odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 7th October 2026, ৭th October ২০২৬
অণুর একটি নির্দিষ্ট রূপ কীভাবে প্রাধান্য পায়—রসায়নের শত বছরের পুরোনো রহস্য উন্মোচনে গবেষণার স্বীকৃতি; ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে তাঁদের কাজ।

রসায়নে নোবেল পেলেন অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৭ October ২০২৬ ১৮:৫২

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৭ October ২০২৬ ১৮:৫২

অধিকার পত্র ডটকম | আন্তর্জাতিক

ঢাকা, ৭ অক্টোবর ২০২৬: অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে অ-রৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের মাধ্যমে রসায়নের শত বছরের পুরোনো এক রহস্যের সমাধান করায় ২০২৬ সালের রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী অঁরি বি. কাগান এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই।

বুধবার সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস চলতি বছরের রসায়নে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করে।

নোবেল কমিটির মতে, তাঁদের গবেষণা অণুর একটি নির্দিষ্ট রূপ কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাধান্য পেতে পারে—রসায়নের দীর্ঘদিনের সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিশেষ করে ওষুধসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতে তাঁদের গবেষণার তাৎপর্য রয়েছে।

অণুর ‘দর্পণ প্রতিবিম্ব’ রহস্য

জীবজগতের কিছু অণু, যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। এই দুই রূপ একে অপরের দর্পণ প্রতিবিম্বের মতো। রসায়নের ভাষায় এ ঘটনাকে বলা হয় ‘হোমোচিরালিটি’।

মানুষের দুই হাত যেমন একে অপরের দর্পণ প্রতিবিম্ব হলেও একইভাবে একটির ওপর আরেকটি পুরোপুরি মেলে না, অণুর ক্ষেত্রেও তেমন দুটি রূপ থাকতে পারে।

কিন্তু জীবন্ত কোষ ও প্রোটিনে সাধারণত এই দুই রূপের মধ্যে একটি রূপই প্রাধান্য পায়। প্রকৃতিতে কেন এমন একটি নির্দিষ্ট রূপের আধিপত্য তৈরি হয়েছে—বিজ্ঞানীদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের রহস্য ছিল।

ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে ওষুধ বা অন্যান্য রাসায়নিক তৈরির সময় আবার প্রায়ই দুটি রূপের সমান মিশ্রণ তৈরি হতো। ফলে কাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক বা চিকিৎসাগত প্রভাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াইয়ের গবেষণা এই রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দেয়।

কাগানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত

অঁরি কাগান ১৯৮৬ সালে এই রহস্য সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখান। তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে অণুর একটি নির্দিষ্ট রূপ অন্যটির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব হয়।

অপ্রতিসম অনুঘটনে তাঁর গবেষণা পরবর্তীতে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

অধ্যাপক কাগানকে জৈব রসায়নে অপ্রতিসম অনুঘটন গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৩০ সালের ১৫ ডিসেম্বর ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী ফ্রান্সের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল নাসিওনাল সুপেরিওর দে শিমি দ্য প্যারিসে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

প্রায় চার দশক তিনি ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস-সুদে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।

গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি উলফ প্রাইজ ও বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন মেডেলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।

সোয়াইয়ের যুগান্তকারী বিক্রিয়া

জাপানি জৈব রসায়নবিদ কেনসো সোয়াইও দীর্ঘদিন ধরে অণুর অপ্রতিসমতা ও রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে আসছেন।

১৯৫০ সালে জন্ম নেওয়া সোয়াই ১৯৭৯ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক সিন্থেসিসে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে যোগ দেন এবং বর্তমানে ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা করেন, যা হোমোচিরাল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তিনি ল্যাবরেটরিতে এমন একটি বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি রূপের মধ্যে কেবল একটি নির্দিষ্ট রূপ তৈরি হয়।

জীবন্ত কোষের বাইরে কৃত্রিম পরিবেশে এ ধরনের সাফল্য এর আগে দেখা যায়নি। তাঁর এই কাজ প্রকৃতির বাইরে কৃত্রিমভাবে হোমোচিরালিটি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সোয়াই জাপান সরকারের মেডেল উইথ পার্পল রিবন এবং জাপান একাডেমি প্রাইজসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।

ওষুধ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব

নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা রসায়নের দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তাঁদের গবেষণার ফলাফল কার্যকর ওষুধ ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের অণু তৈরি করার সক্ষমতা আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রসায়নে নোবেলের ইতিহাস

১৯০১ সালে রসায়নে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের দুই নতুন বিজয়ী যুক্ত হওয়ায় এ পর্যন্ত রসায়নে নোবেল বিজয়ীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০২ জনে।

তবে বিশ্বযুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়নি।

রসায়নে মাত্র দুই বিজ্ঞানী দুইবার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁরা হলেন ফ্রেডরিক সেঙ্গার, যিনি ১৯৫৮ ও ১৯৮০ সালে দুইবার পুরস্কার পান এবং কে. ব্যারি শার্পলেস, যিনি ২০০১ ও ২০২২ সালে দুইবার নোবেল লাভ করেন।

এ ছাড়া বিজ্ঞানী মেরি কুরি দুই ভিন্ন বিষয়ে নোবেল পেয়েছেন—১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে।

প্রথম রসায়ন নোবেলজয়ী ফান্ট হফ

১৯০১ সালে রসায়নে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানী ইয়াকোবুস হেনরিকুস ফান্ট হফ। রাসায়নিক গতিবিদ্যা এবং দ্রবণের অসমোটিক চাপ সম্পর্কিত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

২০২৫ সালে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক বা ধাতব-জৈব কাঠামো তৈরির যুগান্তকারী প্রযুক্তির জন্য জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া, যুক্তরাজ্য/অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড রবসন এবং জর্ডান/যুক্তরাষ্ট্রের ওমর এম. ইয়াগি যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পান।

নারী নোবেলজয়ীদের মধ্যে প্রথম মেরি কুরি

এ পর্যন্ত রসায়নে মোট আটজন নারী নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম ছিলেন মেরি কুরি, যিনি ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পান।

অন্যদিকে রসায়নে সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে ফ্রেডেরিক জোলিও-কুরির। ১৯৩৫ সালে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য স্ত্রী ইরেন জোলিও-কুরির সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর।

নোবেলের পুরো ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ডটি জন বি. গুডএনাফের। ২০১৯ সালে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উন্নয়নে অবদানের জন্য নোবেল পাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৯৭ বছর।

১০ ডিসেম্বর পুরস্কার প্রদান

রীতি অনুযায়ী, আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেলজয়ী অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াইয়ের হাতে মেডেল, ডিপ্লোমা ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হবে।