প্রকাশিত: ২৯ মে ২০২৬, ১২:৩০ এএম
অধিকার পত্র ডেস্ক:
রাজধানীর পোস্তা, টাউন হল, সায়েন্স ল্যাব, ধানমন্ডি ও কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবারও দেখা দিয়েছে পুরোনো সংকট। সরকার গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম বাড়ালেও বাস্তব বাজারে সেই দামের প্রতিফলন নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় প্রতি পিস চামড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম পাচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারা। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
ঈদুল আজহার দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ী, আড়তদার, ট্যানারি প্রতিনিধি ও মৌসুমি সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চামড়ার বাজার ঘিরে প্রতি বছরই বড় প্রত্যাশা তৈরি হলেও বছরের পর বছর ধরে অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেটনির্ভর বাজার, সংরক্ষণ সংকট এবং ট্যানারি শিল্পের দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিক্রেতারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সরকারি দর কাগজে, বাস্তবে নেই
চলতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা।
হিসাব অনুযায়ী ছোট আকারের একটি লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। মাঝারি আকারের চামড়া ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষায়, “সরকারি দর কাগজে আছে, বাজারে নেই।”
পোস্তায় ব্যস্ততা, তবু নেই স্বস্তি
রাজধানীর পোস্তা এলাকায় সকাল থেকেই জমে ওঠে কাঁচা চামড়ার বাজার। ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা।
কোথাও চামড়া বাছাই, কোথাও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ, আবার কোথাও দরদাম নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও বিক্রেতাদের চোখেমুখে ছিল হতাশার ছাপ।
অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা অগ্রিম টাকা দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছেন, তাদের উদ্বেগ আরও বেশি।
মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরাও বলছেন, চামড়া বিক্রির অর্থ তাদের শিক্ষা ও খাদ্য ব্যয়ের বড় উৎস। কিন্তু কম দামে বিক্রি হওয়ায় এবার সেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
“গত বছর ৮০০ টাকা পেয়েছি, এবার ৬৫০-ও মিলছে না”
কলাবাগান এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, তিনি ছোট ও মাঝারি মিলিয়ে ১৫টি চামড়া নিয়ে বিক্রির জন্য আসেন। প্রতি পিস ১ হাজার টাকা চাইলেও সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বলা হয়।
পরে তিনি দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও কোনো ক্রেতা রাজি হননি। ট্যানারির কর্মীদের কাছেও একই অভিজ্ঞতা হয় তার।
হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “গত বছর এই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার ৭৫০ টাকা হলেও ছেড়ে দিতাম। কিন্তু কেউ ৬৫০ টাকার ওপরে দাম বলছে না।”
কেন কম দাম?
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি, মূল সংকটের শুরু ট্যানারি পর্যায়ে। তাদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকেরা আগেভাগেই কম দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে আড়তদার ও ফড়িয়ারাও কম দামে চামড়া কিনছেন।
কলাবাগান এলাকার চামড়া সংগ্রহকারী পাভেল বলেন, “ট্যানারিগুলো বলছে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। রাসায়নিক, লবণ, শ্রমিক—সব কিছুর খরচ বেশি। তাই তারা বেশি রেট দেবে না। আমরা বেশি দামে কিনলে পরে লোকসান হবে।”
আড়তদার ও পাইকারদের মতে, শুধু চামড়া কেনাই নয়, সংরক্ষণ ও পরিবহন খরচও বেড়েছে। লবণের দাম, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিক মজুরি—সবকিছুই বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ট্যানারি মালিকদের ভিন্ন দাবি
তবে ট্যানারি মালিকেরা বলছেন, বাস্তবে দাম কমেনি। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি। আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি। বিকালের পর দাম আরও বাড়তে পারে।”
তার মতে, অনেক বিক্রেতা তাড়াহুড়ো করে কম দামে চামড়া বিক্রি করে দিচ্ছেন।
ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় অচল
গরুর চামড়ার বাজারে কিছুটা বেচাকেনা থাকলেও ছাগলের চামড়ার অবস্থা আরও ভয়াবহ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোথাও আবার বিনামূল্যেও দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ছাগলের চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এসব চামড়া কিনতেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
কোরবানি কম হওয়ায় চামড়াও কম
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ পশু। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাস্তবে কোরবানি কিছুটা কম হয়েছে।
ট্যানারি মালিকেরাও এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় কম।
টাউন হল এলাকার ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, “গত বছর দুপুরের মধ্যে দেড়শ’র বেশি চামড়া কিনেছিলাম। এবার একই সময়ে মাত্র ২০টা চামড়া কিনতে পেরেছি।”
সম্ভাবনাময় খাতেও কাটছে না সংকট
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প একসময় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে বিবেচিত হতো। তৈরি পোশাক শিল্পের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় খাত হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল এই শিল্পের।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি স্থাপনে ব্যর্থতা, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে না পারা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতায় খাতটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সেই দাম বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ট্যানারি শিল্পকে আধুনিক ও রফতানিযোগ্য মানে উন্নীত করতে না পারলে প্রতিবছরই কোরবানির ঈদে একই সংকট ফিরে আসবে।
চামড়ার বাজারে ফের সংকট, হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা
#চামড়া_শিল্প #কোরবানি #ট্যানারি #চামড়ার_দাম #ঈদুল_আজহা #বাংলাদেশ_অর্থনীতি #অধিকার_পত্র
চামড়ার দাম ঈদুল আজহা বাংলাদেশ অর্থনীতি মৌসুমি ব্যবসায়ী পোস্তা বাজার ছাগলের চামড়া কোরবানির চামড়া ট্যানারি শিল্প কাঁচা চামড়া চামড়ার বাজার

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: