odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Saturday, 10th October 2026, ১০th October ২০২৬
ট্রাম্পের ক্ষোভ, সু চির ব্যর্থতা ও ইউনূসের শাসনকাল—শান্তিতে নোবেল কি সুশাসনের নিশ্চয়তা, নাকি কঠোর জবাবদিহির নতুন দায়?

শান্তির নোবেল, ক্ষমতায় অশান্তিকতটুকু সত্যি? পদকের আড়ালে মানুষের বিচার: প্রেক্ষিত ২০২৬ শান্তি নোবেল পুরস্কার

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১০ October ২০২৬ ০৭:০২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১০ October ২০২৬ ০৭:০২

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার

শান্তিতে নোবেল পেলেই কি একজন মানুষ সফল ও মানবিক শাসক হয়ে ওঠেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার সূত্র ধরে নাভি পিল্লাইয়ের বিচারিক অবদান, অং সান সু চির রোহিঙ্গাসংক্রান্ত ভূমিকা, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও দুর্নীতির পরিস্থিতি এবং আবি আহমেদের অভিজ্ঞতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ। ম্যান্ডেলা ও কলম্বিয়ার শান্তিপ্রক্রিয়ার পাল্টা উদাহরণ এবং মাচাদোর পদক হস্তান্তরের তাৎপর্যও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও নাগরিক জবাবদিহিকে পৃথক করে এই ফিচার খুঁজেছে শান্তির প্রকৃত মানদণ্ড: সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের বাস্তব পরিবর্তন।

একটি সোনার পদক পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে পারে না। অথচ আমরা কখনো কখনো তার কাছে সেই অলৌকিক ক্ষমতাই দাবি করি। অসলোয় কারও নাম ঘোষিত হলে মনে হয়, মানুষটি বুঝি যুদ্ধ থামানোর চাবি পেয়েছেন; তাঁর হাতে রাষ্ট্র তুলে দিলেই দুর্নীতি, বিভেদ ও নিপীড়নের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। কয়েক বছর পরে রক্তপাতের খবর এলে একই মানুষকে ঘিরে উল্টো সিদ্ধান্ত তৈরি হয়: শান্তির পুরস্কারটাই বুঝি অশান্তির কারখানা। এই দুই বিশ্বাসের মাঝখানে পড়ে থাকে সাধারণ মানুষের জীবন, যার জন্য পদকের চেয়ে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার বেশি জরুরি।

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পর আবার সামনে এসেছে এই পুরোনো দ্বন্দ্ব। পিল্লাইয়ের শান্তিতে অবদান অস্বীকার করে সাবেক আইনজীবী ডেভিড শোয়েনের পোস্ট রিপোস্ট করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এখানেই একটি সীমারেখা টানা প্রয়োজন। একজন বিজয়ীকে আক্রমণ করা আর সব নোবেলজয়ী শান্তির বদলে অশান্তি তৈরি করেন বলে প্রমাণ করা এক কথা নয়। ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া থেকে যে বড় প্রশ্নটি উঠছে, তা ব্যক্তিগত ক্ষোভের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ক্ষমতায় গিয়ে মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্যে কতটা সম্পর্ক আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পুরস্কারের মঞ্চ থেকে একটু দূরে দাঁড়াতে হয়। ক্যামেরার ঝলকানি সরিয়ে দেখতে হয়, কাকে কোন কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, পরে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁর হাতে কতটা ক্ষমতা ছিল এবং সেই সিদ্ধান্তে কার জীবন বদলেছে। কারণ ইতিহাসের বিচার কোনো অনুষ্ঠানের সনদ দেখে শেষ হয় না। যে মানুষ গতকাল নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহস দেখিয়েছেন, আজ তাঁর নিজের সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধেও একই সাহস দেখানোর প্রত্যাশা থাকে।

নাভি পিল্লাইকে নিয়ে বিতর্কে প্রথমেই দেখা দরকার তাঁর কাজ। নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় কাজ এবং যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অংশ। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হতে পারে—এমন বিচারিক অগ্রগতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই তাঁর শান্তিতে অবদান একেবারে নেই বলা তথ্যসমর্থিত মূল্যায়ন নয়।

অবশ্য বিচারকও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কোনো তদন্তের পদ্ধতি, সাক্ষ্য, ভাষা কিংবা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তোলা যায়। পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিশনের গাজাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তদন্ত মানেই সেই রাষ্ট্রের জনগণের প্রতি বিদ্বেষ—এমন সমীকরণ গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক বিচার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একইভাবে, কোনো কমিশনের অনুসন্ধানী সিদ্ধান্তকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সমতুল্য ধরাও ঠিক নয়। সমালোচনার শক্তি ব্যক্তিগত আক্রমণে নয়, প্রমাণের দুর্বলতা দেখাতে পারায়।

Enjoy Music🎭 মুখে শান্তির কথা—আড়ালে ক্ষমতার খেলা? কিছু কথা গানে বললে আরও গভীরে পৌঁছায়। ব্যঙ্গের হাসি, প্রতিবাদের সুর আর বিবেকের প্রশ্ন নিয়ে অধিকারপত্র ও LearningBdFun উপস্থাপন করছে পাঁচটি গানের অ্যালবাম— 🎼 মুখোশের আড়ালে: শান্তি, ক্ষমতা ও ইতিহাসের গান : রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের এই সংগীত আয়োজনে আপনাকেও আমন্ত্রণ। শুনুন, ভাবুন, আর জানান—কোন গানটি আপনার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটল? 🎧 পাঁচটি গান শুনুন এখানে:

শান্তিকে শুধু দুই নেতার করমর্দনের ছবিতে খুঁজলে এ বিতর্ক বোঝা কঠিন। যুদ্ধবিরতি জরুরি, কিন্তু হত্যার বিচার, বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং সংখ্যালঘুর নাগরিক অধিকারও শান্তির উপাদান। আগুন নেভানোর পরে ঘরের ভেতরের ধোঁয়া সরাতে হয়। দায়মুক্তি রেখে সাময়িক নীরবতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তাকে স্থিতি বলা যেতে পারে; দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বলতে গেলে মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

তবে নোবেলের উজ্জ্বল মুখ এবং ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণগুলোর একটি অং সান সু চি। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস সংগ্রামের স্বীকৃতিতে তিনি নোবেল পান। সেই স্বীকৃতি তাঁর তৎকালীন সংগ্রামের। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা বিচার করতে গেলে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতা সামনে আসে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে হত্যা, যৌন সহিংসতা ও গ্রাম পোড়ানোর বিবরণ রয়েছে; দুই মাসে সাত লাখের বেশি মানুষ পালিয়ে যায়। সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের ঘটনা অস্বীকারও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

২০১৯ সালে সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির হন। যে নেত্রীকে বিশ্ব নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর ভেবেছিল, তাঁকে তখন নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ মোকাবিলা করতে দেখে গভীর নৈতিক প্রশ্ন ওঠে। এখানে সমালোচনার জায়গা যথেষ্ট শক্ত: সংখ্যাগরিষ্ঠের জনপ্রিয়তা রক্ষার জন্য সংখ্যালঘুর দুর্দশা উপেক্ষা করলে অতীতের সাহস বর্তমানের ব্যর্থতা ঢেকে রাখতে পারে না। রাষ্ট্রের অন্যায়ের মুখে একজন শান্তিপুরস্কারজয়ীর দায়িত্ব সাধারণ রাজনীতিকের চেয়েও বেশি বলে মানুষ আশা করতেই পারে।

কিন্তু মিয়ানমারের সব বিপর্যয়কে সু চির ব্যক্তিগত সৃষ্টি বলা হলে সেনাবাহিনীর সরাসরি ভূমিকা আড়াল হয়। জাতিসংঘের অনুসন্ধান সামরিক বাহিনীর পদ্ধতিগত নৃশংসতা এবং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানে সেই সেনাবাহিনী বেসামরিক সরকার সরিয়ে সু চিকেও আটক করে। তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা বিচার করা প্রয়োজন; একই সঙ্গে যে শক্তি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙেছে, তার দায় পৃথকভাবে নির্ধারণও প্রয়োজন। নোবেল পরিচয় দিয়ে কাউকে রক্ষা করা যেমন অন্যায়, সেই পরিচয় দিয়ে সব অপরাধ তাঁর ঘাড়ে চাপানোও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নয়।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই আলোচনাকে আরও কাছের করে তোলে। মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগের জন্য যৌথভাবে নোবেল পান। সেই পুরস্কার রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সনদ ছিল না। ক্ষুদ্রঋণ বা সামাজিক উদ্যোগের অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সব দক্ষতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। একজন দক্ষ চিকিৎসককে পুরো হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্ব দিলেই প্রতিটি সংকটের সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তাও থাকে না।

ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী আমলের মূল্যায়নে গুরুতর অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নির্বিচার আটক এবং উদ্বেগজনক জনতা-সহিংসতার উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিবেদন পূর্ববর্তী আমলের ব্যাপক গুমসহ কিছু ভয় ও দমন কমেছে বলেও জানিয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক খ্যাতি জনগণের প্রতিদিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি; আবার সব পরিবর্তনকে একরঙা ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোরও ভিত্তি নেই।

ফ্রিডম হাউসের ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও এই দ্বৈত বাস্তবতা আছে। রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসর কিছুটা খুললেও বিচারবহির্ভূত সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ সমস্যা হিসেবে থেকে যায়। বাংলাদেশের কোনো পরিবার যদি হামলার ভয় পায়, কোনো শিক্ষক যদি দলীয় পরিচয়ের কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, কিংবা সাংবাদিক যদি নিরাপদে প্রশ্ন করতে না পারেন, তাহলে সরকারের প্রধানের আন্তর্জাতিক সম্মান তাঁদের ক্ষতি পূরণ করে না। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনার তদন্ত, প্রশাসনের ভূমিকা এবং প্রতিকার পাওয়ার বাস্তব সুযোগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব বিচার করতে হবে।

দুর্নীতির প্রশ্নেও আবেগের বদলে তুলনাযোগ্য তথ্য দরকার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-তে ২৪; আগের বছরের চেয়ে এক পয়েন্ট বেশি। অবস্থাটি দুর্বল, উন্নতিও সামান্য। কিন্তু এই তথ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি বেড়েছে বলে সিদ্ধান্ত টানা যায় না। আবার সূচকটি ধারণাভিত্তিক হওয়ায় এক পয়েন্ট বৃদ্ধিকে নির্দিষ্ট দুর্নীতি বন্ধের প্রমাণও বলা যায় না। রাষ্ট্রীয় ক্রয়, নিয়োগ, ব্যাংকিং ও তদন্তের তথ্য মিলিয়ে গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন।

পুরোনো দুর্নীতি নতুন সরকারের অজুহাত হতে পারে না; নতুন ব্যর্থতাও পুরোনো ব্যবস্থাকে নিষ্পাপ করে না। বাংলাদেশের বিচার তাই হওয়া উচিত ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে: কোন সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে এসেছে, কোনটি নতুন সিদ্ধান্তে বেড়েছে, কোথায় প্রতিকার হয়েছে এবং কোথায় রাষ্ট্র নাগরিককে রক্ষা করতে পারেনি। রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে—এমন সর্বব্যাপী বাক্যের বদলে নির্দিষ্ট ক্ষতি দেখাতে পারলে সমালোচনা আরও ধারালো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করাই দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের কাজ।

ইথিওপিয়ার আবি আহমেদ নোবেল নির্বাচনের ঝুঁকি বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১৯ সালে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত নিরসনের উদ্যোগের জন্য তিনি পুরস্কার পান। পরে টাইগ্রে সংঘাতে ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৩ সালের মূল্যায়নে ইথিওপীয় ও ইরিত্রীয় বাহিনী, টাইগ্রে বাহিনী এবং আমহারা বাহিনীর সদস্যদের যুদ্ধাপরাধের কথা বলা হয়। এখানে শিক্ষা স্পষ্ট: প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তি স্থাপনের একটি উদ্যোগ দেশের ভেতরে ভবিষ্যৎ আচরণের নিশ্চয়তা নয়। একটি দরজা খুললেই সব জানালা দিয়ে আলো আসবে না।

হেনরি কিসিঞ্জারের ঘটনাও মনে করিয়ে দেয়, বিতর্ক নোবেলের ইতিহাসে নতুন নয়। ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতির আলোচনার জন্য ১৯৭৩ সালে তিনি লে দুক থোর সঙ্গে পুরস্কার পান। থো তা গ্রহণ করেননি; প্রতিবাদে নোবেল কমিটির দুই সদস্যও পদত্যাগ করেন। ফলে পুরস্কার বিতরণের মুহূর্তেই সিদ্ধান্তের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কমিটি ভুল করতে পারে, সীমিত অর্জনকে বেশি বড় করে দেখতে পারে, কিংবা অসমাপ্ত প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আশা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক মর্যাদা সেই সম্ভাবনাগুলো মুছে দেয় না।

কিন্তু এই উদাহরণগুলোর পাশে নেলসন ম্যান্ডেলাকে না রাখলে বিচার অসম্পূর্ণ থাকবে। ১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলা ও এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক বর্ণবৈষম্য থেকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরণের কাজে যৌথভাবে নোবেল পান। তাঁদের সমঝোতায় সমান ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ব্যবস্থার পথ তৈরি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সব সমস্যা তাতে শেষ হয়নি; তবু সেই অবদানকে শূন্য বলা যায় না। কোনো সমাজে পরবর্তী সংকট থাকলেই আগের সংঘাত নিরসনের মূল্য বিলীন হয় না। ইতিহাসের খাতা শুধু ব্যর্থতার পাতায় খুলে রাখলে সফলতার প্রমাণ চোখ এড়িয়ে যায়।

কলম্বিয়ার হুয়ান মানুয়েল সান্তোসের ক্ষেত্রেও পুরস্কার একটি কঠিন শান্তিপ্রক্রিয়ার স্বীকৃতি। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার জন্য ২০১৬ সালে তিনি নোবেল পান, যদিও শান্তিচুক্তি নিয়ে গণভোটে সামান্য ব্যবধানে প্রত্যাখ্যান এসেছিল। এই ঘটনা দেখায়, শান্তির পথ সোজা নয়। সমঝোতার বিরুদ্ধে জনমত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি এবং নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা একই সঙ্গে থাকতে পারে। কোনো উদ্যোগকে মূল্যায়ন করতে হলে তার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও দেখতে হয়, বিকল্প হিসেবে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে মানুষের ক্ষতি কতটা হতে পারত।

মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পদক ট্রাম্পকে দেওয়া বিতর্কে আরেকটি স্তর যোগ করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি নিজের নোবেল পদক ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন, ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার প্রতি তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে। কিন্তু পদক দেওয়া এবং নোবেলজয়ীর মর্যাদা হস্তান্তর আলাদা বিষয়। নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, পদকের মালিক বদলাতে পারেন; পুরস্কারের স্বীকৃতি মূল বিজয়ীর সঙ্গেই থাকে। রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতার এই প্রতীকী ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে তার ফলে ট্রাম্প নোবেলজয়ী হন না, কিংবা মাচাদোর আগের সমস্ত কাজও মূল্যহীন হয়ে যায় না।

আসলে বিপদ শুরু হয় যখন আমরা পুরস্কারকে মানুষের সমগ্র চরিত্রের স্থায়ী নিশ্চয়তা মনে করি। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এক ক্ষেত্রের খ্যাতির আলোয় অন্য ক্ষেত্রের সক্ষমতাকেও অতিমূল্যায়ন করা যায়। ফলে অনুসারীরা প্রশ্ন করতে সংকোচ করেন, প্রশাসনের ব্যর্থতা ব্যক্তির মর্যাদার আড়ালে চলে যায় এবং সমালোচককে শত্রু মনে হতে থাকে। ক্ষমতায় থাকা মানুষের জন্য এটি বিপজ্জনক সুবিধা। তাঁর প্রশংসা যত আন্তর্জাতিক হবে, স্থানীয় নাগরিকের প্রশ্নের অধিকার তত শক্ত হওয়া দরকার।

Enjoy Music🎵 বিশেষভাবে শুনুন: The Mask of Peace | শান্তির মুখোশ বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে প্রতিবাদী রক অ্যান্থেম। শান্তির মুখোশের আড়ালে আপনি কী দেখেন? মন্তব্যে লিখুন। গানগুলো ভালো লাগলে শেয়ার করুন—সুরের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ুক প্রশ্ন করার সাহস। ✊🎶 ▶️ গান শুনুন এখানে

আরেকটি বিপদ হলো কারণ ও পরিণতি গুলিয়ে ফেলা। নোবেলজয়ী ক্ষমতায় আসার পরে সংঘাত ঘটেছে—এটি সময়ের সম্পর্ক; তিনি নোবেলজয়ী বলেই সংঘাত ঘটেছে—এটি কারণের দাবি। দ্বিতীয়টি প্রমাণ করতে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামরিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পূর্ববর্তী সংঘাতের ভূমিকা পরীক্ষা করতে হয়। নইলে ভাঙা সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে উদ্বোধনের ফলককেই দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ বলার মতো ভুল হয়। ফলক প্রশ্নের বাইরে নয়, কিন্তু সেতুর নকশা ও নির্মাণও দেখতে হবে।

সুতরাং ট্রাম্পের ক্ষোভের ভেতরে একটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন আছে: শান্তির পুরস্কার পাওয়া মানুষকে কি ক্ষমতায় গিয়ে আরও কঠোরভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি করা উচিত? উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। কিন্তু সেখান থেকে সব বিজয়ীর অবদান অস্বীকার করা প্রমাণের সীমা ছাড়িয়ে যায়। সু চি, ইউনূস কিংবা আবির প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিচারযোগ্য; পিল্লাই, ম্যান্ডেলা বা অন্যদের নির্দিষ্ট অবদানও বিচারযোগ্য। একই মাপকাঠি চাই—সমর্থক ও প্রতিপক্ষ, বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্র, পুরস্কারজয়ী ও পুরস্কারবঞ্চিত সবার জন্য।

ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন মানে প্রত্যেক পক্ষের অভিযোগকে সমান সত্য ধরে নেওয়া নয়। যার বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বেশি, তার দায়ও বেশি স্পষ্টভাবে বলতে হবে। সরকারের বক্তব্য রাখা প্রয়োজন, কিন্তু সেই বক্তব্য যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা প্রয়োজন নেই। একইভাবে, কোনো জনপ্রিয় নেতার অনুসারীরা তাঁর সাফল্যের তালিকা দিলেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিযোগ অদৃশ্য হয় না। শান্তির দাবি পরীক্ষা করতে হয় বিরোধীর অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের সীমা দিয়ে।

এই পরীক্ষায় সাংবাদিকতার দায়িত্বও বড়। পুরস্কারের ইতিহাস লিখতে গিয়ে শুধু নেতাদের ছবি ও বক্তৃতা দেখলে মানুষের জীবন হারিয়ে যায়। একটি শান্তিচুক্তির প্রভাব বোঝার জন্য উদ্বাস্তু পরিবারের নিরাপত্তা দেখতে হয়; সংস্কারের সাফল্য বোঝার জন্য থানায় অভিযোগ দিতে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে হয়। তথ্য, সাক্ষ্য এবং প্রতিষ্ঠানের নথি পাশাপাশি রাখলে ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিবিদ্বেষের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবেই পাঠক বুঝতে পারেন, কে শান্তির ভাষা ব্যবহার করছেন এবং কে বাস্তবে শান্তির শর্তগুলো রক্ষা করছেন। এই পার্থক্যই জনস্বার্থের অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক প্রচারণা থেকে পৃথক করে।

পুরস্কারদাতা কমিটিরও আত্মসমালোচনা দরকার। নির্বাচনের যুক্তি যত স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, জনআস্থার ভিত্তি তত শক্ত হবে। বিজয়ীর পরবর্তী ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষার ভালো উপায় হলো তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা, অন্ধ সমর্থন কিংবা নির্বিচার নিন্দা নয়।

শেষ পর্যন্ত শান্তি অসলোয় ঘোষিত একটি নামের চেয়ে বড়। তার ঠিকানা আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া মানুষ, হামলা থেকে বেঁচে থাকা সংখ্যালঘু, ভয় ছাড়া কথা বলা শিক্ষক এবং ঘরে ফেরার আশা রাখা শরণার্থী। তাঁদের জীবনে কী বদলাল, রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করল এবং অন্যায়ের প্রতিকার কতটা হলো—সেই প্রশ্নই সবচেয়ে জরুরি। নোবেল অতীতের একটি স্বীকৃতি হতে পারে; ভবিষ্যৎ শাসনের দায়মুক্তির দলিল হতে পারে না। আর পুরস্কার নিয়ে কোনো নেতার ক্ষোভও ইতিহাসের বিকল্প বিচারক নয়।

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com

#নোবেলশান্তিপুরস্কার #শান্তি #ডোনাল্ডট্রাম্প #নাভিপিল্লাই #অংসানসুচি #মুহাম্মদইউনূস #বাংলাদেশ #মিয়ানমার #মানবাধিকার #সুশাসন #জবাবদিহি #আন্তর্জাতিকআইন #অধিকারপত্র #দেশচিন্তা