odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Saturday, 15th August 2026, ১৫th August ২০২৬
আর্কটিকের বরফাচ্ছন্ন উত্তর সাগরপথকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে চীন ও রাশিয়া। তবে এই নতুন বাণিজ্যিক করিডর পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলেছে

বরফে ঢাকা সমুদ্রপথে চীন-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা: আর্কটিক রুটকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

Special Correspondent | প্রকাশিত: ১৫ August ২০২৬ ০০:৪০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ১৫ August ২০২৬ ০০:৪০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

বিশ্ব রাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চল ক্রমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বরফে ঢাকা এই অঞ্চলের উত্তর সাগরপথ (Northern Sea Route বা NSR) এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, বরং এটি চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত সহযোগিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই রুট ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উত্তর সাগরপথে জ্বালানি বাণিজ্য ও চীনের উপস্থিতি

সম্প্রতি ‘ক্রিস্টোফ ডি মার্জেরি’ নামক একটি এলএনজি ট্যাঙ্কার রাশিয়ার আর্কটিক এলএনজি-২ প্রকল্প থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহন করে উত্তর সাগরপথ পাড়ি দেয়। পরবর্তীতে সেটি রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপের একটি ভাসমান সংরক্ষণ ইউনিটে গ্যাস স্থানান্তর করে। স্যাটেলাইট চিত্র ও জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, একই প্রক্রিয়ায় আরেকটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ ‘আর্কটিক মুলান’ সেই গ্যাস চীনের বেইহাই বন্দরে পৌঁছে দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের অনেকেই এই রুট থেকে সরে দাঁড়ালেও চীন তার উপস্থিতি আরও জোরালো করেছে। বর্তমানে উত্তর সাগরপথে আন্তর্জাতিক পরিবহনের একটি বড় অংশই চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

পোলার সিল্ক রোড ও দুই নেতার স্বপ্ন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উত্তর সাগরপথকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডরে পরিণত করতে চান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায় তিনি এই মৌসুমী রুটটিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৮ সালে ‘পোলার সিল্ক রোড’ ধারণা সামনে আনেন, যা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের একটি সম্প্রসারিত রূপ। চীনের জন্য এই রুটের গুরুত্ব কেবল জ্বালানি আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তারের এটি একটি বড় সুযোগ। বর্তমানে অন্তত ছয়টি চীনা শিপিং কোম্পানি এই মৌসুমে ৫০টিরও বেশি যাত্রা পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে উত্তর সাগরপথের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

পশ্চিমা উদ্বেগ ও পরিবেশগত ঝুঁকি

চীন ও রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো আশঙ্কা করছে যে, বাণিজ্যিক সহযোগিতার আড়ালে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। ইতিপূর্বে আর্কটিক অঞ্চলে দুই দেশের যৌথ বোমারু মহড়া এবং কোস্ট গার্ডের যৌথ অভিযান সেই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও, পরিবেশবাদীরা আর্কটিক অঞ্চলের সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এই অঞ্চলে তেল ছড়িয়ে পড়া বা অন্য কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই কারণে বিশ্বের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক পরিবহন প্রতিষ্ঠান এই রুট বর্জন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই রুট আরও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দশকে উত্তর সাগরপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্ব।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: