নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম
দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে বাংলাদেশ সরকার। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায় ঢাকা। একই সঙ্গে চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকার সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চায়।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়।
অতীতের প্রত্যাবাসন অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান উদ্যোগে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। ইউএনএইচসিআরের ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ওই বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও তৎকালীন বার্মার মধ্যে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি হয়। ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর এ প্রক্রিয়ার শেষ প্রত্যাবাসনকারী সীমান্ত অতিক্রম করেন।
এরপর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেন। শামা ওবায়েদ তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, ওই সময় খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা প্রত্যাবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় খালেদা জিয়ার মানবিক অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকা খালেদা জিয়া সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং তাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপ, কমছে সহায়তা
শামা ওবায়েদ বলেন, বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এর প্রভাব বহন করছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থান ও অন্যান্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনও বাড়ছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি মনে করেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং তা কার্যকরভাবে শুরু করাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায় ঢাকা
শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক উদ্যোগের অন্যতম পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাত্রা। তাঁর মতে, আগের প্রক্রিয়াগুলোতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই উদ্যোগ প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, সমঝোতা হলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।
এ কারণে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে চায়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ এবার আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।
মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে উল্লেখ করেন শামা ওবায়েদ।
তিনি জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তবে এ যোগাযোগ সহজ নয়। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় চ্যানেলেই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
বাসসের সাক্ষাৎকারে শামা ওবায়েদ জানান, রোহিঙ্গা সংকটকে সরকার উচ্চপর্যায়ের বহুপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি।
- বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ।
- পূর্বানুমেয় ও ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
- ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা।
- আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
সাক্ষাৎকারে বলা হয়, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন।
নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন, আসিয়ান ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ জোরদার করছে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে এ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে ঢাকা।
শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক রয়েছে। তাই সংকট সমাধানে তারা নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও বাংলাদেশের উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং একাধিক কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে সংকটের সমাধান সহজ হবে না বলে সতর্ক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, এটি অত্যন্ত কঠিন সমস্যা; রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়।
পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি
প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্তকরণ ও যাচাইয়ের কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান শামা ওবায়েদ। এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে বারবার আহ্বান জানিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন অভিজ্ঞতা বর্তমান উদ্যোগের জন্য প্রাসঙ্গিক। তাই দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি জাতিসংঘের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য, রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা। তবে এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করছে মিয়ানমারের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগের ওপর।
বাসস
