নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এখন এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে গত ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও সম্প্রতি সৌদি আরবের দুটি তেল শোধনাগারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেই আস্থার সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে রিয়াদ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একইসঙ্গে এই যুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষা ও সামরিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে।
শোধনাগারে হামলা ও সৌদির কঠোর হুঁশিয়ারি
বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ অত্যন্ত কড়া ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন ইরান যদি এখনই প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ না করে তবে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রিয়াদের রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের আস্থার সম্পর্ক এখন ধ্বংসের মুখে। গত বুধবার ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালালে তার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোয় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া চারটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে যার ধ্বংসাবশেষ একটি তেল শোধনাগারের কাছে পড়েছে।
সক্রিয় হতে পারে পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারির মতে সৌদি আরব যদি পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করবে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সম্পাদিত এই চুক্তির ধরন অনেকটা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো অর্থাৎ সৌদি আরবের ওপর হামলা মানেই পাকিস্তানের ওপর হামলা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে সৌদি আরব কার্যত পাকিস্তানের পারমাণবিক ছাতার (Nuclear Umbrella) সুরক্ষায় চলে আসবে যা ইরানের জন্য হবে এক বিশাল সামরিক চ্যালেঞ্জ।
হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
ইরান ও ইসরায়েলের এই পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি রপ্তানি হয়। এর ফলে সৌদি আরবের প্রতিদিনের তেল রপ্তানি ৭০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ৪০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশটি লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে সরবরাহ সচল রেখেছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও সামরিক অবস্থান
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে সরাসরি অবহিত করেছেন। তেহরান অবশ্য নিশ্চয়তা চেয়েছে সৌদি আরবের ভূমি ব্যবহার করে যেন ইরানের ওপর কোনো হামলা চালানো না হয়। তবে সংকটের গভীরতা এতটাই পাকিস্তান একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় নিজেদের সামরিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
উত্তেজনার কেন্দ্রে প্রক্সি গোষ্ঠী
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন ইরান সরাসরি এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করছে। রিয়াদে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও কাতারসহ এক ডজন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে যখন বৈঠক চলছিল তখনও রিয়াদের আকাশে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শোনা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন গত দুই সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করলেও সৌদি আরবের বর্তমান সামরিক বিকল্প বেছে নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: