নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
২০২১ সালের আগস্টে কাবুলের পতনের পর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে তালেবান। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে পাঁচটি বছর। এই পাঁচ বছরে কঠোর নিয়ম আর ফতোয়ার বেড়াজালে আফগান নারী ও মেয়েদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে জনসমক্ষ থেকে তাদের একপ্রকার মুছে ফেলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ লাইভ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে সেখানে নারীরা বন্দি জীবন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
বন্দিদশা ও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
অনেক আফগান নারী নিরাপত্তার স্বার্থে নাম গোপন রেখে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বন্দিশালায় অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এক নারী জানান, কারাগারে আমার সাথে এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যা আমি আজও আমার নিজের মায়ের কাছেও বলতে পারিনি। আফগানিস্তানের মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশের সাবেক সাংবাদিক জুহাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি চাই না আমার পুরো জীবনটা কেবল ঘরের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকুক।
কাবুল প্রদেশের এক ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট জানান, এখন তাদের কাছে স্বপ্ন পূরণ নয়, বরং কেবল "টিঁকে থাকা ও বেঁচে থাকাই প্রধান অগ্রাধিকার" হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, পেশায় জুয়েলারি কারিগর অন্য এক নারী আক্ষেপ করে বলেন, বিমানের পাইলট হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তা এখন আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মহামারির মতো ছড়াচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ও আত্মহত্যার প্রবণতা
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (UN Women)-র বরাতে বিবিসির আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা ইয়োগিতা লিমায় জানান, আফগানিস্তানের অন্তত ৭০ শতাংশ নারী তাদের মানসিক অবস্থাকে ‘খারাপ’ বা ‘খুবই খারাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক মনস্তাত্ত্বিক এই পরিস্থিতিকে "আত্মঘাতী চিন্তার এক মহামারি" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও চাকরি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে তৈরি হওয়া তীব্র হতাশা থেকে অনেক তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানান, আমার ক্লাসের অধিকাংশ মেয়েই আত্মহত্যার কথা ভেবেছে। আমরা সবাই ডিপ্রেশন ও চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছি, আমাদের কোনো আশা নেই।
বেত্রাঘাত ও প্রকাশ্যে শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি
বিবিসি আফগান সার্ভিসের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে দেশটিতে প্রকাশ্যে শারীরিক ও শারীরিক নির্যাতন বহুগুণ বেড়েছে। তালিবানের সুপ্রিম কোর্টের তথ্যানুযায়ী:
২০২৪ সালে: অন্তত ২৪১ জনকে (২১০ জন পুরুষ ও ৩১ জন নারী) প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে: এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯৫ জনে (৩১৭ জন পুরুষ ও ৭৮ জন নারী)।
তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাস্তব সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক শাস্তির ঘটনা তালিবান সরকার তাদের ওয়েবসাইটে বা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করে না।
নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে নারীদের অধিকার
কাবুলে উপস্থিত বিবিসির চিফ ইন্টারন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট লাইস ডুসেট (Lyse Doucet) জানান, একের পর এক জারি করা কঠোর ফতোয়া আফগান নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাদের ঘরবন্দি করে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকরা নারীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: