আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) টানা পঞ্চম দিনের মতো সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকা। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্যবস্তু ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রী এদি রামার দপ্তর।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেকে মুখোশ পরে পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রলবোমা ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া বিক্ষোভ দমনে রাবার বুলেট ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অনেকে আহত হয়েছেন। বিবিসির ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮০ জনের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ আনা হয়েছে। আরও কয়েক শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অথবা তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগের দাবি
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা বিক্ষোভ সাম্প্রতিক সময়ে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।
বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁদের একটি অংশ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের জন্য এক বছরের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়েও তাঁদের দাবি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ফলে আন্দোলনের একাংশ সহিংস হয়ে উঠেছে। তবে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেছেন, আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে কিছু ব্যক্তি দোকানপাট ও ব্যাংকে ভাঙচুর চালাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে সংঘর্ষ
শনিবার বিকেলে বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ রাজধানীর প্রধান সড়কে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রী এদি রামার দপ্তরের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। সংঘর্ষের মধ্যে একটি যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষ বাহিনীও মোতায়েন করা হয়।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় ভাঙা কাচ, পোড়া ধ্বংসাবশেষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারী—উভয় পক্ষের মানুষ রয়েছেন।
গোয়েন্দাপ্রধান ও ব্যবসায়ীকে ঘিরে তদন্ত
আলবেনিয়ার রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে চলমান তদন্তও প্রধানমন্ত্রী রামার সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির বিশেষ কৌঁসুলিদের একটি তদন্তের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ভ্লোরা হাইসেনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এরগিস আগাসিকে বিচার এড়াতে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।
আগাসির বিরুদ্ধে অভিযোগও তদন্তাধীন। তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাইসেনি কৌঁসুলিদের জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করতেই তিনি আগাসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে আলবেনীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী রামা আগাসিকে চেনেন বলে স্বীকার করলেও কোনো অবৈধ লেনদেন সম্পর্কে জানার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
ইইউতে যোগদানের লক্ষ্য, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এদি রামার নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট পার্টি আলবেনিয়ার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশটির ১৪০ আসনের সংসদে দলটির আসন ৮৩টি। পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান আলবেনিয়ার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। রামা ২০৩০ সালের মধ্যে ইইউতে যোগদানের অগ্রগতি অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক আন্দোলন তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বিক্ষোভের জন্য বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং নাম উল্লেখ না করা বিদেশি পক্ষগুলোর ভূমিকার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দুর্নীতি, রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাব এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরছেন।
আলবেনিয়ার চলমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের অবস্থান এবং দুর্নীতির অভিযোগে চলমান তদন্ত—সবকিছুই দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
