odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Saturday, 31st October 2026, ৩১st October ২০২৬
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় শিক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকিতে; স্কুল থেকে ফেরার পথে নিহত ১৪ বছরের মোহাম্মদ, গুলিবিদ্ধ দুই ছাত্রী।

গাজায় স্কুলে যাওয়ার পথেও মৃত্যু, ইসরায়েলি হামলা ও গুলিতে নিহত ১০ শিশু

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩১ October ২০২৬ ১৮:৩৩

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩১ October ২০২৬ ১৮:৩৩

অধিকারপত্র ডটকম। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি :

ফিলিস্তিন, গাজা, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় দীর্ঘ বিরতির পর আবারও স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে শিশুরা। তাঁবু ও অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে শুরু হয়েছে পাঠদান। কিন্তু শিক্ষার পরিবেশে ফেরার সেই আশাও এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারদের গুলির ঝুঁকিতে পড়ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। কেউ প্রাণ হারাচ্ছে, কেউ গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে।

আলজাজিরার ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত মারাম হুমাইদের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গাজার শিশুদের এমন ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রতিবেদনে কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা, স্কুলে গুলিবর্ষণ এবং আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

 স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রাণ গেল ১৪ বছরের মোহাম্মদের

গত ১৭ অক্টোবর দেইর আল-বালাহ এলাকায় অস্থায়ী স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল ১৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ হামাদ। অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছিল তার শ্রেণির মেধাবী ছাত্রদের একজন।

১০ বছর বয়সী ছোট ভাই আবদুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে আল-বারাকা এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের চলার পথ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে মোহাম্মদ নিহত হয়। প্রাণে বেঁচে যায় তার ছোট ভাই।

মোহাম্মদের বাবা ৪৪ বছর বয়সী রিয়াদ হামাদ আলজাজিরাকে বলেন, ছেলে শুধু তার সন্তান ছিল না, ছিল বন্ধুর মতো। পড়াশোনায় ভালো ফল এবং অর্জন নিয়ে পরিবার গর্ব করত।

ছেলের মৃত্যুর পর ছোট ভাই আবদুল্লাহ একা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। আগে দুই ভাই একসঙ্গে স্কুলে যেত এবং ফিরত। এখন ভাইকে হারিয়ে তার মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর আতঙ্ক।

 স্কুলের সারিতে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী

গত ২১ অক্টোবর উত্তর গাজার জাবালিয়ার মুরাদিয়া স্কুলে সকালের সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। এ সময় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুয়াদ আবদ রাব্বো গুলিবিদ্ধ হয়।

গুলিটি তার হাঁটুর ওপরের অংশে ঢুকে স্নায়ু ও টেন্ডনের কাছাকাছি আটকে যায়। হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকেরা গুলিটি বের করতে পারেননি। তাঁদের আশঙ্কা, সেটি বের করতে গেলে পক্ষাঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।

সুয়াদের মা আলিয়া আবদ রাব্বো জানান, মেয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি খালি পায়ে ছুটে যান। মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও সুয়াদ এখন তাঁবুতে শয্যাশায়ী। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারছে না। সুস্থ হওয়ার জন্য বিদেশে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও গাজা থেকে বের হওয়ার ওপর ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সেই সুযোগ পাওয়া অনিশ্চিত।

একই ঘটনায় পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী আমিনা খাদরও গুলিবিদ্ধ হয়। তার পেটে সামান্য আঘাত লাগে। তবে শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিশুটি।

গুলির আতঙ্কে স্কুলে উপস্থিতি কমছে

মুরাদিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাইমা আলুশ জানান, স্কুলটিতে প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। ২০টি অস্থায়ী শিক্ষাকক্ষ বা তাঁবুতে চলছে পাঠদান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলের আশপাশে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গোলাবর্ষণ, কোয়াডকপ্টার ড্রোন ও স্নাইপারের গুলির ঝুঁকি রয়েছে। সুয়াদ ও আমিনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্কুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে যেতে স্কুলে ছুটে আসেন। পরবর্তী দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিও বেড়েছে।

আলুশ বলেন, প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় তাঁর মনে ভয় কাজ করে—কোনো শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষক আবারও গুলিবিদ্ধ হন কি না।

আমিনার বাবা খালেদ খাদর জানান, ঘটনার পর তাঁর মেয়ে স্কুলে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। একবার স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে সে দ্রুত ফিরে আসে। রাতে দুঃস্বপ্নেও সহপাঠীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।

 যুদ্ধবিরতির মধ্যেও প্রাণহানি

আলজাজিরার প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ১ হাজার ৫৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৬৮৭ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর গাজায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। কিন্তু স্কুল খোলার পরও হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

১৮ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০ শিশু এবং একজন শিক্ষক নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

২১ অক্টোবর জাবালিয়ার মুরাদিয়া স্কুলে সকালের সমাবেশের সময় দুই ছাত্রী আহত হয়। একই সপ্তাহে গাজা সিটির ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে হামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়, যাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর ছিল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থী, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

 ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি

গাজার তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার কাছাকাছি অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঝুঁকি আরও বেশি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে এই রেখা গাজার ভূখণ্ডকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিভক্ত করেছিল।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এক বছর আগে চুক্তিতে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশ ভূখণ্ডের পরিবর্তে ইসরায়েল এখন গাজার ৬৫ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। হলুদ রেখাটিও পশ্চিম দিকে সরে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রেখার কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ৬৬ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ওই অঞ্চলে স্কুলে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্নাইপারদের গুলি এবং বোমা হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

 শিক্ষা নাকি জীবন—দুইয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত

গাজার অভিভাবকদের সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন—সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেবেন, নাকি নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখবেন?

আমিনার বাবা খালেদ খাদর বলেন, শিশুদের পড়াশোনার জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় সেই পরিবেশ নেই, বিকল্প ব্যবস্থাও নেই।

অন্যদিকে সুয়াদের মা মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুদ্ধের সময় দক্ষিণ গাজার দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নেওয়ার পর আবার উত্তর গাজার জাবালিয়ায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁর মধ্যে অনুশোচনা কাজ করছে।

গাজার শিশুদের জন্য স্কুল এখন শুধু শিক্ষার জায়গা নয়; অনেকের কাছে এটি নতুন করে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুঝুঁকির আরেক নাম।

শিক্ষা যেখানে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেখানে গাজার শিশুদের প্রতিদিনের লড়াই এখন বেঁচে থাকা এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার।

 অধিকার পত্র ডটকমের সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ

গাজার শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার সংকট কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের ওপরও আঘাত। যুদ্ধের কারণে বছরের পর বছর শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখন স্কুলে ফেরার পরও যদি শিশুরা গুলি ও বোমার ভয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে না পারে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গাজার শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

 

স্কুলে যাবে, নাকি প্রাণ বাঁচাবে? গাজায় শিশুদের শিক্ষাজীবন এখন মৃত্যুর মুখে!

বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা শিশুদের। অথচ গাজার শিশুদের প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া মানেই জীবনের ঝুঁকি। স্কুল থেকে ফেরার পথে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ গেছে ১৪ বছরের মোহাম্মদের। স্কুলের সারিতে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুয়াদ। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামছে না প্রাণহানি। গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎ কি তবে ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়বে?

#Gaza #Palestine #Israel #GazaChildren #EducationUnderFire #StopTheWar #HumanRights #Odhikarpatra