odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 10th April 2026, ১০th April ২০২৬
শহরের বাজেটের কুম্ভকারখানায়, গ্রামীণ মাটিতে পড়ছে শিক্ষার হালকা আলো

শিক্ষাব্যবস্থায় বৃদ্ধিমান ব্যয় ও গরীবের চোখে সর্ষেফুল

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১০ April ২০২৬ ০২:২৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১০ April ২০২৬ ০২:২৮

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেট ক্রমাগত বাড়লেও সেই বাড়তি বরাদ্দের সুফল সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না গ্রামীণ শিক্ষায়; উন্নয়নের এই অসম বণ্টনের গল্পই প্রতীকীভাবে ধরা পড়ে ‘সর্ষেফুল’-এর বয়ানে, যেখানে বৈষম্য, অপচয় ও অপূর্ণ স্বপ্ন একসাথে জড়িয়ে আছে। শহরের দালানকোঠায় বাজেটের ঝলকানি চোখে পড়লেও গ্রামের মাটিতে তা রয়ে যায় অধরা, আর রাইনার চোখে দেখা সর্ষেফুল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি—যেখানে শেখার অধিকার এখনো অনেক শিশুর কাছে কেবলই স্বপ্ন। এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দের বাস্তব চিত্র, অপচয় ও দুর্নীতি, এবং বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে গ্রামীণ শিক্ষার পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন জাগে—বাজেট বাড়লেও কেন শিক্ষা উন্নত হচ্ছে না; গ্রামের শিশুদের চোখে সেই প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট, সর্ষেফুলের মতোই তাদের শিক্ষার স্বপ্ন আজও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সর্ষেফুলের আড়ালে লুকানো গল্প

পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধ, প্রেম এবং শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, ততটা হয়তো আর কোনো বিষয় নিয়ে হয়নি। তবু বাংলাদেশের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টিনের চালের স্কুল এমন এক গল্প শোনায়, যা এই বহুল আলোচিত বিষয়গুলোকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সেখানে ব্ল্যাকবোর্ডের চেয়ে ধুলোর স্তর একটু বেশি, আর স্বপ্নের চেয়ে বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা একটু বেশি স্পষ্ট। এই বৈপরীত্যই যেন সেই স্কুলের প্রতিদিনের বাস্তবতা—যেখানে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তা পূর্ণতার মুখ দেখে না।

সেই স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের যদি ভাষা দেওয়া যেত, তারা হয়তো বলত—“স্যার, আমাদের স্বপ্নগুলো নাকি ফাইলে ঢুকে গেছে। কিন্তু আমাদের হাতে এসেছে শুধু খাতা আর বাতাস।” এই বাক্যটি কেবল একটি আবেগঘন উক্তি নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন, যেখানে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে।

স্কুলের পাশেই বিস্তৃত সর্ষেফুলের মাঠ—হলুদ রঙের সেই উজ্জ্বলতা দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন প্রকৃতি নিজেই একটি নিখুঁত রিপোর্ট কার্ড তৈরি করেছে। সবকিছুই উজ্জ্বল, আশাব্যঞ্জক, সম্ভাবনাময়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব বেদনা। ফুলগুলো হাসছে, কিন্তু স্কুলটি যেন নীরবে কাঁদছে—অবহেলা, অভাব আর অসমতার ভারে।

এই গ্রামীণ স্কুলটিতে প্রায় দেড়শো শিক্ষার্থী পড়ে। তাদের মধ্যে অর্ধেকের হাতে পর্যাপ্ত বই নেই, আর যারা বই পেয়েছে, তাদের অনেকের বইই গত বছরের পুরোনো সংস্করণ। শিক্ষক আছেন তিনজন, কিন্তু নিয়মিত উপস্থিত থাকেন মাত্র একজন। বাকিরা নাকি প্রশিক্ষণে ব্যস্ত—যে প্রশিক্ষণের ফল শিক্ষার্থীদের কাছে খুব কমই পৌঁছায়।

স্কুলে একটি কম্পিউটার ল্যাবও রয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে “ডিজিটাল শিক্ষা কেন্দ্র”। দরজার উপরে বড় অক্ষরে লেখা এই নামটি যেন এক ধরনের প্রতিশ্রুতি—যেন ভেতরে প্রবেশ করলেই ভবিষ্যতের সঙ্গে পরিচয় হবে। কিন্তু দরজা খুললেই সেই প্রতিশ্রুতির ফাঁকফোকর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাস্তবতা জানিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ এখনো যেন ‘লোডিং’-এর অপেক্ষায় আটকে আছে।

ল্যাবে মোট দশটি কম্পিউটার রয়েছে, কিন্তু সচল মাত্র তিনটি। বাকি সাতটি নিঃশব্দে পড়ে আছে—যেন তারা নিজেরাই ব্যবহারের বাইরে চলে গেছে। একজন শিক্ষক হালকা হাসি দিয়ে বলেন, “চালু করতে গেলে আগে বিদ্যুৎ দরকার, তারপর ইন্টারনেট, তারপর সময়… এই তিনটার একটাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না।” তার এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে পুরো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—যেখানে প্রযুক্তি আছে, কিন্তু তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মৌলিক শর্তগুলো অনুপস্থিত।

এইভাবেই গল্পের শুরু হয়—একটি ছোট্ট স্কুল, কিছু অসম্পূর্ণ স্বপ্ন, আর এক বিশাল সম্ভাবনার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতার গল্প নিয়ে।

শহরের বাজেট: টাকা আছে, ব্যবহার নেই

বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ছে—এই খবর আমাদের মধ্যে স্বস্তি ও আশাবাদের অনুভূতি জাগায়। আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিই, বেশি বরাদ্দ মানেই উন্নত শিক্ষা, বিস্তৃত সুযোগ, এবং একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবতার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই সমীকরণটি সবসময় এতটা সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি উন্নয়নের পরিবর্তে নতুন ধরনের অসামঞ্জস্য ও অদক্ষতার জন্ম দেয়—যেখানে সম্পদের উপস্থিতি থাকলেও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয় না।

রাজধানীর একটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। সম্প্রতি সেখানে একটি নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে—চকচকে কাঁচে মোড়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, আধুনিক স্থাপত্যে সাজানো। বাইরে থেকে দেখলে সেটি যেন একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক, প্রায় সিনেমার দৃশ্যের মতো নিখুঁত। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই ধরা পড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই; অনেকেই বারান্দায় বসে ক্লাস করছে। অন্যদিকে ভবনের কিছু কক্ষ “মাল্টিমিডিয়া রুম” হিসেবে চিহ্নিত, কিন্তু সেগুলো তালাবদ্ধ—ব্যবহারের চেয়ে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত।

একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন, “আমাদের সময়ে ছাদ ফুটো ছিল, কিন্তু ক্লাস হতো। এখন ছাদ ঠিক আছে, কিন্তু ক্লাস কোথায় হবে সেটা ঠিক নেই।” এই মন্তব্যটি কেবল একটি প্রজন্মগত তুলনা নয়; এটি বর্তমান ব্যবস্থার এক গভীর সংকটকে তুলে ধরে—যেখানে অবকাঠামোর উন্নয়ন শিক্ষার মৌলিক কার্যকারিতাকে ছাপিয়ে গেছে।

শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক প্রকল্পে ব্যয় হয়। সেখানে নতুন ভবন, আকর্ষণীয় সাইনবোর্ড, স্মার্ট বোর্ড ও প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধার দিকে জোর দেওয়া হয়। কিন্তু একই সময়ে গ্রামের স্কুলগুলোতে যে মৌলিক চাহিদাগুলো জরুরি—যেমন পর্যাপ্ত বই, দক্ষ শিক্ষক, কিংবা একটি ভাঙা বেঞ্চ মেরামত—সেগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়: শহরে শিক্ষার “দেখানো” বাড়তে থাকে, আর গ্রামে শিক্ষার প্রকৃত “হওয়া” ক্রমশ সংকুচিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি কেবল বাজেটের পরিমাণ নিয়ে নয়, বরং তার বণ্টন ও ব্যবহারের দর্শন নিয়ে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সমানভাবে প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে এবং বাস্তব পরিবর্তন ঘটায়। অন্যথায়, বাড়তি বাজেট কেবল একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে—যা কাগজে উন্নয়নের গল্প বলে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

গরীবের চোখে সর্ষেফুল: বাস্তবের প্রতীক

রাইনা—দশ বছরের একটি মেয়ে, যার হাতে ধরা একটি পুরোনো, কিছুটা ছেঁড়া বই। বিকেলের নরম আলোয় সে বসে আছে সর্ষেফুলের মাঠে। চারপাশে হলুদ ফুলের বিস্তার, যেন প্রকৃতি নিজেই এক উজ্জ্বল স্বপ্নের চিত্র এঁকে দিয়েছে। বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকায়—সেই দৃষ্টিতে আছে কৌতূহল, আছে এক অদেখা ভবিষ্যতের টান। তার স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়, আবার একেবারেই ছোটও নয়—সে বড় হয়ে “কম্পিউটার চালাবে”।

কিন্তু এই স্বপ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের অজানা শূন্যতা। রাইনা এখনো স্পষ্ট করে জানে না, একটি কম্পিউটার কীভাবে চালু করতে হয়, কীভাবে কাজ করে সেই যন্ত্র। তার কাছে কম্পিউটার একটি ধারণা, একটি দূরের বাস্তবতা—যেটি সে শুনেছে, কল্পনা করেছে, কিন্তু ছুঁয়ে দেখার সুযোগ খুব কম পেয়েছে। একদিন তার শিক্ষক বলেছিলেন, “তোমরা ভালো করে পড়াশোনা করো, তাহলে তোমরাও শহরের মতো স্কুলে পড়তে পারবে।” এই বাক্যে ছিল আশার সুর, ছিল সম্ভাবনার ইঙ্গিত।

কিন্তু রাইনা তখন চুপচাপ ছিল। তার নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বাস্তবতার কঠিন উপলব্ধি। কারণ সে জানে, তাদের স্কুলেও একটি কম্পিউটার আছে—কিন্তু সেটি গত তিন মাস ধরে চালু হয়নি। যন্ত্রটি সেখানে আছে, কিন্তু কার্যত অনুপস্থিত; সম্ভাবনা আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। এই বৈপরীত্যই তার অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে গেছে।

রাইনার চোখে সর্ষেফুল তাই কেবল একটি ফুল নয়; এটি এক জটিল প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই হলুদ বিস্তার তার কাছে যেমন সৌন্দর্যের চিহ্ন, তেমনি এক অমীমাংসিত প্রশ্নেরও প্রতিধ্বনি—“আমার স্বপ্নটা কি সত্যি হবে?” এই প্রশ্নের ভেতরে আরেকটি গভীর আশঙ্কা লুকিয়ে থাকে—স্বপ্নটি কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি সেটিও কোনো একদিন বাজেটের ফাইলের ভাঁজে আটকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, কিন্তু সেই অজানার দিকেই তাকিয়ে রাইনা তার বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে—একটি ভবিষ্যতের আশায়, যা হয়তো এখনো লেখা বাকি।

বাজেটের প্রলেপ: বাইরে চকচকে, ভেতরে ফাঁকা

আমাদের দেশে উন্নয়নের এক অদ্ভুত ধারা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে—যাকে অনায়াসেই বলা যায় “দেখানোর উন্নয়ন”। এই ধরনের উন্নয়নে প্রকল্পের নাম হয় দীর্ঘ ও জাঁকজমকপূর্ণ, উদ্বোধনী বোর্ড হয় বিশাল, কিন্তু বাস্তব কাজের গভীরতা থাকে সীমিত। বাহ্যিক উপস্থাপনায় সবকিছু পরিপাটি ও চিত্তাকর্ষক, যেন উন্নয়নের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই চকচকে আবরণের ভেতরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, প্রকৃত অগ্রগতি কতটা হয়েছে, আর কতটা কেবল প্রদর্শনের জন্য নির্মিত।

শহরের অনেক স্কুলেই এখন স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে—বড় বড় স্ক্রিন, প্রজেক্টর, ভিডিও লেকচারসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তির সমাহার। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সবসময় এতটা আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকরা এই প্রযুক্তি ব্যবহারের যথাযথ প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে যন্ত্রপাতি থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না; প্রযুক্তি হয়ে ওঠে উপস্থিতির প্রতীক, কার্যকারিতার নয়।

অন্যদিকে গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন, কিন্তু সমানভাবে উদ্বেগজনক। সেখানে অনেক শিক্ষকই আন্তরিকভাবে পড়াতে চান, শিক্ষার্থীদের শেখানোর আগ্রহও প্রবল। কিন্তু তাদের হাতে নেই প্রয়োজনীয় উপকরণ, নেই প্রযুক্তিগত সহায়তা, এমনকি মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধাও অনেক সময় অনুপস্থিত। ফলে একদিকে শহরে ব্যবহৃত না হওয়া প্রযুক্তির স্তূপ, অন্যদিকে গ্রামে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব—এই বৈপরীত্যই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব রূপকে স্পষ্ট করে তোলে।

একজন প্রাক্তন শিক্ষা কর্মকর্তার কথায়, “প্রকল্পের টাকা আগে কাগজে খরচ হয়, তারপর বাস্তবে। আর বাস্তবে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।” এই ‘হালকা হয়ে যাওয়া’ কথাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে সমস্যার মূল সারমর্ম। বরাদ্দের পূর্ণতা বাস্তবায়নের পথে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়—প্রশাসনিক জটিলতা, অদক্ষতা কিংবা অনিয়মের কারণে। ফলে শেষ পর্যন্ত যে সম্পদ মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়, তা প্রায়শই প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে বাজেট কেবল একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি প্রতীকের মতো—যা বাইরে থেকে উন্নয়নের রঙিন ছবি আঁকে, কিন্তু ভেতরে বাস্তবতার ফাঁকফোকর ঢাকতে পারে না। সত্যিকার পরিবর্তন আনতে হলে তাই কেবল বরাদ্দ বাড়ানো নয়, বরং সেই বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

দুর্নীতি: শিক্ষার নীরব শত্রু

গ্রামের সেই স্কুলটিতে একদিন হঠাৎ করেই ঢাকার একজন কর্মকর্তা এসে পৌঁছালেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই পরিবেশে এক ধরনের অদৃশ্য তৎপরতা তৈরি হলো। প্রধান শিক্ষক দ্রুত ফাইলপত্র গুছিয়ে নিলেন, যেন সবকিছু সুশৃঙ্খল দেখায়। শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা ছাত্রছাত্রীরাও হঠাৎ করেই সোজা হয়ে বসে পড়ল—যেন এই মুহূর্তে তাদের আচরণই পুরো প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।

কর্মকর্তা চারপাশে তাকিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে প্রশ্ন করলেন, “কম্পিউটার ল্যাব আছে?”
প্রধান শিক্ষক একরকম অভ্যস্ত হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, “জি, আছে।”পরবর্তী প্রশ্ন, “চালু হয়?”
একটু থেমে, কিছুটা ইতস্তত করে উত্তর এল, “জি… মাঝে মাঝে।”

এই সংলাপের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্কুলের উঠোনে বসে থাকা ছাত্রদের ফিসফিস কথোপকথনে। তারা নিজেদের মধ্যে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করছে—“আজকে কি কম্পিউটার চালু হবে?” আরেকজন নিঃসংকোচে বলে ওঠে, “না, আজ শুধু দেখানোর দিন।” এই সরল বাক্যটিই যেন পুরো ব্যবস্থার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি—যেখানে বাস্তব ব্যবহার নয়, প্রদর্শনই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বিস্তৃত সমস্যার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে, শিক্ষা খাতে অনিয়ম যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব, শিক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে অস্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত ব্যয়, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গরমিল—সব মিলিয়ে একটি জটিল চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রে অর্থের প্রবাহ থেমে থাকে না, কিন্তু সেই প্রবাহ শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হয় না।

ফলে দুর্নীতি এখানে কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি শিক্ষার অগ্রগতির পথে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বাধা। এটি এমন এক শত্রু, যা প্রকাশ্যে নয়, বরং আড়ালে থেকে কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। আর যতদিন এই অদৃশ্য শত্রুকে চিহ্নিত করে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না যাবে, ততদিন উন্নয়নের বাহ্যিক চিত্র যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, তার ভেতরের শূন্যতা থেকেই যাবে।

কল্পনা বনাম বাস্তবতা

রাইনা এখনো স্বপ্ন দেখে—সেই স্বপ্নে আছে এক বিস্তৃত শহর, উঁচু দালানের ভেতর সাজানো আধুনিক স্কুল, আর সারি সারি কম্পিউটার যেখানে বসে সে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দেবে। তার কল্পনার এই জগৎ বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল, অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। কিন্তু বাস্তবতা এখনো তাকে বেঁধে রাখে একটি সীমিত পরিসরে, যেখানে সুযোগের চেয়ে অভাবই বেশি দৃশ্যমান।

একদিন তার পাশেই বসা এক সহপাঠী নিঃসঙ্গ স্বরে বলে উঠেছিল, “আমাদের স্কুলে যদি বিদ্যুৎটা ঠিকমতো থাকত, তাহলে আমরা এখনই কম্পিউটার শিখে ফেলতাম।” এই কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ বঞ্চনার ইতিহাস—যেখানে সামান্য অবকাঠামোগত ঘাটতিই ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়। রাইনা তখন হেসে জবাব দেয়, “আমাদের বিদ্যুৎ না থাকলেও কল্পনা তো আছে।” তার এই সরল উক্তি যেন বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার এক নীরব প্রতিবাদ।

আসলে এখানেই গ্রামীণ শিশুদের এক গভীর শক্তি লুকিয়ে আছে। তারা হয়তো কম পায়—কম সুযোগ, কম উপকরণ, কম সুবিধা—কিন্তু তাদের ভাবনার জগৎ বিস্তৃত ও উন্মুক্ত। এই কল্পনাশক্তি কোনো বাজেটের অঙ্কে ধরা পড়ে না, কোনো প্রকল্পের প্রতিবেদনে মাপা যায় না। বরং এই অদৃশ্য সম্পদই তাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পুঁজি, যা সঠিক সহায়তা পেলে একসময় বাস্তবতার সীমানাকেও অতিক্রম করতে সক্ষম।

শহর বনাম গ্রাম: একই দেশের দুই ছবি

রাজধানীর একটি কলেজে প্রবেশ করলেই মনে হয় যেন ভবিষ্যতের এক পরিপাটি সংস্করণে এসে পড়া গেছে। উঁচু ভবন, ঝকঝকে করিডর, আধুনিক যন্ত্রপাতি—সবকিছুই উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রমাণ বহন করে। কিন্তু সেই চকচকে আবরণের ভেতরে যখন ক্লাসরুমে ঢোকা হয়, তখন একটি ভিন্ন বাস্তবতা ধরা পড়ে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সবাই ব্যস্ত, সময়ের অভাব স্পষ্ট, কার্যক্রমও চলছে—কিন্তু শেখার গভীরতা কতটা, তা সবসময় পরিষ্কার নয়। এখানে গতি আছে, কিন্তু সেই গতির দিকনির্দেশ সবসময় সুস্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, গ্রামের একটি স্কুলে প্রবেশ করলে মনে হয় সময় যেন ধীর হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও থমকে আছে। পুরোনো বেঞ্চ, সীমিত উপকরণ, কখনো বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। তবুও এই সীমাবদ্ধতার মাঝেও একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—শেখার আন্তরিক ইচ্ছা। শিক্ষার্থীদের চোখে কৌতূহল, শিক্ষকদের চেষ্টায় এক ধরনের নীরব নিষ্ঠা, যা কোনো বাহ্যিক জৌলুসের ওপর নির্ভর করে না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি মূলত ব্যবস্থাপনার, অগ্রাধিকার নির্ধারণের, এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।

ধরা যাক একটি বাস্তবধর্মী উদাহরণ। ধরা যাক। একটা প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলো। লক্ষ্য—গ্রামের স্কুলগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষা পৌঁছানো।

বাস্তবে কী হলো?
২০% সরঞ্জাম পৌঁছালো।
৮০% কাগজে ঘুরল।
এই হিসাবটা খুব পরিচিত।

এবার এই বাস্তবধর্মী উদাহরণের ব্যাখ্যা দেখি। একটি প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো, যার উদ্দেশ্য—গ্রামের স্কুলগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। পরিকল্পনায় সবকিছুই সুসংগঠিত: আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, সংযোগব্যবস্থা। কাগজে-কলমে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে রূপান্তরমূলক। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে এসে চিত্রটি ভিন্ন হয়ে যায়।

দেখা যায়, মোট বরাদ্দের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ সরঞ্জাম সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়। বাকিটা—প্রায় ৮০ শতাংশ—নথিপত্র, অনুমোদন, প্রশাসনিক জটিলতা ও অদৃশ্য প্রক্রিয়ার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়; বরং এটি একটি বহুল পরিচিত কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন, যেখানে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে শহর ও গ্রামের এই দুই চিত্র একই দেশের হলেও যেন দুই ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলে। একদিকে আছে দৃশ্যমান অগ্রগতি, অন্যদিকে অদৃশ্য সম্ভাবনা। এই ব্যবধান ঘোচাতে হলে কেবল বাজেট বৃদ্ধি নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনাই হতে পারে প্রকৃত সমাধানের পথ।

কী করা যায়: বাস্তব কিছু পথ

শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বললে কোনো পরিবর্তন আসে না; বরং সমস্যার গভীরে নেমে তার কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই জরুরি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমাদের ভাবতে হবে কিছু সুসংগঠিত ও কার্যকর পদক্ষেপের কথা, যা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য হবে।

প্রথমত, অডিটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—তবে সেটি যেন কেবল দাপ্তরিক নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত অডিট হতে হবে মাঠপর্যায়ে, সরাসরি বিদ্যালয়ে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। একটি স্কুলে আসলে কী আছে, কী নেই, এবং কীভাবে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করা হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই হবে এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি গ্রামের মানুষ তার নিজস্ব বিদ্যালয় সম্পর্কে সবচেয়ে গভীর ও প্রামাণ্য ধারণা রাখে। তাদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করলে উদ্যোগগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহারকে সহজ ও প্রাসঙ্গিক করতে হবে। প্রতিটি স্থানে আধুনিক ও ব্যয়বহুল ল্যাব স্থাপন সম্ভব নয়, এবং সেটি সবসময় প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং একটি স্মার্টফোন, একটি প্রজেক্টর এবং সৌরশক্তির মতো সহজলভ্য উপায় ব্যবহার করেও শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। এখানে মূল বিষয় হলো প্রযুক্তির উপযোগিতা, জটিলতা নয়।

চতুর্থত, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এতে করে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং অপচয় বা দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে।

সবশেষে, শিক্ষকের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। একজন দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষকই শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো যত উন্নতই হোক না কেন, যদি শিক্ষক যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত ও প্রণোদিত না হন, তবে সেই উন্নয়নের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

শেষ দৃশ্য: সর্ষেফুলের আলো

শেষ দৃশ্যটি যেন এক নীরব অথচ গভীর প্রতীকের ভেতর দিয়ে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। বিকেলের নরম রোদে সর্ষেফুলের মাঠ স্বর্ণালি আলোয় ঝলমল করছে, আর সেই আলোয় বসে আছে রাইনা—খোলা বইয়ের পাতায় চোখ রেখে, অথচ তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার এক অদৃশ্য বাস্তবতা। হালকা বাতাস বইছে, বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে, যেন সময় নিজেই তাকে এগিয়ে নিতে চাইছে—কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়ার পথ এখনো পুরোপুরি নির্মিত নয়।

এই দৃশ্যের বিপরীতে কোথাও দূরে, শহরের কোনো প্রান্তে হয়তো এক নতুন ল্যাবরেটরির উদ্বোধন চলছে—ফিতা কাটা হচ্ছে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে, উন্নয়নের ঘোষণা উচ্চারিত হচ্ছে জোর গলায়। কিন্তু এই মাঠে, এই নির্জন বাস্তবতায়, উন্নয়নের সেই আড়ম্বরের কোনো প্রতিধ্বনি পৌঁছায় না। এখানে শিক্ষা এখনো একটি আকাঙ্ক্ষা, একটি অপেক্ষা—যা রাইনার মতো অসংখ্য শিশুর চোখে নীরবে বেঁচে আছে।

তবু এই গল্প কেবল বঞ্চনার নয়; এটি সম্ভাবনারও। সেই সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে উঠতে পারে, যদি বরাদ্দকৃত বাজেট কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে মাটির স্পর্শ পায়। সর্ষেফুলের মতোই শিক্ষা—শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়, তার প্রকৃত মূল্য নিহিত তার গভীরে, তার গন্ধে, যা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আর সেই গন্ধ যদি একদিন সত্যিই গ্রামে পৌঁছে যায়, তবে রাইনার চোখে সর্ষেফুল আর কেবল প্রতীক হয়ে থাকবে না; তা রূপ নেবে এক স্পর্শযোগ্য, বাস্তব অর্জনে—যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান আর থাকবে না।

️ অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিক্ষাব্যবস্থা #বাংলাদেশশিক্ষা #গ্রামীণশিক্ষা #শিক্ষাদুর্নীতি #বাজেটঅপচয় #সর্ষেফুলেরগল্প #গ্রামেরস্কুল #শিক্ষাবৈষম্য #ডিজিটালবাংলাদেশবাস্তবতা #EducationCrisis #RuralEducation #Bangladesh #EducationInequality #SocialAwareness



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: