odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 2nd November 2026, ২nd November ২০২৬
মুখস্থবিদ্যার মবের দেশে উদ্ভাবক তৈরি হবে কীভাবে? গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫ এবং বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট

উদ্ভাবনের বিশ্বে বাংলাদেশ কোথায়? মেধা আছে, শিক্ষার্থী আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে—তবু নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরিতে আমরা পিছিয়ে কেন?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২ November ২০২৬ ০৯:০৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২ November ২০২৬ ০৯:০৪

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক । দেশচিন্তা

বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সংস্থা (WIPO) প্রকাশিত Global Innovation Index 2025—এ ১৩৯টি দেশের মধ্যে ২১.০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ৩৮তম, ভিয়েতনাম ৪৪তম, পাকিস্তান ৯৯তম এবং নেপাল ১০৭তম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনের মতো উদ্ভাবন—অগ্রসর দেশের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D), বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিল্প—একাডেমিয়া সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অবস্থান কেবল অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন নয়; বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক উদ্ভাবনী সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সংকটেরও ইঙ্গিত বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, পরীক্ষা—নিরীক্ষা চালাতে, ভুল থেকে শিখতে এবং নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবনী ধারণা সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করে না, সেই ব্যবস্থা কীভাবে একটি উদ্ভাবনী প্রজন্ম কিংবা জ্ঞাননির্ভর জাতি গড়ে তুলবে? এই বিশেষ ফিচারে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের কাঠামো ও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণের পাশাপাশি অনুসন্ধান করা হয়েছে—কেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্ভাবনী প্রজন্ম তৈরি করতে পারছে না, শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীলতা ও গবেষণার চর্চা কেন সীমিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান কীভাবে শিল্প ও সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে যুক্ত হতে পারে এবং শিক্ষা সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ, শিক্ষক উন্নয়ন ও সমন্বিত জাতীয় উদ্ভাবননীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

প্রারম্ভিক কথন : একটি শ্রেণিকক্ষ, কয়েকটি প্রশ্ন এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ

ঢাকার কোনো একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পাঠদান করছেন। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বোর্ডে লেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, সূত্র ও তথ্য। কেউ খাতায় তুলে নিচ্ছে, কেউ বইয়ের দাগানো অংশ মুখস্থ করছে। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য কোন প্রশ্নের উত্তর কতটুকু লিখতে হবে, সেটিও হয়তো তাদের জানা। কিন্তু ক্লাস শেষে যদি শিক্ষক প্রশ্ন করেন, ‘তোমাদের এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে কেন? এই সমস্যা সমাধানে তোমরা কী করতে পারো?’ তখন কী হবে?

কেউ হয়তো বলবে, রাস্তার নালা বন্ধ। কেউ বলবে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আরেকজন হয়তো একটি ছোট মডেল তৈরি করার প্রস্তাব দেবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই চিন্তা বাস্তবে পরীক্ষা করার সুযোগ আছে কি? বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ, সময়, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কিংবা প্রকল্পভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা আছে কি? তাদের নতুন ধারণাকে মূল্যায়ন করা হবে, নাকি পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত উত্তরের বাইরে যাওয়ার জন্য নম্বর কমবে?

এই ছোট্ট দৃশ্যের মধ্যেই বাংলাদেশের উদ্ভাবন—সংকটের একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে।

উদ্ভাবন (Innovation) বলতে শুধু নতুন কোনো যন্ত্র আবিষ্কার বোঝায় না। কোনো সমস্যার নতুন সমাধান, উৎপাদনের উন্নত পদ্ধতি, কার্যকর ব্যবসায়িক ধারণা, সামাজিক সেবা দেওয়ার নতুন ব্যবস্থা, এমনকি শিক্ষাদানের নতুন কৌশলও উদ্ভাবনের অংশ হতে পারে। তবে একটি ধারণা তখনই বাস্তব উদ্ভাবনে পরিণত হয়, যখন সেটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং মানুষ, সমাজ বা অর্থনীতির জন্য নতুন মূল্য তৈরি করে।—এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন।

বিশ্বের অন্য দেশগুলো যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, উন্নত চিকিৎসাপ্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, নতুন উপকরণ এবং ডিজিটাল উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ কতটা নতুন জ্ঞান তৈরি করছে? আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটা গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে কতটি কার্যকর প্রযুক্তি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাচ্ছে? আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই এমন মানুষ তৈরি করছে, যারা শুধু বিদ্যমান জ্ঞান ব্যবহার করবে না, বরং নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি করবে?

বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সংস্থা (World Intellectual Property Organization—WIPO) প্রকাশিত Global Innovation Index 2025 বাংলাদেশের সামনে এই প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম—Innovation at a Crossroads, অর্থাৎ উদ্ভাবন এক সন্ধিক্ষণে। ১৩৯টি দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে তৈরি এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। স্কোর ২১.০।

এটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং নয়। বরং আমাদের শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির দিকে তাকানোর একটি সুযোগ। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করল, কতজন সনদ পেল কিংবা কতটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন নতুন কিছু ভাবতে পারে, কতজন বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং কতজন নিজের জ্ঞান দিয়ে দেশের উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

১. ১৩৯ দেশের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান: সংখ্যাগুলো কী বলছে?

WIPO—এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান ১০৬তম। ১০০—এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২১.০। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধানটি আরও পরিষ্কার হয়।

দেশ
বৈশ্বিক অবস্থান
স্কোর
ভারত
৩৮
৩৮.২
শ্রীলঙ্কা
৯৩
২২.৯
পাকিস্তান
৯৯
২২.১
বাংলাদেশ
১০৬
২১.০
নেপাল
১০৭
২০.২
উৎস: WIPO, Global Innovation Index 2025, Economy Rankings, পৃষ্ঠা ১৯ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের প্রোফাইল।

এই তুলনায় দুটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ভারত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের ব্যবধান খুব বেশি নয়। নেপালের অবস্থান বাংলাদেশের ঠিক এক ধাপ নিচে। কিন্তু কাছাকাছি অবস্থান মানেই কাছাকাছি সক্ষমতা নয়। একটি দেশের উদ্ভাবনী ব্যবস্থা কোন জায়গায় শক্তিশালী এবং কোথায় দুর্বল, তা বুঝতে সামগ্রিক অবস্থানের পাশাপাশি পৃথক সূচকগুলো দেখতে হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৩৬ লাখ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী ১,৬৯২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, বড় জনসংখ্যা, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে যথেষ্ট কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এখানে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। ভারত ৩৮তম অবস্থানে। নিম্ন—মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে তার অবস্থান প্রথম। দেশটির শক্তির জায়গা শুধু বড় বাজার নয়; তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি, স্টার্টআপ, গবেষণার বাণিজ্যিক প্রয়োগ, উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন এবং বিনিয়োগের সঙ্গে জ্ঞানের সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি সূচকে প্রথম অবস্থান এবং শেষ পর্যায়ের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল চুক্তিতে চতুর্থ অবস্থান তার উদ্ভাবনী অর্থনীতির বিস্তার বোঝায়। একই সঙ্গে দেশটির গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতিও WIPO উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ, ভারতও নিখুঁত নয়; বরং বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উন্নতির পথে এগোচ্ছে।

ভিয়েতনামের অবস্থান ৪৪তম। ফিলিপাইন ৫০তম। ইন্দোনেশিয়া ৫৫তম। এই দেশগুলোর অগ্রগতি দেখায়, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। বরং পরিকল্পিত শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং গবেষণার ধারাবাহিকতা তৈরি করতে পারলে মধ্যম আয়ের দেশও এগিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই শিক্ষণীয় বিষয়টি রয়েছে। আমরা শুধু কতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, তা দিয়ে নিজেদের অগ্রগতি বিচার করতে পারি না। দেখতে হবে, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কতটা নতুন পণ্য, সেবা, উৎপাদনপদ্ধতি ও জ্ঞান তৈরি করছি।

২. ইনোভেশন ইনডেক্স আসলে কী মাপে? শুধু আবিষ্কার নয়, একটি দেশের সম্পূর্ণ সক্ষমতা

অনেকে মনে করেন, উদ্ভাবন সূচকে ভালো করতে হলে বেশি বেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করতে হবে। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু WIPO—এর সূচক আরও বিস্তৃত।

Global Innovation Index মূলত একটি দেশের উদ্ভাবনী পরিবেশ, সক্ষমতা, কার্যক্রম এবং বাস্তব ফলাফল পরিমাপের চেষ্টা করে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ১৩৯টি দেশের ৭৮টি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সূচক সাতটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত।

প্রথম পাঁচটি স্তম্ভ উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও উপকরণ পরিমাপ করে। এগুলো হলো প্রতিষ্ঠান (Institutions), মানবসম্পদ ও গবেষণা (Human Capital and Research), অবকাঠামো (Infrastructure), বাজারের পরিপক্বতা (Market Sophistication) এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা (Business Sophistication)।

অন্য দুটি স্তম্ভ উদ্ভাবনের ফলাফল পরিমাপ করে। সেগুলো হলো জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎপাদন (Knowledge and Technology Outputs) এবং সৃজনশীল উৎপাদন (Creative Outputs)।

এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। উদ্ভাবনের উপকরণ এবং উদ্ভাবনের ফলাফল—দুটিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একটি দেশে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণাগার, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থাকলেই হবে না। সেগুলো ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি, পণ্য, সেবা ও সৃজনশীল সম্পদ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সহজ করে বললে, একটি বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার আছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সেই পরীক্ষা থেকে নতুন কোনো ধারণা, কার্যকর প্রকল্প বা বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরি হচ্ছে না। তাহলে শুধু বিজ্ঞানাগার থাকার কারণে বিদ্যালয়টিকে উদ্ভাবনী বলা যাবে না।

একই কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ আছে, শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী আছেন, গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল যদি কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে, চিকিৎসার উন্নতি ঘটাতে কিংবা পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে কাজে না লাগে, তাহলে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংযোগ তৈরি হয়নি।

এই সূচক তাই একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি পরীক্ষা না করলেও শিক্ষার মান, গবেষণার সক্ষমতা এবং জ্ঞান উৎপাদনের কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, GII কোনো দেশের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা সরাসরি পরীক্ষা করে না। এটি উদ্ভাবনী পরিবেশ ও ফলাফলের বিভিন্ন পরিমাপযোগ্য দিককে একত্র করে। তাই এই র‍্যাঙ্কিংকে শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র মূল্যায়ন হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। বরং শিক্ষার সঙ্গে অর্থনীতি, গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্পর্ক বোঝার একটি সমন্বিত সূচক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

৩. বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়? মানবসম্পদ ও গবেষণায় বিপদের সংকেত

বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান ১০৬তম হলেও সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি পাওয়া যায় মানবসম্পদ ও গবেষণা (Human Capital and Research) স্তম্ভে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। শিক্ষা (Education) উপস্তম্ভে ১৩৪তম। তৃতীয় স্তর বা উচ্চশিক্ষায় অবস্থান ১২২তম। —এগুলো শুধু নিম্ন অবস্থান নয়; বরং আমাদের উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

মানবসম্পদ বলতে শুধু জনসংখ্যা বা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বোঝায় না। একজন মানুষ কতটা জ্ঞান অর্জন করেছেন, সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারেন কি না, নতুন সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারেন কি না এবং উৎপাদনশীল কাজে অংশ নিতে পারেন কি না—এসব বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার বিস্তার এবং শিক্ষার কার্যকর সক্ষমতা এক বিষয় নয়। WIPO—এর বাংলাদেশের প্রোফাইলে শিক্ষা খাতে ব্যয় GDP—এর ২.০ শতাংশ, যা সংশ্লিষ্ট সূচকে ১২৯তম অবস্থানে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারি অর্থায়নের সূচকে অবস্থান ৯১তম। বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের প্রত্যাশিত মেয়াদ ১১.১ বছর, অবস্থান ১০৪তম। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক—শিক্ষার্থী অনুপাতের সূচকে অবস্থান ১২১তম।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ২ শতাংশ কোনো একটি বিদ্যালয়ের বাজেট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির তুলনায় সরকারি শিক্ষা ব্যয়ের অনুপাত। অর্থাৎ, একটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনের কত অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেটিই এখানে বিবেচিত হয়েছে। —এত কম বিনিয়োগের পরিবেশে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণাগার, প্রযুক্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর শেখার পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক তৈরি। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মোট স্নাতকদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ের স্নাতকদের অংশ ১১.১ শতাংশ। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। —এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা সীমিত। এখানে শুধু বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে ভর্তি বাড়ালেই সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কী ধরনের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করছে, গবেষণায় অংশ নিতে পারছে কি না এবং স্নাতক হওয়ার পর সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী চার বছর ধরে প্রকৌশল পড়লেন। কিন্তু বাস্তব শিল্পকারখানায় কাজের অভিজ্ঞতা নেই, গবেষণাগারে নিয়মিত কাজের সুযোগ নেই, কোনো প্রকল্প তৈরি করেননি, এমনকি নিজের বিভাগের বাইরে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজও করেননি। তাঁর সনদ থাকবে, কিন্তু উদ্ভাবনী সক্ষমতা কতটা তৈরি হবে, সেটি বড় প্রশ্ন।

৪. শ্রেণিকক্ষের সংকট: উত্তর মুখস্থ, প্রশ্ন করার অভ্যাস কোথায়?

উদ্ভাবনের সূচনা হয় প্রশ্ন থেকে। একটি শিশু যখন জানতে চায়, আকাশ নীল কেন, গাছের পাতা সবুজ কেন, কিংবা একটি যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তখনই তার মধ্যে অনুসন্ধানের প্রবণতা প্রকাশ পায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর মনে রাখার গুরুত্ব অনেক বেশি হয়ে উঠেছে।

এটি সব বিদ্যালয় বা সব শিক্ষকের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে কাজ করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞানমেলা, বিতর্ক, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবু সামগ্রিক ব্যবস্থায় পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে শেখার প্রবণতা শক্তিশালী।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। মুখস্থবিদ্যা (Rote Learning) শিক্ষার্থীকে বিদ্যমান তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) তাকে তথ্য যাচাই করতে, বিভিন্ন যুক্তির তুলনা করতে এবং নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শেখায়। অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা (Inquiry—based Learning) তাকে প্রশ্ন করতে, প্রমাণ সংগ্রহ করতে এবং পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত যাচাই করতে শেখায়। —উদ্ভাবনের জন্য এই তিনটি সক্ষমতার সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু তথ্য মনে রাখলে হবে না; তথ্যকে ব্যবহার করতে হবে।

ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী পানিদূষণ সম্পর্কে একটি অধ্যায় পড়ছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে সে দূষণের সংজ্ঞা, কারণ ও প্রতিকার মুখস্থ করবে। পরীক্ষায় ভালো নম্বরও পেতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানভিত্তিক পদ্ধতিতে শিক্ষক তাকে স্থানীয় কোনো জলাশয়ের পানির নমুনা সংগ্রহ করতে বলতে পারেন। শিক্ষার্থীরা পানির রং, গন্ধ, পরিবেশগত অবস্থা এবং উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দূষণের সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করতে পারে। এরপর তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার প্রস্তাব দেবে।

দুটি পদ্ধতিতেই একই বিষয় পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, দলগত কাজ, তথ্য সংগ্রহ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করছে। আর এটাই উদ্ভাবনমুখী শিক্ষার ভিত্তি।

অবশ্য বাস্তবতা হলো, সব বিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উপকরণ কিংবা প্রকল্প পরিচালনার অর্থ নেই। বড় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকস্বল্পতা, প্রশাসনিক চাপ এবং পাঠ্যসূচি শেষ করার তাগিদও বাধা তৈরি করে। ফলে শুধু শিক্ষককে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ বোঝা যাবে না।

শিক্ষককে উদ্ভাবনী পাঠদান করতে বলার আগে তাঁকে সেই পরিবেশ দিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উপকরণ, সময়, পেশাগত স্বাধীনতা এবং উপযুক্ত মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অপরদিকে শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে বিরক্তি হিসেবে দেখা হলে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হবে না। আর প্রশ্ন করার অভ্যাস না থাকলে উদ্ভাবনের সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে না।

৫. শিক্ষক: পাঠ্যবইয়ের ব্যাখ্যাকারী, নাকি নতুন জ্ঞান তৈরির পথপ্রদর্শক?

একটি উদ্ভাবনী শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকেন শিক্ষক। প্রযুক্তি, পাঠ্যক্রম, গবেষণাগার কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—কোনোটিই শিক্ষকের বিকল্প নয়। শিক্ষকই শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা তৈরি করেন। তিনি ভুল উত্তরকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন, আবার ভুলের জন্য শিক্ষার্থীকে নিরুৎসাহিতও করতে পারেন। একই শ্রেণিকক্ষে দুই ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি হওয়ার পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা কতটা উদ্ভাবনমুখী?

একজন শিক্ষককে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দিলেই যথেষ্ট নয়। তাঁকে শেখাতে হবে কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হয়, কীভাবে বাস্তব সমস্যাকে পাঠের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, কীভাবে দলগত প্রকল্প পরিচালনা করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি মূল্যায়ন করতে হয়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণে গবেষণাভিত্তিক পাঠদান (Research—based Teaching), প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা (Project—based Learning), অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষকশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে গবেষণা ও উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ যদি শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা, পরীক্ষা ও সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শ্রেণিকক্ষে তার প্রভাবও সীমিত থাকবে।

শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নকে এককালীন প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শিক্ষককে নিয়মিত গবেষণা, সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নতুন শিক্ষণপদ্ধতি পরীক্ষা এবং নিজের পাঠদানের ফলাফল মূল্যায়নের সুযোগ দিতে হবে। এখানে শিক্ষকের স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিক্ষার্থী একইভাবে শেখে না। একই পাঠ সব শ্রেণিতে একই পদ্ধতিতে কার্যকর হয় না। শিক্ষক যদি স্থানীয় বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে না পারেন, তাহলে উদ্ভাবনী শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়।

একজন ভালো শিক্ষক শুধু সঠিক উত্তর জানেন না। তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষার্থী নিজে উত্তর খুঁজতে শেখে। — এই পার্থক্যটি বুঝতে না পারলে আমরা হয়তো অনেক সনদধারী শিক্ষক তৈরি করব, কিন্তু উদ্ভাবনের পথপ্রদর্শক শিক্ষক তৈরি করতে পারব না।

৬. বিশ্ববিদ্যালয় আছে, গবেষণা আছে—কিন্তু জ্ঞান উৎপাদনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক কতটুকু?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্বের একটি হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। শিক্ষা ও গবেষণা একে অন্যের পরিপূরক। গবেষণাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণা করছেন। আন্তর্জাতিক জার্নালেও বাংলাদেশের গবেষকদের কাজ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরও বিস্তৃত, মানসম্মত ও বাস্তবমুখী করতে হবে।

WIPO—এর সূচকে বাংলাদেশের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎপাদন (Knowledge and Technology Outputs) স্তম্ভে অবস্থান ৯৯তম। জ্ঞান সৃষ্টির উপস্তম্ভে অবস্থান ৯৭তম। উৎপত্তির ভিত্তিতে পেটেন্টের সূচকে অবস্থান ১২৪তম। অর্থনীতির আকারের তুলনায় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রবন্ধ প্রকাশের সূচকে অবস্থান ১১৭তম।

অন্যদিকে, গবেষণাপত্রের প্রভাব পরিমাপের H—index সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৯তম। এটি একটি তুলনামূলক ইতিবাচক দিক। অর্থাৎ, গবেষণার কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক জ্ঞান উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত প্রয়োগে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। বাংলাদেশের গবেষকসংখ্যা এবং GDP—এর তুলনায় গবেষণা ও উন্নয়নে মোট ব্যয়ের কয়েকটি মৌলিক তথ্য WIPO—এর প্রোফাইলে অনুপস্থিত। এগুলোকে শূন্য ধরে নেওয়া যাবে না। প্রতিবেদনে অনুপস্থিত তথ্যকে ‘n/a’ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সেগুলো সূচক গণনায় শূন্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। তাই গবেষণা খাতের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি।

তবু যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগের। বিশ্ববিদ্যালয়—শিল্পপ্রতিষ্ঠান গবেষণা সহযোগিতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৪তম। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে সংযোগ দুর্বল।

এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী নিয়ে গবেষণা করছেন। অন্যদিকে, একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কম খরচে টেকসই নির্মাণসামগ্রী তৈরি করতে চায়। দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ, যৌথ গবেষণা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকলে গবেষণার ফলাফল বাজারে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি আলাদা জগতে অবস্থান করে, তাহলে গবেষণা গবেষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি প্রযুক্তি কিনবে, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাপত্র প্রকাশ করবে, আর দেশের নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ সীমিত থাকবে।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। গবেষণার অর্থায়ন, যৌথ প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষকের মেধাস্বত্ব এবং গবেষণার বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার গবেষণাগত দায়িত্ব উপেক্ষিত হয়। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণার ব্যয় বহনে আগ্রহী না করলে জ্ঞান অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে না।

৭. ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের কাছ থেকে কী শেখার আছে?

উদ্ভাবনে অগ্রগতির জন্য সব দেশকে একই পথ অনুসরণ করতে হয় না। WIPO—এর প্রতিবেদনও দেখিয়েছে, বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো ও সক্ষমতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়েছে। যেমন: সুইজারল্যান্ড ২০২৫ সালে প্রথম, সুইডেন দ্বিতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয়। দক্ষিণ কোরিয়া চতুর্থ, সিঙ্গাপুর পঞ্চম। চীন প্রথমবারের মতো শীর্ষ দশে প্রবেশ করে দশম অবস্থানে এসেছে। —এই দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়: শক্তিশালী গবেষণা ও উন্নয়ন, উন্নত প্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষা এবং উদ্ভাবনে সক্রিয় বেসরকারি খাত। তবে তাদের সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং গবেষণার ফলাফলকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তরের সক্ষমতাও রয়েছে।

  • ভারত—শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরির সংযোগ: ভারতের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাই—এই চারটি শহর WIPO—এর ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ উদ্ভাবন ক্লাস্টারের তালিকায় রয়েছে। সেখানে উদ্ভাবন ক্লাস্টার বলতে এমন একটি ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝায়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরি করে। ভারতের ক্ষেত্রে এই সংযোগ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানিতে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গবেষণা, প্রযুক্তি, শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
  • ভিয়েতনাম—উৎপাদন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার : ভিয়েতনাম ৪৪তম অবস্থানে। দেশটির অগ্রগতিতে উচ্চপ্রযুক্তির রপ্তানি, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন এবং বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশটি প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগতে পারে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রপ্তানি করছি। কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত উপকরণ, টেক্সটাইল প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, ডিজাইন এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরিতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
  • চীন—গবেষণাকে উৎপাদনের শক্তিতে রূপান্তর: চীন ২০২৫ সালে দশম অবস্থানে উঠে এসেছে। WIPO—এর প্রতিবেদনে দেশটির গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, পেটেন্ট এবং উদ্ভাবন ক্লাস্টারের শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ উদ্ভাবন ক্লাস্টারের মধ্যে চীনের ২৪টি রয়েছে। এখানে শিক্ষা ও শিল্পের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি জ্ঞান শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকলে গবেষণার ফলাফল উৎপাদনক্ষমতায় রূপ নেয়। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, গবেষণাকে বিচ্ছিন্ন একাডেমিক কাজ হিসেবে না দেখে জাতীয় উৎপাদন ও সামাজিক সমস্যার সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
  • রুয়ান্ডা—কম আয় মানেই উদ্ভাবনে অক্ষমতা নয়: আরেকটি উদাহরণ রুয়ান্ডা। দেশটি নিম্ন আয়ের অর্থনীতির মধ্যে ২০২৫ সালে প্রথম এবং সামগ্রিকভাবে ১০৪তম। বাংলাদেশের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে। —এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উদ্ভাবনের জন্য শুধু বিপুল অর্থ বা উন্নত শিল্পভিত্তি প্রয়োজন—এমন ধারণা সঠিক নয়। সীমিত সম্পদ নিয়েও সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার, দক্ষ প্রশাসন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। তবে বাংলাদেশের মতো বড় জনসংখ্যার দেশে রুয়ান্ডার মডেল হুবহু প্রয়োগ করা যাবে না। বরং দেশটির ধারাবাহিকতা, লক্ষ্য নির্ধারণ ও সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

৮. উদ্ভাবনের পথে পাঁচটি বড় বাধা: অর্থ, প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি, বাজার ও সংযোগ

বাংলাদেশের উদ্ভাবন—সংকটের পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। সমস্যাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি দুর্বলতা অন্য দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

  • প্রথম বাধা —গবেষণায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ: গবেষণা ও উন্নয়ন (Research and Development—R&D) হলো নতুন জ্ঞান, পণ্য, প্রযুক্তি ও উৎপাদনপদ্ধতি তৈরির জন্য পরিকল্পিত অনুসন্ধান ও পরীক্ষামূলক কাজ। এই কাজের জন্য অর্থ, সময়, দক্ষ গবেষক, যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে গবেষণার জন্য স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুদান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা বিনিয়োগ এবং সরকারি গবেষণা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
  • দ্বিতীয় বাধা—গবেষণার পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা গবেষণা করতে হলে স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তোলার সুযোগ প্রয়োজন। গবেষণার বিষয় নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল প্রকাশ এবং মতভিন্নতা প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাগত স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অস্থিরতা, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গবেষণা অনুদানের অনিয়মিততা কিংবা গবেষণার উপকরণ সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে গবেষণার গতি কমে যায়। WIPO—এর সূচকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগত স্তম্ভে অবস্থান ১০৯তম। ব্যবসায়িক পরিবেশের উপস্তম্ভে অবস্থান ৮১তম হলেও সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানগত পরিবেশের স্কোর ৩৩.৯। এই তথ্য প্রতিষ্ঠান ও নীতিগত পরিবেশ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
  • তৃতীয় বাধা—শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের ব্যবধান।: শিক্ষার্থী যে জ্ঞান অর্জন করছে, কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগের সুযোগ কতটা আছে? শিল্পপ্রতিষ্ঠান কী ধরনের দক্ষতা চায়? বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই চাহিদা বুঝে পাঠ্যক্রম তৈরি করছে? —এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দুর্বল হলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ে, আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পায় না। এখানে শুধু শিক্ষার্থীদের দক্ষতার অভাব নয়; শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতাও বিবেচনা করতে হবে।
  • চতুর্থ বাধা—নতুন উদ্যোগের অর্থায়ন সংকট।: একটি উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। অনেক সময় একটি প্রযুক্তি বা পণ্য তৈরিতে দীর্ঘদিন কাজ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পান না। WIPO—এর সূচকে বাংলাদেশের বাজারের পরিপক্বতা স্তম্ভে অবস্থান ৯৬তম এবং বিনিয়োগ উপস্তম্ভে ৯৮তম। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারীসংক্রান্ত সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান ১০৮তম। এর অর্থ, নতুন ধারণাকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার আর্থিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
  • পঞ্চম বাধা—ব্যর্থতাকে গ্রহণ না করার সংস্কৃতি: ; উদ্ভাবনের পথে ভুল হবে। প্রথম পরীক্ষায় কোনো প্রকল্প সফল নাও হতে পারে। একটি নতুন পণ্য বাজারে গ্রহণযোগ্যতা নাও পেতে পারে। গবেষণার অনুমান ভুল প্রমাণিত হতে পারে। —এসব ব্যর্থতা গবেষণা ও উদ্ভাবনের স্বাভাবিক অংশ।ম কিন্তু আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে ব্যর্থতাকে অনেক সময় অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। পরীক্ষায় কম নম্বর, প্রতিযোগিতায় পরাজয় কিংবা নতুন উদ্যোগের ব্যর্থতা একজন শিক্ষার্থী বা তরুণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। অথচ উদ্ভাবনের জন্য এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকবে এবং একই সঙ্গে দায়িত্বশীলতা বজায় থাকবে। আর এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: ব্যর্থতাকে গ্রহণ করা মানে অপচয়, অব্যবস্থাপনা বা দায়িত্বহীনতাকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। বরং পরিকল্পিত পরীক্ষা, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং শেখার সুযোগ তৈরি করা।

৯. বাংলাদেশের সম্ভাবনা কি নেই? আছে—কিন্তু সম্ভাবনাকে ফলাফলে রূপ দিতে হবে

বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হলেও প্রতিবেদনটিতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সেগুলো উপেক্ষা করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ হবে।

  • প্রথমত, বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি বৈচিত্র্যের বৈশ্বিক সূচকে অবস্থান ৮০তম।
  • দ্বিতীয়ত, শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির সূচকে অবস্থান ১১তম।
  • তৃতীয়ত, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রবাহের সূচকে অবস্থান ১১তম।
  • চতুর্থত, মোবাইল অ্যাপ তৈরির সূচকে অবস্থান ৭২তম।
  • পঞ্চমত, সৃজনশীল সম্পদের তীব্রতা (Intangible Asset Intensity) সূচকে অবস্থান ৪২তম।

এগুলো দেখায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে কিছু উদ্ভাবনী সক্ষমতা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা, ক্ষুদ্রঋণ, উৎপাদন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং সৃজনশীল সম্পদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীও একটি বড় সম্পদ। WIPO—এর ব্যবসায়িক সক্ষমতা স্তম্ভে Youth Demographic Dividend সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। অর্থাৎ, তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যাগত সুবিধা (Demographic Dividend) তখনই বাস্তব সম্পদে পরিণত হয়, যখন তরুণরা মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ পায়। একটি তরুণ জনগোষ্ঠী যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ না পায়, গবেষণায় যুক্ত হতে না পারে, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ না পায় কিংবা নতুন উদ্যোগ শুরু করার অর্থায়ন না পায়, তাহলে জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে।

আমাদের সামনে তাই দুটি পথ। একদিকে রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, বড় বাজার এবং উৎপাদনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা। অন্যদিকে রয়েছে শিক্ষার গুণগত দুর্বলতা, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ এবং শিল্প—একাডেমিয়া সংযোগের ঘাটতি। —কোন পথটি শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের নীতি, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপর।

১০. শিক্ষা সংস্কার: পরীক্ষায় প্রথম নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধানে দক্ষ প্রজন্ম চাই

বাংলাদেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পথ হলো শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তন শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বদলানো কিংবা নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষার উদ্দেশ্য, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষক তৈরির পদ্ধতি, মূল্যায়নব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

  • প্রথম পরিবর্তনটি প্রয়োজন শিক্ষার দর্শনে। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু চাকরির জন্য যোগ্যতা অর্জন নয়। মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সমাজের সমস্যার সমাধানে সক্ষম করে তোলাও শিক্ষার দায়িত্ব।—এ জন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। শিশুদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা, প্রশ্ন তৈরি, তথ্য সংগ্রহ এবং সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দিতে হবে। বিজ্ঞান শেখার জন্য সব সময় ব্যয়বহুল গবেষণাগারের প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় পরিবেশ, কৃষি, পানি, মাটি, আবহাওয়া, বিদ্যুৎ ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোও শেখার উপকরণ হতে পারে।
  • দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু লিখিত পরীক্ষায় মুখস্থ তথ্য পুনরুৎপাদন করার ক্ষমতা যাচাই করলে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যায় না। মূল্যায়নে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, ব্যবহারিক কাজ, প্রকল্প, দলগত সমস্যা সমাধান এবং উপস্থাপনার দক্ষতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।—তবে এর অর্থ লিখিত পরীক্ষা বাতিল করা নয়। বরং লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment) যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থী কীভাবে শিখছে, কীভাবে নিজের ভুল সংশোধন করছে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করছে—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
  • তৃতীয়ত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। উদ্ভাবন শুধু প্রকৌশলীর কাজ নয়। একজন অর্থনীতিবিদ নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করতে পারেন। একজন সমাজবিজ্ঞানী সামাজিক সমস্যার নতুন সমাধান দিতে পারেন। একজন শিক্ষক শিক্ষাদানের কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করতে পারেন। একজন আইন গবেষক প্রযুক্তির নৈতিক ও আইনি ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন।—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তি বোঝার পাশাপাশি মানুষের অধিকার, নৈতিকতা, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশ বোঝাও জরুরি।
  • চতুর্থত, আন্তবিষয়ক শিক্ষা (Interdisciplinary Education) চালু করতে হবে। একজন প্রকৌশলীকে অর্থনীতি বুঝতে হবে, একজন চিকিৎসককে তথ্যপ্রযুক্তি বুঝতে হবে, একজন কৃষিবিদকে পরিবেশ ও বাজার বুঝতে হবে। বাস্তব সমস্যাগুলো কোনো একটি বিষয়ের সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না।
  • পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর প্রথমবার গবেষণার ধারণা পাওয়ার পরিবর্তে মাধ্যমিক স্তর থেকেই বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ এবং প্রকল্পভিত্তিক কাজের অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থী যেন নিজের এলাকায় একটি সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানের প্রস্তাব তৈরি করতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মডেল তৈরি করবে, কেউ কৃষিতে পানির অপচয় কমানোর পদ্ধতি অনুসন্ধান করবে, কেউ বিদ্যালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করবে। এগুলো ছোট উদ্যোগ। কিন্তু এখান থেকেই বড় গবেষণার মানসিকতা তৈরি হতে পারে।

১১. বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার: ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনী অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন প্রয়োজন।

  • প্রথমেই গবেষণা অর্থায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান (Competitive Research Grants) চালু করা যেতে পারে। গবেষণার মান, সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব, বাস্তব প্রয়োগ এবং গবেষকের সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি জাতীয় গবেষণা তহবিল (National Research Fund) গঠন করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, শিল্পপ্রযুক্তি এবং নগর ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। গবেষণার অর্থ শুধু বড় বিশ্ববিদ্যালয় বা পরিচিত গবেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তরুণ শিক্ষক, নতুন গবেষক, নারী গবেষক এবং অপেক্ষাকৃত কম সুযোগপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য পৃথক অনুদান কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন।
  • দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (Research and Innovation Centre) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু নামফলক বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নয়; এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল, গবেষণাগার, তথ্যভান্ডার, অর্থায়ন এবং বাস্তব প্রকল্প থাকতে হবে।
  • তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণার ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা সেই সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন। যৌথ অর্থায়ন ও ফলাফল ব্যবহারের বিষয়ে আগেই চুক্তি থাকবে।
  • চতুর্থত, প্রযুক্তি হস্তান্তর দপ্তর (Technology Transfer Office) গড়ে তুলতে হবে। কোনো গবেষক নতুন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, পণ্য বা উৎপাদনপদ্ধতি তৈরি করলে সেটিকে পেটেন্ট, লাইসেন্স কিংবা বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দপ্তর সহায়তা করবে।
  • পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্টার্টআপ ইনকিউবেটর (Startup Incubator) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনকিউবেটর হলো এমন একটি সহায়ক ব্যবস্থা, যেখানে নতুন উদ্যোক্তারা প্রাথমিক পর্যায়ে পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, কাজের জায়গা, বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরির সহায়তা পান।

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি নতুন ধারণা তৈরি করলে তাকে শুধু চাকরির প্রস্তুতির দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। তার ধারণাটি পরীক্ষার, উন্নয়নের এবং প্রয়োগের সুযোগ থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ক্ষেত্রে এমন উদ্ভাবনী কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পদ ভাগাভাগির ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গবেষণার স্বাধীনতা, মেধার মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, মতভিন্নতা প্রকাশের কারণে পেশাগত ঝুঁকিতে পড়েন কিংবা গবেষণার অর্থায়ন অনিশ্চিত থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরি হবে না।—বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে রেখে জ্ঞানচর্চার নিরাপদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা উদ্ভাবননীতিরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

১২. উদ্ভাবনী প্রজন্ম তৈরির জাতীয় কর্মপরিকল্পনা: আগামী দশ বছরের জন্য কী করতে হবে?

বাংলাদেশের উদ্ভাবন—সংকট সমাধানে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মেয়াদ হতে পারে ২০২৭ থেকে ২০৩৬ সাল। এই পরিকল্পনায় শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

  • প্রথম পর্যায়—ভিত্তি তৈরি (২০২৭–২০২৮): প্রথম দুই বছরে দেশের শিক্ষা ও গবেষণা সক্ষমতার একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোন বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার আছে, কোথায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরনের গবেষণার সুযোগ আছে, গবেষণার জন্য কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কী ধরনের প্রযুক্তিগত চাহিদা রয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় উদ্ভাবন কাউন্সিল (National Innovation Council) গঠন করা যেতে পারে। এই কাউন্সিলে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিল্প, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কাউন্সিলের কাজ হবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
  • দ্বিতীয় পর্যায়—শ্রেণিকক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তন (২০২৯–২০৩১): এই পর্যায়ে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। নির্বাচিত বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি ও পরিবেশভিত্তিক উদ্ভাবনাগার স্থাপন করা যেতে পারে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী গবেষণা অনুদান, আন্তবিভাগীয় প্রকল্প এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালু করতে হবে।
  • শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকতার মূল্যায়নে শুধু ক্লাস নেওয়া ও পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি, গবেষণা এবং নতুন শিক্ষণপদ্ধতির প্রয়োগও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
  • তৃতীয় পর্যায়—গবেষণাকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা (২০৩২–২০৩৪): এই পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণার সংখ্যা বাড়াতে হবে। কৃষি, পোশাকশিল্প, ওষুধ, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ এবং ডিজিটাল সেবায় প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রকল্প নিতে হবে। স্টার্টআপ অর্থায়ন, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং গবেষণার বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি ক্রয়ে উদ্ভাবনী পণ্য পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
  • চতুর্থ পর্যায়—আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা (২০৩৫–২০৩৬): এই পর্যায়ে বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, পেটেন্ট, উচ্চপ্রযুক্তির রপ্তানি, জ্ঞাননির্ভর কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি। শুধু GII—তে অবস্থান উন্নত করার জন্য নয়, বরং দেশের উৎপাদনশীলতা, মানুষের জীবনমান এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য এসব লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবছর প্রকাশ করতে হবে। লক্ষ্য পূরণ না হলে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসূচি সংশোধন করতে হবে।

১৩. ইনোভেশন ইনডেক্সকে শিক্ষা সংস্কারের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার: শুধু র‍্যাঙ্কিং নয়, বাস্তব পরিবর্তন চাই

WIPO—এর সূচককে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে একটি ভুল করা যাবে না। শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য শুধু GII—তে কত ধাপ এগোলাম, তা দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়। কারণ GII—তে ৭৮টি সূচক রয়েছে, যার সবগুলো সরাসরি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আবার বিভিন্ন সূচকের তথ্য ভিন্ন ভিন্ন বছরের। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে কোনো কোনো তথ্য ২০২৩, ২০২২ কিংবা তারও আগের বছরের। ফলে ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন মানেই সব তথ্য ২০২৫ সালের নয়।

এ ছাড়া প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করেছে, সূচকের কাঠামো, তথ্যের প্রাপ্যতা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে বছরভিত্তিক অবস্থান সরাসরি তুলনা করা সব সময় যথাযথ নয়। তাই বাংলাদেশের জন্য দুটি স্তরে মূল্যায়নব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।

  • প্রথম স্তরে থাকবে আন্তর্জাতিক তুলনার জন্য GII—এর সাতটি স্তম্ভ।
  • দ্বিতীয় স্তরে থাকবে জাতীয় শিক্ষা ও উদ্ভাবন পর্যবেক্ষণ কাঠামো।

এই জাতীয় কাঠামোতে কয়েকটি বিষয় নিয়মিত পরিমাপ করা যেতে পারে।

পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র
প্রস্তাবিত পরিমাপক
শিক্ষা বিনিয়োগ
GDP—এর তুলনায় শিক্ষা ব্যয়
শিক্ষক উন্নয়ন
প্রশিক্ষিত ও গবেষণায় যুক্ত শিক্ষকের অনুপাত
শিক্ষার্থীর সক্ষমতা
সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগমূলক দক্ষতা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
STEM স্নাতক ও গবেষণায় অংশগ্রহণ
গবেষণা
R&D ব্যয়, গবেষকসংখ্যা ও মানসম্মত প্রকাশনা
উদ্ভাবন
পেটেন্ট, কার্যকর প্রযুক্তি ও নতুন পণ্য
শিল্প—একাডেমিয়া সংযোগ
যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর
উদ্যোক্তা উন্নয়ন
নতুন স্টার্টআপ ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ
সৃজনশীলতা
ডিজাইন, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট ও সৃজনশীল সম্পদ

এসব সূচকের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ গবেষণা ও শিক্ষা নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্য বিনিময়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থায় যুক্ত করা যেতে পারে।

বিশেষভাবে প্রয়োজন গবেষণার ব্যয়ের সঠিক হিসাব। সরকারি, বেসরকারি, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান—প্রতিটি খাতে গবেষণা ও উন্নয়নে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলাফল কীভাবে বাস্তব জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, তা নয়; কতটি গবেষণা থেকে নতুন প্রযুক্তি, পণ্য, নীতিগত পরিবর্তন কিংবা সামাজিক সমস্যার সমাধান তৈরি হলো, সেটিও দেখতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্ভাবনকে ঢাকাকেন্দ্রিক করা যাবে না। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। কৃষি, মৎস্য, নদী, জলবায়ু, পর্যটন, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় শিল্পের সমস্যা নিয়ে আঞ্চলিক উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।—এভাবে জাতীয় উদ্ভাবনব্যবস্থা শুধু কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও উদ্যোক্তারাও এতে অংশ নিতে পারবেন।

১৪. রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সমাজ: দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

বাংলাদেশের উদ্ভাবন—সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই শিক্ষার্থীদের দক্ষতার অভাব, শিক্ষকদের দুর্বলতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়। এসব বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের নয়।

  • রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো এবং স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার স্বাধীনতা, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি, গবেষণার নৈতিকতা এবং জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ নিশ্চিত করা।
  • শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তি উন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
  • শিক্ষকের দায়িত্ব হলো নিজের জ্ঞান নিয়মিত উন্নত করা, শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো এবং গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
  • শিক্ষার্থীর দায়িত্ব হলো কৌতূহলী থাকা, প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, নতুন দক্ষতা অর্জন করা এবং নিজের জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা করা।
  • গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও ভূমিকা আছে।

আসলে উদ্ভাবন শুধু বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সংবাদ নয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কী নতুন ধারণা তৈরি করছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কীভাবে কৃষকের কাজে লাগছে, স্থানীয় কোনো তরুণ কীভাবে পরিবেশগত সমস্যার সমাধান করছে—এসব বিষয় গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এখানে জবাবদিহির প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার শিক্ষা ও গবেষণায় অর্থ ব্যয় করলে তার ফলাফল কী, তা প্রকাশ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য অর্থ পেলে কী অর্জন করল, তা জানাতে হবে। কোনো গবেষণা প্রকল্প ব্যর্থ হলে কেন ব্যর্থ হলো, তা মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো প্রযুক্তি সফল হলে সেটি কীভাবে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ, উদ্ভাবননীতি কেবল অর্থ বরাদ্দের নীতি হতে পারে না। এটি হতে হবে ফলাফল, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার নীতি।

তাহলে পথ কোথায়?

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির অভাব নয়; বরং প্রযুক্তি ও জ্ঞান তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলা। আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারি, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারি, বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারি, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবাও নিতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তির কতটুকু আমরা নিজেরা তৈরি করছি?

একটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্যের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু স্থায়ী প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করতে হলে নিজের জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি তৈরি করতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি জাতীয় উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা দর্শন। এই দর্শনে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার উত্তর লিখবে না; বাস্তব সমস্যার উত্তর খুঁজবে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই ব্যাখ্যা করবেন না; শিক্ষার্থীর চিন্তার বিকাশ ঘটাবেন। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ দেবে না; নতুন জ্ঞান তৈরি করবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু উৎপাদন করবে না; প্রযুক্তি উন্নয়নেও বিনিয়োগ করবে।

এ জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তরুণদের নতুন উদ্যোগের জন্য অর্থায়ন ও সহায়তা দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার মানকে রাজনৈতিক প্রচারণা, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা বন্ধ করতে হবে। দেখতে হবে, শিক্ষার্থী কী শিখছে এবং সেই শিক্ষা দিয়ে কী করতে পারছে।

বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে তিনটি স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে: শিক্ষার্থীকে চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষককে জ্ঞান ও গবেষণার পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজ ও অর্থনীতির জ্ঞানকেন্দ্রে রূপান্তর করা।

এ কাজ এক—দুই বছরে সম্ভব নয়। কিন্তু শুরু করতে দেরি করারও সুযোগ নেই।

শেষ কথা: আমরা কি শুধু মেধা রপ্তানি করব, নাকি মেধা দিয়ে দেশ গড়ব?

বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীর অভাব নেই। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন, গবেষণা করছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও বাংলাদেশি গবেষকদের অংশগ্রহণ রয়েছে। দেশের ভেতরেও অনেক শিক্ষক, গবেষক, প্রকৌশলী ও তরুণ উদ্যোক্তা সীমিত সুযোগের মধ্যে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন।—তাহলে প্রশ্নটি মেধার নয়। প্রশ্নটি সুযোগের, পরিবেশের এবং প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতার।

যে শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকে প্রশ্ন করতে শেখেনি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাকে হঠাৎ উদ্ভাবক হওয়ার প্রত্যাশা করা যায় না। যে শিক্ষক গবেষণার সুযোগ পাননি, তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত গবেষণাভিত্তিক পাঠদান আশা করাও কঠিন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অর্থ, স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই, সেখানে বিশ্বমানের গবেষণার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হয় না। আর যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তি তৈরির চেয়ে শুধু স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে না।

এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। WIPO—এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন আমাদের অবস্থান দেখিয়েছে। কিন্তু ১০৬তম অবস্থানই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নয়। এটি একটি সতর্কসংকেত। এই সংকেত থেকে আমরা কী শিখব, সেটিই আসল বিষয়।

একটি দেশ কতটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কত নতুন জ্ঞান তৈরি করল। কত শিক্ষার্থী পাস করল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তারা কতটি বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারল। কতজন শিক্ষক নিয়োগ পেলেন, তার চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, তাঁরা কতজন শিক্ষার্থীর মধ্যে চিন্তা, অনুসন্ধান ও গবেষণার আগ্রহ তৈরি করতে পারলেন।

আমরা যদি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে পারি, যারা শুধু চাকরি খুঁজবে না, নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করবে; শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, নিজেরাও প্রযুক্তি তৈরি করবে; শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ করবে না, বইয়ের বাইরের প্রশ্নও করতে শিখবে—তাহলেই বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হবে।

একদিন আমাদের কোনো শিক্ষার্থী যখন নিজের তৈরি প্রযুক্তি দিয়ে কৃষকের উৎপাদন বাড়াবে, কোনো গবেষক যখন স্থানীয় রোগের কার্যকর চিকিৎসা নিয়ে কাজ করবেন, কোনো প্রকৌশলী যখন দেশের জন্য সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব যন্ত্র তৈরি করবেন কিংবা কোনো শিক্ষক যখন একটি প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ করে দেবেন, তখনই উদ্ভাবনের প্রকৃত অর্থ দৃশ্যমান হবে।—সেদিন হয়তো আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও বদলাবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটবে মানুষের জীবনে।

আজ আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন। আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছি, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু উত্তর দিতে শেখে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছি, যেখানে সে নতুন প্রশ্ন তৈরি করার সাহসও পায়?

কারণ যে জাতির শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা নেই, তার গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ে। একটি দেশের উদ্ভাবনী ভবিষ্যৎ শুরু হয় কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিশাল ভবনে নয়। শুরু হয় একটি শ্রেণিকক্ষে, একজন শিক্ষকের প্রশ্নে এবং একজন শিক্ষার্থীর কৌতূহলে। আর সেই কৌতূহলকে আমরা কতটা সম্মান করি, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের অবস্থান।

–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #GlobalInnovationIndex #GII2025 #WIPO #Innovation #EducationReform #শিক্ষাসংস্কার #উদ্ভাবন #গবেষণা #ResearchAndDevelopment #HigherEducation #UniversityResearch #STEMEducation #CriticalThinking #CreativeLearning #InnovationEcosystem #TeacherEducation #DigitalTransformation #YouthInnovation #KnowledgeEconomy #FutureGeneration #EducationForInnovation