অধিকারপত্র ডটকম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মুল প্রতিবেদন:
হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে আধুনিক যুগের বিমান ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার আগে পবিত্র মক্কায় পৌঁছানো ছিল এক দীর্ঘ, কষ্টকর এবং কখনও কখনও জীবনসংহারী অভিযাত্রা। শত শত বছর ধরে আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লাখো মুসলমান মরুভূমি, পাহাড় ও উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হিজাজে পৌঁছাতেন।
সৌদি গবেষক ও ইতিহাসবিদ Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth তাঁর গ্রন্থ Hajj and Umrah Atlas-এ এসব ঐতিহাসিক হজপথের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। সেখানে প্রাচীন কাফেলা, সমুদ্রপথ, মিকাত এবং বাণিজ্য রুটের সঙ্গে হজযাত্রার গভীর সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।
আফ্রিকান হজের পথ: জাইলা বন্দর থেকে বাব আল-মান্দাব হয়ে জেদ্দা
আফ্রিকার শিং অঞ্চল বা হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আগত হজযাত্রীরা একসময় দীর্ঘ স্থল ও নৌপথ ব্যবহার করতেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মিশর ও শামের কিছু অঞ্চলে এই এলাকাকে “জাইলা দেশ” নামে উল্লেখ করা হতো।
হজযাত্রীরা ভারত মহাসাগরের উপকূল ধরে সোমালিয়ার ঐতিহাসিক জাইলা বন্দরে পৌঁছাতেন। সেখান থেকে তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালি অতিক্রম করে লোহিত সাগর হয়ে জেদ্দা বন্দরের দিকে যাত্রা করতেন।
এছাড়া ভারত মহাসাগরের কমোরোস দ্বীপপুঞ্জ ও পূর্ব আফ্রিকার জাঞ্জিবার অঞ্চল থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক হজপথ গড়ে উঠেছিল। সেই পথে এডেন উপসাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি অতিক্রম করে হজযাত্রীরা জেদ্দায় পৌঁছাতেন।
ছবির ক্যাপশন: হিজাজে আফ্রিকান হজের রুট দেখানো একটি ঐতিহাসিক মানচিত্র।
ছবির উৎস: Hajj and Umrah Atlas by Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth
ইয়েমেনি হজের পথ: পর্বতমালা পেরিয়ে মিকাতের পথে
ইয়েমেন থেকে হজযাত্রার পথ ছিল আরব উপদ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন রুট। এই পথ সানা থেকে শুরু হয়ে সয়দা ও জুরাশ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার পাশ দিয়ে আসির পর্বতমালা অতিক্রম করত। এরপর বিশা, তাবালা ও তুরাবাহ হয়ে কাফেলাগুলো কারনুল মানাজিল পর্যন্ত পৌঁছাত, যা বর্তমানে আস-সায়লুল কাবির নামে পরিচিত।
এই স্থানটি ছিল নজদ অঞ্চলের হজযাত্রীদের মিকাত।
কখনও কখনও ইয়েমেনি কাফেলাগুলো তাবালা থেকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় পথ ধরে ইয়ালামলাম মিকাতের দিকে যেত। বর্তমানে এটি সৌদি আরবের আল-লিথ গভর্নরেটের অন্তর্গত আস-সাদিয়া এলাকায় অবস্থিত এবং মক্কা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার।
ড. মাগলুথ উল্লেখ করেন, Muhammad bin Abdul Rahman bin Rashid Al-Thunaiyan নামের এক গবেষকের মতে, ইসলামের পূর্বে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত পথগুলোই পরে ইয়েমেনের মুসলমানরা হজযাত্রার জন্য ব্যবহার করতে শুরু করেন।
ছবির ক্যাপশন: প্রাচীনকালে ইয়েমেন থেকে আসা হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো মানচিত্র।
ছবির উৎস: Hajj and Umrah Atlas by Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth
ওমানি হজের পথ: মরূদ্যান থেকে হাজরামাউত
ওমান থেকে হজযাত্রার পথ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল।
প্রথম রুটটি ওমান থেকে ইয়াবরিন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইয়াবরিন বর্তমান রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত একটি মরূদ্যান, যা রুব আল-খালি মরুভূমির উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত। এরপর কাফেলাগুলো ইয়ামামা ও দারিয়াহর দিকে যাত্রা করত, যেখানে বসরা ও বাহরাইন অঞ্চল থেকে আসা অন্যান্য হজযাত্রীরাও মিলিত হতেন।
দ্বিতীয় রুটটি বর্তমান ওমানের নিজওয়া প্রদেশের ফিরাক গ্রাম থেকে শুরু হয়ে আওকালান, হাবাত উপকূল ও আল-শিহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আল-শিহরকে ভারত মহাসাগরে হাজরামাউতের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
এরপর কাফেলাগুলো ইয়েমেনি প্রধান হজপথ ধরে মক্কার দিকে অগ্রসর হতো।
ওমানি হজযাত্রীরা কখনও লোহিত সাগরের সমান্তরাল উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে জেদ্দা হয়ে মক্কায় যেতেন, আবার অনেকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ পথও বেছে নিতেন।
ছবির ক্যাপশন: ওমান থেকে হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির উৎস: Hajj and Umrah Atlas by Dr. Sami Abdullah Al-Maghlouth
আল-আহসা বা হাজারি হজের পথ: উপসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক রুট
আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চল বা বর্তমান উপসাগরীয় দেশগুলোর হজযাত্রীরা আল-আহসা পথ ব্যবহার করতেন, যা “হাজারি হজের পথ” নামেও পরিচিত ছিল।
এই পথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। বর্তমান সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের আল-আহসা শহরটি অতীতে “হাজার” নামে পরিচিত ছিল।
ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চল বসরার দক্ষিণ থেকে ওমান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত “বাহরাইন” অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এর সঙ্গে বর্তমান রাষ্ট্র Bahrain-এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। ড. মাগলুথের মতে, বর্তমান বাহরাইন দ্বীপ অতীতে “উয়াল” নামে পরিচিত ছিল।
এই হজপথ কাতিফ শহর থেকে শুরু হয়ে মুবাররাজ অতিক্রম করত। সেখানে কাতার থেকে আসা কাফেলাগুলো একত্রিত হতো। এরপর নজদ হয়ে কাফেলাগুলো মক্কায় পৌঁছাত।
কখনও কখনও জুবাইল অঞ্চল থেকেও কাফেলা যাত্রা শুরু করে নজদের কেন্দ্রস্থল পেরিয়ে মদিনা পর্যন্ত যেত।
‘হাজি’ উপাধির পেছনে যে ত্যাগ ও কষ্ট
১৯৩৪ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তোলা সৌদি আরবের একটি ঐতিহাসিক ছবিতে দেখা যায়, কীভাবে হজযাত্রীরা মরুভূমির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছেন।
এই মহাকাব্যিক যাত্রাগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন বহু মুসলিম সমাজে “হাজি” উপাধি এত সম্মানের।
লেখক Sayyid Abdel-Majid Bakr তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন, “তারা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছিলেন, পাথর ও শিলা তাদের পা রক্তাক্ত করেছিল এবং প্রাচীন গৃহের যাত্রায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করেছিলেন।”
অন্যদিকে ভূগোলবিদ Atef Moatamed আধুনিক যুগের হজব্যবস্থার কিছু দিকের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও আরামের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আজকের হজে ভোগবাদ ও অতিরিক্ত মোবাইল-নির্ভরতা আধ্যাত্মিক মনোযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, অতীতে যেখানে হাজিরা কাবার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে জিকির, তাসবিহ ও ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন থাকতেন, এখন সেখানে অনেকেই মোবাইল ক্যামেরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হজ শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আধ্যাত্মিক ও ভৌগোলিক যাত্রার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে।
হজ #উমরাহ #মক্কা #হিজাজ #ইসলামের_ইতিহাস #ড_সামি_আল_মাগলুথ #হজের_ঐতিহাসিক_পথ #ইয়েমেনি_হজ #আফ্রিকান_হজ #ওমানি_হজ
কীওয়ার্ড: হজের ইতিহাস, ঐতিহাসিক হজপথ, হিজাজ, মক্কা, ইয়েমেনি হজ, আফ্রিকান হজ, ওমানি কাফেলা, আল-আহসা পথ, বাব আল-মান্দাব, জেদ্দা বন্দর, Hajj and Umrah Atlas
ঐতিহাসিক হজপথ হজের ইতিহাস মক্কা হিজাজ ইয়েমেনি হজ আফ্রিকান হজ ওমানি কাফেলা আল-আহসা পথ বাব আল-মান্দাব জেদ্দা বন্দর Hajj and Umrah Atlas

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: