আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে নতুন করে চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শিবির।
আল জাজিরার ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এবং কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেনের রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বর্তমান বিক্ষোভের কারণে ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতির অবসান ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।
শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা নিশ্চিত করা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ পরে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মান নিয়ে উদ্বেগ। তরুণদের একটি অংশ মনে করছে, তাদের দাবি ও সমস্যাগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কিছু স্থানে আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়। দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে কি ক্ষোভ কমেছে?
বিক্ষোভের পর ১৮ অক্টোবর দেওয়া বক্তব্যে ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা করেন। সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।
তবে আন্দোলনকারীদের একাংশের প্রত্যাশা ছিল, সরকার শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা করবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে এবং তাৎক্ষণিক নতুন নীতিগত পদক্ষেপের বিস্তারিত ঘোষণা আসেনি।
ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগ আন্দোলনকারীদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তরুণ ভোটারদের সমর্থন যাচ্ছে কোন দিকে?
ফ্রান্সের রাজনীতিতে তরুণ ভোটারদের সমর্থন এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত OpinionWay-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর প্রতি সমর্থন ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের তুলনায় এটি ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেলঁশোঁর দল ফ্রান্স আনবাউড বা ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজ’ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের বেতন এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ব্যবস্থা সংস্কারের মতো বিষয় দলটির কর্মসূচিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, মেরিন লে পেনের ন্যাশনাল র্যালি দল বিক্ষোভের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামনে এনে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নির্বাচনী জরিপে লে পেনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব জরিপের ফলাফলকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রার্থীদের কর্মসূচি এবং ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তিত হতে পারে।
মধ্যপন্থী রাজনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক উত্থানের সময়ও ফ্রান্সে সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। ২০১৮ সালে জ্বালানির কর বৃদ্ধি থেকে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
বর্তমান সংকটের সঙ্গে সেই আন্দোলনের কিছু মিল থাকলেও এবার সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বাড়তি চাপ রয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজেট ঘাটতি ও ব্যয় সংকোচনের চাপের কারণে নতুন সরকার বা পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য একদিকে সরকারি ব্যয় কমানো এবং অন্যদিকে জনঅসন্তোষ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে আসন্ন নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থীদের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ?
বর্তমান পরিস্থিতি ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তরুণদের অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন বিরোধী দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ দিচ্ছে।
তবে ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মধ্যপন্থীরা কতটা সমর্থন ধরে রাখতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের নেতৃত্ব, নীতিগত প্রস্তাব এবং ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর। একই সঙ্গে বাম ও ডানপন্থী বিরোধী দলগুলো আন্দোলনকারীদের দাবি কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রশ্নও সামনে এনেছে। ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে এই অসন্তোষ দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা পরিবর্তন আনে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
**তথ্যসূত্র:** আল জাজিরা, ২০ অক্টোবর ২০২৬; সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী জরিপ ও ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদন।
---
**ফ্রান্সে বিক্ষোভে চাপে ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থীরা, ২০২৭ সালের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ?**
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ এবং সহিংস বিক্ষোভে চাপে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক শিবির। তরুণ ভোটারদের মধ্যে বামপন্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর সমর্থন বৃদ্ধির তথ্যও সামনে এসেছে। অন্যদিকে, ডানপন্থী মেরিন লে পেন সরকারবিরোধী অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
#ফ্রান্স #ইমানুয়েলম্যাক্রোঁ #ফরাসিবিক্ষোভ #মেরিনলেপেন #জ্যঁলুকমেলঁশোঁ #ফ্রান্সনির্বাচন #আন্তর্জাতিকসংবাদ #অধিকারপত্রডটকম
