নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম
মুঠোফোন, ট্যাবলেট ও টেলিভিশনের মতো ডিজিটাল ডিভাইস এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এসব ডিভাইস ব্যবহারের সময় অভিভাবকের সক্রিয় উপস্থিতি ও কনটেন্টের ধরন শিশুর ভাষা ও বাচনিক দক্ষতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সবসময় পাশে থাকেন মাত্র ২০ শতাংশ অভিভাবক। আর স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন ৩০ শতাংশ অভিভাবক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের এমফিল গবেষণায় তিন থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘শিশুদের বাক ও ভাষা বিকাশে স্ক্রিন টাইমের প্রভাব: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন মো. জাহিদ হোসাইন খান। গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিলেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ।
৮০ শতাংশ শিশু দেখে বিনোদনমূলক কনটেন্ট
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের তিন থেকে আট বছর বয়সী ৫০ শিশু এবং সমসংখ্যক অভিভাবক ও কেয়ারগিভারকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৪০ শতাংশ প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা এবং ২০ শতাংশ চার ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়। শিশুদের প্রধান ডিজিটাল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ৯০ শতাংশ শিশু। এরপর রয়েছে টেলিভিশন ৭০ শতাংশ এবং ট্যাবলেট ৫০ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৮০ শতাংশ শিশু কার্টুন ও অন্যান্য বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখে। প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু স্ক্রিনের সামনে মূলত নিষ্ক্রিয়ভাবে সময় কাটায়।
কনটেন্টের ধরন ও শিশুর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—শিশু কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছে, তার পাশাপাশি কী দেখছে এবং কীভাবে দেখছে, সেটিও ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষামূলক ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ অ্যাপ ব্যবহারকারী তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে নতুন শব্দ পুনরাবৃত্তি করা, প্রশ্ন করা এবং বাক্য গঠনে অগ্রগতির মতো আচরণ দেখা গেছে।
অন্যদিকে, শুধু কার্টুন বা ইউটিউব ভিডিও দেখায় অভ্যস্ত শিশুদের কথা বলার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। স্ক্রিন বন্ধ করে দিতে বললে কিছু শিশুর মধ্যে কান্না বা জেদের মতো প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা হয়।
ছয় থেকে আট বছর বয়সী শিশুরা কনটেন্ট নিয়ে তুলনামূলক বেশি কথা বললেও তাদের বাক্যের কাঠামোগত দুর্বলতা গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে।
অভিভাবকের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি
গবেষক মো. জাহিদ হোসাইন খানের মতে, ভাষা শেখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দ্বিমুখী কথোপকথন। কিন্তু স্ক্রিনে শিশুর একমুখী যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়।
অভিভাবক যদি শিশুর পাশে বসে কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন করেন, শিশুর সঙ্গে আলোচনা করেন এবং নতুন শব্দের ব্যবহার ব্যাখ্যা করেন, তাহলে স্ক্রিনের ব্যবহার শেখার কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া অভিভাবকদের ৫০ শতাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ভাষা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ৬০ শতাংশ অভিভাবক শব্দভান্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ মনে করেন, যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে স্ক্রিন শিশুদের ভাষা শেখায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলা শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরির সুপারিশ
গবেষণায় শিশুদের বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ, মানসম্মত বাংলা ভাষার শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের অধ্যাপক হাকিম আরিফ বলেন, বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের সুস্থ বিকাশের ক্ষেত্রে স্ক্রিনটাইম বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। এ গবেষণা সেই ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গবেষণাটি মো. জাহিদ হোসাইন খানের এমফিল গবেষণার অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাঁকে এমফিল ডিগ্রি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: