ঢাকা | রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১

দেশের স্বাধীনতা নাকি অপ-সাংবাদিকতা : চিশতী

odhikar patra | প্রকাশিত: ১ এপ্রিল ২০২৩ ২৩:৪০

odhikar patra
প্রকাশিত: ১ এপ্রিল ২০২৩ ২৩:৪০

ছোট বেলায় রচনা পড়তে গিয়ে শিখেছিলাম, সংবাদপত্র সমাজ বদলের হাতিয়ার। কিন্তু আজকাল হলুদ ও অপ-সাংবাদিকতার পাশাপাশি কিছু কিছু সংবাদপত্রের অসচ্ছতা, অনিয়ম, স্বার্থান্বেষী মনোভাব ও সর্বোপরি নিজের মতো করে যত্রতত্র এর অপপ্রয়োগ প্রভৃতি বিষয় দেখে এ কথা বলতেই হয়, সংবাদপত্র যেন এখন আর সমাজ বদলের হাতিয়ার নয়! অনেকটা ব্যক্তিন্নোয়ন বা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করছে।

দৈনিক প্রথম আলোর একটি গ্রাফিক্স কার্ড প্রসঙ্গ নিয়েই বলি। যা নিয়ে সারাদেশে চলছে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। যেখানে বলা হয়েছে- "পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।" পুরো বাক্যটি আমার কাছে বানোয়াট মনে হচ্ছে। খেয়াল করুন, আমাদের পেটে ভাত না জোটায় আমরা কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি। একদম সংক্ষেপে যদি বলি- স্বাধীনতার বিপরীত শব্দ পরাধীন। সুতরাং পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছি এবং পৃথিবীর প্রায় দেশ একই কারণে স্বাধীনতা চেয়েছে। ‘বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়।’ এটা মানা যায়। কিন্তু পরের বাক্য- ‘আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।’ এর মধ্যে আবার ঝামেলা আছে। মাছ-মাংস ও চাইলের স্বাধীনতা বলতে কি বুঝাইলো? মাছ-মাংস, চাইল কী কেউ বন্দী করে রেখেছে বা কেউ কি কিনতে দিচ্ছে না যে স্বাধীনতা চাইতে হবে? কিংবা আমরা কি মাছ-মাংস, চালের কম দামের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি?
মজার বিষয় হচ্ছে,ঐ দিনই প্রথম আলোর আরেকটি রিপোর্টেই দেখানো হয়েছে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে সমস্ত সেক্টরেই কয়েকগুণ এগিয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তারা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান দেখিয়েছে। যেখানে দেখানো হয়েছে, জিডিপির আকার, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি আয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গড় আয়ু, ডলারের দাম, সাক্ষরতার হার সবকিছুতেই বাংলাদেশ অনেক অনেক এগিয়ে পাকিস্তান অপেক্ষা। পাকিস্তান বাংলাদেশ অপেক্ষা ৮ গুণে বড় হলেও তারা আমাদের মতো এগিয়ে যেতে পারেনি। কারণ তাদের রাজনৈতিক এবং পলিসিগত দিক দিয়ে পরিকল্পনার অভাব। যার কারণে তারা পিছিয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতেও পাকিস্তানে ব্রয়লার মুরগীর মাংস কেজিতে ৬৫০ রুপিতে পৌঁছেছে। যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
দিনমজুর জাকির হোসেন টোটাল দ্রব্যমূল্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঠিক আছে, ভালো কথা। কিন্তু দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে স্বাধীনতাকে টেনে আনার কথা না নিশ্চয়ই। আমি তো টেনে আনি না। টেনে আনতে কাউকে দেখিওনি বা সম্ভাবনাও দেখছি না। এবং কোনো দেশের দ্রব্যমূল দিয়ে স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধও করা যায় না। যেমন আপনি খাইতে বা পরতে না পারলে জন্ম নিয়া প্রশ্ন তোলেন? নিশ্চয় না। তাহলে পুরো উদ্বৃতির উপস্থাপন নিয়ে ঝামেলা আছে কী না?
কিংবা মনে করে নিলাম- দিনমজুর জাকির কাব্যিক ভাষায় এভাবে বলেছেন বা বলতে পারেন। কিন্তু এটার প্রমাণ তো লাগবে ভাই।সাংবাদিকতায় প্রমাণ ছাড়া তো কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য না। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন- বন্ডু চন্দীদাস পারলে জাকির হোসেন কেন পারবেন না। বলা হয়ে থাকে, প্রাচীণ ভারতীয় কবি বন্ডু চন্ডীদাস কবিতার পরিবেশে না থেকেও আবহে না বৈষ্ণব পদাবলী লিখতে পেরেছিলেন। তাহলে দিনমজুর জাকির হোসেনও কবিতার পরিবেশে না থেকেও কেন লিখতে পারবেন না। যৌক্তিক প্রশ্ন। যদি বলে থাকে তাহলে প্রথম আলোর কাছে দাবি থাকলো তারা যেন অডিও বা ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ করে। তখন হিসেবটা অন্যরকম হবে। অনেকে প্রশ্ন তুলছে- রফিক আজাদের-‘ভাত দে হারাম জাদা, নাইলে মানচিত্র খাব।’ এটা যদি পত্রিকার শিরোনাম হতে পারে তাহলে জাকিরেরটা কেন হতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে, তবে জাকির সেই কথা বলেছে কী না, তার প্রমাণ চাই। নাকি আপনি নিজেই বানোয়টী করেছেন, তাও দেখতে চাই।আরও একটি সম্ভাবনা থেকে যায়- গ্রাফিক্স কার্ডটি বানিয়ে ১৭ মিনিট পরে সরিয়ে ক্ষমা চাওয়া প্রথম আলোর একটি চালাকিও হতে পারে। তারা দেশের প্রথম সারির পত্রিকা। এই কাটিংটা মুহুর্তে ভাইরাল হবে। দেশী-বিদেশী চক্ররা এই ডকুমেন্ট নিয়ে সক্রিয় হবে। তাদের সেই সুযোগটা করে দিতে পারে।একটা শিশুর হাতে ১০ টাকা ঘুষ দিয়ে তার নাম করে একটা সংবাদ পরিবেশন করা তা ও আবার স্বাধীনতা দিবসে এবং যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। এটা যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর আমাদের একটি নিয়মের ওপর থাকা উচিত। সাংবাদিক হচ্ছে জাতীর বিবেক। তাদের থেকেই মানুষ যা দেখবে তাই জানবে। প্রথম আলো বাংলাদেশের পত্রিকার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তাদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের আর কিভাবে বিশ্বাস করবে? তারা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেললো তাও স্বাধীনতা দিবসের মত এক মহান দিনে। স্বাধীনতার পরও একটি পক্ষ এখনো দেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্নকে তারই কন্যা শেখ হাসিনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তাও একটি বিশেষ পক্ষের সহ্য হচ্ছে না। তাহলে প্রথম আলো তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না তো?

এর আগেও দেশের উন্নয়ন নিয়ে প্রথম আলো মিথ্যে ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা তো পত্রিকার লিডই করে ‘পদ্মা সেতু হচ্ছে না!!’। অথচ দেশে আজ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। তাহলে প্রথম আলোর এমন মিথ্যে সংবাদে জাতীর সামনে কি তারা ক্ষমা চেয়েছে? এখানেই শেষ নয়। প্রথম আলোর সম্পাদক মহানবী হয়রত (মো:) সা. নিয়েও কটাক্ষ করেছেন যার জন্য তিনি বায়তুল মোকাররম গিয়ে প্রকাশ্যে ইমামের মাধ্যমে মুসল্লিদের কাছে ক্ষমা চান।
আর বিদেশীদের মনে হয় অপরাধীদের পক্ষে থাকাটাই চরিত্র। সাংবাদিক হলেই সব অপরাধ মাফ , আর অপরাধী ধরলে হিরো হয়ে যায়। মহান স্বাধীনতার অবমাননা করা, শিশুকে ১০ টাকা ঘুষ দিয়ে অপব্যবহার করা, শিশুর জীবনটাকে শঙ্কিত করে দেওয়া, এটা অমার্জনীয় অপরাধ।
ক্লাস ওয়ানে পড়া একটা শিশুকে এভাবে ব্যবহার করে নিউজ করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে চায়। এটা জঘন্য অপরাধ । এই জঘন্য অপরাধের জন্য তাদেরকে গ্রেফতার করলে বিদেশীরা ঝাপ দিয়ে পড়ে। যেসব দেশ বিবৃতি দিয়েছে সেসব দেশে কোন একটা শিশুকে যদি এভাবে এক্সপ্লয়েট করা হতো তারা কি করতো? কি ব্যবস্থা নিতো ? তাদের কাছে জানতে চাই ।

লেখক : সাজ্জাদ হোসেন চিশতী, গণমাধ্যম কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: