আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে থাকা বেসামরিক মানুষকে সহায়তা এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেন এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে।
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত তা বহাল ছিল। তবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। <
যুদ্ধবিরতির পেছনে মানবিক সংকট
ওলেশকি শহরটি ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে দিনিপ্রো নদীর তীরে অবস্থিত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের শুরুতে শহরটি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যুদ্ধের কারণে শহরের বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের হিসাবে, যুদ্ধের আগে ওলেশকিতে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। বর্তমানে সেখানে আনুমানিক ১,৭০০ থেকে ২,০০০ মানুষ রয়েছেন। তাঁদের বড় অংশ বয়স্ক; এ ছাড়া প্রায় ৫০টি শিশু রয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। স্থলপথে চলাচলের ক্ষেত্রে মাইন ও সামরিক হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং যারা শহর ছাড়তে চান, তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতা
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, মেলানিয়া ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে ওলেশকির জন্য সীমিত পরিসরে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করেন। তাঁর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, নিরাপদ পথ প্রস্তুত করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সমন্বয় করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই দেশের বেসামরিক প্রতিনিধিরা শহরের বাসিন্দাদের প্রয়োজন মূল্যায়ন করবেন। যারা চলে যেতে চান, তাঁদের পছন্দের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন ও সমন্বিত সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কেউ রাশিয়ায় যেতে চাইতে পারেন, আবার কেউ ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ফিরতে চাইতে পারেন—এমন সম্ভাবনার কথাও হোয়াইট হাউস উল্লেখ করেছে। <
ইউক্রেনে ফিরতে পারবেন কি না, সেই উদ্বেগ
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ওলেশকির বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। খেরসন সিটি কাউন্সিলের উপদেষ্টা ও সদস্য ওকসানা পোহোমিই *দ্য টেলিগ্রাফকে* জানিয়েছেন, শহর ছাড়তে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন, তাঁদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে এবং ইউক্রেনে ফেরার সুযোগ নাও মিলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পথ থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। যারা শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করছেন বলেও জানানো হয়েছে।
তবে রাশিয়া সবাইকে জোর করে নিয়ে যাবে কিংবা ইউক্রেনে ফিরতে বাধা দেবে—এমন কোনো সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার মতো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। এখানে মূল বিষয় হলো, বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে গন্তব্য বেছে নেওয়ার অধিকার এবং তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবহন নিশ্চিত করা। <
যুদ্ধবিরতি কি শান্তিচুক্তির ইঙ্গিত?
ওলেশকির যুদ্ধবিরতি একটি নির্দিষ্ট শহরকে কেন্দ্র করে মানবিক উদ্যোগ। এটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার পুরো যুদ্ধের অবসান নয়। দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর শান্তি আলোচনা নিয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নভেম্বরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে; বৈঠকের স্থান হিসেবে আবুধাবি বা সুইজারল্যান্ডের কথা এসেছে।
যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকরভাবে বজায় থাকে, মানবিক সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছায় এবং বাসিন্দারা নিরাপদে নিজেদের পছন্দের গন্তব্যে যেতে পারেন কি না—এসব বিষয়ই উদ্যোগটির বাস্তব সাফল্য নির্ধারণ করবে।
সূত্র:হোয়াইট হাউস, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও *দ্য টেলিগ্রাফ*।
