬টি দেশের ১৪৬টি আবেদনের ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে; বাংলাদেশ ওই ৭৬টি দেশের তালিকায় রয়েছে। বৈশ্বিক ফল উদ্বেগজনক: ৩৮ শতাংশ আবেদন কোনো substantive বা বিষয়বস্তুভিত্তিক উত্তর পায়নি। বিপরীতে ৪২ শতাংশ আবেদনে চাওয়া তথ্য সম্পূর্ণ পাওয়া গেছে, যদিও তার কিছু উত্তর দেরিতে এসেছে। আংশিক প্রাপ্তিসহ মোট ৫৪ শতাংশ আবেদনে কিছু না কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। মাত্র ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আবেদন গ্রহণের প্রাপ্তিস্বীকার দেওয়া হয়েছিল। এগুলো পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত আবেদনগুলোর সম্মিলিত ফল; বাংলাদেশের নিজস্ব শতকরা হার নয়।

এখানে ‘নীরব প্রত্যাখ্যান’ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কোনো দপ্তর লিখিতভাবে তথ্য দিতে অপারগতার কারণ জানালে আবেদনকারী সেই কারণ যাচাই করে আপিল করতে পারেন। কিন্তু বিষয়বস্তুভিত্তিক উত্তরই না এলে তিনি জানেন না—আবেদনটি বিবেচিত হয়েছে কি না, তথ্য আদৌ আছে কি না, কিংবা অপেক্ষার পর তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত। প্রাপ্তিস্বীকার না থাকলে আবেদন জমা দেওয়ার ঘটনাটিই প্রমাণ করাও কঠিন হতে পারে। ফলে নীরবতা কেবল বিলম্ব নয়; এটি প্রতিকার পাওয়ার পথও দুর্বল করে।l

বাংলাদেশের জন্য দুটি উৎস পাশাপাশি পড়া জরুরি। UNESCO দেশের জরিপে তথ্য অধিকার আইন ও বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ পাওয়া যায়; CLD-এর পরীক্ষায় দেখা হয় বাস্তব আবেদন করলে দপ্তর কীভাবে সাড়া দেয়। প্রথমটি মূলত জমা দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে, দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট কিছু আবেদন করে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি। এই দুই পদ্ধতি পরস্পরকে সম্পূরক করে, কিন্তু কোনোটিকেই নাগরিকের সব ধরনের তথ্যপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতার পূর্ণ ছবি বলা যায় না। বিশেষত CLD নিজেই সতর্ক করেছে যে প্রতি দেশে মাত্র দুটি আবেদন দিয়ে সেই দেশের সব কর্তৃপক্ষের গড় কর্মক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না। প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদন বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করলেও মূল আলোচনায় বাংলাদেশের দুটি আবেদনের পৃথক ফল বা জাতীয় স্কোর দেয় না; তাই বৈশ্বিক ৩৮ শতাংশ ‘নীরব প্রত্যাখ্যান’ বাংলাদেশের হার হিসেবে ব্যবহার করা ভুল

তবু পরীক্ষাটি বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর প্রশ্নমালা দেয়। ভূমির খতিয়ান, বিদ্যালয়ের বরাদ্দ, হাসপাতালের ওষুধ কেনা কিংবা স্থানীয় জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যয়—এসব বিষয়ে একই পদ্ধতিতে আবেদন করলে দেখা সম্ভব: আবেদন জমা নেওয়া হয় কি না; রসিদ দেওয়া হয় কি না; নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ নথি আসে কি না; আংশিক তথ্য দিলে বাদ দেওয়ার কারণ জানানো হয় কি না; এবং উত্তর না এলে আপিল কাজ করে কি না। শিক্ষা ও নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে এমন পর্যবেক্ষণ করলে কোথায় প্রশিক্ষণ, নথি ব্যবস্থাপনা বা তদারকির ঘাটতি রয়েছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে।

২০২৬ সালের তথ্যের অখণ্ডতা ও তথ্য-বিশৃঙ্খলার আলোচনায় এই স্ট্রেস টেস্টের শিক্ষা আরও গভীর। কোনো জনস্বার্থের তথ্যের জন্য সরকারি নথি চাওয়া হলো, অথচ উত্তর এল না—এমন শূন্যস্থানে গুজব ও অনুমান ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তাই বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপরিবেশ গড়তে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইন রাখা নয়; প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, উত্তর দেওয়ার প্রমাণ রাখা এবং নাগরিককে মূল নথি যাচাইয়ের বাস্তব সুযোগ করে দেওয়া।

বিশ্বের আয়নায় বাংলাদেশ: তথ্য অধিকার সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছেছে?

তথ্য অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বোঝার জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্কোর দেখা যথেষ্ট নয়। তুলনার অন্তত তিনটি প্রশ্ন আছে: আইনে কী অধিকার দেওয়া হয়েছে, আবেদন করার পথ কতটা সহজ, এবং আবেদন করলে মানুষ বাস্তবে কী উত্তর পান? একটি দেশ আইনের ভাষায় এগিয়ে থেকেও দপ্তরের নীরবতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্য দেশে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও সব আবেদন দ্রুত বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়—এমন নিশ্চয়তা নেই।

UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৪১টি দেশ ও অঞ্চলে জনসাধারণের তথ্যপ্রাপ্তির আইনগত নিশ্চয়তা ছিল এবং ১২৩টি দেশ ও অঞ্চল তার জরিপে অংশ নেয়। জরিপটি আইন গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্বাচিত দিক দেখে; দেশগুলোকে ‘ভালো’, ‘মাঝারি’ বা ‘খারাপ’ শ্রেণিতে ফেলে না। এতে বাংলাদেশ প্রতিবেদনে পাওয়া ৯ স্কোরকে ১০-এর মধ্যে নাগরিক সন্তুষ্টির নম্বর হিসেবেও পড়া যাবে না—ওই জরিপের মোট স্কোরের সীমাই ৯। অতএব বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে ওই ফলের পাশাপাশি বাস্তব আবেদন, আপিল এবং নাগরিকের অভিজ্ঞতা দেখতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার কাছের তুলনা

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের কাঠামো এবং নাগরিককে সহায়তার পদ্ধতিতে মিল যেমন আছে, তেমনি শেখার মতো পার্থক্যও আছে।

দেশ

তুলনায়   দৃশ্যমান ব্যবস্থা

বাংলাদেশের   জন্য প্রশ্ন

বাংলাদেশ

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯; তথ্য কমিশন এবং তথ্যের জন্য অনলাইন   আবেদন ও আপিলের ব্যবস্থা

আবেদন থেকে প্রতিকার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ   সাধারণ মানুষ কত সহজে ব্যবহার করতে পারছেন?

ভারত

কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের   জন্য অনলাইন তথ্যের আবেদন এবং প্রথম আপিলের পোর্টাল

আবেদন, প্রাপ্তিস্বীকার, অবস্থান দেখা   ও আপিল কি একটি সহজ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রাখা যায়?

শ্রীলঙ্কা

তথ্য অধিকার আইন, তথ্য কমিশনে আপিলের উপকরণ এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের নির্দেশনা

আবেদন করার আগেই কোন সিদ্ধান্ত ও সেবার তথ্য   প্রকাশ করা উচিত?

নেপাল

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৭-এর অধীনে জাতীয় তথ্য কমিশন; অধিকার ব্যবহারের নির্দেশনামূলক উপকরণ

নাগরিককে নিজের ভাষায় আবেদন ও প্রতিকারের   পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে কীভাবে?

পাকিস্তান

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তথ্যপ্রাপ্তির আইন এবং   পাকিস্তান তথ্য কমিশন

আইনের আওতায় কোন প্রতিষ্ঠান পড়বে এবং   জনস্বার্থে অর্থ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের হিসাব কতটা উন্মুক্ত হবে?

এই সারণি দেশগুলোর সাফল্যের ক্রমতালিকা নয়; এটি প্রকাশিত সরকারি ব্যবস্থাগুলোর তুলনা। ভারতের কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল রাজ্য সরকারের সব দপ্তরের জন্য একই পোর্টাল নয়। একইভাবে কোনো দেশে তথ্য কমিশন বা আবেদনপত্র থাকা থেকে তার সব আবেদনকারী সন্তোষজনক ফল পাচ্ছেন—এ সিদ্ধান্ত টানা যায় না। বাংলাদেশেরও অনলাইন আবেদন ও আপিলের পথ আছে; এখন তার ব্যবহারযোগ্যতা, নিয়মিত নিষ্পত্তি এবং অফলাইনে সহায়তার মান যাচাই করাই মূল কাজ।

সাধারণ মানুষের জায়গা থেকে তুলনাটি আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের একজন কৃষক জমির রেকর্ড, ভারতের একজন নাগরিক কেন্দ্রীয় দপ্তরের নথি, কিংবা শ্রীলঙ্কার একজন অভিভাবক সরকারি সেবার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে প্রথম বাধা প্রায় একই: সঠিক কর্তৃপক্ষ ও সঠিক নথি শনাক্ত করা। এরপর দেখা দেয় আবেদন গ্রহণের প্রমাণ, ভাষা, সময় এবং উত্তর না এলে আপিলের প্রশ্ন। একটি কার্যকর পোর্টাল কিছু ধাপ সহজ করতে পারে; কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারা মানুষের জন্য সরাসরি সহায়তাও সমান জরুরি।

অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞতা: অধিকার কার তথ্য পর্যন্ত যায়?

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা তুলনায় একটি ভিন্ন দিক যোগ করে। দেশটির Promotion of Access to Information Act রাষ্ট্রের হাতে থাকা তথ্যের পাশাপাশি নির্দিষ্ট অধিকার প্রয়োগ বা সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা তথ্য চাওয়ারও পথ দেয়। এই বিধানের প্রয়োগের নিজস্ব শর্ত আছে; তবু এর নীতিগত প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক: জনসেবা বা মানুষের অধিকার যখন রাষ্ট্র, ঠিকাদার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন জবাবদিহির জন্য প্রয়োজনীয় নথির সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে?

ধরা যাক, একটি এলাকায় সরকারি অর্থে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কাজ করেছে একাধিক সংস্থা। নাগরিকের প্রয়োজন প্রকল্পের নাম জানা পর্যন্ত সীমিত নয়। তিনি জানতে চাইতে পারেন: অর্থ কে দিয়েছে, কাজের মান কে যাচাই করেছে, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার এবং সমস্যা হলে অভিযোগ কোথায় করবেন। এই ধরনের তুলনা বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আলোচনাকে দপ্তরের তালিকা থেকে বের করে সেবার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় তথ্যের অনুসরণযোগ্যতা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে।

উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা: পুরোনো নীতি, ব্যবহারযোগ্য পথ

সুইডেনে সরকারি নথিতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকারের নীতি তার মৌলিক আইনি কাঠামোর অংশ। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বা সরাসরি গিয়ে সরকারি নথি দেখার পথ ব্যাখ্যা করা হয়েছে—গোপনীয়তার প্রযোজ্য বিধান সাপেক্ষে। বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রযুক্তি নকল করা নয়; নথি কোথায় আছে, কার কাছে চাইতে হবে এবং কোন অংশ প্রকাশযোগ্য—এগুলোর প্রশাসনিক স্পষ্টতা গড়ে তোলা।

যুক্তরাজ্যে তথ্য কমিশনারের দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, বেশির ভাগ সরকারি কর্তৃপক্ষকে সাধারণত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্যের আবেদনে সাড়া দিতে হয়। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, বৈধ আবেদন করতে নাগরিককে আবশ্যিকভাবে আইনের নাম লিখতে বা নির্দিষ্ট তথ্য কর্মকর্তার কাছেই আবেদন পাঠাতে হয় না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকবান্ধব নীতি: মানুষ সঠিক প্রশ্ন করলেও যদি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ নাম-পদবি না জানেন, তবে প্রশাসনের কাজ হওয়া উচিত আবেদনটি সামলানো ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া। অবশ্য আইনগত সময়সীমা থাকাই সব আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তির প্রমাণ নয়; তার জন্য পৃথক কর্মসম্পাদন তথ্য দেখতে হয়।

বিশ্বব্যাপী পরীক্ষায় সতর্কবার্তা: উন্নয়নের স্তর একা ফল নির্ধারণ করে না

UNESCO-র সহায়তায় Centre for Law and Democracy-এর ‘গ্লোবাল স্ট্রেস টেস্ট’ দেখিয়েছে কেন শুধু দেশকে ‘উন্নত’ বা ‘উন্নয়নশীল’ বললে তথ্য অধিকার বোঝা যায় না। ৭৬টি দেশে ১৪৬টি পরীক্ষামূলক আবেদনের মধ্যে ৩৮ শতাংশে বিষয়বস্তুভিত্তিক উত্তরই আসেনি। পরীক্ষাটিতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ফল তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল; এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সম্মিলিত ফল মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল। বাংলাদেশ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনের এই হারকে বাংলাদেশের নিজস্ব ফল হিসেবে দেখানো যায় না। প্রতি দেশে অল্প কয়েকটি আবেদন নিয়ে কোনো দেশের সব দপ্তরের মানও নির্ধারণ করা যায় না।

তবু পরীক্ষাটির তুলনামূলক শিক্ষা শক্তিশালী: অর্থনৈতিক সামর্থ্য, পুরোনো আইন কিংবা অনলাইন পোর্টাল—কোনোটিই একা সময়মতো উত্তর নিশ্চিত করে না। নথি সংরক্ষণ, আবেদন গ্রহণের প্রমাণ, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা এবং উত্তর না দিলে কার্যকর প্রতিকার একসঙ্গে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের সংযুক্ত UNESCO জরিপে আনুষ্ঠানিক আবেদন ও আপিলের সংখ্যা আছে; পরবর্তী ধাপে এসব সংখ্যার শ্রেণিবিন্যাস পরিষ্কার করা এবং নাগরিক বাস্তবে কী পেয়েছেন, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অবস্থান: অর্জনের ভিত্তির ওপর পরের ধাপ

আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে এক কথায় ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ বলা গবেষণাসম্মত হবে না। দেশটির আইনগত ভিত্তি, তথ্য কমিশনের বিধান ও আবেদন করার ব্যবস্থা আছে। আবার সাধারণ মানুষের ব্যবহারযোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য: কত আবেদনকারী প্রথমবারেই সঠিক দপ্তর খুঁজে পান; কতজন প্রাপ্তিস্বীকার পান; পূর্ণ নথি পেতে কত সময় লাগে; নারী, গ্রামীণ ও প্রতিবন্ধী আবেদনকারীদের অভিজ্ঞতা কেমন; এবং আপিল করে কতজন কার্যকর প্রতিকার পান।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য তাই একটি বাস্তব লক্ষ্য দাঁড়ায়: তথ্য চাইতে গিয়ে নাগরিককে যেন ব্যবস্থাটির বিশেষজ্ঞ হতে না হয়। দপ্তর নিজের নথি জানবে, নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করবে, আবেদন বুঝতে সহায়তা করবে, সময়মতো উত্তর দেবে এবং ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ রাখবে। সেদিন আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান শুধু একটি স্কোরে নয়—ভূমি অফিস, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান হবে।

সত্য জানার অধিকার, বিশ্বাস গড়ার শর্ত

তথ্য অধিকার দিবসের তাৎপর্য কেবল একটি আইন স্মরণ করা নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভিতর প্রশ্ন করার অধিকারও আছে। কোনো দপ্তর তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিলে, কোনো স্কুল পাঠ্যবইয়ের সংশোধন দেখালে, কোনো কর্তৃপক্ষ সেবার যোগ্যতা ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করলে—তাতে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কমে না; বরং মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ বাড়ে। তথ্যের আলো সবসময় আরামদায়ক নয়। কখনো তা ভুল, অপচয় বা অব্যবস্থাপনা প্রকাশ করে। কিন্তু আলো নিভিয়ে রাখলে সমস্যা মুছে যায় না, কেবল তার ছায়া বড় হয়।

গুজবের বিরুদ্ধে শুধু নিষেধাজ্ঞা, তিরস্কার বা “বিশ্বাস করবেন না” ধরনের আহ্বান যথেষ্ট নয়। মানুষকে যাচাই করার উপকরণ দিতে হয়। সেই উপকরণের একটি হলো নির্ভরযোগ্য, সময়মতো ও সহজবোধ্য সরকারি তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য-বাণিজ্যের বিস্তারও তখনই মোকাবিলা করা সম্ভব, যখন জনস্বার্থের তথ্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ভিডিও, গোপন সূত্রের দাবি বা ভাইরাল পোস্টের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তথ্য প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে দায়: প্রকাশিত তথ্য সঠিক কি না, পুরোনো হলে হালনাগাদ হলো কি না, ভুল হলে সংশোধন করা হলো কি না।

বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবসে তাই প্রশ্নটি আমাদের সবার: নাগরিক যখন নিজের জীবন, শিক্ষা বা সেবার বিষয়ে জানতে চান, তখন প্রতিষ্ঠান কি তাঁকে সহযোগী হিসেবে দেখে, নাকি সন্দেহভাজন হিসেবে? সত্যের ওপর মানুষের বিশ্বাস আদেশ দিয়ে তৈরি হয় না। তা গড়ে ওঠে ধারাবাহিকভাবে তথ্য দেওয়া, ভুল স্বীকার করা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্য দিয়ে। তথ্যের দরজা যত খোলা থাকবে, গুজবের জানালা তত কম আকর্ষণীয় হবে।

তথ্য অধিকারকে কার্যকর করতে এখন যা করা জরুরি

বাংলাদেশে তথ্য অধিকারকে বাস্তব নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমেই দরকার কার্যকর তদারকি। তথ্য কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল রেখে কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ করতে হবে। তথ্য না দেওয়া, অসম্পূর্ণ উত্তর দেওয়া বা অযৌক্তিক বিলম্বের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে; সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়নের অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্পষ্ট ক্ষমতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নথিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না করলে তাঁদের কাছ থেকে কার্যকর সেবা আশা করা কঠিন। একই সঙ্গে আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে কোন আইনগত কারণে তা করা হয়েছে, তা সহজ ভাষায় লিখিতভাবে জানাতে হবে; কোনো নথির কিছু অংশ গোপন রাখার প্রয়োজন হলে প্রকাশযোগ্য অংশ নাগরিককে দিতে হবে।

তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হলো নাগরিককে বারবার আবেদন করতে বাধ্য না করা। প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও সরাসরি সেবা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচিতি, সেবার নিয়ম, যোগ্যতা, ফি, সময়সীমা, বরাদ্দ, ব্যয়, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, চলমান প্রকল্প ও সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা নিয়মিত হালনাগাদ করে প্রকাশ করা উচিত। তথ্য যেন শুধু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নথি না হয়—তা হতে হবে অনুসন্ধানযোগ্য, সহজ ভাষায় লেখা, বাংলা ও প্রয়োজনমতো বিকল্প প্রবেশগম্য বিন্যাসে পাওয়া যায় এমন। নথি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাল করা এবং তথ্যের সংস্করণ ও সংশোধনের ইতিহাস রাখা জরুরি। ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি আবেদন ও সহায়তার সুযোগও বজায় রাখতে হবে, যাতে ইন্টারনেট বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে কেউ অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।

শিক্ষা খাতে এই নীতির প্রয়োগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবই তৈরির ধাপ, পর্যালোচনা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া, সংশোধনের কারণ, সংস্করণভিত্তিক পরিবর্তন এবং ভুল সংশোধনের বিজ্ঞপ্তি উন্মুক্ত করতে পারে। এতে বিতর্ক প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে হবে, আর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক বুঝতে পারবেন কোনো তথ্য কীভাবে নির্ধারিত বা সংশোধিত হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ থেকেই তথ্য-সাক্ষরতা শেখাতে হবে: প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা, উৎস খোঁজা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, মতামত ও প্রমাণের পার্থক্য বোঝা, এবং তথ্য নৈতিকভাবে ব্যবহার ও উদ্ধৃত করা। এতে মানুষ শুধু তথ্য চাইতে নয়, পাওয়া তথ্যের যথার্থতা যাচাই করতেও সক্ষম হবে।

শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং সরকারি দায়িত্বের অংশ। তাই প্রতিটি দপ্তরের তথ্যপ্রাপ্তি, আবেদন নিষ্পত্তি, প্রত্যাখ্যানের কারণ ও অভিযোগের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসম্মুখে প্রতিবেদন থাকা দরকার। তথ্য উন্মুক্ত হওয়া মানেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা নয়; বরং জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষার যুক্তি ও সীমা স্পষ্ট করা। তথ্যপ্রাপ্তির পথ সহজ,  কার্যকর এবং সংশোধন দৃশ্যমান হলে গুজবের জায়গা সংকুচিত হবে। অধিকার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নাগরিক শুধু আইনটির কথা শুনবেন না—প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক তথ্য পাবেন, বুঝবেন এবং তা দিয়ে নিজের জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

আগামী দিনের স্বপ্ন: যখন তথ্য চাইতে ভয় থাকবে না

একদিন হয়তো ভূমি অফিসে গিয়ে কোনো কৃষককে আর শুনতে হবে না, ‘কাগজটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি নিজের জমির রেকর্ড দেখতে পারবেন, কোথায় সংশোধন হয়েছে বুঝতে পারবেন এবং ভুল থাকলে কোন পথে প্রতিকার পাবেন, তা জানতে পারবেন। কোনো অভিভাবক সন্তানের বৃত্তির ফল নিয়ে প্রশ্ন করলে তাঁকে পরিচিত লোক খুঁজতে হবে না; সিদ্ধান্তের নিয়ম ও কারণ তাঁর সামনে থাকবে। একটি গ্রামের মানুষ রাস্তার কাজ দেখে তার বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে নিতে পারবেন। এমন দিন কল্পনা করা বিলাসিতা নয়। এটাই তথ্য অধিকার কার্যকর হওয়ার সাধারণ অর্থ।

সেই ভবিষ্যতে সরকারি নথি মানুষের কাছ থেকে লুকানো কোনো দুর্বোধ্য সম্পদ হবে না। জনস্বার্থের তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত হবে সহজ বাংলায়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অন্য ব্যবহারযোগ্য ভাষা ও বিন্যাসেও। অনলাইনে খোঁজার ব্যবস্থা থাকবে; যাঁরা অনলাইন ব্যবহার করতে পারেন না, তাঁরাও সহায়তা পাবেন। কোনো আবেদন জমা পড়লে তার প্রাপ্তিস্বীকার মিলবে, নির্ধারিত সময়ে উত্তর আসবে। তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে কারণ জানানো হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত প্রশ্ন করার কার্যকর পথ খোলা থাকবে।

আমরা এমন বিদ্যালয়ের স্বপ্নও দেখতে পারি, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু তথ্য মুখস্থ করবে না—জিজ্ঞাসা করতে শিখবে: উৎস কোথায়? তথ্যটি কবে প্রকাশিত? পুরো নথিতে কী আছে? অন্য প্রমাণ কী বলছে? শিক্ষক তাঁকে শেখাবেন কীভাবে একটি ভাইরাল পোস্টের সঙ্গে মূল ঘোষণা মিলিয়ে দেখতে হয়, কীভাবে ভুল বুঝলে নিজের ধারণা সংশোধন করতে হয়। তথ্য-সাক্ষরতা তখন কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় থাকবে না; হয়ে উঠবে দৈনন্দিন নাগরিক দক্ষতা।

এই স্বপ্ন বাস্তব হবে এক দিনে নয়। এর জন্য নথি ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, দপ্তরগুলোর উত্তর দেওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে, তথ্য কমিশনের প্রতিকারব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে এবং প্রকাশিত পরিসংখ্যানও যাচাইয়ের উপযোগী করতে হবে। সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের কাজ হবে প্রশ্ন করা এবং পাওয়া উত্তরের যথার্থতা পরীক্ষা করা। আর নাগরিকের অধিকার হবে ভয় বা ব্যক্তিগত তদবির ছাড়াই সেই প্রশ্নের উত্তর চাওয়া।

তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনটি হয়তো কোনো বড় ঘোষণার দিন হবে না। দিনটি আসবে ছোট ছোট দৃশ্যে: একজন নারী নিজের প্রাপ্য সেবার নিয়ম পড়ে বুঝছেন; একজন তরুণ গুজব শেয়ার করার আগে মূল উৎস খুলছেন; একটি দপ্তর আবেদনকারীকে সময়মতো পূর্ণ উত্তর দিচ্ছে; আর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নথির আলোয় সংশোধিত হচ্ছে। যেদিন সাধারণ মানুষ তথ্যের সামনে অসহায় বোধ করবেন না, সেদিনই তথ্য অধিকার আইন সত্যিকার অর্থে তাঁদের নিজের আইন হয়ে উঠবে।

“তথ্যের দরজা যত খোলা থাকবে, গুজবের জানালা তত কম আকর্ষণীয় হবে।”

শেষ প্রতিফলন

তথ্য অধিকারকে কাগুজে বিধান থেকে কার্যকর নাগরিকসেবায় রূপ দিতে আইন, প্রতিষ্ঠান, নথি-ব্যবস্থাপনা, স্বপ্রণোদিত প্রকাশ, তথ্য-সাক্ষরতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশগম্যতাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। নাগরিক যেন তথ্য চাইতে গিয়ে ব্যবস্থাটির বিশেষজ্ঞ হতে বাধ্য না হন—এই নীতিই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী সংস্কারের কেন্দ্র।

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com

#তথ্যঅধিকার #বিশ্বতথ্যঅধিকারদিবস #বাংলাদেশ #স্বচ্ছতাওজবাবদিহি #পাঠ্যবই #শিক্ষাব্যবস্থা #RightToInformation #AccessToInformation #EducationTransparency #FactCheck