odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 24th March 2026, ২৪th March ২০২৬
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা: অগ্রগতির ইতিহাস, না কি ফিরে আসা পাকিস্তানি ভূতের ছায়া?

প্রাথমিক শিক্ষার ক্রমবিকাশ থেকে সংকট: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পাকিস্তানি ভূতের ফিরে আসা ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আলো-অন্ধকার

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৩ March ২০২৬ ২২:৪৩

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৩ March ২০২৬ ২২:৪৩

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্কুল অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি—সবই ছিল সুসংগঠিত। পরে বিভিন্ন সরকারের উদ্যোগে মানোন্নয়ন এবং জেন্ডার প্যারিটি নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। ঝরে পড়ার হার বেড়ে ১৬% ছাড়িয়েছে। প্রায় অর্ধেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। শিক্ষক সংকট এবং প্রশিক্ষণ অভাবে ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ, দারিদ্র্য এবং প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক নীতি, পুনঃঅন্তর্ভুক্তি প্রোগ্রাম, উপবৃত্তি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পাকিস্তানি যুগের বৈষম্য ও অবহেলার ছায়া আবারও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্থায়ী হবে। আসলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় এইু নতুন সংকট যেনো পাকিস্তানি যুগের অবহেলার ভূতের আবার ফিরে আসা

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষা-স্তর নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি। এই স্তরেই শিশুর জ্ঞান, মূল্যবোধ, দক্ষতা এবং নাগরিক চেতনার বীজ রোপিত হয়। একটি রাষ্ট্র কতটা টেকসই ও মানবিক হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে এই প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। কিন্তু সময়ের প্রবাহে দেখা গেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ খাত কখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, আবার কখনো নানামুখী সংকটে বিপর্যস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, দীর্ঘদিনের সেই অগ্রযাত্রা এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে—যেখানে অতীতের অন্ধকার ছায়া যেন আবার ফিরে আসছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় যে সংকটের চিত্র সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনকই নয়, বরং অশনি সংকেত বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত সফলতা যেন হঠাৎ করেই স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি উদ্যোগ ও চলমান প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা কমে গেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে, এবং ঝরে পড়ার হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অনেকের কাছেই এই পরিস্থিতি সেই পাকিস্তান আমলের প্রাথমিক শিক্ষার অবহেলিত বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—যেখানে শিক্ষা ছিল নীতিগতভাবে প্রান্তিক।

এই সংকট কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রশাসনিক অদক্ষতা, নীতি বাস্তবায়নে শৃঙ্খলার অভাব এবং অর্থনৈতিক চাপ একত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে দুর্বল করে তুলছে। বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি সেই পুরোনো বৈষম্যমূলক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

একসময় সরকার বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়ে টেনে আনার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, এখন তার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষায় টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক সংকট শিশুশ্রম ও স্কুলত্যাগের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরেই যদি এই ভাঙন শুরু হয়, তবে তার প্রভাব পুরো শিক্ষাজীবনে পড়বে। এতে শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। এই উল্টোদিকের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র যে অঙ্গীকার করেছিল—প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা—তার বাস্তবায়ন বিভিন্ন সময়ে এগিয়েছে, আবার থমকেও গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে: আমরা কি আবার সেই পুরোনো অবহেলার চক্রে ফিরে যাচ্ছি? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার এই পিছিয়ে পড়া বাস্তবতা তাই শুধু একটি খাতের সংকট নয়, বরং একটি বৃহত্তর নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে গেলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতেই হয়। পাকিস্তান আমলের প্রাথমিক শিক্ষা যে “বৈষম্য ও অবহেলার যুগ” হিসেবে পরিচিত, তা কোনো অলঙ্কারমূলক বক্তব্য নয়—বরং কঠোর বাস্তবতা। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশনের সুপারিশ প্রাথমিক শিক্ষাকে কার্যত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে ‘উটোপিয়ান’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে সরাসরি সরে দাঁড়ানোর শামিল। একইসঙ্গে ইংরেজি ও উর্দুকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষাকে বেসরকারিকরণের প্রস্তাব একটি বৈষম্যমূলক কাঠামোকে আরও পোক্ত করে।

এই নীতির বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যে শিক্ষা আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়, কিছু সুপারিশ প্রত্যাহারও হয়, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব উন্নয়ন হয়নি। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ১৯৪৭-৪৮ সালে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৯,৬৩৩টি, তা ক্রমেই কমতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানে বেশি বিনিয়োগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত খারাপ হয়ে পড়ে, অবকাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। ইয়াহিয়া খানের আমলে (১৯৬৯-৭১) কোনো নতুন প্রকল্প বা বাজেট বৃদ্ধি না হওয়ায় এই অবহেলা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা তখন বৈষম্য ও উপেক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার এক ঐতিহাসিক সুযোগ পায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৪ সালে ‘প্রাইমারি স্কুলস (টেকিং ওভার) অ্যাক্ট’ পাস করে ৩৬,০০০-এর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা পান এবং শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়। একই সময়ে কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ বছর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে, এবং সরকার প্রায় ১১,০০০ নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করে। এসব পদক্ষেপ প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্রীয় কাঠামোর মধ্যে এনে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষার দরজা উন্মুক্ত করে। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৫-১৯৮১) শিক্ষকদের বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অডিট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হয়। ১৯৭৯ সালে শামসুল হক কমিটি প্রাথমিক ও প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ওপর জোর দেয়। যদিও বড় কোনো আইনগত পরিবর্তন হয়নি, তবুও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী হয়।

এরশাদ আমলে (১৯৮২-১৯৯০) প্রাথমিক শিক্ষাকে আইনি বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয়। ১৯৯০ সালের ‘প্রাইমারি এডুকেশন (কম্পালসরি) অ্যাক্ট’ শিক্ষাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে। গ্রামীণ মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং বিনামূল্যে বই সরবরাহ শিক্ষার প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬) দরিদ্র ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি পরবর্তীতে উপবৃত্তি কর্মসূচিতে রূপ নেয়, যা শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। মেয়েদের শিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে নেট এনরোলমেন্ট ৯৭ শতাংশে পৌঁছে এবং জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১ ও ২০০৯-২০২৪) প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-১ থেকে PEDP-৪) বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সার্বজনীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। নেট এনরোলমেন্ট ৬৮ শতাংশ থেকে ৯৮ শতাংশে উন্নীত হয়, কমপ্লিশন রেট ৮২ শতাংশের বেশি হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, নতুন কারিকুলাম প্রবর্তন এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তবে প্রশ্ন হলো—এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রার পরও কেন আবার সংকটের আভাস দেখা যাচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ের বাস্তবতা অনেককে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যে স্থবিরতা ও দুর্বলতা দেখা গেছে, তা অনেকাংশে সেই পাকিস্তানি আমলের অবহেলার মানসিকতার সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।

নীতির ধারাবাহিকতা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন অর্জিত অগ্রগতিও ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—শিক্ষাকে অবহেলা করলে তার মূল্য দীর্ঘমেয়াদে দিতে হয়। তাই এখনই সময়, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে আবারও জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসার।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রাথমিক শিক্ষায় যে সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার পেছনে সরকারি অবহেলার প্রশ্নটি ক্রমেই সামনে চলে আসে। দীর্ঘদিন ধরে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা যেন হঠাৎ করেই থমকে যায়। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা যায়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমতে থাকে, আর ঝরে পড়ার হার আবার বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে অনেকের কাছেই মনে হতে থাকে—প্রাথমিক শিক্ষায় যেন পাকিস্তান আমলের সেই অবহেলার ছায়া আবার ফিরে আসছে।

এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের ‘বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসএস)’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩.১৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.২৫ শতাংশে। প্রায় দেড় দশক পর এই উল্লম্ফন কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সংকেত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ছেলেদের ঝরে পড়ার হার মেয়েদের তুলনায় বেশি, যা পরিবারিক অর্থনৈতিক চাপে তাদের দ্রুত শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রবণতাকে নির্দেশ করে।

এর পেছনে মূল কারণগুলোও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিম্নআয়ের পরিবারের আর্থিক সংকট শিশুদের শিক্ষাজীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো বাধ্য হচ্ছে শিশুদের স্কুল থেকে সরিয়ে কাজে লাগাতে। যদিও সরকার ঝরে পড়া রোধে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পুনঃপ্রবর্তন এবং উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নিয়েছে, তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই পদক্ষেপগুলো বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই সময় আরেকটি বড় সংকট হিসেবে সামনে আসে শিক্ষক সংকট এবং প্রশিক্ষণের অভাব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি) এবং প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) চরম জনবল সংকটে ভুগছে। ইউআরসি-তে ৫০৫টি সহকারী ইনস্ট্রাক্টর পদের মধ্যে মাত্র ১৮ জন কর্মরত, আর পিটিআই-তে ১৩৩টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৫২ জন। এই বাস্তবতায় নতুন শিক্ষকরা প্রায় কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শিক্ষাবিদরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রযুক্তি সংযোজন শিক্ষার মান বাড়াতে পারে না। শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষক এবং কারিকুলাম। একজন শিক্ষক যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ না পান, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারবেন না, দক্ষতা গড়ে তুলতে পারবেন না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে।

প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক চিত্র আরও পরিষ্কার হয় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫,৫৯৬টি, যেখানে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ৬৪ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। গড়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৮১ শতাংশ হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা ৬৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত জাতীয়ভাবে ১:৪৩ হলেও অনেক এলাকায় তা ১:৭০ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখনো প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ পাননি।

এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রধান শিক্ষক সংকট। দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়োগে বিলম্ব, পদোন্নতিতে জটিলতা এবং মামলাজট এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে যে চিত্রটি সামনে আসে, তা উদ্বেগজনক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ, শিক্ষা খাতে ধারাবাহিক নজরদারি ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের অভাব থাকলে এমন সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন একটাই—এই সংকটকে আমরা সাময়িক বিচ্যুতি হিসেবে দেখব, নাকি এটি একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেব?

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যে কোনো সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সেই দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান ঘাটতি ছিল। বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর গতি কমে যাওয়া, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে স্থবিরতা, এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব—সব মিলিয়ে একটি অকার্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, নীতির চেয়ে অনিশ্চয়তা বেশি প্রভাব ফেলেছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে না-ও পারে, কিন্তু অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সচল রাখা তাদের ন্যূনতম দায়িত্ব। সেই জায়গায় ব্যর্থতা স্পষ্ট হলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এই সময়ের দুর্বলতাই দেখিয়ে দেয়, শিক্ষা খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু নীতি গ্রহণ নয়, তার ধারাবাহিক ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।

রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বিভিন্ন খাতে একের পর এক কমিটি গঠন এবং সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগ চোখে পড়লেও, শিক্ষাখাত—বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা—যেভাবে উপেক্ষিত থেকেছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন একজন নোবেলজয়ী শিক্ষক রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষস্থানে, তখনই যদি শিক্ষাব্যবস্থা অবহেলার শিকার হয়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক বৈপরীত্য। শিক্ষা সম্পর্কে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং নীতিগত অগ্রাধিকার তালিকায় শিক্ষা যেন ক্রমশ পেছনের সারিতে সরে গেছে।

শিক্ষা নিয়ে এই উদাসীনতা কেবল নীতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়। প্রাথমিক শিক্ষায় কার্যকর সরকারি মনিটরিংয়ের অভাব এখন স্পষ্ট। বিদ্যালয়ের উপস্থিতি, শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ—এসব মৌলিক বিষয়েও তদারকির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ছাড়া কোনো শিক্ষাব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না, অথচ সেই কাঠামোটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমিটমেন্টের ঘাটতি। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা নেই। অনেক উদ্যোগ কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষাকে ঘিরে রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির আশঙ্কা। যখন শিক্ষা একটি জাতীয় অগ্রাধিকার না হয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা, যা একটি জাতির ভিত্তি গড়ে তোলে, সেটিকে যদি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা না যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দুর্বল ভিত্তি তৈরি হবে।

অতীতের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই, পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল অবহেলা, বৈষম্য এবং নীতিগত দুর্বলতার শিকার। তখন শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি; বরং তা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির একটি উপেক্ষিত খাত। দুঃখজনকভাবে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার যে স্থবিরতা, মনিটরিংয়ের অভাব, শিক্ষক সংকট এবং ঝরে পড়ার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকাংশে সেই পুরোনো বাস্তবতার প্রতিধ্বনি মনে করিয়ে দেয়। পার্থক্য শুধু সময়ের, সমস্যার ধরনে নয়—অবহেলার চরিত্রে। ইতিহাস আমাদের একবার শিখিয়েছে, শিক্ষাকে অবহেলা করলে একটি জাতি পিছিয়ে পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিন্তু সেই শিক্ষা থেকে আমরা যদি আবারও সরে আসি, তাহলে সেটি কেবল নীতিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি জাতিগত দায়। তাই এখনই সময়, পাকিস্তানি আমলের সেই অন্ধকার অধ্যায়কে শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ রেখে, বাস্তবতায় তার পুনরাবৃত্তি রোধ করার। অন্যথায়, অর্জিত সব অগ্রগতি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অনিশ্চিত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে—যার দায় এড়ানোর সুযোগ কারো থাকবে না।

️ অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#প্রাথমিকশিক্ষা #শিক্ষাসংকট #বাংলাদেশ #শিক্ষাব্যবস্থা #ঝরেপড়া #শিক্ষকসংকট #শেখমুজিব #শেখহাসিনা #২০২৪শিক্ষা #পাকিস্তানিভূত #শিক্ষানীতি #বাংলাদেশশিক্ষা #শিক্ষা-সংস্কার

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: