odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 27th January 2026, ২৭th January ২০২৬
বঙ্কিম ও নজরুলের সেই কালজয়ী সাহিত্যের চশমা দিয়া আজ আমাদের শিল্পায়ন ও দেশীয় শিল্পের বিকাশের এক করুণ অথচ শ্লেষাত্মক ব্যবচ্ছেদ

'পথিক, কি আসলেই দেশি পণ্য হারাইয়াছো?' : শিল্পায়নের ধোঁয়া আর আমদানির জোয়ারে দেশীয় শিল্পের 'তাতা থৈথৈ'

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৭ January ২০২৬ ১৫:৩৬

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৭ January ২০২৬ ১৫:৩৬

অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (দশম পর্ব)

শিল্পায়ন ও দেশীয় শিল্পের বিকাশ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই অমর ঝাউবন আজ টেক্সটাইল মিলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর কপালকুণ্ডলার সেই তন্তুজ মসলিনের বদলে আজ বাজারে সয়লাব বিদেশি সিন্থেটিক কাপড়ে। বঙ্কিমের নবকুমার যখন পথ হারাইয়াছিলেন, তখন তিনি এক কাপালিকের হাতে বলির অপেক্ষায় ছিলেন। আজ ২০৬ সালের বাংলাদেশের একজন দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা যখন কাঁচামালের সংকট কিংবা বিদেশি পণ্যের অসম প্রতিযোগিতায় হন্যে হইয়া চাকুরির বিজ্ঞাপন বা ঋণের আবেদনপত্র হাতে ঘোরেন, তখন তাঁহার অবস্থাও সেই দিকভ্রান্ত নবকুমারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে তফাত হইল—নবকুমারকে বলি দিতে চাহিয়াছিল এক জটাধারী কাপালিক, আর আজকের দেশীয় শিল্পকে প্রতিদিন তিলে তিলে বলি দিতেছে 'অনিয়ন্ত্রিত আমদানিনির্ভরতা নীতিহীন শিল্পায়ন' নামক একদল টাই-পরা আধুনিক কাপালিক।

১. নবকুমারের 'তাঁত' বিভ্রম ও আমদানির ঝাউবন

বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসে নবকুমারকে তাঁহার সহযাত্রীরা নির্জন বনে ফেলিয়া গিয়াছিল। আজকের দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের (SME) অবস্থাও ঠিক তেমনই। ব্যাংক ঋণের জটিলতা আর গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের মাঝে নীতি-নির্ধারকরা যেন সেই সহযাত্রী, যাহারা দেশীয় শিল্পকে এই প্রতিযোগিতার দুর্ভেদ্য অরণ্যে একা ফেলিয়া দিয়া আমদানিকৃত পণ্যের এলসি (LC) খোলা লইয়া মত্ত হয়।

নবকুমার পথ হারাইয়া কপালকুণ্ডলার দেখা পাইয়াছিলেন। কিন্তু আজকের তাঁতি বা মৃৎশিল্পী যখন তাঁহার পণ্যের ন্যায্য দাম না পাইয়া থমকিয়া দাঁড়ান, তখন কোনো সুন্দরী নয়, বরং এক বিদেশি পণ্যের ডিলার বঙ্কিমী ঢঙেই জিজ্ঞেস করে— "পথিক, তুমি কি দেশি পণ্যের মোহ হারাইয়াছো?" বঙ্কিমচন্দ্র আজ নরসিংদীর তাঁত পল্লীতে কিংবা জামদানির গ্রামে গেলে নিশ্চয়ই দেখিতেন, কারিগররা সুতার দামের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা হইয়া বসিয়া আছে। তিনি হয়তো তাঁহার ডায়েরিতে লিখিতেন, "যাহারা বিদেশি পণ্যের দালালি করিয়া দেশীয় শ্রমকে অবজ্ঞা করে, তাহারা কি স্বজাত্যবোধ হারাইয়াছে না কি হীনমন্যতার সাগরে ডুব দিয়াছে?" আজ আর কোনো কপালকুণ্ডলা আসিয়া মসলিনের গৌরব ফিরাইবার পথ দেখায় না, বরং বিদেশি জর্জেট আজ ইশারায় পথিককে জিজ্ঞেস করে— "পথিক, তুমি কি পৈত্রিক শিল্পের কদর হারাইয়াছো?"

পড়ুন নবম পর্ব— অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (নবম পর্ব) পুরো লেখাটি পড়ুন: 'পথিক, তুমি কি আসলেই পকেট হারাইয়াছো?'—সিন্ডিকেটের অরণ্যে দ্রব্যমূল্যের 'তাতা থৈথৈ' 👇

২. নজরুলের 'দুর্দিনের যাত্রী' ও প্লাস্টিকের রক্ত-তিলক

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁহার 'দুর্দিনের যাত্রী' প্রবন্ধে তরুণদের রক্ত-যজ্ঞের পূজারি হইতে বলিয়াছিলেন। আজ শিল্পায়নের বাজারে সেই রক্ত-যজ্ঞ চলিতেছে পরিবেশ ধ্বংসের নামে। নজরুলের প্রবন্ধে এক 'কাপালিক' ছিল, যাহার কপালে ছিল রক্ত-তিলক। আমাদের বর্তমান শিল্পায়নের আজকের কাপালিক হইল— 'পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন নদীখেকো কলকারখানা'

এই কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরের মতো নদীর তীরে তীরে ইটিপি (ETP) বিহীন কারখানা গড়িয়াছে। মন্দিরের শুভ্র বেদি যেমন রক্তে ভাসিয়া যাইত, আমাদের নদীগুলোর স্বচ্ছ জল আজ কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যালের রক্তে ভাসিয়া যাইতেছে। নজরুল যে 'ভৈরব-গান' গাহিয়াছিলেন জাগরণের জন্য, তা আজ কারখানার চিমনির ধোঁয়ার নিচে চাপা পড়িয়া দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হইয়াছে।

অপরিকল্পিত শিল্পপতিরা আজ নজরুলের সেই কাপালিকের মতো হাতে খড়্গ (দূষণ ও দখল) লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। তাহারা প্রতিদিন শিল্পের নামে প্রকৃতি বলি দেয় আর ডম্বরু বাজায়। জনতা (সাধারণ কারিগর) আজ নজরুলের ঢঙেই চিৎকার করিয়া বলে— "মাভৈঃ! আমরা কর্ম হারাই নাই, আমরা শুধু কারখানার বিষবাষ্পে নিশ্বাস হারাইয়াছি!"

৩. তাঁত ও কুটির শিল্পের হাহাকার: সেই 'রক্ত-আঁকা' মসলিন কোথায়?

নজরুল লিখিয়াছিলেন, "এই বনের পথই আমাদের চির চেনা পথ... সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক-কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা।" আমাদের দেশীয় তাঁত ও কুটির শিল্প আজ নজরুলের সেই "নিবিড় অরণ্য"। বিদেশি সস্তা প্লাস্টিক আর মেলামাইনের চাপে বাঁশ-বেত ও মৃৎশিল্প আজ "সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত"।

বঙ্কিমচন্দ্র আজ কোনো বিলাস বহুল শপিং মলে গেলে দেখিতেন, সেখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের আড়ালে দেশীয় পণ্যকে ব্রাত্য করিয়া রাখা হইয়াছে। তিনি নিশ্চয়ই আক্ষেপ করিয়া বলতেন, "ওগো আধুনিক নবকুমার, তুমি কি ঐতিহ্যের পথ হারাইয়া কেবল বিদেশি লেবেলের অরণ্যে ঘুরিতেছো?" নজরুলের সেই "রক্ত-ভুখারিনির তৃষ্ণাবিহ্বল জিহ্বা" আজ যেন সেই বৃহৎ পুঁজির সিন্ডিকেট, যাহারা টপটপ করিয়া ক্ষুদ্র শিল্পীদের শেষ রক্তবিন্দু শুষিয়া লইতেছে।

৪. শিল্প খাতের ব্যবচ্ছেদ: এক নজরে বিকাশের ‘তাতা থৈথৈ’ (ডাটা টেবিল)

কেন আমাদের দেশীয় শিল্পের পথিকরা বার বার পথ হারায়? নিচের টেবিলটি যেন আমাদের শিল্পায়নের এক ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্ট’:

৫. বিসিক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো: ডিজিটাল কাপালিকের তান্ডব নৃত্য

নজরুল লিখিয়াছিলেন, "রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল।" আমাদের শিল্প সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম অনেক সময় নজরুলের সেই "তান্ডব নৃত্যের" মতো—অনেক ঘটা করিয়া শিল্প মেলা করা হয়, কিন্তু মেলা শেষে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বঙ্কিমের সেই নবকুমারের মতো ঋণের দায়ে নির্জন বনে একা ঘুরিয়া বেড়ায়।

বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা যেমন নবকুমারকে সতর্ক করিয়াছিলেন, অর্থনীতিবিদরা আজ আমাদের তেমনি সতর্ক করিয়া বলিতেছেন— "পথিক, তুমি যদি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ (Backward Linkage) না গড়ো, তবে তুমি আমদানিনির্ভরতার অরণ্যে চিরতরে হারাইয়া যাইবে।" কিন্তু এই ডিজিটাল কাপালিকরা নজরুলের সেই মন্দিরে প্রতি রাতে দেশীয় মেধা বলি দিতেছে কেবল বিলাসদ্রব্য আমদানির বিনিময়ে।

৬. এসএমই ফাউন্ডেশন ও ব্যাংক ঋণ: নজরুলের বিদ্রোহ বনাম বঙ্কিমের আভিজাত্য

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় আভিজাত্য ছিল, যা আমাদের বড় বড় শিল্পপতিদের কর্পোরেট অফিসের জৌলুসের সাথে মেলে। কিন্তু সেই আভিজাত্যের আড়ালে নজরুলের সেই "দস্যি মেয়ের কড়া নাড়া"র মতো লুকাইয়া আছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ না পাওয়ার হাহাকার।

ব্যাংক ঋণের দোহাই দিয়া যে বড় বড় শিল্পপতিরা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়, বঙ্কিমচন্দ্র আজ সেই বৈষম্য দেখিলে নিশ্চয়ই তাঁহার চশমা খুলিয়া বলতেন, "ওগো ব্যাংক কর্মকর্তা, তোমরা কি শিল্প গড়িতেছো নাকি আমলাতন্ত্রের দেয়াল ভরাইতেছো?" নজরুলের সেই "সিংহ-শার্দূল" তেজ আজ অনেক উদ্যোক্তার নেই, তাহারা কেবল টেবিলের উপর জামানতের ফাইল সাজাইয়া সময় পার করে, মূল কাপালিকদের (ঋণ খেলাপি) ছোঁয়াও যায় না।

৭. অগ্নিরথ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: যখন 'মেড ইন বাংলাদেশ' কেবলই মরীচিকা

নজরুল লিখিয়াছিলেন, "আকাশ থেকে অগ্নিরথ নেমে এল। বলিদানের তরুণরা তাতে চড়ে ঊর্ধ্বে উঠে যেতে লাগল।" আমাদের জন্য সেই 'অগ্নিরথ' হইল তথাকথিত 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব' (4IR)। কিন্তু এই রথের গতির সাথে তাল মিলাইতে গিয়া আমরা কি দেশীয় স্বকীয়তা হারাইতেছি?

প্রযুক্তির ফ্লাইওভারের উপর দিয়া রোবোটিক্স চলিয়া যায়, আর নিচে হাতে বোনা জামদানির কারিগরটি বঙ্কিমের সেই লাইনের কথা ভাবে— "পথিক, তুমি কি যান্ত্রিকতার ভিড়ে কারুশিল্পের পথ হারাইয়াছো?" নজরুলের সেই "ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ" আজ আর তাঁত পল্লীর বারান্দায় শোনা যায় না; সেখানে শোনা যায় কেবল বিদেশি মেশিনের খটখট শব্দ।

৮. পরিশেষ: দেশীয় শিল্পের শিব জাগাবার পথ কি মিলিবে?

নজরুল বলিয়াছিলেন, "ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে।" আমাদের শিল্পের সেই 'শিব' হইল উৎপাদনশীলতা আর স্বনির্ভরতা। রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেবল 'আমদানির যজ্ঞশালা' আর ' বিদেশি পণ্যের শোরুম' না বানাইয়া একে দেশীয় কারিগরদের অধিকারের অবলম্বন হিসেবে রক্ষা করিতে হইবে। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যেমন অবশেষে ঘর পাইয়াছিলেন, আমাদের দেশীয় পণ্যও যেন একদিন বিদেশের বাজারে সগৌরবে নিজের আসন পাইবার নিশ্চয়তা পায়।

উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে আমাদের শেষ কথা— বড় বড় আমদানিকৃত ব্র্যান্ড দিয়া নয়, বরং একটি দেশের কুটির ও ভারী শিল্পের শক্তিতে তাহার উন্নতির বিচার করা হয়। নজরুলের সেই 'অগ্নিরথ' যেন কেবল বিদেশের কাঁচামাল আমদানির বাহন না হয়, বরং তা যেন হয় দেশীয় পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করিবার রথ।

যদি কোনোদিন বিদেশি পণ্যের দালালেরা আমাদের জিজ্ঞেস করে, "পথিক, তোমরা কি স্বদেশি চেতনার পথ হারাইয়াছো?" আমরা যেন বঙ্কিমী মৌনতায় না ডুবিয়া নজরুলের তেজে উত্তর দিতে পারি—

"আমরা পথ হারাই নাই! আমরা শপথ লইলাম, ওই আমদানিনির্ভরতার মন্দির আমরা চূর্ণ করিয়া দিয়া দেশীয় শিল্পের জয়যাত্রা প্রতিষ্ঠা করিবই!"

আপনার মতামত আমাদের জন্য অমূল্য। কলামটি ভালো লাগিলে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট বক্সে আপনার ভাবনা জানান।

— অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
 
#পথিক_তুমি_কি_হারাইয়াছো #দেশীয়শিল্প #আমদানিনির্ভরতা #বাংলাদেশঅর্থনীতি #নজরুলেরতাণ্ডব #বঙ্কিমেরঝাউবন #BangladeshEconomy #LocalIndustry #ImportDependence #NazrulSpirit #BankimChandra


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: