নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর নারী সদস্যদের ৭০ শতাংশ নিজেদের প্রস্তুত মনে করেননি বলে জানিয়েছেন দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ। তাঁর দাবি, এ কারণেই জাতীয় নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঢাকায় ব্র্যাক সেন্টারে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) আয়োজিত দিনব্যাপী এক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বুধবার প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
মারদিয়া মমতাজ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির মজলিসে শুরায় গণতান্ত্রিকভাবে নেওয়া হয়েছে।
নারী প্রার্থীদের প্রস্তুত করতে চায় জামায়াত
মারদিয়া মমতাজের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের অনেক পুরুষ সদস্য কারাগারে থাকায় তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব নারীদের নিতে হয়েছিল। ফলে অনেক নারী সদস্য নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেননি।
তিনি বলেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিরোধী নয় জামায়াত। তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে নারী সদস্যদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপযোগী করে গড়ে তোলার আশা করছে দলটি।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে মারদিয়া বলেন, এবার সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আশাবাদী তাঁরা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে: উমামা ফাতেমা
একই সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হাজারো নারী রাস্তায় নেমেছিলেন এবং আন্দোলন সংগঠিত করতেও ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু আন্দোলন শেষ হওয়ার পর রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ কমেছে।
তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে নারীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। নারী অধিকার নিয়ে কথা বললে তরুণীদের অনেক সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন—এমন ধারণার মুখোমুখি হতে হয়।
উমামা ফাতেমার মতে, দৃশ্যমান নারী নেতৃত্বের অভাব, নারীদের মধ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন কিছু অ্যালগরিদম, যা প্রচলিত লিঙ্গগত ধারণাকে আরও জোরদার করে, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনীতিতে তরুণ পুরুষদের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে নারীদের বাদ দিচ্ছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটছে না।
নারীদের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, রাজনৈতিক দলের কাঠামো সংস্কার এবং অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
#নারী নেতৃত্বকে স্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ দেওয়ার প্রশ্ন
সম্মেলনে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক, অধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নারীদের ভূমিকা, অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার এবং নারীর অধিকার প্রাতিষ্ঠানিক করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের নেতৃত্ব, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এবং ধর্মের সঙ্গে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিআইজিডির গবেষকেরা নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ ও এ বিষয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলাফলও উপস্থাপন করেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিআরএসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন এবং কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমেরিটা হোমা হুডফার।
**মূল পর্যবেক্ষণ:** জামায়াতের পক্ষ থেকে নারী সদস্যদের নির্বাচনী প্রস্তুতির ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে উমামা ফাতেমা রাজনৈতিক কাঠামো ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুই বক্তব্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
